Ruhel Bin Sayed

একটা গল্প বলি। একজন সদ্য ধনী হওয়া লোক সকালে ঘুম থেকে ওঠে নিজের বাড়ির বারান্দায় বসে বউয়ের সাথে খোশগল্প করছেন। বউ বলছেন– “দেখো, তোমার তো এখন ম্যালা টাকা পয়সা হয়েছে। এখন আর অত কিপটামি না করে, পোলাপানদের পুষ্টির জন্য কিছু টাকা পয়সা খরচ করো। লটকার স্বাস্থ্য দেখছো। কি নাজুক অবস্থা। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন গোয়ালা দুধ নিয়ে যায়। অন্তত ১ লিটার দুধ তো ওর কাছ থেকে প্রতি দিন কিনতে পারো।” পিছন থেকে লটকা বলে ওঠলো – “মা, দুধ খাব।”

বউয়ের কথা কর্তার মনে ধরলো। বললেন – “গোয়ালা দেখলেই ডাক দিবা।” পরের দিন সকালে গোয়ালা হাজির। কর্তা বললেন–

“১ লিটার দুধের দাম কতো?”

“আজ্ঞে, ৪০ টাকা।”

“ঠিক আছে। কাল থেকে প্রতিদিন সকালে ১ লিটার করে দুধ দিয়ে যাবা।”

“আচ্ছা”– বলেই গোয়ালা রওয়ানা দিলো। কর্তা চিন্তা করলেন। ৪০ টাকায় ১ লিটার বলার সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলো। দেখি না ৪০ টাকায় ২ লিটার দুধ দেয় কিনা। গোয়ালাকে আবার ডেকে বললেন – “আচ্ছা, ৪০ টাকায় তুমি কি ২ লিটার দিতে পারবা?” উত্তর এলো- “জ্বি, তা পারবো।”

দুধ খেয়ে লটকার পুষ্টি বেশ যষ্টি হতে শুরু করেছে। লটকা পুষ্টিতে পরিপুষ্ট, কর্তা-কর্ত্রী দুজনেই বেশ তুষ্ট। কিছুদিন পর কর্তা চিন্তা করলেন, ৪০ টাকায় ২ লিটারে রাজি হয়ে গেলো! তাহলে ৩ লিটারে দেয় কিনা চেষ্টা করে দেখি। গোয়ালাকে বললেন – “এই তুমি কি ৪০ টাকায় ৩ লিটার দিতে পারবা?” এবারও উত্তর- “জ্বি বাবু, তাও পারবো।”

কিন্তু দুধ খেয়ে লটকার পুষ্টি এবার আর তেমন বাড়ে না। খেলার মাঠে সামান্য ল্যাং খেলেই লটকা চ্যাং হয়ে ছিটকে পড়ে। কর্তা চিন্তা করলেন, দুধের পরিমাণ আরেকটু বাড়াতে হবে। গোয়ালাকে বললেন – “৪০ টাকায় ৪ লিটার দিতে পারবা?” এবার উত্তর- “জ্বি আজ্ঞে, পারবো। তবে দুধে পুষ্টি তো দূরের কথা দুধের রঙই আর খুঁজে পাবেন না। সব জলরঙ হয়ে যাবে। এক লিটার দুধে আর কত জল মিশানো যায় বলেন?”

গল্প বলা শেষ; এখন আসুন বাস্তবতার সাথে ধাক্কা খেয়ে হুঁশ ফেরাই! গল্পটির সাথে আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটু মিল খোঁজার চেষ্টা করি।

একটি পাবলিক পরীক্ষা গেল। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী। সবার একটাই লক্ষ্য, ভালো ফলাফল করে একটা সার্টিফিকেট পাওয়া। লটকার বাবার মত আমাদের শিক্ষাকর্তা বেশ উদারমনা! মেধার যাচাইয়ে তিনি পরীক্ষক শিক্ষকদের উপর আরোপ করলেন শর্ত। শিক্ষকদের ওপর নির্দেশ আসলো পাশের হার ৬০ হবে। উনারা বললেন – “নো প্রবলেম!” শিক্ষাকর্তা ৬০-এ সন্তুষ্ট না। আরো বাড়াতে হবে। অসুবিধা নাই। কত চান? ৭০, ৮০, ৯০, ৯৫, ৯৯%। চিন্তার কোনো কারণ নাই। A+ কত চান? শত, হাজার, ১০ হাজার, ২০ হাজার, লাখ। নো প্রবলেম! হচ্ছে, হবে, হয়ে যাবে। যা চান, তাই সাপ্লাই দেয়া হবে। শিক্ষাকর্তা বেজায় খুশী। পাশ আর পাশ! প্লাস আর A প্লাস!

