একজন বলিউডের শাহেনশাহ। এক নামে চেনে সবাই। নায়ক শব্দটার সার্থক উপমা যেন তিনিই। তাকে দেখে নায়ক হতে চেয়েছে কত লক্ষ তরুণ। সালমান-শাহরুখ কিংবা আমির খান, সবার কৈশর আর তারুণ্যের রোল মডেল ছিলেন এই ব্যক্তি। তিনি বলিউডের বিগ-বি, অমিতাভ বচ্চন।

অন্যজন দক্ষিণী অভিনেতা। পর্দায় খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেই পরিচিতি পেয়েছেন, বলিউডেও পরিচিত মুখ। খল চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে ফুটিয়ে তোলায় তুলনা নেই তার। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে একটা সিনেমা অভিনয়ও করেছেন তিনি, নাম ছিল- ‘বুড্ডা হোগা তেরা বাপ’। সেখানে নায়ক অবশ্যই অমিতাভ, আর ভিলেন তিনি- প্রকাশ রাজ।

সিনেমায় নায়ক আর খলনায়কের সদ্ভাব না থাকলেও, বাস্তব জীবনে তারা বন্ধুই হয়ে থাকেন। তবে অমিতাভ বচ্চন আর প্রকাশ রাজের মধ্যে সেটাও দেখা যাচ্ছে না। কয়েকদিন আগেই যেমন সাংবাদিক বারখা দত্তের সঙ্গে আলাপচারিতায় প্রকাশ রাজ সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুললেন অমিতাভ বচ্চনের দিকে। বলিউডের এই কিংবদন্তী অভিনেতাকে ‘কাপুরুষ’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি!

ঘটনার সূত্রপাত কাঠুয়া গণধর্ষণ নিয়ে। কাশ্মিরের উন্নাওয়ের আসিফা নামের এক নাবালিকা কিশোরীকে সাতদিন ধরে স্থানীয় এক মন্দিরে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয়েছিল। তারপর প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে মেয়েটাকে খুন করেছিল ধর্ষকেরা। এই ঘটিনায় মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ছাড়াও জড়িত ছিলেন স্থানীয় এক পুলিশ অফিসারও। মূলত শ্রীনগরের যে জায়গাটায় এই ঘটনা ঘটেছে, সেখানে বনের ধারে বেশ কয়েক ঘর মুসলিম যাযাবর পরিবারের বাস। এই পরিবারগুলোকে ভয় দেখিয়ে সেই এলাকা থেকে বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। কিছু হিংস্র হায়েনার ধর্মীয় আর বৈষয়িক লোভের বলি হয়েছিল আসিফা নামের ছোট্ট মেয়েটা।

এক সপ্তাহ পরে আসিফার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় জঙ্গলের ভেতর থেকে। পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে ভেতরে কাহিনী। ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে কাশ্মির, সেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো ভারতেই। ক্রিকেটার থেকে শিল্পি, সাধারণ জনতা থেকে বলিউডের সুপারস্টার, সবাই যোগ দিয়েছিলেন সেই প্রতিবাদে, বিচার চেয়েছিলেন অপরাধীদের। দেশের সরকারে থাকা বিজেপি নেতারা তখন অভিযুক্তদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, কাশ্মীরের বিজেপি’র মন্ত্রীরা কথা বলছেন দোষীদের হয়ে, সেই ঘটনা দাবানল হয়েই ছড়িয়ে গিয়েছিল সবার মধ্যে। প্রতিবাদের জোর বেড়েছিল বহুগুণে। ‘জাস্টিস ফর আসিফা’ ক্যাম্পেইন সাড়া ফেলেছে সবার মধ্যে।

অমিতাভ বচ্চন কিছুদিন আগেই সাংবাদিকদের সামনে এসেছিলেন তার নতুন সিনেমা ‘১০২ নটআউটে’র প্রচারণার কাজে। সামাজিক যোগায্যগমাধ্যমে সরব থাকলেও, কাঠুয়ার এই ধর্ষণ নিয়ে তাকে কিছু বলতে শোনা যায়নি। এটা নিয়েই তাকে প্রশ্ন করেছিলেন এক সাংবাদিক। অমিতাভ জবাব দিয়েছিলেন- “এটা নিয়ে কথা বাড়াবেন না প্লিজ! এই বিষয়টার কথা ভাবতেও ঘৃণা হয়!”

