সরকারি চাকুরিতে বাংলাদেশের মানুষের জন্য ১০০% কোটা নিশ্চিত হয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। পরবর্তীতে এই ১০০% কোটাকে বিভিন্নভাবে ভাগ করা হয়েছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা সরাসরি অবদান রেখেছেন সেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরুপ তাদের জন্য ও তাদের সন্তানদের জন্য সরকারি চাকুরিতে কোটা বরাদ্দ ছিল খুব স্বাভাবিক ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। এর পাশাপাশি আছে নারী, কোটা, জেলা কোটা ইত্যাদি। সবগুলো কোটাই অত্যন্ত যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়। যে কারণে স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ কয়েক দশক ‘কোটা সংস্কার’ বিষয়ক কোন ধারণার উদ্ভব হয়নি, প্রয়োজনও পড়েনি।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পর থেকেই এই বাংলাদেশেই ‘স্বাধীনতাবিরোধী চক্র’ নামক একটা গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল, এখনো আছে। দীর্ঘদিন ধরেই এরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় আছে। আর এর জন্য সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে তাদের অনুগত লোকদের অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে তাদের অতি সুপরিকল্পিত এক কৌশল।

আর এই কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায় ছিল ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’। তাই অনেক আগে থেকেই এই গোষ্ঠী সরকারি চাকরিতে ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’ কিভাবে কমানো যায় সেই চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু তাদের সাথে জনসমর্থন ছিল না।

কেন ছিল না?

কারণ একসময় সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে সরকারি চাকরি এতো ‘গ্ল্যামারাস’ কিছু ছিল না। তবে ধীরে ধীরে এই পরিস্থিতি বদলেছে। বেতন স্কেল বৃদ্ধিসহ নানামুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারি চাকুরি বিশেষ করে ‘বিসিএস’ কে এতো বেশি হাইপড করা হয়েছে যে চাকরির বাজারে এটাই এখন হটকেক। একসময় ‘সরকারি চাকরি’ বলতে নাক শিটকানো মানুষজনও এখন নিজেদের সন্তানদের সরকারি চাকরিতে দেখতে চায়।

অনেক সত্যিকারের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরাই বিদেশে চলে না গিয়ে দেশেই ভাল কিছু করার চিন্তাতে এখন ‘বিসিএসমুখী’ হচ্ছেন। এবং এই পরিবর্তিত পরিস্থিতে হঠাৎ করেই অনেকে আবিষ্কার করেছে যে সরকারি চাকুরিতে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সামনে একটা বাঁধা হয়ে এসেছে বিভিন্ন কোটা, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা।

এখন কথা হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা কমানো তো ছিল স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর এজেন্ডা। সেই এজেন্ডায় দেশের সাধারণ মানুষ তথা ছাত্র-ছাত্রীরা কেন আগ্রহী হয়ে উঠলো?

কারণ দুইটি।

১) মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য কোটা বরাদ্দ খুবই যৌক্তিক একটা ব্যাপার ছিল। কিন্তু তাদের পরবর্তী বংশধরদের জন্যেও একই কোটা সুবিধা বরাদ্দ করা অনেকের কাছেই ‘যৌক্তিক’ সিদ্ধান্ত নয়!

২) শুধুমাত্র বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার জন্য ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট’ সংগ্রহ কিংবা দলীয় লোকজনদের বরাদ্দ দেয়ার মাধ্যমে এই কোটাকে কলুষিত করা।

সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের অনেকেই কোটা থাকা সত্ত্বেও সেই বাড়তি সুবিধা না নিয়ে নিজেদের মেধার মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, হচ্ছেন। অথচ যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটধারীরা এই ‘অন্যায় সুবিধা’ গ্রহণ করে সত্যিকারের যোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

এভাবেই একসময়ের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর এজেন্ডা এখন দেশের সর্বস্তরের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে! এবং তারই ফলশ্রুতিতে গত কয়েকদিনের এই ছাত্র আন্দোলন।

এই আন্দোলনের বেশকিছু ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিষয় আমার নজরে এসেছে। প্রথমেই কিছু নেতিবাচক বিষয় নিয়ে বলি।

গত কয়েকদিনে আমি বেশ কয়েকবার অবাক হয়েছি।

প্রথমবার অবাক হয়েছি, যখন জেনেছি শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক দাবির একটি আন্দোলনকে পুলিশ শক্তি প্রয়োগ করে থামানোর চেষ্টা করেছে। একই সাথে যোগ দিয়েছে সরকারের অনুগত ছাত্রসংগঠন। 

আমি ভীষণ অবাক হয়েছি যখন এক ছাত্রের মৃত্যুর ভুয়া গুজব ছড়িয়ে আন্দোলনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সাথে ভুয়া ছবি ছড়িয়ে যখন এই আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে সেটিও ছিল অনেকটাই সেই শাহবাগ আন্দোলনের বিরোধীতাকারীদের নেয়া অপকৌশলকে অনুসরণ!

আমি অবাক হয়েছি, যখন কোন কারণ ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলা চালানো হয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে থাকা সাধারণ ছাত্রদের কেউ এই ভাংচুর করেছে বলে আমি মনে করি না। একই সাথে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র যদি আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে এই আক্রমণ করে থাকে, তবে সেটাও এমন ‘রক্তপাতহীন’ভাবে শেষ হয়ে গেছে বলে মেনে নিতেও কেমন জানি কষ্ট হচ্ছে!

