অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

নতুন দেশ, অচেনা গোরখোদক ও কবরে ঢুকে পড়ার নিমন্ত্রণ!

আচ্ছা নতুন কোন দেশে গেলে প্রথমে আলাপ হয় কার সাথে? ইমিগ্রেশন অফিসার, ট্যাক্সি ড্রাইভার, না হলে নিদেনপক্ষে হোটেলের রিসেপ্সনিস্টের সাথে, তাই না? কিন্তু একবারে নতুন কোন দেশে প্রথমবার পা ফেলার পর যদি সবচেয়ে প্রথম আলাপচারিতা করতে হয় কবর খুঁড়তে থাকা একজন গোরখোদকের সাথে, তবে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায়? তার উপর অজানা-অচেনা সেই গোরখোদক যদি আপনাকে কবরে ঢুকে পড়ার আমন্ত্রন জানায় তাহলে ব্যাপারটা কিন্তু আর খুব বেশী স্বাভাবিক থাকে না, তাই না? এবার নতুন দেশে গিয়ে আমার ঠিক সেরকমই এক অদ্ভুত (এবং কিছুটা ভয়াবহ তো বটেই) অভিজ্ঞতা হয়েছে! সেই গল্পই বলছি তবে।

অফিসের কাজে গত মাসে যথারীতি ডেনমার্ক গমন। ডেনমার্কে কাজ শেষে প্ল্যান ছিল পূর্ব ইউরোপে প্রাচীন দুটি শহর – চেক রিপাবলিকের রাজধানী ‘প্রাগ’ ও হাংগেরী রাজধানী ‘বুদাপেষ্ট’ ঘুরে তারপর দেশে ফেরার। সেইমত কাজকর্মের পালা শেষ হলে পরদিন সকালে ডেনমার্কের অরহুস থেকে উড়াল দিলাম প্রাগের উদ্দেশ্যে। ATR এয়ারক্র্যাফটে মাত্র দুঘন্টার ফ্লাইট শেষে নেমে গেলাম প্রাগে। শেনজেন ভিসা বলে ইমিগ্রেশনের ঝামেলা নেই; সাথে আমার শুধু একখানা ব্যাগপ্যাক, সুতরাং ব্যাগেজেরও অপেক্ষা নেই।

নতুন কোথাও গেলে চোখ বন্ধ করে আমি ভরসা করি ল্যারি ও সের্গেই এই দুই ভদ্রলোকের উপর। আরে এঁদের চিনলেন না? আরে গুগলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন আর কি! কারণ, অজানা-অচেনা জায়গায় গুগল ম্যাপ আমার একমাত্র অন্ধের হাতের ছড়ি আর কি। তার উপর আবার ইউরোপের সমস্ত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, যেমন বাস, ট্রাম, মেট্রো, ফেরী সবগুলোর LIVE সময়সূচী গুগল ম্যাপের সাথে একেবারে সেকেন্ড মেপে Synch করা থাকে। সুতরাং, চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়।

যা হোক, গুগল ম্যাপ দেখে আমি টার্মিনাল থেকে চড়ে বসলাম ১৯১ নম্বর বাসে। ম্যাপ অনুযায়ী এই বাস যাবে ‘ভায়াপিক’ নামের বাস স্টপেজ পর্যন্ত, সেখানে নেমে একটা মাঠ আর কিছু ঢাল পেরিয়ে ১৮ মিনিট হাঁটলে আমার হোটেল । নতুন জায়গায় হাঁটতে আমার দারুণ লাগে, আর ইউরোপ হলে তো কথাই নেই– পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, গরম নেই আর বাতসে আদ্রতা কম, সুতরাং চিটচিটে ঘামের ঝামেলা নেই; বরং বেশ লাগে । যা বলছিলাম, ভায়াপিক আসলে নেমে গেলাম বাস থেকে। স্টপেজের পাশেই একখানা বিশাল মাঠ। ম্যাপ বলছে মাঠ পেড়িয়ে আড়াআড়ি যেতে হবে। পিঠে ব্যাগপ্যাক ঝুলিয়ে শুরু করলাম হাঁটা। গুগল ম্যাপ বলছে আর আমি হাঁটছি। মাঠ পার হবার পর ডিরেকশন অনুযায়ী ঢাল পেরিয়ে ঢুকে গেলাম এক জংগলের ভেতর, ভেতরে পায়ে হাঁটা পথ। দুপুর তখন সাড়ে বারোটার মত। কিন্তু জংগলের ভেতর দু-একটা পাখির ডাক ছাড়া কোন মানুষের সাড়া মাত্র নেই। হাঁটতে হাঁটতে দেখি জংগল আস্তে আস্তে ঘন হচ্ছে! একবার ভাবলাম বের হয়ে যাই। কিন্তু বের হয়ে আন্দাজে যাব কোনদিকে! বিশ্বস্ত গুগল বলছে সামনে এগুতে। সুতরাং, এগুতে থাকলাম।

