যে ঐশ্বর্যশালী ভাষায় সৃষ্টি হয়েছে একের পর এক মহাকাব্য, জন্মের পর থেকে মমতাময়ী মা মুখের যে মধুর বুলি হৃদয়ে ধারন করে মায়ের সাথে খুনসুটিতে মেতেছি, যে অসাধারন ভাষায় বলেছি জীবনের প্রথম কথা, লিখেছি জীবনের প্রথম লেখা, দুর্মূল্য দুষ্প্রাপ্য রতনের চেয়েও দামি যে ভাষায় হেসেছি, কেঁদেছি, করেছি প্রানখুলে চিৎকার, যখন মাথায় পুরীষ ভরা কিছু মারখোর এসে বলতে চাইল, আমাদের সে ভাষা ভুলে যেতে হবে, ঠিক সে মুহূর্তটায় যেন আমরা বিস্মিত হতেও ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার পরমুহূর্তেই গর্জে উঠলো বাঙ্গালী, যার লাভাস্রোতে ঝলসে গেল সবকিছু… ১৯৫২ সালের ৮ই ফাল্গুন, ইংরেজি একুশে ফেব্রুয়ারি তাই শুধু একটা সাধারণ দিনই নয়, এটা এক অনলবর্ষী খাপখোলা তলোয়ার, এক অনন্তবিস্তৃত লাভাস্রোত, যে লাভা স্রোতের দিগন্তে আমরা পেয়েছিলাম এক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ… মায়ের মুখের বুলির অধিকার আদায়ের জন্য বাঘের গর্জন করতে করতে বুকের তাজা রক্ত খোলা রাজপথে ঢেলে দেওয়ার মত যে সাহস এবং ভালোবাসা দেখিয়েছিল বাঙ্গালী, সেটা দেখাবার কথা কল্পনাও করতে পারেনি আর কোন জাতি…

এরপর পার হয়ে গেছে অনেকদিন। আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা বিশ্বজুড়ে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ভাষাশহীদদের অভাবিত আত্মত্যাগকে প্রতিবছর স্মরন করি আমরা পরম শ্রদ্ধায়, পরম ভালোবাসায়। কিন্তু কিভাবে ২১ শে ফেব্রুয়ারির এই আত্মত্যাগ সম্পর্কে সারা বিশ্বের মানুষ জানলো, কিভাবে এই দিনটা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেল, কাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সম্ভব হল এ স্বীকৃতি, সে ইতিহাস ধীরে ধীরে চলে গেছে আড়ালে… আমরা আজ অনেকেই জানি না, কি অসম্ভব কিচু চড়াইউৎরাই পার হয়ে একুশে পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি… সে ইতিহাস অনন্য শ্বাসরুদ্ধকর, একই সাথে কিছু মানুষের অপরিমেয় দেশপ্রেমের হিরন্ময় উদাহরণও বটে…

একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিল রফিক-জব্বার-সালাম-বরকতসহ অসংখ্য মানুষ। আর এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে ৪৬ বছর পর অসামান্য অবদান রেখেছিলেন আরেক রফিকুল ইসলাম, আবদুস সালাম!

২১-এ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতির প্রথম দাবি করা হয় ১৯৯৭ সালে। ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বারের জন্মস্থান ময়মনসিংহ জেলার গফুরগাঁও উপজেলা থেকে এ দাবি ওঠে। সে বছর স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘গফুরগাঁও থিয়েটার’ ওই দাবির পক্ষে শোভাযাত্রা বের করে। এলাকার বিভিন্ন দেয়াল, বাস ও ট্রেনে পোস্টার লাগায়। তার দুই বছর পর সংগঠনটির একুশের সংকলনেও স্লোগান ছাপে ‘বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস চাই/ একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাই’ (সূত্র : মাহবুবুল আলম কবীরের প্রবন্ধ, ১১ জানুয়ারি ২০১৩, দৈনিক কালের কণ্ঠ)।

এরপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সাবেক ছাত্র কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের প্রবাসী বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম উপলব্ধি করলেন, মায়ের মুখের বুলির অধিকার আদায়ে অকাতরে রফিক-সালাম-জব্বারের আত্মত্যাগ পৃথিবীবাসীর সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। ১৯৫২ সালে যে বীর রফিক মায়ের ভাষার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, তার ৪৬ বছর পর আরেক রফিক সেই অভাবিত আত্মত্যাগকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে নামলেন এক অসম্ভব যুদ্ধে। ১৯৯৮ সালের ৯ই জানুয়ারী রফিক জাতিসংঘের তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারী কফি আনানকে চিঠি দেন। চিঠিতে ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য বাঙ্গালীর আত্মত্যাগকে তুলে ধরে তিনি মহাসচিবকে প্রস্তাব করেন যেন একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিবের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা হাসান ফেরদৌস এর নজরে আসে ব্যাপারটি। ১৯৯৮ সালের ২০ শে জানুয়ারী তিনি রফিককে পরামর্শ দেন প্রস্তাবটি জাতিসংঘের অন্য আরেকটি সদস্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে একই প্রস্তাব আনার ব্যবস্থা করেন। ফলে আরেক সহযোদ্ধা আবদুস সালামের সাথে মিলে রফিকুল গঠন করেন Mother Language Lovers of the World” নামের একটি সংগঠন। মাতৃভাষা-প্রেমিকগোষ্ঠীর এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন সাত জাতি ও সাত ভাষার ১০ জন সদস্য। তাঁরা হলেন অ্যালবার্ট ভিনজন ও কারমেন ক্রিস্টোবাল (ফিলিপিনো), জ্যাসন মোরিন ও সুসান হজিন্স (ইংরেজি), ড. কেলভিন চাও (ক্যান্টনিজ), নাজনীন ইসলাম (কা-চি), রেনাটে মার্টিনস (জার্মান), করুণা জোসি (হিন্দি) এবং রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম (বাংলা)।  এবার তারা এই সংগঠনের পক্ষ থেকে আবার মহাসচিবের কাছে প্রস্তাব পাঠান। এবং ইউএনওর ক্যানাডিয়ান এম্বাসেডর ডেভিড ফাওলারের কাছে এই চিঠির একটা কপি প্রেরন করেন। কিন্তু এরপর সেরকম সাড়া না পেয়ে কিছুটা থমকে যায় কার্যক্রম।

এবার তারা এই সংগঠনের পক্ষ থেকে আবার মহাসচিবের কাছে প্রস্তাব পাঠান। এবং ইউএনওর ক্যানাডিয়ান এম্বাসেডর ডেভিড ফাওলারের কাছে এই চিঠির একটা কপি প্রেরন করেন। কিন্তু এরপর সেরকম সাড়া না পেয়ে কিছুটা থমকে যায় কার্যক্রম।

কিন্তু হাল ছাড়েননি রফিক-সালাম। তারা এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীনশিক্ষামন্ত্রী এম এ সাদেক এবং শিক্ষা সচিব কাজী রকিবুদ্দিন, অধ্যাপক কফিলউদ্দিন আহমেদ, মশিউর রহমান (প্রধানমন্ত্রীর সেক্রেটারিয়েটের তৎকালীন ডিরেক্টর), সৈয়দ মোজাম্মেল আলি (ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত), ইকতিয়ার চৌধুরী (কাউন্সিলর), তোজাম্মেল হক (ইউনেস্কোর সেক্রেটারি জেনেরালের শীর্ষ উপদেষ্টা)প্রমুখ সবাইকে এই ব্যাপারতার গুরুত্ব অনুধাবন করাতে সক্ষম হন এবং তারা সবাই প্রায় ২৯ টি দেশের সমর্থন আদায়ে দিনরাত পরিশ্রম করতে থাকেন। ১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে হাসান ফেরদৌস সাহেব রফিক ও সালামকে পরামর্শ দেন ইউনেস্কোর ভাষা বিভাগের জোশেফ পডের সাথে দেখা করতে। জোশেফ তাদের পরামর্শ দেন ইউনেস্কোর আরেক কর্মকর্তা আনা মারিয়ার সাতে দেখা করতে। এই ভদ্রমহিলা আমাদের ইতিহাসের এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেননা সেদিন যদি ইনি খুব মনোযোগ দিয়ে পুরো ব্যাপারটি শুনে কার্যকরী ব্যবস্থা না নিতেন, তবে আমাদের স্বপ্নপুরনে আরও অনেক বাঁধার মুখোমুখি হতে হত… তার অবদানের কথা একজন ব্লগার স্মরন করেছেন এভাবে…

