গত বছরের খবর। বগুড়া সরকারি মেডিক্যালের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, মেডিক্যালে আসা এক রোগীর স্বজনকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মারধর করছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের তদন্তের পর চারজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। এই ঘোষণার পর মেডিক্যালের সকল ইন্টার্ন চিকিৎসক কর্মবিরতি ঘোষণা করেন। তাদের কথা হচ্ছে, শাস্তি প্রত্যাহার করতে হবে।

তাদের সঙ্গে কর্মবিরতি কর্মসূচিতে যোগ দেয় রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা মেডিকেল কলেজ ও সিরাজগঞ্জের নর্থবেঙ্গল মেডিকেল কলেজের শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। পরদিন ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও কর্মবিরতি শুরু হয়।

এভাবে একযোগে সব মেডিক্যালে কর্মবিরতির কারণে রোগীরা চরম ভোগান্তির স্বীকার হোন। চিকিৎসার মতো একটি মৌলিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হন কেবল ইন্টার্ন চিকিৎসকদের স্বেচ্ছাচারী কর্মসূচিতে।

মন্ত্রনালয় অতঃপর কথিত একটা আশ্বাসের বিনিময়ে শাস্তি প্রত্যাহার করে নেয়। আশ্বাসটি ছিলো এই , ভবিষ্যতে এভাবে চিকিৎসা সেবাকে তারা আর জিম্মি করবেন না।

বাস্তবে এই আশ্বাস তারা রাখতে পারেন না। তাদের মতিগতি এবং কর্মসূচির চিত্র দেখলে মনে হয়, তারা হয়ত মনে করেন, তাদের জন্য কোনো আইন নেই। আইন থাকলেও তারা কেয়ার করেন না। কেয়ার কেনো করবেন? তারা কর্মবিরতি দিলে অসহায় রোগীর আত্মচিতকারে, আহাজারিতে যখন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যাবে না, তখন সব আইন ভেঙ্গে তাদের উপর আরোপ করা শাস্তি সরিয়ে তাদের আবার কর্মে বহাল করা হবে। কারণ, চিকিৎসা সেবা অসহায়, রোগীরা অসহায়। তাই এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা বারবার রোগীদের জিম্মি করেন, জিম্মি করে নিজেদের দাবি দাওয়া আদায় করে নেন, নিজেদের মুক্ত করেন রোগীদের শাস্তি দিয়ে।

চিকিৎসক, কর্মবিরতি, ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু, রাইফা, ম্যাক্স হাসপাতাল

গুগলে সার্চ দিলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন, চুন থেকে পান খসলেই চিকিৎসকরা কর্মবিরতি দিয়ে বসেন, হাসপাতালের কাজ বন্ধ রেখে নাকে তেল দিয়ে ঘুম দেন। তারা জানেন, তাদের কিছুই করতে হবে না, তাদের আবার জামাই আদর করে স্ব স্ব স্থলে ফিরিয়ে আনা হবে। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে চলে গেছে, ডাক্তাররা এখন নিজেদের ঈশ্বর ভাবতে শুরু করেছেন কি না কে জানে! তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়, তাদের যেনো কোনো ভুল হতে নেই, ভুল স্বীকার যেনো তাদের অভিধানে নেই, ভুলের শাস্তি যেনো তাদের জগতে নেই। তারা অন্য গ্রহের মানুষ, তারা মহান পেশার, তারা দেবতা। অদ্ভুত!

চিকিৎসক সমাজের সাম্প্রতিক জিম্মিনামার উদাহরণ চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতাল কান্ড।

২৯ জুন রাতে সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরোর স্টাফ রিপোর্টার রুবেল খানের আড়াই বছর বয়সী মেয়ে রাইফা খান চট্টগ্রামের মেহেদিবাগের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আকস্মিকভাবে মারা যায়।

অভিযোগ ওঠে মৃত্যুর পেছনে দায়ী ভুল চিকিৎসা ও হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা। রোগী মারা গেলে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার সংস্কৃতি বাংলাদেশে পুরানো। মানসিক কারণেই হোক বা অন্য কোনো কারণে, মানুষ ডাক্তারদের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়তে পছন্দ করে। ডাক্তাররাও এটা জানেন। তারা যে পেশা বেছে নিয়েছেন এটা থ্যাংকলেস জব। রোগী ভালো হয়ে গেলে খুব কম ক্ষেত্রেই এমন হয়, ডাক্তারকে কেউ ধন্যবাদ জানায়।

চিকিৎসক, কর্মবিরতি, ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু, রাইফা, ম্যাক্স হাসপাতাল

কিন্তু, ম্যাক্স হাসপাতালের ক্ষেত্রে যে অভিযোগ উঠেছে তদন্তে তার সত্যতা প্রমানিত হয়েছে।

সিভিল সার্জনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘শিশু রাইফা যখন তীব্র খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়, তখন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের অনভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতার অভাব দেখা যায়। ওই সময় সংশ্লিষ্ট নার্সদের এ রকম জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো দক্ষতা বা জ্ঞান কোনটাই ছিল না।’

প্রতিবেদনে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া, ম্যাক্স হাসপাতালের সার্বিক ত্রুটিপূর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা অতিদ্রুত সংশোধন করা সহ চারদফা সুপারিশ করা হয়েছে।

০৬ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনে ঘোষণা দেন, শিশু রাইফা খানের মৃত্যুর ঘটনায় যেসব ডাক্তার দায়ী, তাদের শাস্তি পেতেই হবে। তিনি বলন, কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তা কঠোরভাবে মোকাবেলা করা হবে।

কিন্তু আজ র‍্যাব ম্যাক্স হাসপাতাল সহ বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অভিযান চালানোর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তাদের পুরানো অস্ত্র দিয়ে, সেই অস্ত্র হলো তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য চিকিৎসা সেবা বন্ধ রাখবেন। সব বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন অভিযান চালানোর প্রতিবাদে!

চিকিৎসক, কর্মবিরতি, ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু, রাইফা, ম্যাক্স হাসপাতাল

কেন তারা প্রতিবাদ করছে জানেন? কারণ, অভিযানে হাসপাতালের ড্রাগ লাইসেন্স নবায়ন না করা, বাইরের রোগ নির্ণয়কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনাসহ ম্যাক্স হাসপাতালের নানা অনিয়মের তথ্য পায় র‍্যাব।

এইটুকুতেই অনির্দিষ্টকাল হাসপাতাল বন্ধের ঘোষণা এসেছে, তাহলে কি তারা আরো বড় আরো গভীর কোনো অনিয়ম লুকাতে চান? তারা কি রোগীদের জিম্মি করে রাইফা খানের মৃত্যুর দায়মুক্তি আদায় করে নিতে চান?

পারবেন হয়ত তারা, বেসরকারি হাসপাতাল, অনেক টাকা, হয়ত দুইদিন পর একটা আশ্বাস কিংবা ছোট খাটো ক্ষতিপূরণ দিয়ে আবার চিকিতসা ব্যবসা করতে বসে যাবেন, রোগীরা আসবে, তাদের জিম্মি করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবেন আপনারা। শুধু রাইফার জীবন ফিরে আসবে না, শুধু অনিয়মগুলো বৈধতা পেয়ে যাবে। হাসপাতাল, চিকিৎসক থেকে যাবেন আইনের আওতার বাইরে। এভাবেই কি চলবে চিরকাল?

তথ্য এবং ছবি- কালের কণ্ঠ, বাংলা ট্রিবিউন, ঢাকা টাইমস।

Comments
Spread the love