ভরা রাস্তায় তিন যুবককে কষে পেটাচ্ছে ষোল-সতেরো বছর বয়সের এক কিশোরী- দৃশ্যটা দেখলে আঁতকে ওঠাটাই স্বাভাবিক। জুডো-কারাতের নিখুঁত মার, একটার পর একটা শুধু খেয়েই যাচ্ছে ছেলেগুলো, হাত পা নাড়িয়ে মারের হাত থেকে বাঁচার ব্যর্থ চেষ্টা করছে, কেউবা দৌড়ানোর কথা ভাবছে, তখনই পিঠের ওপর এসে পড়ছে বিরাশি সিক্কার মোক্ষম ঘুষি- এমন দৃশ্য চোখে পড়লে কেউ কেউ সিনেমার শুটিং বলেও ভুল করতে পারেন। তবে শুটিং ফুটিং কিছুই নয়, কলকাতার সাঁইথিয়ায় গত সোমবার এমন দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে প্রিয়াঙ্কা সিংহ রায় নামের এক উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী কিশোরী। উত্যক্তকারী তিন তরুণকে একাই পিটিয়ে ছাতু বানিয়েছে মেয়েটা, তারপর তুলে দিয়েছে পুলিশের হাতে!

সোমবার বিকেলে বোনকে নিয়ে সাইকেলে করে পাড়ায় বেড়িয়েছিল প্রিয়াঙ্কা। মাঝপথে ওই তিন যুবক তার পথ আটকে ধরে, উত্যক্ত করে তাকে। প্রতিবাদ করায় উল্টো তার হাত চেপে ধরেছিল ওদের একজন, বলেছিল- একটু পাশে চল! বেচারারা জানতো না, খাল কেটে কুমির ডেকে নিয়ে এসেছে। প্রিয়াঙ্কা আদতে তায়কোয়ান্দোর ব্লু-বেল্ট। মার্শাল আর্টের সঙ্গে তার বসবাস ছয় বছর ধরে। অর্জিত জ্ঞানের খানিকটা এবার ঝেড়ে দিলো ছেলেগুলোর ওপরে। চড়-থাপ্পড়-ঘুষি-ফ্লাইং কিক থেকে শুরু করে জুডো’র মোক্ষম প্যাঁচ- বাদ যায়নি কোনকিছুই। মিনিট পাঁচেকও লাগেনি ওই তিন যুবককে মাটিতে শুইয়ে ফেলতে।

আশেপাশে লোকজন জড়ো হয়ে গিয়েছিল, অবাক হয়ে সবাই দেখছিল এই কাণ্ড। একটা কিশোরী মেয়ে এমন তেজের সঙ্গে তিনটা ছেলেকে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলতে পারে, সেটা দেখেই সবাই হতভম্ব। সাইকেল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়াঙ্কার বোন ততক্ষণে বাড়ির দিকে ছুট লাগিয়েছে, ডেকে এনেছে প্রিয়াঙ্কার মা সুলেখাদেবীকে। তিনি এসে থামিয়েছেন প্রিয়াঙ্কাকে, নইলে এই মেয়েটা এদের হাত-পা ভেঙেই দিতো বোধহয়। নামের মধ্যে সিংহ শব্দটা আছে প্রিয়াঙ্কার, কিন্ত মনের মধ্যে যে সিংহীর তেজ আর অদম্য সাহসও লুকিয়ে আছে, সেটা সেদিনই জানতে পারলো সবাই। লোকজন তখন ধরে গণপিটুনি দিচ্ছিল উত্যক্তকারী ওই তিন তরুণকে, তাদেরকেও নিবৃত্ত করেছেন সুলেখাদেবী। পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি, পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেছে ওই তিন উত্যক্তকারীকে।

বাবা সিটি কর্পোরেশনে চাকুরী করেন, মা গৃহিণী। হাইস্কুলে উঠেই মার্শাল আর্টের ক্লাসে ভর্তি হয়েছিল প্রিয়াঙ্কা, জেলা আর রাজ্য পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় পুরস্কারও জিতেছে সে। তবে সবচেয়ে বড় পুরস্কারটা বোধহয় জিতে নিলো এদিনই। মানুষের ভালোবাসা তো জিতেছেই, সেই সঙ্গে হাজারো তরুণীর মনে আশা আর সাহসের একটা প্রদীপও জ্বালিয়ে দিয়েছে প্রিয়াঙ্কা। কেউ উত্যক্ত করলে মানসম্মানের কথা ভেবে ভারত বা বাংলাদেশের তরুণীরা এখনও চুপ হয়ে থাকে, লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে স্বীকারই করে না। সেই মেয়েগুলো প্রিয়াঙ্কার এই কীর্তিতে খানিকটা অনুপ্রেরণা পেরে পারে অবশ্যই। যারা মেয়েদের রাস্তাঘাটে উত্যক্ত করে, ওরা কোন বাঘ-ভাল্লুক নয়, সাহস সঞ্চয় করে দুটো ঘা বসিয়ে দিতে পারলে বাপ বাপ করে পালানোর পথ খুঁজে পাবে না এই নরাধমগুলো, সেটাই বীরদর্পে জানিয়ে দিলো প্রিয়াঙ্কা সিংহ রায়।

তিনটা শক্তপোক্ত ছেলেকে পেটাতে যাওয়ার আগে একটুও ভয় লাগেনি? মনে হয়নি, ওদের সঙ্গে জোরে পারবো না? কলকাতার সংবাদমাধ্যমকে প্রিয়াঙ্কা বলছিল- “নিজের সামর্থ্যটা আমি জানি। তাই ভয় পাইনি। নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল, ওই তিনটে ছেলেকে একাই শায়েস্তা করতে পারবো, করে দেখিয়েছিও।” বড় হয়ে পুলিশ হতে চায় কিশোরী এই মেয়েটা, আইনের পোষাক পরে পথেঘাটে মেয়েদের উত্যক্ত করা ছেলেগুলোকে নিজের হাতে শায়েস্তা করবে, এমনটাই স্বপ্ন প্রিয়াঙ্কার। চোখেমুখে অদ্ভুত একটা উজ্জ্বলতা ফুটিয়ে প্রিয়াঙ্কা বলছিল- “ওদের যা মার দিয়েছি, পরে কারো সঙ্গে অসভ্যতা করার আগে পাঁঁচবার ভাববে।”

আমাদের দেশে রাস্তাঘাটে মেয়েদের উত্যক্ত করে হয়, ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়। বাসের মধ্যে কিছু ধর্ষকামী পুরুষ মেয়েদের জামা কেটে দেয় ব্লেড দিয়ে, রাস্তায় মেয়েদের মলেস্ট করে। এই পশুগুলোকে শায়েস্তা করার জন্যে প্রিয়াঙ্কার মতো হাজার হাজার সাহসী তরুণী দরকার আমাদের, যারা এইসব নরপশুদের শায়েস্তা করতে পারবে। যোদ্ধানারী নামের একটা প্রকল্প চালু আছে, যেখানে মেয়েদের শারিরীক আর মানসিকভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যেকোন স্থানে উত্যক্তকারী পুরুষকে শায়েস্তা করার কৌশলগুলো শেখানো হয়। এরকম প্রচুর যোদ্ধানারী দরকার আমাদের, যারা উত্যক্তকারী বা ধর্ষকামী পুরুষদের দুই পায়ের মাঝখানে কষে লাথি দিতে পারবে, একাই জন্মের মতো শিক্ষা দিতে পারবে সেই বেজন্মাগুলোকে।

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- আনন্দবাজার পত্রিকা

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-