আমার মেয়েটা খুব মুডি। মা আগেই সাবধান করেছিলেন যে এমনটাই হবে, ছয় বছর বয়স হতেই সে অদ্ভুত রকম গম্ভীর। সেদিন সে সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে গুণগুণ করে গান গাইছিল, যখন তার বাবা ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে প্রিমিয়ার লীগ জিতে ফিরেছে। শুধু জিতেছে বললে ভুল হবে, এক সিজনে দল পেয়েছে ১০০ পয়েন্ট। কিন্তু তাতে মেয়ের কি এসে যায়!

ম্যানচেস্টার সিটিকে সে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয় না। তার হৃদয়জুড়ে লিভারপুল! তো যেটা বলছিলাম, সে হলরুম জুড়ে ছুটছিল। আগে কখনো খেয়ালই করি নি, মেয়েটা দৌড়ায় ঠিক তার বাবার মত। বুক ওঠানামা করতে থাকে, পিঠ থাকে বাঁকানো, হাতজোড়া নড়তে থাকে কিছুটা। তো সে ঠিক কি গাইছিল?

মো সালাহ, মো সালাহ

রানিং ডাউন দ্যা উইং

সালাহ লা লা লা

ইজিপশিয়ান কিং

আপনারা ভাবতে পারেন? কি ভয়ংকর শত্রুকে বাড়িতে পুষছি!

সে আমার মতই, আমি যখন ছোট্টটি ছিলাম। সত্যিই, সে একেবারেই আমার কপি। ভালোভাবে না চিনলে সে কারো সাথে কথা বলবে না। একটা শব্দও না। প্রথমে আপনাকে তার বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। এই বিষয়টা একেবারে আমাদের পরিবারের শেকড়ে গেঁথে আছে বলা যায়।

আপনাকে কি আমি বিশ্বাস করতে পারি? আমার গল্পটা বলতে পারি আপনাকে? আপনি কি শুনবেন? যারা ইংল্যান্ডের ডেইলিগুলো ফলো করেন, তারা হয়তো ভাববেন, আরে এর গল্প তো ভালো করেই জানি। আর কিই বা আছে অজানা? আসলেই কি জানেন?

আমি একেবারে ছোটটি ছিলাম তখন, বাবাকে কারা জানি মেরে ফেললো। আমার বয়স তখন দুই বছর। ঘটনাটা আমার পুরো জীবনকে গড়ে দিয়েছিল। কিছুদিন পরেই মা সিদ্ধান্ত নিলেন, আমাকে আর আমার বোনকে জামাইকায় রেখে ইংল্যান্ড যাবেন, চেষ্টা করবেন ডিগ্রী শেষ করার, যাতে আমাদের একটা সুন্দর জীবন দিতে পারেন। পরের কয়েক বছর আমরা নানীর সাথে কিংস্টনে ছিলাম, আমার মনে পড়ে যখন আমার বয়সী বাচ্চাদের মায়ের সাথে দেখতাম, আমার ভেতরটা পুড়তে থাকতো। মা আমাদের জন্য ঠিক কি প্ল্যান করেছিলেন, আমার কাছে পরিষ্কার ছিল না। আমি শুধু জানতাম, মা আমার কাছে নেই। আমার নানী নিঃসন্দেহে চমৎকার একজন মহিলা ছিলেন, কিন্তু এই বয়সে সবাই তো মাকে কাছে চায়, তাই না?

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তিনি মাকে দিতে না পারলেও ফুটবল দিয়েছিলেন। আমার মনে পড়ে, যখন বৃষ্টি হত, বাচ্চারা রাস্তায় নেমে আসতো, উদ্দেশ্যহীনভাবে বলে লাথি দেয়া, সেটা ছিল জীবনের সেরা সময়। এখনো যখন আমি জামাইকা নিয়ে ভাবতে বসি, এই ছবিটাই ঘুরতে থাকে মাথায়। যখন বৃষ্টি হবে, ঘরে লুকিয়ে থাকার সুযোগ নেই। বাইরে বের হও, বৃষ্টি উপভোগ কর। আরেকটা জিনিস মনে পড়ে, মাঝেই মাঝেই নানীর কাছে টাকার জন্য ঘ্যান ঘ্যান করতাম, পেলেই দোকানে ছুটতাম গ্রেপনাট আইসক্রিম কিনতে।

সত্যি বলতে, পুরো বিশ্বের উচিত গ্রেপনাট জিনিসটা চেখে দেখা। আপনাদের কোন ধারণা নেই কি মিস করছেন আপনারা। এটা পৃথিবীর সেরা খাবার, যদিও ইংল্যান্ডে আমি কখনই এটা খুঁজে পাইনি।

