হাইট একটু কম, আকীকা দেয়া নাম ভুলিয়ে দিয়ে স্কুল, কলেজ, এলাকায় তার নাম হয়ে যায় “বাইট্টা”। সবাই বাইট্টা বলে মজা নেয়। যে শোনে সে হয়ত বিকেল বেলা খেলতে না গিয়ে মন খারাপ করে বাসায় বসে ভাবে, আমার তো কোন দোষ ছিল না! আমি কেন আরেকটু লম্বা হলাম না!

অথচ ব্রেনের ব্যবহারের দিক দিয়ে, মেধার দিক দিয়ে তার ধারে কাছে হয়ত আশেপাশের কেউ নেই। লাস্ট পরীক্ষায় ম্যাথে ৯৫ পেয়েছে সে। তবুও সে ‘বাইট্টা’!

আবার স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে হাইট বেশি হলে সে হয়ে যায় লম্বু, তালগাছ। তার নাকি মাথায় কিছু নেই, বুদ্ধি হাঁটুতে।

একটা ছেলে একবার আমাকে বলছিল, “৬ ফুট হাইট বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে বেশী। হাইট ৬ ফুট হলে নাম হয়ে যায় লম্বু, বুদ্ধি হাটুতে। জন্ম থেকে এসব শুনতেছি।”

আবার ওজন বেশি, মোটাসোটা, নাম হয়ে যায় ভোটকা। কালো- সাদার রেসিজম তো আছেই। সেটা খুবই ভয়াবহ মেয়েদের বেলায়।

এক মেয়ের কাছে শুনেছিলাম, “যুক্তিতে না পারলে তখন বলে কালো মেয়েদের এত দেমাগ ভালো না। ইনবক্সে বাজে প্রস্তাবে সাড়া না দিলে, আয়নায় নিজের মুখ দেখছিস! বিয়ের বেলায় মেয়ের সব ভালো খালি গায়ের রং কালা। কালা! ওর মেয়ে হইছে । গায়ের রং কি? -কালা ঘৃনা লাগে এই সব। বিয়ে করলে আমার মত চামড়া কালা ছেলেই বিয়ে করবো।”

দুই ঠোঁট দিয়েও দাঁত ঢাকে না কারও, সে হয়ে যায় দাঁতাল। একটু চ্যাপ্টা নাক থাকলেই সে হয়ে যায় বোঁচা। চোখ বেশি ছোট হলে চায়নিজ চোখ, চোখ বেশি বড় হলে গরুর চোখ।

মুমু নামের এক মেয়ে আমাকে বলেছেন, “আমি কালো, খাটো, নাক বোঁচা একটা মেয়ে, এইটা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নাই, কিন্ত আত্মীয়-স্বজনের বিরাট সমস্যা, চান্স পাইলেই জিগায়, বোনদের ভিতরে তুমিই সবচেয়ে শর্ট না? তুমিই শুধু কালো না? তখন কি করা লাগে?”

কারও ঠোঁট ন্যাচারালি কালো হলেও বলে সিগারেট খেয়ে বানিয়েছে। ঠোঁট বেশি লাল হলে বলে মেয়েদের মত ঠোঁট। দাড়ি না উঠলে তো কথাই নেই। কীভাবে দাড়ি উঠানো যায় সেসব নিয়ে সবাই পরামর্শ দিতে আসে। কেউ কেউ রেজার গিফট করে। ট্রল পেজের পোস্টে মেনশন করে অপমান তো চলেই। আবার দাড়ি কম উঠলেও কটা উঠেছে সেটা আবার গুনেও রাখে কেউ কেউ। চুল পড়া শুরু হয়ে লুক চেঞ্জ হওয়ার আগেই নাম চেঞ্জ হয়ে টাকলা হয়ে যায়।

বাবা মায়ের সাথে চেহারার মিল না পেলে সবাই অবাক হয়ে এমন খারাপ একটা ইংগিত করে, যেটা শুনলে গা ঘিনঘিন করে। আশপাশের মানুষের মন্তব্য নিয়ে এক আপু বলেছেন, “তোমার দুই বোন অনেক সুন্দরি তুমি শ্যামলা হইলা কেন? আজব আমি জানবো কিভাবে! এই হচ্ছে মানুষ!”

ফেসবুকে দেখেছিলাম, এক ভদ্রলোক বলেছেন, “বুদ্ধি বেশী হইলেও সমস্যা। কোন ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই বলে, সবকিছু একটু বেশি বুঝস!”

মেয়ে হলে আবার সবদিক দিয়েই সমস্যা। মিতু আকতার নামের এক মেয়ে বলেছেন, “মেয়েদের বেলায়, everyone like “এই মেয়ের জামাই কই পাবো?”

পচানো ব্যাপারটায় আমাদের আগ্রহ প্রচুর। একজন আরেকজনকে পচিয়ে আমরা প্রচুর সুখ পাই। অথচ এই ব্যাপারগুলোর কোনোটাই আমাদের হাতে না। সৃষ্টিকর্তা যাকে যেভাবে বানিয়েছেন সে তেমনই থাকবে। বদলানোর সু্যোগ নেই।

এই জিনিশটা যদি নিজেদের হাতে থাকতো তাহলে পৃথিবীর সব ছেলেরাই মাথা ভরা চুল, গাল ভরা দাড়ি, সিক্স ফিট হাইট আর সিক্স প্যাক অ্যাবসওয়ালা ড্যাশিং লুক নিয়ে জন্মাতো। সব মেয়েরাই ৫.৫ হাইট, স্লিম ফিগার আর সাদা সাদা চামড়া নিয়া জন্মাতো। অথচ, যেটা আমাদের হাতে না সেটা নিয়েই আমাদের যত আলোচনা। সেটা নিয়েই কত হাসি তামাশা। এই এসব শুনেও সার্ভাইভ করা দলের মানুষদের জন্য দুনিয়াটা কঠিন।

স্টুডেন্ট হিসেবে যত মেধাবীই হোক, কর্মক্ষেত্রে যত ইফিশিয়েন্ট হোক, মানুষ হিসেবে যত ভালোই হোক না কেন। দিন শেষে নিখুঁত কেউ যখন তাদের সাথে ফাইট দিতে পারে না, তর্কে জিততে পারে না, কোনকিছুতেই টপকাতে পারে না তখন মুখের উপর বলে দেয়… তুই বাইট্টা, তুই কাইল্লা, তুই টাকলা, তুই ভটকা, নিজের চেহারা আয়নায় দেইখা আয়… শালা ট্যাবলেট!

খেলাটা যখন ব্রেন টু ব্রেন না হয়ে, কোয়ালিটি টু কোয়ালিটি না হয়ে এপিয়ারেন্স টু এপিয়ারেন্স হয়ে যায় তখন যে এভাবে সৃষ্টি করেছে প্রতি একটাই জিজ্ঞাসা থাকে- হোয়াই অলওয়েজ মি?

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-