ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলন, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন…

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলনের একটা ভিডিও দেখছিলাম ইউটিউবে। ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ট্রাম্প, সামনে একগাদা সাংবাদিক। একটার পর একটা প্রশ্ন ছুটে আসছে ট্রাম্পের দিকে, প্রশ্ন তো নয়, যেন আগুনের গোলা। ভব্যতা-সভ্যতার ধার ধারছেন না সাংবাদিকেরা, একেকটা প্রশ্ন শুনে মনে হচ্ছিল, ট্রাম্পের সঙ্গে বোধহয় এদের জন্ম-জন্মান্তরের শত্রুতা আছে! অথবা ট্রাম্পের চৌদ্দগোষ্ঠির কেউ বোধহয় এদের কারো পাকা ধানে মই দিয়েছিল কখনও! ট্রাম্পের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, কতটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন তিনি, বিরক্তিটা লুকাতে পারছিলেন না কোনভাবেই। চেহারায় ফুটে উঠছিল অসহায়ত্ব, তবে সেসব দিকে সাংবাদিকদের নজর নেই, তারা আরও বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ট্রাম্পকে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখে মায়াই হচ্ছিল তখন, মনে হচ্ছিল, একটা হরিণ ছানা বোধহয় ভুল করে একপাল শিকারী বাঘের মাঝখানে পড়ে গেছে! তৃতীয় বিশ্বের এক দেশে বসে এই ভিডিওটা দেখে আমার কাছে অবাক লেগেছে, কিন্ত বাস্তবতা হচ্ছে, এটাই ওদের সংস্কৃতি, এভাবেই ইউরোপ-আমেরিকা বা উন্নত দেশগুলোতে সাংবাদিকেরা রাষ্ট্রপ্রধানকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করেন, তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন। ট্রাম্প বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি হতে পারেন, কিন্ত এই জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পাবার কোন উপায় তার নেই। 

বাংলাদেশের নাগরিক আমরা, তাই যেকোন কিছুর সঙ্গেই বাংলাদেশকে, এদেশের অবস্থা আর পটভূমিকে মেলানোর চেষ্টা করি।আমাদের প্রধানমন্ত্রীও নিয়মিত বিরতিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন, বিভিন্ন বৈদেশিক সফর বা চুক্তির পরে সেগুলো নিয়ে মিডিয়ার সঙ্গে আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর রসবোধ ভালো, সংবাদ সম্মেলনে বেশ হাসি-ঠাট্টার মুডেই তিনি কথাবার্তা বলেন, কৌতুকও করেন। প্রশ্ন করলে সেটার জবাব দেন, এমনকি যে সফর বা বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলন, সেটার বাইরে গিয়ে প্রশ্ন করলে সেসবেরও উত্তর দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে কেউ তাকে প্রশ্ন করেছে, আর তিনি সেটা এড়িয়ে গিয়েছেন, এরকম কোন ঘটনা আমি দেখিনি।

চাইলে এই সংবাদ সম্মেলনগুলোতে অনেক প্রশ্নই করা যায় প্রধানমন্ত্রীকে। বাংলাদেশে হাজারটা সমস্যা আছে, অনিয়ম আছে, দুর্নীতি আছে, প্রতিদিন একশো একটা ইস্যু তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর সাথে জনগণের ভালো থাকা খারাপ থাকা সরাসরি জড়িত। আমাদের সাংবাদিকদের সামনে দারুণ সব সুযোগ আসে, সেই সমস্যাগুলোর কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর, সেগুলো নিয়ে তিনি কি ভাবছেন, সমাধানের জন্যে কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন, এগুলো জানার সুযোগ পাওয়া যায় এই প্রেস কনফারেন্সগুলোতে। 