জ্যামাইকায় পাওয়া যেত। জ্যামাইকা অদ্ভুত একটা জায়গা। মানুষের সামর্থ্য খুব বেশি নয়, তারপরে হাসিমুখে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে জীবনের সবটুকু পাওয়ার জন্য। আমার মাও তাঁর মত করে যুদ্ধ করতেন, আমাদেরকে আরেকটু আরামদায়ক জীবন দেয়ার জন্য। বয়স পাঁচ হলে আমি ও আমার বোন লন্ডনে গেলাম তাঁর সাথে। সময়টা কঠিন ছিল, কারণ সংস্কৃতি ছিল একেবারেই আলাদা, এবং সবচেয়ে বড় কথা আমাদের যথেষ্ট টাকা ছিল না। আমার মা চেষ্টা করতেন আমাদের সব ইচ্ছা পুরণ করতে, তারপরেও খুব সুখের জীবন সেটা ছিল না।

মা ক্লিনার হিসেবে হোটেলে হোটেলে কাজ করতেন, যাতে বাড়তি কিছু টাকা আসে আর তাঁর ডিগ্রির টাকাটা জোগাড় হয়। আমি কখনই ভুলবো না, ঘুমঘুম চোখে সকাল পাঁচটায় আমি নতুন দিন দেখতাম, আর স্টোনব্রিজের বিভিন্ন হোটেলে টয়লেট পরিষ্কার করতে মাকে সাহায্য করতাম। বোনের সাথে তর্ক হত প্রায়ই, “আজকে টয়লেট তোমার ভাগে, আমার ভাগে বেডশীট “। মা আমাদের থামিয়ে দিতেন। পরে আমরা স্কুলে যেতাম।

আমাদের বন্ধন খুব দৃঢ় ছিল। থাকতেই হত, আমরা ছাড়া আর কেউ নিজের ছিল না আমাদের। আমার মনে পড়ে, আমি বাড়ীর সব জিনিস ভাঙতাম আর মাকে বলতাম, “মা, এবার কি একটু বাইরে যেতে পারবো?” মা সবসময় বলতো, “বাইরে যাও, কিন্তু কখনও বাড়ি ছেড়ে যেও না”।

এখন যখন পেছনে ফিরে তাকাই, মায়ের জন্য খুব কস্ট লাগে। যখন প্রাইমারি স্কুল শুরু করি, আমার বদের হাড্ডি ছিলাম, মাকে জ্বালিয়ে মারতাম। এমন না যে, আমি খুব খারাপ ছিলাম, তবে আমি কারো কথা শুনতাম না। চুপচাপ বসে ম্যামের কথা শুনবো, আমার পক্ষে সেটা সম্ভব না। আজকে পড়ানো হচ্ছে “বিয়োগ”, আমার কিছু যায় আসে না তাতে। আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতাম, কখন একটু বিরতি পাবো, একটু খাবার খেয়েই বাইরে চলে যাবো। নিজেকে রোনালদিনহো ভেবে কাদায় ছুটোছুটি করবো, এই তো জীবন!

অবশেষে তারা আমাকে স্কুল থেকে বের করে দিল। আসলে, টেকনিক্যালি তারা আমাকে বের করে দিয়েছিল বলা যাবে না। তারা মাকে বলেছিল, আমার জন্য আরো কড়া পরিবেশের ব্যবস্থা করা হবে, ছোট্ট ক্লাসরুমে আরো পাঁচজন ছাত্র ও তিনজন টিচারের সাথে আমাকে রাখা হবে। একেবারেই মজা করছিনা, এটাই সত্যি। লুকোনোর কোন সুযোগ নেই।

সবচেয়ে বাজে জিনিসটা ছিল, বাস প্রতিদিন আমাদের বাসা থেকে তুলে আনতো, আবার বাসায় ছেড়ে দিত। একদিন আমি বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম, অন্য সব বাচ্চারা হেঁটে হেঁটে নিজের মত স্কুলে আসছিল, আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। আমার হৃদয়টা ভেঙ্গে গেল। আমি তো অন্য সবার মতই থাকতে চাই। আমি তো কোন দোষ করি নি। আমি স্কুল ছেড়ে দিলাম।

আমি মা ছাড়া অন্য কারো কথা শুনতাম না। আমার দোষ ছিল এটাই।

এক বছর পর আমি অন্য একটা বড় স্কুলে ফিরলাম। তবে যে মানুষটা আমাকে পালটে দিয়েছে, তাঁর নাম ক্লাইভ এলিংটন। মহল্লায় যাদের বাবা নেই, তাদের সে মেন্টর করতো। ছুটির দিনগুলোতে সে আমাদের ঘুরতে নিয়ে যেত লন্ডনজুড়ে, জীবনের বিভিন্ন দিক দেখাত। মাঝে মাঝে আমরা স্নুকার খেলতাম। ক্লাইভ একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “রহিম, তুমি কি করতে ভালোবাসো?”