ইউনেস্কোর সদর দফতরের সদা হাস্যময় আনা মারিয়ার কথা কিছুতেই ভুলে যাওয়া উচিত হবে না বাংলাদেশের। তার নিজের দেশ সুইডেন। কিন্তু সুইডেনে তার নিজের মাতৃভাষা ইংরেজি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। কিন্তু তিনি চান সুইডিশ ভাষার পাশাপাশি ইংরেজিও সেখানে বেঁচে থাকুক। তাই তিনি এমন একটি দিবসের জন্যে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। অফিসের সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও আনা মারিয়া ওইদিন বসে ছিলেন বাংলাদেশ মিশন থেকে রেজ্যুলেশানটি পাবার আশায়। কেননা ফাইলে রেজ্যুলুশান রাখার ওটিই ছিল শেষ দিবস। এদিকে ঢাকায় ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোর ফ্যাক্স মেশিন ছিল একেবারেই পুরানো। তাই সেখান থেকে বার বার ফ্যাক্স পাঠালেও দূতাবাসের কর্মীরা তার পাঠোদ্ধার করতে পারছিলেন না। অফিস সময় পেরিয়ে গেলেও দূতাবাসের অফিস কর্মী আবদুল আউয়ালও তাই অনেক রাত পর্যন্ত অফিসেই ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কয়েকজন মিলে সেটির পাঠোদ্ধার করে নতুনভাবে টাইপ করে মারিয়ার অফিসে পাঠানো হয় এবং মারিয়ার অপেক্ষারও অবসান ঘটে। প্রস্তাবটি ইউনেস্কোর সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠিয়ে দিয়ে তবে তিনি বাসায় ফেরেন।

এরা সবাই আমাদের এই অর্জনের অংশীদার। বিনম্র চিত্তে তাদেরও আমরা যেন মনে রাখি!

আনা মারিয়া পরামর্শ দেন প্রস্তাবটি আনীত হতে হবে ৫ টি সদস্য দেশ – বাংলাদেশ, ক্যানাডা, ভারত, হাঙ্গেরি এবং ফিনল্যান্ড দ্বারা। সময়টা ছিল আশার, উত্তেজনার , অনিশ্চয়তার…

১৯৯৯ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর। ইউনেস্কোতে প্রস্তাব উত্থাপনের শেষ দিন। বিনিদ্র রজনী আর অকল্পনীয় অনিশ্চিত উত্তেজনায় টেলিফোনে আর ইমেইলে সময় পার করছেন রফিক-সালামেরা। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার থেকে আনুষ্ঠানিকভাব প্রস্তাবটি তখনও এসে পৌঁছায়নি। জানা গেল, প্রস্তাবটি আসতে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর একটা সই দরকার। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তখন পার্লামেন্টে, সংসদ অধিবেশন শেষ হবার পরে সই নিতে নিতে অনেক দেরি হয়ে যাবে, ততক্ষণে প্রস্তাব উত্থাপনের সময়সীমা যাবে পার হয়ে। শেষ পর্যন্ত উপায়ন্তর না দেখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করা হল কানাডার ভ্যানকুভার থেকে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব ধরনের জটিলতা উপেক্ষা করে নথি অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই নিজের সইখানা ফ্যাক্স করে পাঠিয়ে দিলেন ইউনেস্কোর সদরদপ্তরে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সহযোগিতায় ইউনেস্কোর অফিসটাইম শেষ হবার মাত্র এক ঘণ্টা আগে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব দিল।

