খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

পুতিনের সামনে পুতিনের বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ!

ফুটবল মাঠে হুট করে দর্শক নেমে আসার ঘটনাটা খুবই স্বাভাবিক। ক্লাব ফুটবলে এমনটা অহরহ ঘটে। প্রিয় তারকাকে একবার কাছে থেকে দেখার জন্যে, একটু ছুঁয়ে দেখার টানে দর্শকেরা বিধিনিষেধ ভুলে গ্যালারী থেকে নেমে আসেন মাঠে। নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের সরিয়েও নেন। কিন্ত বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বড় আর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এমন ঘটনা খুব একটা ঘটতে দেখা যায়নি কখনও। এসব ম্যাচে সাধারণত নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর করা হয়।

কিন্ত কঠোর নিরাপত্তার ফাঁক গলিয়ে গতকাল মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে একসঙ্গে মাঠে নেমে গিয়েছিলেন চার দর্শক। রেফারী বাধ্য হয়েছিলেন খেলা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে। শুনলে অবাক হবেন, প্রিয় কোন খেলোয়াড়কে ছুঁয়ে দেখতে নয়, চারজনের এই দলটা মাঠে নেমেছিল ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে! ভিআইপি গ্যালারীতে তখন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিওভান্নি ইনফান্তিনোর পাশে বসে আছেন পুতিন স্বয়ং! এই ছেলেমেয়েগুলোর বুকভর্তি সাহস আছে বলতে হবে!

পুশি রায়টস, রাশিয়া, বিশ্বকাপ ফুটবল, ফাইনাল

ঘটনাটা ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের। একান্ন মিনিটের খেলা শেষ হয়েছে তখন। ফ্রান্স এগিয়ে আছে ২-১ গোলে। সমতায় ফেরার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ক্রোয়েশিয়া। হুট করেই মাঠে ঢুকে পড়লেন সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা কয়েকজন। রাশিয়ান পুলিশের পোষাক এটা। একজন আবার কালো কোট আর ট্রাউজার পরে আছেন। মাঠের নিরাপত্তাকর্মীরা সঙ্গে সঙ্গেই ছুট লাগিয়েছেন ওদের পিছু পিছু। ধরে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে এসেছেন মাঠ থেকে। একজন আবার এরই মধ্যে এমবাপ্পের সঙ্গে হাতও মিলিয়ে ফেলেছেন, দুজনের হাসিমুখের সেই ছবি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে!

চারজনকেই টেনে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মাঠ থেকে। মোটামুটি ত্রিশ সেকেন্ড সময়ের মধ্যেই ঘটে গেছে এতসব ঘটনা। এই চারজনের উদ্দেশ্য কি ছিল, এরা কারা সেসব তাৎক্ষণিক জানা না গেলেও, পরে মিলেছে সেসব প্রশ্নের উত্তর। আর সেই উত্তরে মিশে আছে অনেক অজানা তথ্য।

এই চারজন যে দলটার প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেটার নাম ‘পুশি রায়টস’। এই দলটার পরিচয় প্রধানত এটাই যে, তারা ভ্লাদিমির পুতিনের কট্টর সমালোচক। মূলত মস্কোর হাইক্লাস সোসাইটির ছেলেমেয়েরাই এই দলের সদস্য। যদিও তাদের সংখ্যাটা একদমই হাতেগোনা। পুশি রায়টস প্রথম আলোচনায় আসে ২০১২ সালে, এটা তখন একটা ব্যান্ডদল ছিল। মস্কোর প্রধান গীর্জার সামনে একটা স্ট্রীট কনসার্টে পুতিনকে ব্যাঙ্গ করে একটা গান বানিয়েছিলেন এই ব্যান্ডের সদস্যেরা। সেকারণে গ্রেফতার হন তিন সদস্য। প্রেসিডেন্টকে ব্যাঙ্গ করার শাস্তি হিসেবে প্রায় একুশ মাস জেল খেটেছেন তারা। এরপর থেকেই মূলত পরিচিতি পায় দলটা।

পুশি রায়টস, রাশিয়া, বিশ্বকাপ ফুটবল, ফাইনাল

যে চারজন মাঠে নেমেছিলেন গতকাল, তাদের মধ্যে তিনজন ছিলেন নারী, আর একজন ছিলেন পুরুষ। তার নাম পিওতর ভারজিলভ। তার পরিচয় হচ্ছে, ২০১২ সালে পুতিনকে ব্যাঙ্গ করে গান গাওয়ার অপরাধে গ্রেফতার হওয়া নাদেঝদা তুলুকন্নিকোভা’র স্বামী তিনি। গতকাল ‘পুশি রায়টস’ এর অফিসিয়াল টুইটার একাউন্ট থেকে ম্যাচ চলাকালে বিবৃতি দেয়া হয়েছে, ‘আমাদের সেনারা এখন লুঝনিকিতে আছেন!’ ‘শুধু ফুটবল নয়, বিশ্ব দেখবে পুশি রায়টসের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সও!’- দেয়া হয়েছে এমন ঘোষণাও। সময় মিলিয়ে দেখা গেছে, দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হবার পরপরই করা হয়েছে এসব টুইট। প্রচুর পরিকল্পনা করেই কাজে নেমেছিল সবাই, সেটা এখন বোঝা যাচ্ছে।

