ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

কোটা নিয়ে কেন এত সার্কাস?

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারী চাকুরি থেকে কোটা প্রথা বাতিল করা হয়েছে মন্ত্রীপরিষদের বৈঠকে, এই বিষয়ে প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে আজ। কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনার জন্যে সরকারের ঠিক করে দেয়া কমিটির দেয়া পরামর্শ অনুযায়ীই ব্যবস্থা নিয়েছে মন্ত্রীপরিষদ। সরকারী চাকুরীতে বৈষম্যমূলক ৫৬% কোটা বিলুপ্ত হচ্ছে, কিন্তু এতে খুশি হবার সুযোগ কি আছে পুরোপুরি? লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী তো কোটা বিলুপ্তের দাবী নিয়ে রাস্তায় নামেনি। তারা রাজপথে নেমে এসেছিল বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতির একটা যৌক্তিক সংস্কারের দাবী নিয়ে। সেই দাবী তো পূরণ হয়নি। 

কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন তীব্র রূপ ধারণ করেছিল, তখন সংসদে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, কোটা নিয়ে যখন এত ঝামেলা, তখন কোটাই থাকার দরকার নেই। শেষমেশ প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণাটাই সত্যি হলো। যদিও সিদ্ধান্তটা নেয়া হয়েছে সচিব পর্যায়ের বিশেষায়িত কমিটির সুপারিশ অনুসারেই। নবম থেকে ত্রয়োদশ গ্রেডের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারী চাকুরীতে এখন থেকে শতভাগ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হবে। 

কিন্ত সমস্যা হচ্ছে, কোটাপ্রথা পুরোপুরি বিলুপ্ত করাটা আন্দোলনকারী ছাত্রদের দাবীর কোথাও ছিল না। তারা যতবারই তিনদফা বা পাঁচদফা দাবী তুলেছে, প্রতিবারই বলা হয়েছে, কোটাপ্রথার একটা যৌক্তিক সংস্কার চায় তারা। একটা দেশের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারী চাকুরীতে শতকরা ৫৬ জন কোটায় সুযোগ পাচ্ছে, এটা একেবারেই অযৌক্তিক, এবং অমানবিকও বটে। তারা বলেছে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকুক, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী বা পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্যেও কোটায় একটা নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ রাখা হোক। কিন্ত সেটা যেন সহনীয় মাত্রার হয়। সেই সহনীয় মাত্রাটা দশ পার্সেন্ট হতে পারে, পনেরো বা বিশ পার্সেন্টও হতে পারে। কিন্ত সেটা যেন পঞ্চাশ বা ছাপ্পান্ন শতাংশের মতো অযৌক্তিক কিছু না হয়।

এমনকি আন্দোলনে যেসব ছাত্রীরা অংশ নিয়েছিলেন, তারাও বারবার বলেছেন, নারী কোটা বা জেলা কোটা তারা চান না। নারীরা এখন সবকিছুতেই পুরুষের সাথে পাল্লা দিচ্ছে, সরকারী চাকুরীতে কেন তাদেরকে কোটার আশ্রয় নিয়ে সুযোগ পেতে হবে- এমন প্রশ্নও তুলেছিলেন তারা। তবে কোটা সংস্কার চাইলেও কোটা বাতিলের ঘোষনায় কোটা সংস্কারপন্থী নেতাদের ‘যা পেয়েছি তাতেই খুশী’ আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তাদের। সংস্কার থেকে বাতিল হওয়া কোটা নিয়ে তারা কোন মন্তব্যও করেননি। যেখানে সংস্কার তাদেরই দাবি ছিলো, যে দাবিতে আবারও সড়ক অবরোধ হয়েছে আজ।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের পথটা বরাবরই কণ্টকাকীর্ণ ছিল। আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছাত্র-ছাত্রী বা নেতাদের অজস্র রকমের হেনস্থা করা হয়েছে। পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয়া হয়েছে তাদের, মামলা-জেল-রিমান্ড ভোগ করতে হয়েছে এই আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের। এখনও চলছে ভিসির বাড়ি ভাংচুরের সেসব মামলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে শিক্ষকদের সামনেই আন্দোলনের নেতাদের পিটিয়েছে ছাত্রলীগের কর্মীরা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তারিকুল নামের এক ছাত্রের পায়ের হাড় ভেঙে দেয়া হয়েছিল। পুরোটা আন্দোলনে ছাত্রলীগ সরাসরি ছাত্রদের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল, অথচ তাদের দাড়ানোর কথা ছিল ছাত্রদের পাশে, এই গণজমায়েতের অংশ হবার কথা ছিল ছাত্রলীগের।

