কুকুরের তীক্ষ্ণ ইন্দ্রিয় আর প্রখর ঘ্রাণশক্তির ব্যাপারে আমরা সকলেই কমবেশি জানি। কোথাও কোন গণ্ডগোল বা অসামঞ্জস্যতা দেখা দিলে, তা যতই সূক্ষ্ম হোক আর সাধারণ মানুষ যেটা আঁচ করতে পারুক বা না পারুক, কুকুরেরা সেটি খুব সহজেই ধরে ফেলে, এবং অস্বাভাবিক আচরণের মাধ্যমে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয়। এমনকি মনিবের শরীরে কোন অসুস্থতা দেখা দিলে কুকুরই অনেক সময় প্রথম সেটি ধরে ফেলে, এবং তার মনিবের শরীরে তখনো বিশেষ কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা না দিলেও।

কিন্তু তাই বলে কি কুকুর মানুষের শরীরের অতি জটিল রোগসমূহ, এমনকি যার ফলে একজন মানুষ প্রাণ হারাতে পারে, সেটিও ধরে ফেলতে পারে, যেটি প্রাথমিকভাবে ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমেও নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি? ঠিক এমনই একটি অবাক করা, বিস্ময়কর ঘটনার দৃষ্টান্ত মিলেছে কয়েকদিন আগে, যখন এক কুকুর তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে দুর্দান্তভাবে কাজে লাগিয়ে তার মনিবেড় স্বাস্থ্যোদ্ধারই শুধু করেনি, পাশাপাশি নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকেও তাকে ফিরিয়ে এনেছে। চলুন পুরো গল্পটি জেনে আসি।

কিওলা একটি আমেরিকান আকিতা গোত্রের কুকুর, থাকে দক্ষিণ ইয়র্কশায়ারের ডনকাস্টারে। তার মনিব রিকি ও আলহানা বাটলার তাকে খুবই ভালোবাসে, এবং পরিবারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই তার আদরযত্ম করে। সম্প্রতি কিওলা জানতে পারে যে তার পরিবারের আকার বৃদ্ধি পেতে চলেছে, কেননা তার মনিব অন্তস্বত্তা, শুরুর দিকে এ নিয়ে কিওলা বেশ আনন্দিতই ছিল। কিন্তু একটি পর্যায়ে এসে তার আনন্দ রূপ নেয় উত্তেজনা ও আশংকায়। একদম যেন উন্মাদের মত আচরণ করতে শুরু করে একসময়কার শান্তশিষ্ট, প্রভুভক্ত কুকুরটি। কোনভাবেই তাকে শান্ত করতে পারছিল না রিকি আর আলহানা। বরং যতই দিন এগোতে থাকে, কিওলার পাগলামি বাড়তে থাকে। এবং দেখা যায় যে, তার সব পাগলামি মূলত গর্ভধারিণী আলহানাকে কেন্দ্র করেই। কিন্তু এর মাধ্যমে যে সে আলহানার কোন একটি শারীরিক অস্বাভাবিকতার দিকে ইঙ্গিত করছে, সেটি প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি বাটলার দম্পতি।

এদিকে কয়েক মাস পরই আলহানা তার শরীরের পিছনের দিকের নিচের অংশে ব্যথা অনুভব করতে শুরু করে। যতই দিন যায়, তার ব্যথা বাড়তে থাকে। এ নিয়ে সে ডাক্তারের সাথে আলোচনাও করে। ডাক্তার সবকিছু পরীক্ষা নীরিক্ষা করে রায় জানায় যে আদতে আলহানার গুরুতর কিছুই হয়নি। যে ব্যথা, তা কেবলই গর্ভধারণের একটি ছোট্ট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মাত্র।

ডাক্তারের কোথায় আশ্বস্ত হয়ে নিশ্চিন্ত মনে বাসায় ফিরে আসে আলহানা। কিন্তু কিওলা কিন্তু ঠিকই জানত সবকিছু ঠিক নেই। সে বেশ বুঝতে পারত তার মনিবের শরীরের অভ্যন্তরে কোন না কোন একটি গোলমাল আছেই। তাই সে আগের চেয়ে আরও অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। আলহানা কুকুরটির এমন আচরণ দেখে যারপরনাই অবাক হয়, এবং ধারণা করে কুকুরটিরই হয়ত কোন একটি শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিন্তু কুকুরটি যে আসলে তাকে নিয়েই অতি মাত্রায় চিন্তিত, তা সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।