আর এই জায়গাটাতেই প্রকাশ রাজের ঘোর আপত্তি। অমিতাভ বচ্চন সমাজের ‘আইডল’ শ্রেণীর মানুষন তাকে কোটি কোটি ভারতীয় অনুসরণ করে। মানুষের ভালোবাসাতেই তিনি সুপারস্টার হয়েছেন। ভারতবাসীর প্রতি তো তার খানিকটা দায়ও আছেন। সেই দায় থেকেই প্রকাশ চেয়েছিলেন, এই ঘটনা নিয়ে অমিতাভ কিছু বলবেন, বিচার দাবী করবেন। কিন্ত হতাশ হয়েছেন তিনি, অমিতাভকে ‘সেফ জোনে’ বসে থাকতে দেখে। তার মতে, অমিতাভ এমনটা না করলেও পারতেন।

সাক্ষাৎকারে প্রকাশ রাজ বলেছেন- “আমি তাকে অনুরোধ করেছিলাম, এই অধিকারটা আমার আছে। তার কণ্ঠস্বর সুন্দর, আকর্ষণীয়। আমি আশা করেছিলাম, তিনি এই বিষয়টা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হবেন। কিন্ত তিনি বললেন, তার কিছু বলার নেই! এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে তার ঘেন্না লাগে। কিন্ত স্যার, আপনি এটাকে এড়িয়ে গিয়ে তো আরও বেশী ঘৃণা পাবার কাজ করলেন! আপনি তো কোন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কথা বলছেন না, কোন ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন না। একটা জঘন্য অন্যায় হয়েছে, সেটার বিপরীতে আপনি নিজের অবস্থান ব্যাক্ত করতেই পারতেন। আপনি বিচার দাবী করতে পারতেন, সেখানে একটা নির্দিষ্ট গোত্রের মানুষগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার উদ্দেশ্যে তাদের ওপর যেভাবে অত্যাচার করা হলো, মানবিক কারণেও তো সেটা নিয়ে আপনি কিছু বলতে পারতেন।”

“আপনি বিজেপি সমর্থন করেন, তাই চুপটি করে দেখে গেলেন শুধু। আপনি বিজেপির বিরুদ্ধে কথা বলবেন, সেটা তো আমরা চাইনি। আমাদের আশা ছিল, কিছু অমানুষের শাস্তি চাইবেন আপনি। যেটা তিনি করেছেন, সেটা কাপুরুষোচিত। অমিতাভ বচ্চনকে আমি সম্মান করি, যে জায়গাত তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে সম্মানটা তার প্রাপ্য। তিনি হিন্দি সিনেমার সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা। কিন্ত মানুষ অমিতাভ বচ্চন সেই সম্মানটা খুইয়ে ফেলছেন। আমাদের শিল্পীরা এভাবে কাপুরুষের মতো আচরণ করলে কিভাবে হবে? সমাজের সবার কাপুরুষ হতে তো সময় লাগবে না বেশী।”

প্রকাশ রাজ এমনিতেই বিজেপি’র কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। নিজের রাজ্য কর্ণাটকে প্রকাশের বন্ধু সাংবাদিক গৌরি লঙ্কেশকে গুলি করে হত্যা করেছিল বিজেপির গুণ্ডারা, তার অপরাধ ছিল, বিজেপির বিরুদ্ধে লেখালেখি করা। সেই হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি, তদন্তের কাজও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের ইশারায়। এরপর থেকেই মূলত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আর তার দলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন প্রকাশ। অন্যায়-দুর্নীতি আর ধর্মান্ধতার প্রতিবাদ করছেন নিয়মিত, প্রশ্নবাণে জর্জরিত করছেন বারবার। একারণে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ তার। এতদিন লড়াইটা মোদির বিপক্ষে ছিল, এবার তো অমিতাভ বচ্চনের বিরুদ্ধেও মোটামুটি যুদ্ধ ঘোষণাই করে দিলেন এই ‘ওয়ান্টেড’ আর ‘সিংঘাম’ ভিলেন!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-