কৌতুক করে কেউ কেউ বলে থাকেন, তিনি হচ্ছেন বলিউডে মহেশ ভাটের সেরা অবদান! কথাটা বি-টাউনে এত বেশী প্রচলিত যে, একটা সিনেমাতেও এই ডায়লগটা চলে এসেছে! বাবা নামজাদা পরিচালক, চাইলে যেকোন মূহুর্তে সিনেমায় নামতে পারতেন তিনি। কিন্ত বাবার হাত ধরে সিনেমায় ক্যারিয়ার গড়বেন, এমনটা বোধহয় ইচ্ছে ছিল না। হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন করন জোহর, সেই হাত ধরে তার উঠে আসা। লোকে চিনলো, এটা মহেশ ভাটের মেয়ে আলিয়া ভাট! ব্যাস, এইটুকুই। পরের রাস্তাটুকু নিজে গড়ে নিয়েছেন তিনি, এখনও নিচ্ছেন। নিজের কীর্তিতে মাথার ওপর থেকে সরিয়ে দিয়েছেন বাবার ছায়াটা। আলাদা একটা পরিচিতি তৈরি করেছেন আপন প্রতিভা দিয়ে। ‘আলিয়া ভাট’- এখন এই প্রজন্মের সবচেয়ে ব্যস্ত আর প্রতিভাবান একজন অভিনেত্রীর নাম, সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অভিনেত্রীর নামও কি নয়?

বছর পঁচিশের এই তরুণী বাস্তব জীবনে বেশ আবেগী। ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়ে তার কান্না থামতে চায় না, তার গলা ধরে আসে, কথা বেরোয় না মুখ দিয়ে। সেই মেয়েটাই ক্যামেরার সামনে কি দুর্দান্ত রকমের সাবলীল! যেন তার জন্মই হয়েছে শুধু অভিনয় করার জন্যে! হাইওয়ে-টু স্টেটস-উড়তা পাঞ্জাব কিংবা ডিয়ার জিন্দেগী, আলিয়ার অভিনয় প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটেছে বরাবরই। আরও একবার সেই দুর্দান্ত অভিনয়ের একটা ঝলক দেখা গেলো মেঘনা গুলজারের আপকামিং সিনেমা ‘রাজি’র ট্রেলারে। এই সিনেমায় নিজের আদলটা ভেঙে অন্যরকম একটা রূপে হাজির হয়েছেন আলিয়া ভাট, সাধারণের মধ্যে লুকিয়ে থাকা যে অসাধারণত্বকে চট করে আলাদা করা যায় না!

প্রতিটা দেশেই এমন কিছু মানুষ থাকেন, দেশের জন্যে কাজ করলেও যাদের অবদানের কথা কেউ জানতে পারে না, তাদের গলায় মেডেল ঝোলানো হয় না, মৃত্যুর পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয় না তাদের। তাদের কেউ চেনেনা, বীর হিসেবে তাদের নামটা উচ্চারিত হয় না। শুধু পতাকার সুতোয় নিজেদের অবদানের ছোট্ট ছোট্ট গল্পগুলো লিখে যায় তারা, সেটা সবার চোখে ধরাও পড়ে না। এমনই একজন মানুষের চরিত্রে অভিনয় করছেন আলিয়া, সোজা করে বললে যাকে ‘স্পাই’ বলা চলে।

‘রাজি’ সিনেমার গল্পটা সত্যি ঘটনার ওপরে লেখা একটা উপন্যাস অবলম্বনে বানানো। উপন্যাসটার নাম ‘কলিং সেহমাত’, লেখক হরিন্দ্র শিক্কা নিজে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। নিজের জীবন বিপন্ন করে একজন পাকিস্তানী সেনাকে বিয়ে করেছিলেন কাশ্মিরী এক তরুণী। সেই বিয়ের আড়ালে গুপ্তচর হয়ে কাজ করছিলেন তিনি, স্বামীর কাছে পাওয়া ডিফেন্স সার্ভিসের গোপন তথ্যগুলো তিনি সুকৌশলে পাচার করেছিলেন ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে। সেই গল্পটাকেই এবার সেলুলয়েডে রূপ দিতে চলেছেন মেঘনা গুলহার, সেহমাত চরিত্রে অভিনয় করছেন আলিয়া ভাট, তার সহশিল্পী হিসেবে আছেন ভিকি কৌশল।

