ভালোবাসা দিয়ে ঘৃণাকে জয় করা – এমন ব্যাপার-স্যাপার নাটক-সিনেমা বা গল্প-উপন্যাসেই সাধারণত দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবেও দেখা মিলবে এমন দৃষ্টান্তের, তাও আবার রাজনীতির কদর্য খেলার এক পর্যায়ে, তাও কি কখনও সম্ভব! কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হওয়া ঘটনাটিরই বাস্তব রূপায়ন ঘটল ভারতের লোকসভায়। আর এই অভাবনীয় ঘটনার মূল নায়ক কংগ্রেস সভাপতি বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী।

শুক্রবার ভারতীয় লোকসভায় রাহুল গান্ধী প্রায় এক ঘণ্টার তীব্র সমালোচনামুখর ভাষণ শেষ করে হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামনে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেন। আর এভাবেই অবতারণা ঘটে এক চরম নাটকীয় দৃশ্যের। ঘৃণার বিনিময়ে কিভাবে ভালোবাসা দিতে হয়, তীব্র সমালোচনা করলেও উদারতা কিভাবে মনে ধরে রাখতে হয়, তা-ই যেন তিনি বোঝাতে চাইলেন। 

রাহুল গান্ধী, নরেন্দ্র মোদি, লোকসভা

অবশ্য এর কতটুকু তিনি মন থেকে করেছেন আর কতটুকু নিছকই লোক দেখানোর খাতিরে, এ নিয়েও কিন্তু সন্দেহ ও সংশয়ের অবকাশ থেকেই যায়। আর সেই সুযোগ তৈরী করে দিয়েছেন রাহুল গান্ধী নিজেই। কারণ আলিঙ্গন শেষে নিজের সিটে ফিরে গিয়েই চোখ টেপেন তিনি, যা ক্যামেরার নজর এড়ায়নি।

শুক্রবার লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাবের আলোচনা আগাগোড়াই ছিল নাটকীয়তায় মোড়া। প্রধানমন্ত্রী মোদিকে এ যাবতকালের সবচেয়ে তীর্যক আক্রমন করেন রাহুল গান্ধী। ভাষণে মোদি সরকারের সমালোচনা যেমন করেন, তেমনি নিজ দলের প্রশংসাও করেন তিনি। পরে আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে অনাস্থা প্রস্তাবের আলোচনা শেষ করেন রাহুল। 

রাহুল গান্ধী, নরেন্দ্র মোদি, লোকসভা

ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতারা বিদ্রূপ করে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীকে ‘পাপ্পু’ বলে ডাকেন; যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘হাবাগোবা’ বা ‘বোকারাম’। এটা যে তাঁকে ঘৃণা করে ব্যবহার করা হয়, সেটা উল্লেখ করে রাহুল সরাসরি মোদির দিকে তাকিয়ে বলেন, “আমি জানি, আপনারা আমাকে ‘পাপ্পু’ বলে ডাকতে পারেন। কিন্তু আমি আপনাদের ভালোবাসি।” 

এ কথা বলেই তিনি নিজের আসন ছেড়ে সোজা প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে দাঁড়ান এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর রাহুল চলে যাচ্ছিলেন। পেছন থেকে মোদি তাঁকে ডাকলেন। রাহুলও কাছে গেলে দুজনে অল্প সময় কথা বলেন।

রাহুলের প্রচন্ড আক্রমণাত্মক ভাষণ, মোদিকে জড়িয়ে ধরা এবং শেষে নিজের সিটে ফিরে গিয়ে চোখ টেপা, এর প্রতিটি ঘটনাই তুমুল আলোড়ন ও সাড়া জাগিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। 

রাহুল গান্ধী, নরেন্দ্র মোদি, লোকসভা

অনেকেই রাহুলের মোদিকে আলিঙ্গনের ঘটনার সঙ্গে বলিউডের জনপ্রিয় ছবি ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’-এর মিল খুঁজে পেয়েছেন। বলা হয়েছে, সিনেমার মুন্নাভাইয়ের মতোই এক্ষেত্রে গান্ধীগিরি করেছেন রাহুল। হরসিমরত বাদল টুইট করেছিলেন, পার্লামেন্ট মুন্না ভাইয়ের পাপ্পি-ঝাপ্পির জায়গা নয়। পরের মুহূর্তেই জবাব আসে, নরেন্দ্র মোদি রাহুল গান্ধীর থেকে নিজের জড়িয়ে ধরার অভ্যাসের স্বাদ পেলেন। অঙ্কুর সিং সঙ্গে যোগ করেন, “এমনকি, তার চেয়েও বিশ্রী আলিঙ্গন (হাগ)।” সীতাংশু শুক্লা যোগ করলেন, “পাপ্পু মুন্না ভাই হয়ে গেলেন।” 

অপরদিকে, মোদির সাথে আলিঙ্গন ও খুচরো কিছু কথা শেষে নিজেঢ় সিটে ফিরে গিয়ে পাশের সতীর্থের দিকে তাকিয়ে রাহুল গান্ধীর চোখ টেপার ঘটনাকে নিয়েও শুরু হয়েছে দারুণ হৈচৈ। তুলনা টানা হয়েছে জনপ্রিয় মালয়ালম তারকা প্রিয়া প্রকাশ ভারিয়ারের সঙ্গে। ‘মানিকিয়া মালারয়া পুভি’ গানের মধ্যে প্রিয়ার ভুঁরু নাচিয়ে চোখ মারার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। রাহুলের সাথে সেটিরই যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন অনেকে। 

রাহুল গান্ধী, নরেন্দ্র মোদি, লোকসভা

বলাই বাহুল্য, নিজের এমন ভিন্নধর্মী কর্মকান্ডের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে সহিষ্ণুতার ভাষা শেখানোর চেষ্টা করেছিলেন রাহুল গান্ধী। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জবাবি ভাষণের শুরু থেকেই রাহুলকে আক্রমণের চেনা ছকই বেছে নেন। বক্তব্যের শুরু থেকেই রাহুলের একের পর এক মন্তব্যকে হাতিয়ার করে তাঁকে কটাক্ষ করেন মোদি। এমনকি তাঁর জড়িয়ে ধরার পিছনেও ‘ক্ষমতা দখলের প্রবল ইচ্ছা’- দায়ী বলে অভিযোগ করেন তিনি। বলেন, “যিনি আমার আসনে বসার স্বপ্ন দেখেন তিনি এখানে এসে আমাকে বললেন উঠুন, উঠুন। ক্ষমতা দখলের ইচ্ছা এতই প্রবল যে মানুষের উপর ভরসা না করে নিজেই আমাকে আসন থেকে সরাতে চলে এলেন!”

Comments
Spread the love