লটকার বাবার যেমন গোয়ালার কাছে অল্প টাকায় বেশি দুধ পাওয়ার চাওয়া ছিল, ঠিক সেরকম করে আমাদের শিক্ষাকর্তা প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার আগে আজ্ঞাবহ শিক্ষকদের কাছে চেয়ে বসেন বেশি বেশি ফলাফল! লক্ষ লক্ষ ‘আনকোরা’ মেধাবী একেকটি পরীক্ষা থেকে বেরুচ্ছে! আসলে দুধের পরিবর্তে বেড়েছে শুধুই জল, আর শিক্ষার মানের পরিবর্তে বেড়েছে শুধু পাশের সংখ্যা আর গাদা গাদা A+। কিন্তু মেধাবীর মোড়কে যে এরা অপ্রস্তুত হয়ে শুধুমাত্র একটা সার্টিফিকেট নিয়ে বেরুচ্ছে তার খেয়াল রাখি কয়জন? খেয়াল করি না কিংবা খেয়াল করেও খেয়াল হারানোর অভিনয় করে এড়িয়ে যাই।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা পিছিয়ে তার নমুনা স্পষ্টভাবে দেখা যায় মফস্বলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গেলে। ক্লাস নেয়ার মতো নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক নেই। ইসলাম শিক্ষার শিক্ষক নেন বাংলা ব্যাকরণের ক্লাস, আইসিটির ক্লাস চালিয়ে দেন কৃষি শিক্ষার শিক্ষক! ভালো ফলাফলের আয়োজনে সেখানে হয় না পাঠদান; নিছক নিয়মরক্ষার তাগিদে চলে পাঠকর্মসূচী! কো-কারিকুলার একটিভিটিজ তো অমাবস্যার চাঁদ সেখানে! ‘বিতর্ক, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা, কম্পিউটার ক্লাব, অলিম্পিয়াড, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব’ শব্দগুলো সেখানকার শিক্ষার্থীদের কাছে ভিনদেশী তারা! শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যে শুধু সার্টিফিকেট অর্জন করা নয়, বরং নিজেকে একজন ব্যক্তি হিসেবে লক্ষ-কোটি মানুষের মধ্যে যোগ্য করে তোলা তা তাদের মাথার আশেপাশেও নেই!

কিন্তু আর কত দিন? আজ একজন শিক্ষার্থী দুই দুইটা গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে নিজের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না, পায় না নিজের পছন্দের বিষয়! ১২ বছরে যার অর্জন সর্বোচ্চ পর্যায়ের দুই দুইটি সার্টিফিকেট, সে কোন যুক্তিতে পাবে না সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ? কেন ১৬-২০ বছর পড়াশোনা করে চাকরির ভাইভা বোর্ডে নিজের পরিচয় দিতে আমতা আমতা করবে? কেন ইংরেজীর ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিতে হয় বিভিন্ন চাকরীর সুযোগ থেকে?

এত এত কেন-এর কোন উত্তর নেই। এই কেন-এর উত্তরপত্রও কখনও ফাঁস হয় না! ফাঁস হয় শুধু পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের। আর সেই প্রশ্ন প্রথমেই লুফে নেয় ১২ বছর ধরে পড়াশুনা ঠিকভাবে না করা শিক্ষার্থী। ছড়িয়ে দেয় কাছের দূরের সকল বন্ধুর কাছে। আর ১২ বছর ঠিকভাবে পড়াশুনা করা শিক্ষার্থীটি হয় বলির পাঁঠা! হবেই বা না কেন? ঠিকভাবে পড়াশুনা করে পরীক্ষা দিয়ে ফলাফলে যখন দেখে ক্লাসের সবচেয়ে অনিয়মিত ছেলেটি তার চেয়ে ভালো ফলাফল করে বুক ফুলিয়ে উল্লাস করছে, আর নিজের আম্মুকে এসে ওই ছেলেটার আম্মু এসে কুৎসা শোনায়, তখন তো সেও বলির পাঁঠা-ই!