তখন ইউনেসকোর নির্বাহী পরিষদের ১৫৭তম অধিবেশন এবং ৩০তম সাধারণ সম্মেলন ছিল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের বিষয়টি নিয়ে ইউনেসকোতে দুটি সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত, ইউনেসকো ভেবেছিল, এমন একটা দিবস পালন করতে গেলে ইউনেসকোর বড় অঙ্কের টাকাপয়সা প্রয়োজন হবে। প্রতিবছর অনেক টাকাপয়সা খরচের কথা ভেবে প্রথমেই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। একই সঙ্গে ইউনেসকো মহাপরিচালক  International Mother Language Day নয়,  International Mother Tonguae Day নামে একে অভিহিত করতে সচেষ্ট হন। মহাপরিচালক এ জন্য এক লাখ ডলারের ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাব করেন এবং দুই বছর পর নির্বাহী পরিষদের ১৬০তম অধিবেশনে একটি সম্ভাব্যতা জরিপের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার আদেশ দেন।

এর ফলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার বিষয়টি আটকা পড়ে। প্রস্তাবটি কার্যকর হতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগবে বলে মনে করা হয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক। শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ইউনেসকো অধিবেশনে যোগদানকারী বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা। তিনি অধিবেশনে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, যেখানে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ও তাৎপর্য পৃথিবীর ১৮৮টি জাতির সামনে তুলে ধরেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠক করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পক্ষে অভিমতও গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন। এমনকি উপস্থিত সদস্যদের বোঝাতে সক্ষম হন, দিবসটি পালন করতে প্রকৃতপক্ষে ইউনেসকোর এক ডলারও লাগবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ নিজেরাই নিজেদের মাতৃভাষার গুরুত্ব আলোচনা ও জয়গান গাইতে গাইতে দিনটি পালন করবে।

১৬ই নভেম্বর, ১৯৯৯ তারিখে ইউনেস্কো সভায় বাংলাদেশের প্রস্তাবটি উত্থাপনের কথা ছিল। কিন্তু বিধিবাম! সেদিন কোন এক অজানা কারনে বাংলাদেশের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি উত্থাপন হয়নি। অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলতে দুলতে আসে ১৭ই নভেম্বর। ইউনেস্কোর অধিবেশনে এ প্রস্তাবটি উত্থাপনের সময় ইউনেস্কোর আরেকটি কমিশনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক ও উত্তেজক বক্তব্য উত্থাপন করছিলেন তসলিমা নাসরিন। এই বক্তব্যের কারণে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রস্তাব অনুমোদনও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। কিন্তু ইরানের কূটনীতিক মোহাম্মদ আর কাসানী তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য উপস্থাপনের সময়েই বিষয়টি বাংলাদেশ মিশনের ইকতিয়ার চৌধুরীকে জানান। ফলে বাংলাদেশ মিশনের পক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়, যাতে এ বক্তব্য প্রস্তাবটি অনুমোদনের আলোচনায় কোনও নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। অবশেষে শত প্রতীক্ষার সেই প্রস্তাবের ব্যাপারে সম্মতি জানালো উপস্থিত ১৮৮টা দেশের প্রতিনিধিরা। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১-এ ফেব্রুয়ারি লাভ করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা। ইউনেসকোর ঐতিহাসিক সেই অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের মূল প্রস্তাবক ছিল বাংলাদেশ এবং সৌদি আরব। আর সমর্থন করেছিল আইভরি কোস্ট, ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কমোরোস, ডোমিনিকান রিপাবলিক, পাকিস্তান, ওমান, পাপুয়া নিউগিনি, ফিলিপিন, বাহামাস, বেনিন, বেলারুশ, গাম্বিয়া, ভারত, ভানুয়াতু, মাইক্রোনেসিয়া, রুশ ফেডারেশন, লিথুয়ানিয়া, মিসর, শ্রীলংকা, সিরিয়া ও হন্ডুরাস।