উপন্যাসটার লেখক হরিন্দ্র শিক্কা ছিলেন আর্মি অফিসার। ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের সময় পাকিস্তান বর্ডারে দায়িত্ব পালন করছিলেন। যুদ্ধে ব্যর্থতার কারণ দর্শানো নিয়ে একটা সভায় খুব রেগে গিয়ে আক্রমণাত্নক কিছু কথা তিনি শুনিয়েছিলেন জুনিয়র অফিসারদের, তাদের দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। সবাই চলে যাবার পরে এক অফিসার এসে তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলো, অপ্রসন্ন মুখে সে কি বলতে চায় সেটা শুনতে বসলেন হরিন্দ্র শিক্কা। সেই জুনিয়র অফিসার শুরুতেই জানালেন, তার বাবা একজন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। শুনেই চমকে উঠেছিলেন শিক্কা। এটা কিভাবে সম্ভব! কিন্ত পুরো গল্পটা শোনার পরে শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে মাথা নুইয়ে এসেছিল তার।

১৯৭১ সাল, পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে। ভারতের সমর্থন নতুন জন্ম নেয়া বাংলাদেশের প্রতি। অস্ত্র-গোলাবারুদ দিয়ে মুক্তিকামী দেশটার গেরিলা যোদ্ধাদের সাহায্য করছে ভারত। সেটা পাকিস্তান সহ্য করবে কেন? একটা যুদ্ধ তাই আসন্ন হয়ে উঠলো। ডিসেম্বরের তিন তারিখে পাকিস্তানী বিমান হামলা চালালো ভারতের সীমানায়, এতদিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, এবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেল ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধও।

সেই বছরেই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের এক ধনী মুসলমান ব্যবসায়ীর কন্যার সাথে বিয়ে হয়েছিল পাকিস্তানের এক সেনা কর্মকর্তার। সেই তরুণীর নাম সেহমাত খান। বিয়ের পটভূমিটা একটু আলাদা ছিল, অন্য দশটা বিয়ের মতো ছিল না এটা। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এই বিয়ের পেছনে কলকাঠি নেড়েছিল, সেহমাতকে স্পাই বানিয়ে পাকিস্তানী সেমা আর নৌবাহিনীর ক্লাসিফায়েড ডকুমেন্টগুলো হাতে আনার পরিকল্পনা করেছিল তারা। সেহমাত আর তার পিতা, দুজনেরই সায় ছিল তাতে। একজন ফিল্ড এজেন্টের মতো প্রশিক্ষন দেয়া হয়েছিল সেহমাতকে, সঙ্গে এটাও বলে দেয়া হয়েছিল, যদি কোন কারণে সে ধরা পড়ে যায়, ভারত তার অস্তিত্বই অস্বীকার করবে। মেয়েটা একটুও ভয় পায়নি এই কথায়।

সমরযুদ্ধে একটা কথা খুব মানা হয়- সাগরটা যার দখলে থাকবে, সেই প্রকৃত ক্ষমতাধারী। সেই সাগরের ক্ষমতাটা ধরে রাখতেই ভারতীয় নৌবাহিনীকে সাহায্য করেছিলেন সেহমাত। ভারতীয় এয়ারক্র‍্যাফট ক্যারিয়ার আইএনএস বিরাটকে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করছিলেন সেহমাত, তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পাকিস্তান নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোর অবস্থান সুনিশ্চিত হতে পেরেছিল আইএনএস বিরাট। জলসীমায় পাকিস্তানীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার পেছনে নিজের জীবন বাজী রেখে দেশের জন্যে বিশাল একটা ভূমিকা পালন করেছিলেন সেহেমাত। ধরা পড়ে গেলে নিকৃষ্ট কোন পরিণতিই বরন করে নিতে হতো তাকে, কিন্ত সেসবের পরোয়া তিনি করেননি কখনও। পাকিস্তানে থাকার সময় জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ভাতিজা-ভাতিজীদের পড়াতেন তিনি, খাতির জমিয়ে নিয়েছিলেন উচ্চপদস্থ সেনা অফিসারদের স্ত্রীদের সঙ্গেও। তাদের সাথে আড্ডা দিতে বসেও প্রচুর তথ্য বের করে আনতেন তিনি।