একেবারেই সহজ প্রশ্ন। কিন্তু আমি তখন পর্যন্ত কখনও এটা নিয়ে ভাবিনি। আমি তখন একেবারেই ছোট, রাস্তায় ফুটবল খেলতাম, বন্ধুদের সাথে সাইকেল চালাতাম, এই তো।

আমি বললাম, “আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসি।”

ক্লাইভ বললো, “আমার হাতে একটা ছোট সানডে লীগ গেইম আছে। খেলতে যাবে সেখানে?”

সেই মুহূর্তেই আমার জীবন বদলে গেল। সেই সময় থেকেই আমার জীবন জুড়ে শুধু ফুটবল ফুটবল ফুটবল। আমি একেবারেই অবসেসড হয়ে পড়লাম। তখন আমার বয়স ১০ কি ১১। ইংল্যান্ডের বড় বড় ক্লাবের স্কাউটরা আমার দিকে চোখ রাখলো। ফুলহাম আমাকে চাইছিল, আর্সেনালও। যখন আর্সেনাল আপনাকে চাইবে, আপনার সেখানে যেতেই হবে, তাই না? হাজার হোক, এটা লন্ডনের সেরা ক্লাব। আমি আমার বন্ধুদের গর্বভরে বললাম, “আমি আর্সেনালে যাচ্ছি।”

কিন্তু আমার মা ছিলেন সত্যিকারের যোদ্ধা। এই কঠিন পৃথিবীতে কিভাবে টিকে থাকতে হয়, তাঁর চেয়ে ভালো কেউ জানে না। মা আমাকে দেকে কাছে বসালেন, তারপর বললেন, “দেখো, আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আর্সেনালে যাওয়া তোমার জন্য ভালো কিছু হবে না।”

আমি অবাক হয়ে তাকালাম তাঁর দিকে।

মা বলে যাচ্ছিলেন, “তুমি যদি সেখানে যাও, সেখানে তুমি পাবে আরো ৫০ জন খেলোয়াড়, যারা ঠিক তোমার মতই ভালো। সেখানে ওরা তোমাকে আলাদা যত্ন নেবে না। ওদের কাছে তুমি হবে শুধুই একটা সংখ্যা। এমন কোথাও যাও, এখানে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে।”

মা আমাকে কিউপিআরে যোগ দিতে রাজি করালেন। এখন বুঝতে পারি, সেটা ছিল আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত। ওরা আমাকে হারিয়ে যেতে দেয় নি। তবে আমার পরিবারের জন্য সময়টা ছিল কঠিন। কারণ, আমার মা কখনই আমাকে একা ট্রেনিংয়ে ছাড়বেন না, কিন্তু তাকে তো কাজেও যেতে হত। কাজেই বাধ্য হয়ে আমার বোন আমাকে নিয়ে যেত সেই হিথ্রো পর্যন্ত।

পরপর তিনটা বাস। প্রথমে ১৮, এরপর ১৮২, শেষে ১৪০। লাল ডাবল ডেকার আর বয়সের ভারে ন্যুজ নীল উলের সীটকভার। এতেই সময় কাটিয়েছি বছরের পর বছর। আমরা ৩ টা ১৫ তে বের হতাম বাসা থেকে, ফিরতাম ১১ টা বাজার পর। প্রত্যেকটা দিন। আমার বোন উপরের তলায় একটা ছোট কফিশপে বসে থাকতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা, যতক্ষণ না আমার ট্রেনিং শেষ হয়। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ও ছোট ভাইয়ের জন্য এতটা কষ্ট করেছিল, ভাবা যায় না। একদিনও সে বলে নি, “না, আজ আমি তোমার সাথে যেতে পারবো না।”

আমি তখন বুঝতাম না, ও আমার জন্য কতটুকু স্যাক্রিফাইস করছে। ও আর মা আমাকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আমার পুরো পরিবার আমাকে গড়ে তুলতে নিজেদের সর্বস্ব দিয়েছে। ওরা না থাকলে হয়তো আপনি আমাকে চিনতেন না।