আজ পৃথিবীতে জনগোষ্ঠীর বিচারে বাংলা ভাষার স্থান ৪র্থ। বিশ্বের প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বা প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। কোটি মানুষের মুখের এই মধুর ভাষার জন্য জীবন দেওয়া এই অসামান্য ঘটনার কথা জানে পৃথিবীর প্রায় সবদেশের মানুষ, প্রতি বছরের ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় এই দিবসটা। কিন্তু যে মহাত্মারা আমাদের অর্জন আর গৌরবের একুশের ইতিহাস পৌঁছে দিলেন সারা পৃথিবী জুড়ে, সেই রফিকুল হক আর আবদুস সালামকে আমরা কেন যেন ভুলে গেছি। ২০১৬ সালে রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হলেও তাদের এই অসামান্য অর্জন নিয়ে তেমন কোন আলোচনা হয় নাক, অনেকেই জানে না যে কিভাবে আমাদের এই গর্বের অর্জন পৌঁছে গেল বিশ্বদরবারে। লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২০১৩ সালের ২০ই নভেম্বর কানাডার ভ্যানকুভারেই পরলোকগমন করেন একাত্তরে বিএলএফের হয়ে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম। তার এবং তার সহযোদ্ধা আবদুস সালামের নামে কোন স্থাপনার নামকরণও হয়নি, নেওয়া হয়নি এমন কোন উদ্যোগ যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মাতরে তরুণ-তরুণীরা তাদের কীর্তি সম্পর্কে জানতে পারে। সবচেয়ে অসাধারণ হচ্ছে ২০১৩ সালে রাজাকার-আলবদরদের ফাঁসীর দাবীতে তৈরি গণজাগরণকে সমর্থন জানিয়ে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারেও সমাবেশ হয়েছিল, সেখানে উপস্থিত হয়ে রাজাকারদের ফাঁসীর দাবী জানিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম। পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে তারা এ ব্যাপারে তাদের মতামত জানাতে গিয়ে বলেছিলেন,

আবদুস সালামআমি নিজে কখনো রাজনীতি করিনি, কিন্তু আমি খুব আগ্রহ নিয়ে রাজনীতি অনুসরণ করি — শুধু বাংলাদেশের না, সারা পৃথিবীর রাজনীতি। কারণ, আমি একজন বিশ্ব নাগরিক — আমি বুঝতে চাই আমার চারপাশে কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে? শাহবাগের আন্দোলন আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে আমাদের তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের আসল ইতিহাসটি জানতে পেরেছে। বিভিন্ন সময় আমাদের দেশে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা হয়েছে — যেটা কখনোই উচিত ছিল না — তারপরও তারা প্রকৃত ইতিহাসটি জেনেছে। আমি তাদেরকে স্বাগত জানাই– ৪২ বছর পরে হলেও আমাদের দেশের মানুষ জেগে উঠেছে। শুধু কিছুজন ছাড়া– যারা জানে যে তারা বিভ্রান্তিতে আছে; জেনেশুনে ভুল একটা জিনিস ধরে আছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কোনো দেশের জন্য কোনোদিন কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না — এতে মানুষে মানুষে শুধু হানাহানিই হয়; অন্য মানুষকে ছোট করে দেখা হয়। আমরা দেখেছি ইসলামের নামে আমাদের দেশে জামাতে-ইসলামী একটি চিহ্নিত স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি হয়েও কিভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তারা যে কত বিষাক্ত হতে পারে ১৯৭১ তারা সেটা দেখিয়েছে — এখনও দেখাচ্ছে। কোনো একজন মানুষকে হত্যার জন্য আমাদের দেশে কারও যদি ফাঁসি হতে পারে — তাহলে এই জঘন্য অপরাধীদের ফাঁসি হবে না কেন? শাহবাগের ব্লগারদেরকে নাস্তিক আর ধর্মবিরোধী হিসেবে আখ্যা দিয়ে তারা একইভাবে তাদের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার করতে চা্চ্ছে যেমনটি তারা একাত্তরে করেছিল।আমি জামাতের প্রতিষ্ঠাতা্ আবুল আলা মওদুদীর ছেলের সাক্ষাৎকার দেখেছি যেখানে তিনি বলেছেন যে মানুষ যেমন করে ড্রাগস থেকে নিজের ছেলেমেয়েকে দূরে সরিয়ে রাখে মওদুদীও তেমন করে তার নয় ছেলেমেয়েকে সব সময় সে জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতো যেখানে সে জামাতের ডকট্রিন প্রচার করত। তাই আমি মনে করি বাংলাদেশে যারা জামাতে ইসলামী করছে তারা জানে না তারা বিষাক্রান্ত হয়ে আছে — তারা আসল ইসলাম থেকে অনেক দূরে আছে এবং তাদেরই উচিত আসল ইসলামটা ফলো করা। অন্যদেরকে নাস্তিক বলার অধিকার তাদের নাই, অন্যদেরকে মুরতাদ বলার অধিকার তাদের থাকতে পারে না — ঠিক যেমন আমার কোনো অধিকার নাই কাউকে মুরতাদ বলার; এটা আল্লাহ বিচার করবে। আমার মূল বক্তব্য হচ্ছে — রাজাকারদের বিচার বকেয়া হয়ে আছে ৪২ বছর ধরে — এদের বিচার হওয়া উচিত এবং সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত যাতে করে দেশের মানুষকে যেন আর বিভ্রান্ত না করা যায় এবং দেশে যেন শান্তি আসে। কারণ, তারা তাদের ভুল ডকট্রিন দিয়ে দেশকে বিভক্ত এবং পোলারাইজ করে ফেলছে এবং দেশকে উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে দিচ্ছে না।