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ একবার বলেছিলেন, ছাত্রলীগ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ছাত্র সংগঠন। তার কথাটা সত্যি ধরেই বলি, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ছাত্র সংগঠনের কাজ কি ছাত্রদের দাবীর বিপরীতে দাঁড়ানো? একটা যৌক্তিক দাবীতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ধরে ধরে পেটানো? অথচ এই আন্দোলনের শুরু থেকেই ছাত্রলীগের অজস্র নেতাকর্মী প্রবলভাবে সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু সংগঠনটির হাইকমান্ড উল্টো পথে হেঁটেছে। ছাত্রলীগ কি পারতো না, এই দাবীর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে সরকারের কাছে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করতে? সেটা তারা কেন করেনি? কোটাপদ্ধতি সংস্কারের ঘোষণা যখন দেয়া হলো প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে, তখন তো ধন্যবাদ জানানো বা আনন্দ মিছিল বের করতে পিছপা হয়নি তারা। ‘ছাত্রলীগ সবসময় কোটা সংস্কারের পক্ষে ছিল’- টাইপের স্টেটমেন্ট দিয়ে সংগঠনটিকে হাসির পাত্রেও পরিণত করেছিলেন এর নেতারা! 

‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’, ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড’, ‘মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম’সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার দাবিতে শাহবাগে বিক্ষোভ করছে। সকালে ৫০ থেকে ৬০ জন এ বিক্ষোভে অংশ নেয়। তবে বেলা গড়াতে থাকলে দুপুরের দিকে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা কমে যায়। বিক্ষোভ এখনো চলছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “কোটা চাইলে আবার আন্দোলন করেই সেটা আদায় করতে হবে। কোটার পক্ষে জোরাল আন্দোলন হলে নতুন সিদ্ধান্ত আসতেও পারে।” একই কথা বলেছেন মন্ত্রীপরিষদ সচিবও। হয়তো প্রধানমন্ত্রীর কথায় সাহস পেয়েই এই পঞ্চাশ ষাটজনের দলটা শাহবাগ অবরোধ করেছে!  

অথচ মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের অ্যালার্জি ছিল না। তারা চেয়েছিলেন, পুরো কোটা সিস্টেমের সংস্কার। কোটাপ্রথার কারণে সরকারী চাকুরীতে প্রতি বছরই হাজার হাজার পদ খালি থাকছে, তুলনামূলক বেশি মেধাবী হওয়া স্বত্বেও চাকুরী থেকে অনেকে বঞ্চিত হচ্ছে কোটা না থাকার কারণে। অথচ তাদেরকে বারবার জামায়াত শিবির ট্যাগ দেয়া হয়েছে, নব্য রাজাকার আখ্যায়িত করা হয়েছে।

এই আন্দোলনে শিবির বা সরকারবিরোধী পক্ষের লোকজন সুবিধা নেয়ার জন্যে ঢুকেছে, সেটা আমরা বিশ্বাস করি। কিন্ত এই যে সরকারবিরোধীরা আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছে, বা নিয়েছে, সেটার দায়ভার কি আওয়ামীলীগ বা ছাত্রলীগের ওপরেও বর্তায় না? তারা এই যৌক্তিক আন্দোলনের পাশে থেকে আন্দোলনটাকে আরও জোরালো করতে পারতেন, কনস্ট্রাক্টিভভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন। আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, জামায়াত-শিবিরের শত শত নেতাকর্মীরা ফুলের তোড়া দিয়ে দল পাল্টে আওয়ামীলীগে যোগ দিচ্ছে! জামায়াত শিবির যদি আওয়ামীলীগে ঢুকে যেতে পারে বিনা বাধায়, তাহলে আমরা কিভাবে আশা করি যে একটা নির্দলীয় আন্দোলন তাদের স্পর্শ থেকে দূরে থাকবে? 

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেছেন, যে কোন যৌক্তিক আন্দোলনের সঙ্গে তারা আছেন। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেছেন, “কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার দরকার৷ কতটুকু কোটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, এটা বোঝাতে পারলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনাদের দাবি মেনে নেবেন ৷ আপনারা আমাদের আদর্শিক সহযোদ্ধা। আমরা আপনাদের পাশে আছি ৷” ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও বলছেন, কোটা পদ্ধতির সংস্কার দরকার, তিনিও বাতিল শব্দটি উচ্চারণ করেননি। তাহলে সরকার কেন বাতিলের পথেই হাঁটলো, এটা একটা বড় প্রশ্ন। এই সিদ্ধান্ত কি কোন রাগ বা জেদ থেকে নেয়া?

আওয়ামী লীগ বরাবরই বলে, তারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বও ছিল আওয়ামী লীগের। কাজেই আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, কোটা বাতিল হলেও মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্যে আওয়ামী লীগ কাজ করবে। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কিছু করলে সেটা আওয়ামী লীগই করেছে। কিন্ত পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী বা আদিবাসীদের জন্যে কোটা ভীষণ দরকার। তাদের পাশে কে দাঁড়াবে? আবারও বলছি, কোটা বাতিল করে দেয়াটা কোন সমাধান নয়, কোটা বাতিলের দাবীও কেউ তোলেনি। সবাই একটা যৌক্তিক সংস্কার চেয়েছিল, সেই সংস্কার চেয়েই ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় মার খেয়েছে, জেল খেটেছে, মামলার খড়্গ মাথায় নিয়ে ঘুরছে। কিন্ত সেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কারটা আসেনি… 

আরও পড়ুন- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close