সবচেয়ে লুথা মার্কা মিউজিক কম্পোজ করে অস্কার পুরষ্কার পেয়েছে কে? উত্তরটা শুনলে চমকানোর সম্ভাবনা আছে। লোকটার নাম এ.আর. রহমান।

একটু খুলে বলা যাক ব্যাপারটা। এ আর রহমান অবশ্যই অস্কার পুরষ্কার পাওয়ার মতো কম্পোজার। একটা-দুইটা না, অস্কার পাওয়ার মতো গানের কম্পোজিশন তার অনেকই আছে। সমস্যাটা হলো, অস্কার পাওয়ার লেভেলের সেইসব গান যখন তৈরি হয়েছে, তখন এ. আর. রহমানকে তেমন কেউ চিনতোই না। তখনও তিনি এ আর রহমান হননি। ইন্ডিয়া ততদিনে অস্কারের পর্যায়ে চিন্তা-ভাবনাও করতো না।

আরেকটা বড় কারণ হলো, যে বছর তিনি অস্কার পেলেন, সেই বছর অস্কারে “বেস্ট অরিজিনাল স্কোর” ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য আর তেমন কোনো ভালো প্রতিযোগীও ছিলো না। ফলাফল হলো, এ. আর. রহমানের শ্রেষ্ঠ কম্পোজিশনগুলোকে ছাড়িয়ে অস্কার পেলো “স্লামডগ মিলিওনিয়ার” ছবিতে তার দেয়া, সম্ভবত ক্যারিয়ারের সবচেয়ে লুথা মার্কা এবং মূল্যহীন মিউজিক। আজকের দিনে স্লামডগের মিউজিক কেউ শোনে কিনা সন্দেহ আছে। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছে স্লামডগ। এই মুহুর্তে বাইরের বিশ্বে এ. আর. রহমানকে অনেকেই চেনে, কিন্তু তাকে “মূলত” চেনে ওই স্লামডগ ছবির “জয় হো” গানটার জন্য।

আমাদের নাইন্টিজ জেনারেশনের সৌভাগ্য, আমরা বড় হয়েছিলাম এ. আর. রহমানের প্রতিভা বিস্ফোরণের পিক আওয়ারে। সেইজন্য, এ. আর. রহমানের প্রথম দিককার কম্পোজ করা গানগুলো দুনিয়াব্যাপী খুব কম জনপ্রিয় হলেও, যারা টুকটাক মিউজিকের ব্যাপারে খোঁজ-খবর রাখেন, তারা জানেনঃ এ. আর. রহমান তার ক্যারিয়ারের সেরা কাজ করেছিলেন দুইটা ছবিতে।

একটার নাম “রোজা”, আরেকটার নাম “বম্বে”।

সম্প্রতি ইন্ডিয়ান আপকামিং মিউজিশিয়ানরা ইউটিউব মিডিয়াটাকে খুব সিরিয়াসলি নিয়েছেন। কারণটা হচ্ছে যে, এইটা একটা ওপেন প্ল্যাটফর্ম। আপনি যা ইচ্ছা তাই কম্পোজ করে ইউটিউবের মাধ্যমে সবাইকে শোনাতে পারবেন। সুতরাং, আপনি যদি ইউটিউব ঘাঁটাঘাটি করে থাকেন, তাহলে প্রায়ই খুব চমৎকার কিছু মিউজিকের সন্ধান পাবেন, যেগুলো রীতিমত আনকমন এবং যেগুলো আগে আপনি শোনেননি।

সেজন্য “ইউটিউবার মিউজশিয়ান” সেক্টরটা এখন রীতিমত সিরিয়াস একটা টপিক হয়ে গেছে। কমেডি শো, পচানিমূলক ভিডিও, আজাইরা বিভিন্ন জিনিসের পাশাপাশি যে একটা মিডিয়াকে সিরিয়াস কাজের জন্যও ব্যবহার করা যায়, ইউটিউব মিউজিশিয়ানরা সেটার একটা সুন্দর দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। ইউটিউবে একটু ঘাটলেই ইন্ডিয়া সহ বিভিন্ন দেশের আপকামিং মিউজিশিয়ানদের নানারকম কাভার সং শুনতে পাবেন। পুরাতন গানের সাথে নিজেদের ট্যালেন্টের সামান্য মিশ্রণ ঘটিয়ে এরা চমৎকার সব গান তৈরি করে ফেলছে।

