ভারতের বিজেপি বলে রবীন্দ্রনাথ খাঁটি হিন্দু না, অন্যদিকে হেফাজতিদের কাছে রবীন্দ্রনাথ হলেন ইসলাম বিদ্বেষী পাক্কা হিন্দু! রবীন্দ্রনাথের মতন আর কোন মানুষকে নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে এত বেশি গুজব, মিথ্যা প্রোপাগান্ডার ছাড়ানো হয়নি। কারণ বামনের দেশে এতো বড় বটবৃক্ষ আগে কখনো জন্মায়নি। ছোট বেলায় শুনতাম কবি নজরুলকে নাকি বিষ খাইয়ে মেরেছেন রবীন্দ্রনাথ। এসব প্রোপাগান্ডা এখনও মাদ্রাসায়সহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো হয়।

একসময়কার কাফের নজরুলের মুসলিম হয়ে শ্রী কৃষ্ণ লীলার উপর গান রচনা করা, শ্যামা সঙ্গীত রচনা করা, “খোদার আসন আরস ছেদিয়া.. উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর” চোখে পড়ে না কারও, তার গান ছাড়া এখন আমাদের ইদ হয় না। যার সন্তানের নাম কৃষ্ণ, অরিন্দম; যার প্রেমিকার নাম প্রতিভা বসু এবং স্ত্রীর নাম ছিল প্রমীলা সেনগুপ্ত, সেই কবি নজরুল ভাগ্যিস আজ বেঁচে নেই! বেঁচে থাকলে যার কল্লা হতো হেফাজতীদের, জঙ্গিদের আকাঙ্খিত বস্তু; সে-ই আজ সাচ্চা মুসলমান, তাকে নিয়েই এদেশে মুসলমানরা গর্ব অনুভব করে, পুলকিত হয় এই ভেবে, ‘মালাউনদের রবীন্দ্রনাথ থাকলে আমাদেরও নজরুল আছে’! তারা বগল বাজায় এ ভেবে, ‘শেষের দিকে পাগল না হয়ে গেলে রবীন্দ্রনাথ যে নোবেল পাইছিল, নজরুল একাই সেই নোবেল চার-পাঁচটা পাইতো’!

যাই হোক, কবি, প্রাবন্ধিক আব্দুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন- রবীন্দ্রনাথের সময়কালে শান্তিনিকেতনে প্রতি বছর নবী মুহাম্মদ এর জন্মবার্ষিকীর উৎসব বা ঈদে মিলাদুন্নবি পালন করা হত। নবীজীকে উদ্দেশ্য করে রবীন্দ্রনাথের লিখা একটি গান গাওয়া হতো,

‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ
জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস।
সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো,
পাগল ওগো, ধরায় আস।’

বুদ্ধের জন্য নির্বাচিত ছিল : “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী” যীশুর জন্যে ছিল ” একদিন যারা মেরেছিল তাঁরে গিয়ে” গগনের থালে রবিচন্দ্র দীপক জ্বলে” গাওয়া হতো গুরু নানকের জন্মদিনে। ফাতেহাইয়াজদমে গাওয়া হতো “কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো”।

১৯৩৩ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ে সিরাতুন নবীর সভায় রবীন্দ্রনাথের লিখিত বানী পাঠ করেন সরোজিনী নাইডু। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, “জগতে যে সামান্য কয়েকটি মহান ধর্ম আছে , ইসলাম ধর্ম তাদেরই অন্যতম “।

১৯৩৬ সালে নয়াদিল্লীর জামে মসজিদের পয়গম্বর সংখ্যার জন্য এক লেখায় তিনি হজরত মুহাম্মদের (সা:) প্রতি পবিত্র ও গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন “মানুষের ইতিহাসে এক নতুন সম্ভাবনাময় জীবনীশক্তির সঞ্চার করেছিলেন পয়গম্বর হজরত”।

কোন ব্যক্তিকে ঘৃণা করলে জেনে বুঝে ঘৃণা করা উচিত। অথচ এই দেশের মানুষের ঘৃণার ভিত্তিই হল গুজব, আর মিথ্যা প্রোপাগান্ডা।

Comments
Spread the love