শামির মোন্তাজিদ

আমি একজন মু্ক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমার বাবা ২ নং সেক্টর থেকে যুদ্ধ করেছিলেন। চাইলে প্রমাণ স্বরূপ কর্ণেল আতাউল গণি ওসমানী সাহেবের সাইন করা সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়ের কাগজপত্র সবই দেখাতে পারবো। যথারীতি মুক্তিযোদ্ধার পরিবার হিসেবে আমরা বেশ কিছু সুবিধা লাভ করি। প্রতি মাসে সরকার থেকে আমাদের পরিবারকে ভাতা দেয়া হয়; মাঝে মাঝে উৎসবের বোনাসও পাই। মুক্তিযোদ্ধার পরিবার হিসেবে সম্মান কোনক্ষেত্র কম পেয়েছি বলে মনে হয় না। সবসময়ই মাথা উচুঁ করে বলতে পেরেছি আমি মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সন্তান।

আমার বাবা নিশ্চয়ই যুদ্ধে যাবার সময় “তার ছেলে সহজে বিসিএস ক‍্যাডার হবে” এই কথা চিন্তা করেননি। সবাই যুদ্ধ করেছে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে; বিনিময়ে তাদের কোন ব‍্যক্তিগত দাবীদাবা ছিলো না। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সরকার আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে সাহায‍্য করতে শুরু করে। এটা অবশ‍্যই দরকার ছিলো। দুই পা হারানো একটা লোকের পক্ষে সংসার চালানো তো কঠিন। যখনই এই ভাতার প্রচলন হলো, তখনই শুরু হলো হাজারো “নকল মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট” বানানোর ধান্ধা। একাত্তরের রাজাকারদের দলনেতাও স্বাধীন বাংলায় সরকার দলের পা-চাটা কুকুর হয়ে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়েছে। এই খবর এখন থেকে দশ বছর পুরোনো।
.
একসময় ব‍্যাপারটা অনেকটা এমন হয়ে দাড়ালো— “সরকার দলের সকল সাপোর্টারই মু্ক্তিযোদ্ধা”। এই পৃথিবীর যা কিছু আকর্ষণীয়, সবই তাদের অধিকারে যেতে হবে। মাছের মাথার পিস থেকে শুরু করে বিসিএস-এর চাকুরীর সিংহভাগ— সবই তাদের দরকার। বাংলাদেশের মানুষ অসম্ভব দেশপ্রেমিক ছিলো; এরপর এরা পরিণত হলো সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজে। ফলাফলস্বরূপ, দেশপ্রেমের প্রতীক “মুক্তিযোদ্ধা”দের নিয়ে শুরু হলো দুর্নীতি। আমার বিশ্বাস, আমার মতো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা এই ধরণের কোটা সুবিধার ধার ধারেন না।
.
দেশপ্রমিক মুক্তিযোদ্ধার পরিবারে বড় হয়ে থাকলে আপনার বোঝার কথা নিজের পায়ে দাড়াঁনোর কোন শর্টকাট নেই। আপনার পিতা মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছে; আপনারও দায়িত্ব স্বাধীন বাংলায় নিজের জন‍্য সাধ‍্যমতো পরিশ্রম করা। আপনার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হলে সরকার থেকে সাহায‍্য পাওয়াটা অবশ‍্যই যুক্তিযুক্তি; কিন্তু সেটা অন‍্যের অধিকার খর্ব করে নয়।
.
আমি ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেই। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়ে আমিও বিশ্ববিদ‍্যালয়ে চান্স পেয়েছি। সেটা “মুক্তিযোদ্ধা” কোটায় নয়; সেটার নাম “মেধা” কোটা। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম ১০০-তে স্থান করে মাথা উচুঁ করে সম্মান ডিগ্রী অর্জন করেছি। মর্ত‍্যের ওপার থেকে মুক্তিযোদ্ধা বাবা নিশ্চয়ই তা দেখে খুশি হয়েছেন— ছেলে মেধায় চান্স পেয়েছে, আমার সার্টিফিকেটের কোণা ধরে নয়।
.
আমাদের মতো মুক্তিযোদ্ধার হাজারো সন্তান পাবেন যারা এই কোটা পদ্ধতির সংস্কার চায়। তাহলে কারা এই আন্দোলনের বিপক্ষে?
.
আন্দোলনের বিপক্ষে আছে সরকার দলের পাতি নেতা। মন্ত্রনালয়ে নিজের কমিটির নাম জাহির করে এদের অনেকেই একটা করে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দখল করেছেন। দেহের রক্তে এদের দেশপ্রেম নয়, দুর্নীতির জোশ। যদি কোটা বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অপেক্ষা এই “সকল দলীয় মুক্তিযোদ্ধা”র সন্তানদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। কোটা বন্ধ হলে “মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট” বানানোর লাখ লাখ টাকার ব‍্যবসাও যাবে বন্ধ হয়ে। তাদের পু্চ্ছদেশে আগুন লাগার যথেষ্ট কারণ তো আছেই!
.
মুক্তিযোদ্ধার পরিবারকে সাহায‍্য করাটা অবশ‍্যই যুক্তিযুক্তি; তবে সেটা করতে গিয়ে যোগ‍্য লোকের ভাত মারলে আপনার দেশটাই রসাতলে যাবে। যাবে না বলে ইতোমধ‍্যে চলে গেছে বলাটাই ভালো। মুক্তিযোদ্ধার ছেলের পর এখন নাতিকে পর্যন্ত সুবিধা দিতে হবে! কেন? এইটা তো রাজতন্ত্র না যে বাবার পর ছেলে, এরপর তার ছেলে রাজা হবে। আর মনে রাইখেন, রাজতন্ত্র যখন চলেছিলো তখন অধিকাংশ অযোগ‍্য লোক বংশ পরম্পরায় রাজা হতো; এখন যেমন বিসিএস ক‍্যাডার হয়।

কোটা বৈষম্য, কোটা সংস্কার আন্দোলন
.
বিশ্ববিদ‍্যালয় পড়ুয়া সবাইকে বলি, সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত ক্লাসে যাবেন না। গর্ব করে বলতে পারছি, ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে আন্দোলনটার শুরু হয়েছে। সেইটা আজকে প্রথম না। সেই ৫২-৬২-৬৯-৭১ ও এখানেই শুরু হয়েছিলো। কিন্তু, দেশটা শুধু ঢাবির ছাত্রদের না; দেশটা আমাদের সবারই। ইতোমধ‍্যেই বুয়েটে-জাবি-চবি সহ অনেক জায়গায় ক্লাস বর্জন শুরু হয়েছে। আমার মতো হাজারো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরাও আপনাদের এই আন্দোলনের সমর্থক। আর সার্টিফিকেটধারী মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা যারা রামদা-তলোয়ার নিয়ে আপনাদের কোপাতে এসেছে তাদের দেখে ভয় পাবেন না। ১৯৭১ সালে আমার বাবারা ইয়াহিয়ার বন্দুকের গুলির তোয়াক্কা করলে আজকে আমি এই স্ট‍্যাটাসটা বাংলায় না লিখে উর্দুতে লিখতাম।
.
জয় বাংলা।

Comments
Spread the love