ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

প্রিয়াংকা চোপড়া, গরীবের বউ রাজনীতি ও আমাদের ‘জোশ’ রাষ্ট্রপতি!

বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানগুলোর মূল আকর্ষণটা কি জানেন? অবশ্যই প্রধান অতিথির বক্তব্য। পদাধিকার বলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি দেশের প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য্য। আর তাই বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানেই তিনি উপস্থিত থাকেন। এমনিতে ছাত্রছাত্রীদের জন্যে সমাবর্তনের অনুষ্ঠানটা যথেষ্ট বিরক্তিকর, ঘন্টার পর ঘন্টা একনাগাড়ে বক্তৃতা শুনতে কারই বা ভালো লাগে বলুন? কিন্ত সাবেক স্পিকার এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আবদুল হামিদ যখন থেকে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়েছেন, তখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানগুলো মাতিয়ে তোলার দায়িত্বটা তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন বলা চলে। দারুণ রসবোধসম্পন্ন এই মানুষটা হাসি-ঠাট্টার ছলে সবাইকে মাতিয়ে রাখেন কিছুক্ষণ, কৌতুকের ছলে বলেন নিজের জীবনের গল্প, কিংবা তার আশ্চর্য্য জীবনবোধের গল্পও। সেসব শোনার জন্যে ছাত্র-ছাত্রীরাও উন্মুখ হয়ে থাকেন বরাবর।

আজ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে এসেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। আগে একবার এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি হবার পরে মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ খুব একটা হয় না তার, তাই কখনও সুযোগ পেলে একসঙ্গে অনেক কিছু বলে ফেলেন। আজও তেমনি মনের আগল খুলে গিয়েছিল তার। কথা বলেছেন রাজনীতি নিয়ে, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপকারীতা নিয়ে বলেছেন, আবার পুরুষ নির্যাতন আর প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার প্রসঙ্গ টেনে এনে হাসিয়েছেন উপস্থিত সবাইকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয় না প্রায় আড়াই যুগ হয়ে গেল। সেই বিষয়টা উঠে এসেছে তার বক্তব্যে, রাষ্ট্রপতি বলেছেন-

“ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আমি আশার আলো দেখছি। ছাত্র সমাজের কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ জানাই, যখন তফসিল হয়, দেখা যাবে অনেক ক্যালকুলেশন হবে। ভেজাল সৃষ্টি করে দিতে পারে। অনেকে অনেক স্বার্থে করতে পারে। কিন্তু সমস্ত ছেলেমেয়েদের বঞ্চিত করা উচিত না। এ ব্যাপারে তৎপর থাকতে হবে। যাতে কোনোভাবে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। যারা ব্যক্তি বা অন্য স্বার্থ দেখতে চায় এদেরকে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে হবে।”

আর রাজনীতির কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে ফুটে উঠেছে আক্ষেপ। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ একটা পর্যায়ের পরে রাজনীতিতে যোগ দিতে চাইছেন, সেটা রাজনীতির জন্যে ভালো কিছু নয় বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি। কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেছেন-

“আমি যদি এখন বলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্সের লেকচারার হইতাম চাই, নিশ্চয়ই ভিসি সাহেব আমারে নেবেন না। বা কোনো হাসপাতালে গিয়া বলি, এতদিন রাজনীতি করছি, হাসপাতালে ডাক্তারি করতে দেন। বোঝেন অবস্থাটা কী হবে? এগুলো বললে হাসির পাত্র হওয়া ছাড়া আর কিছু হবে না। যদি বলি এত বছর রাজনীতি করছি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সুপারিন্টেন্ডেন্ট এর পদ দিতে পার। সেখানে আমাকে দিবে? কিন্তু রাজনীতি গরিবের বউয়ের মতো, সবার সে ভাবী। যে কেউ যে কোনো সময় ঢুকে পড়তে পারে, কোন বাধা নাই।”

“সবাই এখন রাজনীতি করতে চায়। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি ডাক্তারি পড়ি, সেইটা কোন ব্যাপার না। ভিসি সাহেবও অবসরের পর রাজনীতি করবেন। যারা সরকারি চাকরি করেন, তারাও একসময় রাজনীতিতে আসবেন। জজ সাহেব যারা আছেন ৬৭ বছর চাকরি করবেন। রিটায়ারের পর বলবেন, ‘আমিও রাজনীতিবিদ’। আর্মির জেনারেল হওয়া সেনাপ্রধান হওয়া, সরকারি সচিব, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, কেবিনেট সেক্রেটারি রিটায়ার কইরা বলেন, ‘আমি রাজনীতি করবো।’ কোন রাখঢাক নাই। যার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা তখনই রাজনীতি ঢোকে…”

“আমার মনে হয় সব রাজনৈতিক দলকে এটা চিন্তা করা উচিত। হ্যাঁ, রজনীতিতে এক্সপার্টের দরকার আছে। অনেক সময় বলা হয় পেশাভিত্তিক পার্লামেন্ট। হ্যাঁ পেশাভিত্তিক করেন। এমবিবিএস পাস করে সরাসরি রাজনীতি করেন। কোনো অসুবিধা নেই। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে চাকরিতে না ঢুকে সরাসরি রাজনীতিতে ঢোকেন। চাকরি করে যা করার করছে। এরপর বলছে রাজনীতি করবো। পুলিশের ঊর্ধ্বতন ডিআইজি, আইজিরাও দেখি (অবসরের পরে) রাজনীতি করেন। মনে মনে কই, আমরা রাজনীতি করার সময় এই পুলিশ তোমার বাহিনী দিয়ে পাছার মধ্যে বাড়ি দিছো। তুমি আবার আমার লগে আইছো রাজনীতি করতে। কই যামু! ডাইরেক্ট রাজনীতির মধ্যে আইসা তারা ইলেকশন করবে, মন্ত্রী হয়ে যাবে এটা যেন কেমন কেমন লাগে। যার জন্যেই আমার মনে হয় আমাদের দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হচ্ছে না।”