রফিকুল ইসলামশাহবাগ আন্দোলনের সাথে পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করে আমি এখানে হিটলারের অন্যতম সহযোগী আইখম্যানের বিচারের কথা বলব। আমরা জানি আর্জেন্টিনায় পালিয়ে থাকা আইখম্যানের বিচার ইসরাইল কি দৃঢ় সংকল্পতার সাথে করেছিল। সেই উদাহরণ টেনে আমি এখানে তিনটি কথা বলব — ১. গণহত্যা,গণধর্ষণের মত জঘন্য মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত রাজাকারদের সর্বনিম্ন শাস্তি যেন মৃত্যুদণ্ড হয়, ২. রাজাকারদের সম্পত্তি যেন বাজেয়াপ্ত করে সরকারিকরণ করা হয় এবং ৩. কোনো রাজাকারকে যেন বাংলাদেশের মাটিতে কবর দেয়া না হয়। আমার ছোট ভাই স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন দিয়ে গেছে, আমার জীবনের অনেক বড় গর্ব আমি স্বাধীনতাযুদ্ধ করতে পেরেছি, আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে ধন্যবাদ জানাই আমি একটি সু্‌স্থ, সুন্দর জীবনযাপন করতে পেরেছি। গত দু’বছর ধরে যদিও একটু শরীর খারাপ যাচ্ছে — আমার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছে, ১৯ টি কেমোথেরাপি দিতে হয়েছে, আমার বোন রিনা বাংলাদেশ থেকে এসে তাঁর বোন-ম্যারো আমাকে ডোনেট করেছে যেটি দিয়ে আমি এখন বেঁচে আছি। আমি এখন কানাডিয়ান, কিন্তু আমি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছি। আমি প্রার্খনা করি বাংলাদেশের মানুষ যেন সুখে, শান্তিতে আর ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে থাকতে পারে। বিকৃত ইতিহাস থেকে মুক্ত হয়ে যেভাবে তারা চায় সেভাবে যেন থাকতে পারে এবং তরুণ প্রজন্মের যে নব জাগরণ হয়েছে তাকে অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে সাধুবাদ জানাই।

রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামদের এতো সহজে ভুলে গেলাম আমরা? তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি, সম্মান দেওয়া কিংবা তাদের কীর্তি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করা কি এতোটাই কঠিন?

তথ্যসুত্র ও সার্বিক কৃতজ্ঞতা:

Comments
Spread the love