আমি আক্ষরিক অর্থেই স্বপ্নের ছায়ায় বেড়ে উঠেছি। আমাদের বাড়ির পেছনে দাঁড়ালে দেখা যেত, নতুন ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামটা গড়ে উঠছে। একদিন বাইরে বের হয়ে দেখলাম, ওয়েম্বলির সেই বিখ্যাত বিশালাকৃতি আর্কটা, অন্যসব বাড়িঘর ছাড়িয়ে যেন পাহাড়ের মত উঠে গেছে উপরে।  ঠিক বাইরেই আমরা খেলতাম, বল গোলে জড়িয়ে আমি যখন সেলিব্রেট করতাম, আমার মাথার ঠিক উপরেই থাকতো ওয়েম্বলির সেই আর্ক। মনে হত, আমি ওখানেই খেলছি।

আসলেই মনে হত, আমি ওখানে খেলতে পারবো, পারবই।

সবাই সেটা ভাবতো না। ১৪ বছর বয়সে আমার একজন টিচার ছিল, যতদূর মনে পড়ে আমি একেবারেই মনযোগ দিচ্ছিলাম না। তিনি আমাকে ধমকে বলেছিলেন, “রহিম, তুমি কি ভেবেছ? ফুটবল তোমার জীবন গড়ে দেবে? তোমার কোনো ধারণা আছে প্রতি বছর কত মিলিয়ন বাচ্চা ফুটবলার হওয়ার জন্য লড়ে যায়?”

আমি পাত্তা দেই নি। এসব তো কতবারই শুনেছি।

তখন তিনি বললেন, “তুমি কিভাবে অন্যদের চেয়ে আলাদা? তুমিতো স্পেশাল কেউ না।”

এই কথাটা আমাকে খুবই আঘাত করলো।

আমার মাথায় ঘুরতে লাগলো, “রহিম, তুমি কিসে আলাদা অন্যদের থেকে? ওকে, আমরা খুব তাড়াতাড়িই দেখতে পাবো”

দুই মাস পর, আমি ডাক পেলাম ইংলিশ অনুর্ধ-১৬ দলের হয়ে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দুটো গোলও বানিয়ে দিলাম। খেলাটা টিভিতে দেখিয়েছিল। আমার জন্য সেটা ছিল দারুণ একটা মুহুর্ত। আমি যখন সোমবারে স্কুলে ফিরলাম, সেই টিচার হয়ে গেল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।

কিন্তু আমার সত্যিকারের টার্নিং পয়েন্ট ছিল ১৫ বছর বয়সে, লিভারপুল আমাকে চাইছিল, কিন্তু লিভারপুল ছিল আমার বাড়ি থেকে তিন ঘণ্টার দূরত্বে। আমি মায়ের পায়ের কাছে বসে তাকে বোঝালাম, আমি আসলেই সেখানে যেতে চাই। মহল্লায় আমার অনেক ভালো বন্ধু ছিল, এখনও তারা আমার খুব কাছের, কিন্তু সেই সময় আমাদের এলাকায় অপরাধ খুনোখুনি বেড়েই চলেছিল, তাই আমার জন্য লিভারপুল ছিল ফুটবলে পুরোপুরি মনোযোগ দেয়ার সেরা সুযোগ।

আমার মাথায় ঘুরছিল, তবে তাই হোক। আমার মা তাঁর জীবনটা দিয়ে আমাকে এখানে এনেছে। আমার বোন তাঁর জীবনটা দিয়ে আমাকে এখানে এনেছে। চল, সবকিছু জিতে আসি, ওদের জন্য।

পরের দুই বছর, আমি অমাবস্যার চাঁদ হয়ে গেলাম। আপনি চাইলে আমার বন্ধুদের জিজ্ঞেস করতে পারেন। ছুটি পেলেই আমি ট্রেনে চেপে লন্ডন চলে আসতাম, মাকে দেখতে। আবার ফিরে যেতাম। এর বাইরে পৃথিবীর দুয়ার আমার কাছে ছিল বন্ধ। পুরো সময় জুড়ে আমি নিজেকে ফুটবলার হিসেবে তৈরি করছিলাম। ক্লাব আমাকে রেখেছিল একটা বয়স্ক কাপলের কাছে, দুজনেই সত্তরোর্ধ। আমাকে দুজনেই খুব ভালোবাসতেন, নিজের নাতির মত যত্ন করতেন। আমার মা প্রতিদিন আমাকে ফোন করতেন, “রহিম, আজকে নামাজ পড়েছ তো? নতুন দিনের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ বলেছ? ”