এদের মধ্যে সবগুলোর মান যে খুব ভালো তা না। তবে আমাদের দেশে যেসব আবর্জনা উৎপাদিত হচ্ছে, সেগুলোর চেয়ে এইসব গানের মান শত-সহস্র গুণ বেশি বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে। “সানাম পুরি” নামে যে ছেলেটা আজকাল জনপ্রিয় হয়েছে, ওর কিন্তু নিজের কোনো অ্যালবাম ছিলো না শুরুতে। শুধু ইউটিউব দিয়েই এতোদূর এসেছে ছেলেটা।

এছাড়াও কম পরিচিত আর্টিস্টদের মধ্যে শ্রদ্ধা শর্মা, জোনিতা গান্ধী, অর্জুন, তুষার জোশী, উদিত শাণ্ডিল্য, আভিশ শর্মা, হানু দীক্ষিত, সিদ্ধার্থ স্লাথিয়া, প্রতীক কুহার, – অনেকের নাম বলা যেতে পারে। আমরা অনেকেই এগুলোর ব্যাপারে কিছুই জানি না। এদের বিভিন্ন পপুলার ইউটিউব চ্যানেলও আছে। Studio Unplugged, 88 Keys To Euphoria, The Krooner Project, Chai Town, The Krimson Blend, Being Indian Music – প্রচুর এরকম চ্যানেল পাবেন, দরকার জাস্ট একটু ইউটিউবে ঘোরাঘুরি করা।

অদেখা বহু মণিমুক্তা অপেক্ষা করছে আপনার জন্য ইউটিউবে, শুনে দেখেন শুধু। অ্যাজ ফার অ্যাজ দ্যা আর্টিস্টিক সেন্স অফ মিউজিক গৌজ – ভালো লাগার কথা এইসব গান। কিছুদিন আগে একটা এরকম গান শুনলাম, এটাও কাভার সং। এ. আর. রহমানের, সম্ভবত, জীবনের সেরা কম্পোজিশন, বম্বে ছবির একটা গান – তুহি রে। কাভার সংটা গেয়েছে রমণ মহাদেবন। মূল গান গেয়েছিলেন দ্যা গ্রেইট সাউথ ইন্ডিয়ান গ্র্যান্ডমাস্টার হরিহরণ, সাথে ছিলেন সাউথেরই আরেক সম্রাজ্ঞী কবিতা কৃষ্ণমূর্তি।

তামিল-তেলুগু ছবির অবাস্তব হাস্যকর ভিডিও চাইলে বহু দেখতে পারবেন, অভাব নাই অনলাইনে-ইউটিউবে। তবে অরিজিনাল মণিমুক্তা আস্বাদনের জন্য সামান্য আর্টিস্টিক সেন্স দরকার। সেটাই আজকাল মানুষের মধ্যে খুব কম। এই নতুন ছেলেগুলোর ভয়েজ হরিহরণের মতো গুরু শ্রেণীর লোকের ধারেকাছেও না, চর্চা দরকার এদের আরও অনেক বেশি। তবে তারপরেও কথা থাকে।

ক্লান্ত একটা দিনশেষে সোফার ওপর বিধ্বস্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়ে, গভীর একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে দিয়ে, ফ্যানটা চালিয়ে দিয়ে, লাইট অফ করে দিয়ে – চোখ বন্ধ করে, মনোযোগ দিয়ে গানটা শোনেন আর অতীতের যে কোনো স্মৃতি নিয়ে ভাবতে থাকেন। ঠিকমতো যদি শোনেন গানটা, তাহলে বুঝতে পারার কথা, কেন বম্বে ছবির এই কালজয়ী সৃষ্টি এতোদিন পরেও মানুষ শোনে, আর কেন অন্ধকারের মধ্যে এই সুরটা শুনে চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।

স্লামডগ কেন আবর্জনা, আর বম্বে কেন ক্লাসিক? পার্থক্যটা অনুভবে।

Comments
Spread the love