যুদ্ধ শেষ হলো, সেহমাতের কাজও শেষ। তার এই গুপ্তচরবৃত্তির খোঁজ কেউ বের করতে পারেনি পাকিস্তানে। ভারতেও তার বাবা আর উচ্চপদস্থ কয়েকজন সেনা অফিসার ছাড়া সেহেমাতের আসল পরিচয়টাও কেউ জানতেন না। পাকিস্তান ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে এলেন সেহমাত; গর্ভে তখন সন্তান। সেই সন্তানকে একাই বড় করেছেন। পাড়া-প্রতিবেশী কেউই ঘূর্ণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি, পাশের বাড়ির এই মেয়েটা এমন ভয়ানক একটা কাজ করে এসেছে! নিজে দেশের জন্যে জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তত ছিলেন সবসময়, তাই ছেলেকেও বরাবর উৎসাহ দিয়ে গিয়েছেন সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার ব্যাপারে। একমাত্র ছেলেটা তার ইচ্ছে পূরণ করে আর্মিতে অফিসার হিসেবে জয়েন করেছিল। সেই ছেলেটাই ছিলেন হরিন্দ্র শিক্কার জুনিয়র অফিসার, শিক্কা ছেলেটার মুখেই তার মায়ের বীরত্বগাঁথা শুনেছিলেন।

২০০৮ সালে এই ঘটনাটা নিয়ে একটা উপন্যাস লিখলেন হরিন্দ্র শিক্কা, নাম কলিং সেহমাত। কেন্দ্রীয় চরিত্রের নামেই উপন্যাসের নাম, যদিও সেহমাত নামটা কাল্পনিক, শিক্কা কখনও সেহমাত নামের আড়ালে থাকা এই বীর ভদ্রমহিলার আসল পরিচয়টা স্বীকার করেননি। সেহমাত নামে সবাই যে চরিত্রটাকে চেনে, তিনি নিজেও কখনও প্রচারের আলোয় আসতে চাননি, দেশের কাছে কোন ধরণের স্বীকৃতি দাবী করেননি। তার ছেলেটাও নিজের যোগ্যতাতেই সেনাবাহিনীতে সুযোগ পেয়েছিল, কারো অনুগ্রহের দরকার পড়েনি তার জন্যে। শিক্কা নিজে গিয়ে সেহমাতের সঙ্গে দেখা করেছিলেন বেশ কয়েকবার, কথা বলেছেন, জানতে চেয়েছেন সেই সময়, সেই ঘটনাগুলোর ব্যাপারে। সেহেমাত বেশী কথা বলতেন না, শিক্কার সঙ্গেও গুপ্তচরবৃত্তির সেই গল্পগুলো খোলামেলাভাবে বলেননি কখনও। সে কারণেই উপন্যাসে খানিকটা ফিকশনের আশ্রয় নিতে হয়েছে লেখককে। জীবদ্দশায় তাকে নিয়ে কোন বই প্রকাশিত হবে, কাল্পনিক কিংবা বাস্তব নামে যাই হোক না কেন- সেটার বিরুদ্ধে ছিলেন সেহমাত। বইটা যখন প্রকাশিত হয়েছে, ততদিনে সেহমাত চলে গেছেন না ফেরার দেশে, সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছেন শিক্কা, সেহমাতের ছেলেও তখন আর্মি ছেড়ে অন্য চাকুরী করছেন।

তালভারের পরে মেঘনা গুলজারের আরেকটা মাস্টারপিস সিনেমা আসতে যাচ্ছে, এমনটাই আশা বলিউডি দর্শকদের। সত্যি ঘটনার ওপরে নির্মিত সিনেমায় এই প্রথম অভিনয় করছেন আলিয়া ভাট। সেহমাত চরিত্রটাকে পর্দায় কতটা নিঁখুতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন তিনি, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সেরা অভিনেত্রী হিসেবে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ফিল্মফেয়ার পুরস্কারটা তিনি এই সিনেমা দিয়েই জয় করবেন বলে দাবী করছেন অনেকে। বাকীটা সিনেমা মুক্তি পেলেই বোঝা যাবে।

Comments
Spread the love