‘যখন ডাক্তাররা আমাকে বাসায় পাঠিয়ে দিল এই বলে যে সবকিছু ঠিকঠাকই চলছে, কোথাও কোন সমস্যা নেই, সে আমার দিকে তাকিয়ে একটানা চেয়ে থাকত, এবং তার দৃষ্টিতে এমন কিছু একটা ছিল যা আমাকে ভয় পাইয়ে দিত। আমি তার এসব কর্মকান্ডের ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করি, এবং কৌতুকও করি যে তার কর্মকান্ড ঠিক “হাচি” ছবির মত, যেখানেও কুকুরটি ঠিক একই রকমের আচরণ করত। কিন্তু হঠাৎ করেই আমার কিছু বন্ধু আমাকে বলতে শুরু করে যে আমার বিষয়টিকে আরও সিরিয়াসলি নেয়া উচিৎ,’- মারকারি প্রেসের কাছে এভাবেই নিজের কুকুরের অস্বাভাবিক আচরণের কথা বর্ণনা করেন আলহানা।

একটি পর্যায়ে এসে কিওলার পাগলামি সহ্যের সীমা পার হয়ে যায়, এবং রিকি ও আলহানা এবার নিশ্চিত হয়ে যায় যে কুকুরটি তাদেরকে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। ‘কেউই আসলে বোঝেনি যে ভিতরে ভিতরে আমি কতটা অসুস্থ ছিলাম। কিন্তু কিওলা বুঝেছিল। সে সবসময় আমার চারপাসে ঘুরঘুর করত আর কাঁদত, কিন্তু আমি কখনোই বুঝিনি কেন সে এমনটা করছে। রিকি আমাকে বলেছিল যে যখনই আমি বাসার বাইরে যেতাম, কিওলা কেমন খ্যাপার মতো আচরণ করত। কিন্তু আগে সে এসব নিয়ে একদমই মাথা ঘামাত না।’

কিন্তু ভাগ্যবশত, আলহানা তার কুকুরের সতর্কতা চিহ্নগুলোকে একদম উড়িয়ে দেয়নি। বরং সে সিদ্ধান্ত নেয় অন্তত আরেকবার হাসপাতালে গিয়ে চেকআপ করিয়ে নিশ্চিত হতে যে তার শরীরের অভ্যন্তরে সবকিছু ঠিকই আছে। এবং হাসপাতালে গিয়ে চেকআপ করা মাত্রই ডাক্তাররা আলহানাকে আইসিউতে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কেননা এবার তারা যা আবিষ্কার করেন তা রীতিমত আঁতকে ওঠার মতঃ আলহানা মৃত্যুর মুখ থেকে স্রেফ একটুর জন্য ফিরে এসেছে!

ডাক্তাররা জানান, আলহানা ‘ডাবল কিডনি ইনফেকশন’-এ ভুগছিল, যার কারণে তার শরীরে এত ব্যথা অনুভূত হতো। এবং বিষয়টি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে কেননা আলহানার শরীরে ধরা পড়া ইনফেকশনটি ছিল খুবই বিরল প্রজাতির। একদম শেষ সময়ে সে নিজে থেকেই (পড়ুন কিওলার পাগলামি সহ্য করতে না পেরে) হাসপাতালে এসে উপস্থিত হয়েছিল। নাহলে তাকে আর প্রাণে বাঁচানো যেত না।

‘যেহেতু আগে এ ধরণের রোগের চিকিৎসা তারা (ডাক্তাররা) করেননি, তাই এটি ছিল তাদের জন্য কঠিনতম একটি কেস,’ ফেসবুকে নিজের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করে আলহানা। ‘তারচেয়েও বড় কথা, আমার শরীরে একটি অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট বাগ পাওয়া গিয়েছিল, যা দ্বারা এর আগে গোটা যুক্তরাজ্যে মাত্র একজনই আক্রান্ত হয়েছিল। ডাক্তাররা বলেছিলেন যে এটিই আমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছিল, এবং আরেকটু দেরি হলে আমি তো বটেই, সাথে হয়ত আমার ছেলেটাকেও তারা বাঁচাতে পারতেন না।’

কিন্তু না। কিওলার সময়োচিত বুদ্ধিমত্তায় এমন ভয়ংকর কোন পরিণতি বরণ করে নিতে হয়নি আলহানাকে। সে বেশ সুস্থ শরীরেই একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দিতে সক্ষম হয়। ছেলেটির নাম সে রেখেছে লিংকন। আর এখন লিংকনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু কে বলুন তো?

ঠিকই ধরেছেন, কিওলা!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-