কিন্ত অবাক হয়ে আবিস্কার করি, আমাদের কল্পনার সাথে বাস্তবের দূরত্ব কয়েক হাজার আলোকবর্ষ! আমাদের সাংবাদিকদের অনেকেই, কিংবা বেশিরভাগই প্রধানমন্ত্রীকে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করার কথা ভুলেই যান! তারা কথা বলেন খালেদা জিয়ার সঙ্গে কেন মেইড সার্ভেন্ট দেয়া হয়েছে সেসব নিয়ে! সাংবাদিক হয়েও তাদের কেউ প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন না, সাগর-রুনির হত্যা মামলার কোন কূলকিনারা হবে কিনা। কেউ জানতে চান না, অন্যায় দাবীতে হুটহাট পরিবহন ধর্মঘট ডেকে দেশ অচল করে দেয়ার অধিকার কারো আছে কিনা। কেউ জিজ্ঞেস করেন না, বেসিক ব্যাংক বা শেয়ার বাজারের হাজার হাজার কোটি টাকা যে লোপাট হয়েছে, সেসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অবগত আছেন কিনা।

প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে এমন কয়েকজন সাংবাদিক যান, যারা প্রশ্ন কম করেন, তারচেয়ে বেশি তৈলমর্দন করেন। প্রধানমন্ত্রীর নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত কি উচিত নয়, এটা নিয়ে আপনার পত্রিকায় হাজার হাজার শব্দের বিশাল কলাম লিখে ফেলুন, তাতে কোন আপত্তি নেই। কিন্ত প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে সময় নষ্ট করে এসব ফালতু কথা বলার মানে টা কি? একেকটা সংবাদ সম্মেলন দেখলে মনে হয়, এখানে সাংবাদিকেরা নেই, দলীয় চাটুকারেরা বুঝি বসে আছেন! এদের ভীড়েও কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান অনেক কিছুই। কিন্ত তেল দেয়া লোকজনের ভীড়ে তাদের সংখ্যাটা খুব কম বলেই মনে হয়। 

আর কয়েকজনের প্রশ্নের ‘ভূমিকা’র কথা না বললেই নয়। কেউ কেউ যে উপন্যাস রচনা করার মনোবাসনা নিয়ে মাইক্রোফোন হাতে নেন। কার ভূমিকা কার চেয়ে বড় হতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা লেগে যায় যেন! একটা যাচ্ছেতাই প্রশ্ন করবেন বলে সাত সাগর তেরো নদী ঘুরে আসেন তারা! তাদের হাতে প্রচুর অবসর সময়, তাই কে কার চেয়ে বেশি ফুটেজ খেতে পারেন, সেটার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে যান কেউ কেউ। বাধ্য হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়, প্রশ্ন যাই হোক, ভূমিকা বাদ দিতে হবে। কিন্ত কে শোনে কার কথা!

আমার খুব পছন্দের একজন সাংবাদিক আছেন, একটা বেসরকারী টিভি চ্যানেলে কাজ করেন তিনি। তার টক-শো তে যে অতিথিই আসেন, তার অবস্থা নাজেহাল করে ছাড়েন তিনি। একের পর এক প্রশ্ন করেই যান, এবং একটা প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। সেই সাংবাদিককে দেখলাম, প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে মুখ থেকে কথা বের করতে পারছেন না। ইনিয়ে বিনিয়ে দশ সেকেন্ডের প্রশ্ন দেড় মিনিটে শেষ করলেন, সেই প্রশ্ন শুনে মনে হলো, একটা আড়াই বছরের বাচ্চাকে ‘বাবু তোমার নাম কি’ জিজ্ঞেস করাটাও বোধহয় এরচেয়ে ভালো! 

আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো বাঘ বা ভাল্লুক নন, কেন তার সামনে গিয়ে তোতলাতে হবে? কেন সংবাদ সম্মেলনে তেলের বালতি উপুড় করে দিতে হবে? সাংবাদিকেরা নাকি সমাজের দর্পন, আয়নায় ময়লা পড়লে তো প্রতিবিম্বের দেখা মেলে না ঠিকঠাক। আমাদের বেশিরভাগ সাংবাদিকই এখন ওই ময়লা আর দাগ পড়া আয়নার মতো হয়ে পড়েছেন, তাদের মধ্যে সমাজের বা মানুষের প্রতিফলনটা চোখে পড়ে না একদমই। 

আরও পড়ুন- 

Comments

Tags

Related Articles