আবদুল হামিদ, রাষ্ট্রপতি, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়ার কুফলগুলোও রাষ্ট্রপতির বক্তৃতায় উঠে এসেছে হাস্যরসের আড়ালে। আবদুল হামিদ বলছিলেন-

“কলেজে পড়ার সময় আমরা প্রেমপত্র লিখছি। ভালো কোটেশন কিভাবে চিঠিতে দিলে সুন্দর হবে। এখন তো চিঠি লেখাই একেবারে নাই। এখন সবাই মেসেজ পাঠায়। ইংরেজিতে বাংলা লেখে। কী লেখে? ফেইসবুক-টেইসবুক এসব আমি বুঝি না। আমি ব্যাকডেটেড। আপনারা যে প্রেমপত্রকে বিসর্জন দিছেন, প্রেমের সাহিত্য তো মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়ে যাচ্ছে। প্রেমপত্র লেখার চর্চাটা অন্তত রাখেন। তাহলে অন্তত প্রেমপত্রে সাহিত্য বেঁচে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পাশাপাশি বসা দু’জন মানুষের মধ্যেও দূরত্ব তৈরি করছে বলে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ধারণা, তার মতে- “আগে ট্রেনে-বাসে উঠলে পাশের যাত্রীকে বলতাম কোথায় যাবেন, বাড়ি কই এসব। এখন কোনো কথাই নেই। বইয়াই মোবাইল টিপ দিয়া দেয়। তুই ব্যাটা জাহান্নামে যা, আমি আছি মোবাইল আছে। এই যে অবস্থা, আমার মনে হয় এতে সামাজিক বন্ধন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।”

রাষ্ট্রপতির প্রায় সব বক্তব্যেই একটা জিনিস খুব কমন থাকে। কোন না কোন এক পর্যায়ে তিনি তার স্ত্রীর প্রসঙ্গ টেনে আনেন, স্ত্রীর সঙ্গে খুনসুটির গল্পগুলো ভাগাভাগি করে নেন শ্রোতাদের সঙ্গে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সমাজে শুধু নারীরাই নির্যাতিত হয় না, পুরুষেরাও নির্যাতিত হয় বলে তার অভিমত। খুনসুটির গল্প বলতে গিয়ে তিনি প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার বাংলাদেশ সফরের সময়কার কথা উল্লেখ করেছেন, বলেছেন-

“প্রিয়াঙ্কা চোপড়ারে তো সবাই চেনেন। আমি যদি বুড়া বয়সে চিনতে পারি, তাহলে এই ছেলেরা তো না চিনার কোন কারণই নাই। এই প্রিয়াঙ্কা চোপড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঢাকায় আসছিল কিছুদিন আগে। আমাদের দেশে বিদেশ থেকে বিশিষ্ট অতিথি যারাই আসেন, সফরের শেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে বঙ্গভবনে আসেন। তো আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, এবার তো প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আসবে। আমি তাকে এই কথা বলছি আসার একদিন আগে। পরে শুনেছি, আমার স্ত্রী নাকি টেলিফোন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলেছে, প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার বঙ্গভবনে আসার কি দরকার?” 

“সাত-আট বছর আগে যখন নারী নির্যাতন আইন পাশ হয় সংসদে, আমি তখন স্পিকার ছিলাম। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, আমাদের দেশে কিন্ত পুরুষেরাও নির্যাতিত হয়। পুরুষ নির্যাতন বিল পাশ করারও তো প্রয়োজন আছে। উনি বলেছিলেন যে, এটার এই মূহুর্তে প্রয়োজন নাই, পরে দরকার হলে এটা করা হবে। ছয়-সাত বছর চলে গেছে, এখনও এটা করেন নাই। প্রধানমন্ত্রী হয়তো খবর টবর রাখেন না, শুধু তো আমার ঘরে নয়, সারা বাংলাদেশেই কিছু না কিছু পুরুষ নির্যাতন হচ্ছে।”

পুরুষ নির্যাতন নিয়ে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সময় শ্রোতারা হাসিতে ফেটে পড়েছিলেন। তবে সেখানেই শেষ নয়, চমকের আরও বাকি ছিল তখনও। এরপরে বয়সে বারো বছরের ছোট নিক জোনাসকে বিয়ে করায় প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার প্রতি কৃত্রিম উষ্মা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। বলেন-

“প্রিয়াঙ্কা চোপড়া নাকি আমেরিকায় গিয়া তার চেয়ে দশ-বারো বছরের ছোট এক ছেলেরে বিয়া করসে, নিক না কি জানি নাম। এখন, আমি তো তার থেকে প্রায় তিরিশ-পঁয়তিরিশ বছরের বড়। বিয়ার জন্যে দশ বছর বারো বছর নিচে যদি সে নামতে পারে, তাহলে তিরিশ-পঁয়তিরিশ বছর উপরেও তো সে উঠতে পারতো। এ ধরনের সুযোগ নষ্ট করাটা তো সে ঠিক করে নাই…”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে নিজের হাস্যরস দিয়ে পুরোটা মনযোগ কেড়ে নিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। বক্তৃতার পুরো সময়টা মাতিয়ে রেখেছিলেন উপস্থিত সবাইকে। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের চুম্বক অংশগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভাইরাল। বিশ্বের বুকে এমন রসবোধসম্পন্ন রাষ্ট্রপতি বোধহয় আর একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভাটির দেশের মানুষ আবদুল হামিদ এখানেই অনন্য। 

আরও পড়ুন- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close