“হ্যাঁ, মা। বলেছি”- আমি বলতাম।

সেটা সম্ভবত ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সময়। আমার পুরো মনোযোগ ছিল একটা ভালো কন্ট্র্যাক্ট পাওয়ার দিকে, যাতে মা বোনকে আর কষ্টের মধ্যে দিয়ে না যেতে হয়। যেদিন মাকে একটা বাড়ি কিনে দিলাম, সম্ভবত সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন।

আমার মনে পড়ে, যখন আমি ছোট ছিলাম, ৩-৪ বার এমন হয়েছে যে, আমি বাড়ি ফেরার জন্য বাসে উঠেছি, আর মা আমাকে টেক্সট করেছে নতুন কোন ঠিকানা।

মেসেজে লেখা থাকতো, “আজ থেকে আমরা এখানেই থাকবো।”

মাঝে দুই বছর এমন ছিল, আমাদের প্রতিনিয়ত জায়গা বদলাতে হত, কারণ আমরা ভাড়া মেটাতে পারতাম না। তখন আমি সেভাবে বুঝতাম না। কিন্তু এখন যখন পেছনে তাকাই, বুঝি, কি তীব্র কষ্ট ও চাপের মধ্যে দিয়েই না মাকে যেতে হয়েছে।

আমার এটা বলতে খুব খারাপ লাগছে, কিন্তু এটা অবশ্যই বলতাম, মিডিয়ায় একটা ধারণা আছে, রহিম স্টার্লিং বিলাসী জিনিসের প্রতি দুর্বল, সে শো অফ করতে পছন্দ করে। আমি জানি না, তারা এটা কোথায় পেয়েছে। আমি যখন আমার মাকে একটা বাড়ি কিনে দিলাম, সাংবাদিকরা সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। এটা খুব দুঃখজনক। না জেনে আজেবাজে কথা বলাটাকে আমি ঘৃণা করি।

কয়েক বছর আগে হলেও আমি এসবে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখাতাম। মাকে বলতাম, “ওরা সব ছেড়ে আমার পেছনে কেন পড়ল?”। কিন্তু এখন, যতক্ষণ আমার মা, বোন আর বাচ্চারা সুখে আছে, আমি সবকিছু নিয়ে খুশি।

যদি লোকে আমার মায়ের বাড়ির বাথরুম নিয়ে লিখতে চায়, তাদের জন্য আমার একটা কথাই বলার আছে। ১৫ বছর আগে আমরা স্টোনব্রিজে টয়লেট পরিষ্কার করতাম, ভেন্ডিং মেশিনের বেঁচে যাওয়া খাবার খেতাম। পৃথিবীতে কারো যদি সুখ পাওনা থাকে, সে হল আমার মা। সে খালি হাতে এই দেশে এসেছিল, বাথরুম আর বেডশিট পরিষ্কার করে নিজের পড়ার খরচ যোগাত। এখন সে একটা নার্সিং ইন্সটিটিউটের ডিরেক্টর।

আর তাঁর ছেলে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলে।

আমার কাছে অভাবনীয় কি লাগে জানেন? আমি ইংল্যান্ডের হয়ে ডাক পেয়েছিলাম মাত্র ১৭ বছর বয়সে। সেটা ছিল ইউক্রেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ার ম্যাচ। ওয়েম্বলিতে! সবচেয়ে অদ্ভুত অনুভূতি ছিল, যখন আমরা বাসে করে স্টেডিয়ামে ঢুকছিলাম। আমি চারপাশে তাকাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম…

এই বাসাটায় আমার বন্ধু থাকতো

এই পার্কিং লটে আমরা রোলার স্কেটিং করেছি

এই কোণায় দাঁড়িয়ে চেষ্টা করেছি মেয়েদের সাথে কথা বলার

এই সবুজে দাঁড়িয়ে আমি আজকের দিনটার স্বপ্ন দেখেছি

তুমি যদি এভাবে বেড়ে ওঠ, যেভাবে আমি বেড়ে উঠেছি, কোন ট্যাবলয়েডের কথা শুনো না। ওরা তোমার আনন্দ কেড়ে নিতে চায়। তোমাকে টেনে নিচে নামাতে চায়।

আমি তোমাকে স্পষ্ট করে বলছি…

ইংল্যান্ড এখনো সেই জায়গা, যেখানে একটা বখে যাওয়া ছেলে শূন্য থেকে এসে তাঁর স্বপ্নের জীবন পেতে পারে।

রহিম স্টার্লিং, ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দল।

মূল লেখাটি প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে পুর্বপ্রকাশিত।

Comments
Spread the love