লিঙ্গ বৈষম্য কি? যেহেতু লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার মূলত নারীরাই, তাদেরকে দিয়েই সংজ্ঞায়ন করা যাক। সোজা-সাপ্টা ভাষায়, একজন নারী যখন শুধুমাত্র সে নারী বলেই অর্থাৎ তার লিঙ্গের কারণে অপর লিঙ্গটির চেয়ে কম সুবিধা পায় এবং বেশি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়, সেটাকেই লিঙ্গ বৈষম্য বলে। এর আবার দুটো অ্যাসপেক্ট আছে। লিগ্যাল ও সোশ্যাল।

আমাদের সংবিধান নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করেছে। শুধুমাত্র সেটিই নয়, দীর্ঘদিনের আধা-অসভ্য পুরুষতান্ত্রিক বাধায় নারী যতটুকু পিছিয়ে গেছে, তা পূরণ করার জন্য আইন করে তাদের কিছু অতিরিক্ত সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। সংসদে সংরক্ষিত আসন, সরকারি চাকরিতে কোটা থেকে শুরু করে বাসে সংরক্ষিত আসন- এসবকে যদি আপনি নারীকে সামনে এগিয়ে আনার সাধু প্রচেষ্টা বলতে চান, বলতে পারেন।

কিন্তু মোটামুটি সভ্য একটি সংবিধান ও আইনের এসব খুঁটিনাটি মহৎ চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে সোশাল এসপেক্টটির জন্য। যেটা এখন আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে ঘটছে। গত কয়েকদিনের ঘটনাবলিতে বাংলাদেশের নারীদের মুষড়ে পড়ার কথা, আতঙ্কিত হওয়ার কথা যে কোন সুস্থ চিন্তার মানুষের।

ইউএস বাংলার বিমান ধ্বসের পর একজন সদ্য-নিহত নারী পাইলট পৃথুলাকে অনলাইনে যে নোংরামি সহ্য করতে হয়েছে, তা দেখে এ দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবার নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। দেশের ভবিষ্যৎ তো দেশের মানুষেরাই, তাই না? সেই হিসাবে, এদেশের ভবিষ্যত ভালো না। একজন নারীর ‘সাংবিধানিক’ অধিকার আছে পাইলট বা যা কিছু সে হতে চায় তা হওয়ার। কিন্তু সামাজিক অধিকার কি আছে? বিমান ধ্বসের কারণে যে সব বরাহ শাবক পৃথুলাকে দায়ী করছে, তাদের একমাত্র যুক্তি হচ্ছে, একজন নারীকে বিমান চালনার গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল কাজ দিলে, সেই বিমান তো ধ্বসে পড়বেই! এই ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চাদের কথার উত্তর দিয়ে আজকে লেখালেখি করতে হচ্ছে, কারণ দুঃখজনক হলেও সত্যি, এটাই বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মানসিকতা, এরাই বাংলাদেশ।

দীর্ঘদিনের সামাজিক অবরোধ কাটিয়ে উপমহাদেশের মেয়েরা সত্যিকারের পড়াশোনার সাথে যুক্ত হয়েছে খুব বেশি হলে গত এক শতাব্দী ধরে। এই এক শতাব্দীতেই তারা বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে। তারপর থেকেই উচ্চশিক্ষার এমন কোন ক্ষেত্র নেই, যেখানে তারা প্রবেশ করেনি, এবং প্রবেশ করেছে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিবন্ধকতা সহ্য করে। ছেলে-মেয়ে দুজনেই স্কুলে যায়, কিন্তু পথ চলতি বখাটেদের উৎপাত, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ সহ্য করতে হয় মেয়েদের। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অফিস করে, কিন্তু অফিসে যাওয়ার আগে পরিবারের সবাইকে খাওয়ানোর এবং অফিস থেকে ফেরার পর অসমাপ্ত গৃ্হস্থালীর দায়িত্ব চলে যায় কেবল স্ত্রীর কাঁধে। একজন ছেলের কখনোই একজন মেয়ের মতো উচ্চশিক্ষার মাঝপথে বিয়ে হয়ে যাওয়ার এবং পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না। এসব কিছু সত্ত্বেও নারীরা পড়াশোনা করছে, কাজ করছে, ভবিষ্যতেও করবে এবং আরো অনেক ভালোভাবে করবে।