পুশি রায়টসের সদস্যদের দাবী ছিল পাঁচটা। সেটাও তারা জানিয়ে দিয়েছে গতকাল।

১/ রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে।

২/ সোশ্যাল মিডিয়ার কোন পোস্টে ‘লাইক’ দেয়ার অভিযোগে কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না।

৩/ রাজনৈতিক মিছিল থেকে কাউকে অন্যায়ভাবে আটক করা যাবে না। মিছিলে পুলিশি হামলা বন্ধ করতে হবে।

৪/ রাশিয়ায় শুধু পুতিনই রাজনীতি করবেন, এমন কোন নিয়ম নেই। বাকীদেরও রাজনীতি করার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, সবাইকে রাজনীতি করার অধিকার দিতে হবে।

৫/ কারো বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা দায়ের করে তাকে জেলে পাঠানো যাবে না।

পুশি রায়টস, রাশিয়া, বিশ্বকাপ ফুটবল, ফাইনাল

পশ্চিমা মিডিয়ায় মাঝেমধ্যেই রাশিয়ায় পুতিনের স্বৈরাচারের নানা নজিরের খবর ছাপা হয়। সেসব যে একদম উড়িয়ে দেয়ার মতো কিছু নয়, সেটা তো পুশি রায়টসের এই প্রতিবাদেই প্রমাণ হলো। বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল, পুরো বিশ্বের মানুষের চোখ থাকবে মস্কোর দিকে- এটা তারা ভালোভাবেই জানতেন। সেই সুযোগটা কাজে লাগানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন তারা, নিজেদের দিক থেকে সফলও হয়েছেন। ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো আর ক্রোয়েশিয়ান প্রেসিডেন্ট কোলিন্দা গ্র‍্যাবার কিতারোভিচের সঙ্গে গ্যালারীতে বসে থাকা ভ্লাদিমির পুতিনের চোখের সামনেই বিশ্ববাসীকে তারা জানিয়ে দিয়েছেন, মুক্তচিন্তা বা স্বাধীন মত প্রকাশের জন্যে রাশিয়া এখনও উপযুক্ত জায়গা নয়!

গ্রেফতারের পর তাদেরকে মস্কোর পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে, নেয়া হয়েছে থানায়। রাশিয়ান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা, আন্তর্জাতিক স্পোর্টস ইভেন্টের আইন ভঙ্গ করা আর অন্যায়ভাবে জনসম্মুখে পুলিশের পোষাক পরার অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। একজনকে ইতিমধ্যেই পনেরো দিনের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সম্ভবত তিনিই এমবাপ্পের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। রাশিয়ায় যেকোন স্পোর্টস ইভেন্ট থেকেও তাকে আজীবনের জন্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাকীদেরও হয়তো জেল-জরিমানা বরণ করে নিতে হবে। রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্সের চোখে ধুলো দিয়ে পুতিনকে অপমান করাটা যে তারা ভালোভাবে নেবে না, এটা তো জানা কথা!

পুশি রায়টস, রাশিয়া, বিশ্বকাপ ফুটবল, ফাইনাল

ম্যাচের মাঝখানে এই চারজন মাঠে নেমে আসায় অবশ্য খেলোয়াড়দের মধ্যে এই ঘটনার তেমন কোন প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি। বিশ্বকাপের শিরোপা জেতার তাড়না থাকায় হয়তো এটা নিয়ে ভাবার সময়ও পাননি তেমন কেউ। তবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার দেজান লভরেন। রেগে গিয়ে এই চারজনের একজনকে (পিওতর ভারজিলভ) ধাক্কাও মেরেছেন এই খেলোয়ায়ার। ম্যাচশেষে বলেছেন- “আমি প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলাম। সময় ফুরিয়ে আসছিল, আর আমার মাথা পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাচ্ছিল তখন। আমার মনে হয়েছিল, আমি যদি ছেলেটাকে স্টেডিয়ামের বাইরে ছুঁড়ে ফেলতে পারতাম!”

তবে কিলিয়ান এমবাপ্পের খুশীই হবার কথা। পুশি রায়টসের দলটা মাঠে নামার খানিক আগেই তার একটা শট ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন ক্রোয়েশিয়ান গোলরক্ষক সুবাসিচ। অবশ্য ম্যাচশেষে হাসিমুখেই মাঠ ছেড়েছেন ফ্রান্সের এই তরুণ তুর্কী। দলের হয়ে শেষ গোলটা করে বিশ্বকাপ জয়ে অবদানও রাখতে পেরেছেন তিনি। ‘লাকী চার্ম’ নামের ব্যাপারটায় বিশ্বাস করে থাকলে পুশি রায়টসের সদস্যেরা এমবাপ্পের ধন্যবাদ পেতেই পারেন। দুরন্ত সাহসিকতার জন্যে এই চারজন অবশ্য পুরো বিশ্বের অভিনন্দনই পাচ্ছেন এখন।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close