এরপর আমি অবাক হয়েছি, যখন এই আন্দোলনকে সেই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র তথা ‘রাজাকারের বাচ্চা’দের আন্দোলন বলে সরকারের দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন! যদিও, তিনি এটাও বলেছেন যে ছাত্রদের প্রতি তাদের কোন ক্ষোভ নেই। কিন্তু, এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ঢালাওভাবে এমন মন্তব্য কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য ছিল না।

আমি বলছি না, এই আন্দোলনে ‘স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী’র সমর্থকরা যোগ দেয়নি, কিন্তু তাই বলে পুরো আন্দোলনটাই তাদের বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা ছিল বিস্ময়কর!

মুক্তিযুদ্ধের পরে একটা সময় স্বাধীন বাংলাদেশে ‘রাজাকার’ শব্দটা উচ্চারণ করা যেত না। দীর্ঘ বিরতির পর প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ তার নাটকে পাখির মুখ দিয়ে ‘তুই রাজাকার’ বলিয়েছিলেন। সর্বশেষ ২০১৩-তে শাহবাগে গণআন্দোলনের সময় থেকে এদেশের তরুণ প্রজন্ম নতুন করে ‘রাজাকার’ শব্দটি চিনেছে ও রাজাকারদের ঘৃণা করতে শিখেছে।

এই ‘রাজাকার’ শব্দটিকে ‘হালকা’ করার জন্য বিভিন্ন সময়ে স্বাধীনতাবিরোধী সেই গোষ্ঠী নানাভাবে যে চেষ্টা চালিয়েছে, সেই চেষ্টাকেই বিস্ময়করভাবে সফল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে সংসদে মতিয়া চৌধুরীর দেয়া ঐ বক্তব্য। গত কয়েকদিনে এদেশের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই নিজেকে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেছে, এরচেয়ে দুঃখজন ঘটনা আর কি হতে পারে? মতিয়া চৌধুরী কি জানেন কত বড় ক্ষতি করেছেন?

এতোক্ষণ নেতিবাচকই বললাম, এবার কিছু ইতিবাচক দিক বলি।

এই আন্দোলনকারীরাই সেই মতিয়া চৌধুরীকেই ‘তুই রাজাকার’ বলে শ্লোগান দিয়েছেন। এর অর্থ হচ্ছে তারা এখনো ‘রাজাকার’ শব্দটিকে ঘৃণার চোখেই দেখছেন!

সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের কয়েকজন ছাত্র বিবেকের তাড়নায় সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেছেন, সাধারণ ছাত্রদের সাথে যোগ দিয়েছেন। পুলিশের টিয়ারশেলের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর সত্যিকারের আদর্শ লালন করেছেন!

শাহবাগ আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে এদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা একটা বড় ছাত্র আন্দোলন করেছিলেন। সেই আন্দোলনের সময়ও প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এক অনাকাংক্ষিত দূরত্ব লক্ষ্য করা গেছে। তবে এবারে আন্দোলনে প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যকার দূরত্ব অনেকাংশেই কমে এসেছে এবং ভবিষ্যতে এই দূরত্ব আরো কমবে বলেই আমার বিশ্বাস!

সরকার বলেছিল কোটা সংস্কারের জন্য তাদের কিছু সময় দরকার। ছাত্ররা বলেছিল, সংস্কারের আগ পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল অতি বিচক্ষণ!

তিনি বলেছেন, বার বার সংস্কার করার চেয়ে বাতিল করে দেয়াই ভাল। আর যদি সংস্কার দরকার হয় তবে সেটা কেবিনেট সেক্রেটারিকে ইতিমধ্যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তবে তিনি মনে করেন বাতিল হয়ে যাওয়াই ভাল!

একই সাথে তিনি আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিয়েছেন আবার পর্যবেক্ষণ কিংবা আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক সংস্কারের পথও খোলা রেখেছেন!

কোটা প্রথা হয়তো সংস্কার হবে, হয়তো বাতিলও হতে পারে। যেটাই হোক, সম্পূর্ণ আগের মত থাকবে না বলেই আমার বিশ্বাস। এবং এর পর বলটা আবারো সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কোর্টেই চলে আসবে। আজ যারা ন্যায্য দাবির পক্ষে আন্দোলন করছেন, তারা যখন সরকারি চাকরিতে সুযোগ পাবেন তখনি হবে তাদের সত্যিকারের পরীক্ষা।

আজকের আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীরা কোন একসময় সরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সকল প্রলোভন ও দুর্নীতির হাতছানি উপেক্ষা করে সত্যিকার অর্থে দেশের সেবায় কাজ করবে বলেই আমার বিশ্বাস। একই সাথে তাদের মনে রাখতে হবে, এই আন্দোলনেই তাদের আশে-পাশেই এমন কেউ না কেউ ছিল যে মন থেকে বাংলাদেশকে এখনো মেনে নেয়নি। এই বন্ধুবেশি শত্রুদের থেকে দেশটাকে রক্ষা করার গুরুদায়িত্বও তাদের কাঁধে থাকবে! আর হ্যাঁ! যাদের জন্য ১০০% কোটাই আমাদের হয়েছে, তাদেরকে কোন অজুহাতে, কোন পরিস্থিতিতেই কখনো অবমাননা করবেন না প্লিজ!

জয় বাংলা!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-