প্রযুক্তির আবির্ভাবের পর কায়িক শ্রমের প্রয়োজনীয়তা ও মূল্যমান অনেকটাই কমে গেছে। উদাহরণ দেই, ধরুন, একটা গাছ ঝড়ে ভেঙে রাস্তার উপর পড়ে আছে। আগে এটি সরাতে সমর্থবান মানুষের প্রয়োজন ছিল। সাধারণ যুক্তি অনুযায়ী, এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে পুরুষের উপযোগীতা বেশি ছিল। (অসাধারণ যুক্তি, অর্থাৎ নারী-পুরুষের শারীরিক সামর্থ্যের পার্থক্যের ইতিহাস নিয়ে অন্য একদিন আলোচনা হবে)। কিন্তু এখন শরীরী জোর নয়, এই ভাঙা গাছ সরাতে ক্রেন ব্যবহার করা হবে, যেই ক্রেন চালাতে পারে নারী-পুরুষ যে কেউ। পুরো পৃথিবীর শ্রম-ধরনই এভাবে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির দ্বারা। তাই নারীর অংশগ্রহণেও কোনরকম প্রতিকূলতা থাকার কথা ছিল না।

কিন্তু প্রতিকূলতা থাকছে, আর সেটা পুরোটাই সামাজিক। আইনগত ভাবে নারী স্বাধীন, তাকে সব রকম অধিকার দেওয়া আছে, কিন্তু সমাজ সেসব স্বীকার করছে না। নারী যখন অশিক্ষিত থেকে কৃষিকাজ করেছে, ফসল উৎপাদনের ৩২ টি ধাপের মধ্যে ২৮ টি ধাপেই প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থেকেছে, তখনও তার শ্রমের স্বীকৃতি ছিল না। এখনো নেই, যখন সে উচ্চশিক্ষিত হয়ে বিমানকে আকাশে উড়িয়ে নিচ্ছে। যখন অফিসের নিজের যোগ্যতায় পদোন্নতির পর শুনতে হয়, ‘বসকে ”খুশি” করে তবে ওই পদে যাওয়া।’

এক সপ্তাহও হয় নি সেই ঘটনার যখন বঙ্গবন্ধুর জাতির ভবিষ্যত পালটে দেওয়া বক্তৃতার ৪৭ বছর পূর্তির দিন একজন ১৫ বছর বাচ্চা মেয়েকে বলতে হয়, সে আর এই দেশে থাকবে না। যখন রাস্তায় মেয়েটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রীতিমতো উৎসব করে অনেক গুলো নোংরা হাত তাকে মলেস্ট করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও ঘটে গেছে এরকম আরো অনেক ঘটনা। যাদের দেশকে কিছু দেওয়ার আছে, আমরা তাদের দেশ থেকে বের করে দেই এভাবে। তারপর অলিম্পিকে যখন ‘বাংলাদেশি-বংশোদ্ভূত’ কোন নারীর স্বর্ণজয়ের খবর শুনি, তখন সেটা নিয়ে গর্বে বাকবাক করতে থাকি। আর নিজের দেশে যখন নারীদের জন্য ম্যারাথনের আয়োজনের খবর পড়ে, তখন কমেন্ট বক্সে অশ্লীলতার বন্যা বইয়ে দেয়।

এরকম পরিস্থিতি সময়ই ছিল, ফেসবুকের কল্যাণে মানুষের মানসিকতাগুলো ইদানীং সামনে আসার সুযোগ পেয়েছে শুধু। একজন নারী হিসাবে এদেশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়ার এখনো কিছু পাই নি। আমরা অধিক প্রতিবন্ধকতা সহ্য করে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করব, প্রতিটা দিনই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অতিরিক্ত লড়াই করব অথচ দিন শেষে কাজের স্বতস্ফুর্ত স্বীকৃতিটুকু জুটবে না, লিঙ্গটি ‘নারী’ বলে।

‘তবে কেন এদেশে থাকা?’ প্রশ্নটি করতে পারলে স্বস্তি লাগত। কিন্তু ডেইলি টেলিগ্রাফের বরাতে কিছু তথ্য জেনে সেই উৎসাহটুকু আর থাকল না। ১৯৭২ সালে যখন ইউভানা পোপ প্রথম নারী পাইলট হিসাবে ব্রিটিশ এয়ারে যোগ দিল, একজন পুরুষ পাইলট বলেছিল, একজন নারী পাইলট হিসাবে যোগ দিলে সে পদত্যাগ করবে। মাঝের এতোগুলো বছরে চিত্র কিছুটা পাল্টেছে। তবে, খুব বেশি না। জরিপ বলছে, বিমানে ‘This is your captain speaking’ বাক্যটি নারীকণ্ঠে শুনলে ‘মেজরিটি’ স্বস্তিবোধ করে না।

নারীকে গৃ্হস্থালীর প্রয়োজনীয় কিন্তু নিরাপদ কাজে লাগিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকা যায়। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় তার উপর ভরসা করার ‘ট্রাডিশন’ এখনো তৈরি হয় নি। কারণ, নারীকে স্বল্পবুদ্ধির এবং সাহসহীন ভাবার ট্রাডিশনটা এখনো ভাঙে নি। আমাদের পৃথুলা রশীদ মৃত্যুর আগে ১০ জন নেপালির জীবন বাঁচিয়ে গিয়েছেন। ঐতিহ্যটা এবার ভাঙা উচিত নয় কি?

Comments
Spread the love