আসুন একটা নতুন শব্দ শিখি- ‘প্রশ্নাসক্তি’!

প্রশ্ন ফাঁস এখন ‘ডাল ভাত’ ব্যাপারের মতো নিয়ম করা ঘটনা। পরীক্ষার আগের রাত্রে ফেসবুকে প্রশ্ন আসবে- রাত্রে সেগুলো পড়বে- পরীক্ষার হলে হুবুহু কপি করে দিয়ে আসবে সেই পড়া- ২ মাস পর ফলাফল আসবে গোল্ডেন এ প্লাস! এ নিয়মেই কতশত শিক্ষার্থী প্রশ্নাসক্তিতে ভুগছে! এবং তাদের কাছে সহজলভ্য হয়ে আসছে আকাঙ্খিত সেই প্রশ্ন। একটি পরীক্ষার্থী যখন পরীক্ষার আগের রাত্রে তার পুরো বছরের সিলেবাস পুনরালোচনায় মগ্ন থাকার কথা, সেখানে দেখা যায় সে ফেইসবুকের এক গ্রুপ থেকে আরেক গ্রুপ, পেইজ থেকে পেইজ, আইডি থেকে আইডি ঘুরছে প্রশ্নের সন্ধানে! বন্ধুর ইনবক্সে প্রশ্ন পেয়েছে কিনা বলে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে! একেবারে হা-হুতাশ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা! যেমনি প্রশ্ন পেয়ে যায় স্থির হয়ে যায়, পায় কিছু অর্জন করার স্বর্গীয় সুখ! এটাই হচ্ছে ‘প্রশ্নাসক্তি’।

 

‘পর্ণ আসক্তি’- আমরা সবাই জানি এই ব্যাপারে। একজন মানুষকে সেক্সুয়ালী শেষ করে দেয়ার জন্য পর্ণ আসক্তি যথেষ্ঠ। নিয়মিত পর্ণো ছবি যারা দেখেন তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে বিকৃত অভ্যাস যার অতিরিক্ত প্রয়োগে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ে এবং যৌন জীবনে নানান সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এটি এক ভয়াল নেশা। পর্ণ সিনেমার নেশা মাদকের নেশার মতোই ভয়ংকর। মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যেমন কষ্টসাধ্য, পর্ণ আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়াও দুরূহ ব্যাপার।

আসক্তি শব্দটাই বলে দেয় কোন কিছুর উপর অস্বাভাবিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া। পর্ণ আসক্তিতে পড়ে মানুষ তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে হুমকির মুখে পড়ে। আর বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীদের প্রশ্নাসক্তি তাদের করে তুলছে মেধাবীর মোড়কে ‘মেধাহীন কূপমুন্ডক’! বাইরে থেকে যতই ভালো ফলাফলের গর্বে উৎফুল্ল থাকুক না কেন, সে ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাবে তার কৃতকর্মের জন্য- আর অপ্রস্তুত থেকে যাবে জীবনের দৌড়ে আজীবন, ঠিক যেরকম পর্ণোআসক্তি ভঙ্গুর করে দেয় মানুষের ব্যক্তিত্বকে। 

কিন্তু আর কত? জাতি হিসেবে আমরা কি পিছিয়ে পড়ার জন্য এগুচ্ছি? প্রশ্নাসক্তিতে কি আমরা এভাবেই জর্জরিত হবো? সবার চোখের সামনে পৃথিবী এগিয়ে যাবে আর আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের পিছিয়ে পড়াকে কি এভাবেই মেনে নেবো? আমাদের শিক্ষাকর্তার কি বোধদয় হবে যে, ৪ লিটার পানির চেয়ে ১ লিটার দুধই বেশি শক্তিশালী ? নাকি এভাবেই দুধের স্বাদ বেশি পেতে পানি মিশিয়ে নিজেদের পঙ্গু করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগুবো?

আমার প্রশ্নের ‘উত্তর ফাঁস’ চাই!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-