-আপনি ২ নং সেক্টরে গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন, কখনো আক্ষেপ হয় না মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী চাওয়া পাওয়া নিয়ে ?
-নাহ, আমার কখনো আক্ষেপ হয় না। একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, এটা অনেক বড় পাওয়া। স্বাধীন দেশে বসে আক্ষেপের ভাবনাও ভাবছি এটা কম কিসে?

পুরান ঢাকার শিক্ষা-সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা রাইসুল ইসলাম আসাদ ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষে মনোবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৭১ সালে ২নং সেক্টরের গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে ঢাকার উত্তরে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তার গেরিলা কমান্ডার ছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।

যুদ্ধের পর সমমনা লোকদের সাথে নিয়ে ‘ঢাকা থিয়েটার’ গঠন করেন। তার অভিনয়ের শখ ছিল না মোটেই। অনেকটা নাটকীয়ভাবেই একটি চরিত্রের অনুপস্থিতির কারণে অভিনয় করা। সেটাই জীবনে প্রথম এবং তাও আবার কেন্দ্রীয় চরিত্রে। এবং সবাই প্রশংসাও করলো এবং তিনি নিজেও তার অভিনয়জ্ঞান সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারলেন। এরপর একই বছরের শেষ দিকে স্বাধীন বাংলা বেতারের আবদুল্লাহ বাকীর হাত ধরে বেতারে কাজ শুরু করেন। ওই বছরই শুরু হলো খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘আবার তোরা মানুষ হ’ (১৯৭৩) চলচ্চিত্রের কাজ। চরিত্রের প্রয়োজনে তাতে অভিনয়ও করলেন। সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী ও প্রয়াত বাদল রহমান তখন ভারতের পুনায় চলচ্চিত্রের ওপর শিক্ষাগ্রহণ (১৯৭৯) শেষে দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে জাকী চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন বলে স্থির করেছেন। তাদের করা মঞ্চ নাটকের প্লট নিয়ে ঘুড্ডি ও ঘূর্ণি নামে দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হবে। বিরতির আগে-পরে দেখানো হবে। রাইসুল ইসলাম আসাদের থাকার কথা ঘূড্ডির পেছনের দিকের সহকারী পরিচালক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করলেন, তখন তা ঘূর্ণি নয়, হয়ে গেল ঘুড্ডি। শুটিং শুরু হলো নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা কেল্লায় এক কস্টিউমে কোনো স্ক্রিপ্ট ছাড়াই। এখনো সেই ঘুড্ডির মতোই উড়ছেন। রাইসুল ইসলাম আসাদ অভিনয়ের পাশাপাশি গানও গেয়ে থাকেন! তিনি প্রথম গান গেয়েছিলেন ঘুড্ডি ছবিতে।

ঘুড্ডি চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে রাইসুল ইসলাম আসাদ

তিনি একাধারে একজন নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা, কাহিনিকার ও অভিনেতা। তিনি একাধারে মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন, সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন সর্বমোট ৬ বার। ৪ বার কেন্দ্রীয় চরিত্রে, দুবার পার্শ্ব চরিত্রে। এছাড়া একাধিকবার বাচসাস, আনন্দলোক, প্রযোজক সমিতি পুরস্কার এবং ভারতের সম্মানজনক ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড (এফজেএ)সহ বহু সম্মাননা অর্জন করেন।

সম্ভাবনাময় চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি দেখেন ‘গাজী রাকায়েতকে’। অন্যদিকে বাংলাদেশের শক্তিমান অভিনেতা সম্পর্কে তিনি বলেন- “হুমায়ুন ফরীদি আমার দেখা সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শক্তিমান অভিনেতা হতে পারত। কিন্তু নিজেকে শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের সস্তা গিমিকে পরিণত করার ফলে অনেকটাই অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। যে নিজেকে কখনোই সস্তা করতে চায়নি তাকেই শেষ পর্যন্ত পরাজিত হতে হয়েছে নষ্ট চলচ্চিত্রের বিক্রেতাদের কাছে। তবে এটাও সত্য, শিল্পী ফরীদির সমকক্ষও কেউ হতে পারেনি মঞ্চ-নাটক-চলচ্চিত্র যেটাই বলি না কেন।”

লালসালুর ভন্ডপীর ‘মজিদ’ কিংবা মৃত্তিকা মায়ার ‘ক্ষিরমোহন’, যে চরিত্রই হোক না কেন, তিনি অভিনয় করেন চরিত্রের ভেতরে ঢুকে। কোনো ক্ষুত তার অভিনয়ে মেলে নাহ। সস্তা বাণিজ্যিক ভাবধারার সিনেমায় গাঁ ভাসিয়ে না নেওয়ার জন্যে তার প্রতি সবসময় আলাদা একটি সম্মান আমার থাকবে। বাংলাদেশের শক্তিমান অভিনেতাদের তালিকা যদি করতে হয়, রাইসুল ইসলাম আসাদ হচ্ছেন সেখানে প্রথম দিকেই থাকবেন। তার মতো প্রথিতযশা অভিনেতাকে নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না ফেসবুকে। অথচ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, হুমায়ুন আহমেদের মতো মৃত্যুর পর শয়ে শয়ে ঠিকই পোস্ট করবো তাকে নিয়েও! তারচাইতে বরং চলুন, তার সম্পর্কে আমরা আরও তথ্য জানি, তা ছড়িয়ে দেই এই প্রজন্মের তরুণদের মাঝে। জীবিত অবস্থাতেই এই গুণীজনকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু দেই। যে মানুষটা দেশটাকে স্বাধীন করেছেন, দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছেন- এতটুকু তো তাঁর প্রাপ্যই, তাই না?

বাংলাদেশের এই মহান অভিনেতার প্রতি রইলো অগাধ সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

তথ্যসংগ্রহ:

১.উইকিপিডিয়া
২.ঢাকাটাইমস২৪.কম
৩.দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিডি.কম

লিখেছেন- Prodosh Bakshi, কৃতজ্ঞতা- ফেসবুক গ্রুপ বাংলা চলচ্চিত্র

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-