কখনও ঢাল বেয়ে নামা, কখনও ওঠা – হাঁটতে হাঁটতে অলরেডী ২০ মিনিট পার হয়ে গেছে। বুঝলাম গুগলের সময়ের হিসাবটা এখানকার সাড়ে ছয় ফুটি লোকজনের বিশাল বিশাল পা ফেলে আমাদের চেয়ে অন্তঃত ডাবল স্পীডে হাঁটার সাথে মিল রেখে হিসেব করা। আমার মত ৫ ফিট ১০ ইঞ্চি এশিয়ানের কাঁধে ব্যাগপ্যাক নিয়ে গুটিগুটি পায়ের স্পীডের সাথে মিলবে না। ব্যাপারটা ঘটল তখনই!

জংগলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখি সামনে বাউন্ডারী ওয়াল দেয়া কিছু একটা। একপাশে ছোট্ট একটা গেট – পাশাপাশি দুজন লোক ঢুকতে পারে এমন ছোট। গেটের উপর বড় একখানা ক্রুশ দেয়া। হাঁটতে হাঁটতে কাছে গিয়ে দেখি আর কিছু না জংগলে ভেতর এটি একটি কবরস্থান! খ্রীষ্টান ধর্মালম্বীদের আর কি! তবে অস্বস্থিকর ব্যপার হচ্ছে গুগল আমাকে নাঁকি নাঁকি মেয়ের গলায় অবিরাম নির্দেশ দিচ্ছে ঐ গেট দিয়ে কবরস্থানের ভেতর ঢুকে যেতে! চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবলাম করি কি! গুগল ম্যাপ ছাড়া আমার কাছে আর কোন উপায়ও নেই । পথে-ঘাটে সারা জীবন এর উপরেই ভরসা করেছি, এবার অবিশ্বাস করি কিভাবে!

যা থাকে কপালে ঢুকে পরলাম কবরস্থানের ভেতর! ভেতরটা অবশ্য সুন্দর! সারি সারি বাঁধাই করা কবর – কোনোটি বেশ পুরানো, কোনোটি নতুন; কোনোটিতে ফুল দেয়া, কোনোটিতে পুড়ে যাওয়া মোমবাতি। এমনকি কবরস্থানটাও কি ঝকঝকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ময়লা-আবর্জনা তো দুরের কথা একটা কাগজের খোসাও নেই কোথাও। মনে মনে ভাবলাম আর আমরা ট্যুরিস্ট স্পটগুলোকে কিভাবে বিরিয়ানীর প্যাকেট দিয়ে ভরে দিয়ে আসি সেই লজ্জার কথা! যদিও আমার তখন কবরস্থানের সৌন্দর্য দেখার মত রোমান্টিসিজম নেই তারপরও দেখছি আর হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে গুগলের দেখানো পথ অনুযায়ী কবরস্থানের অলিগলি হেঁটে এক প্রান্তে চলে যাবার পর দেখি বাউন্ডারী দেয়ালের অন্য প্রান্ত। অথচ, গুগল তখনও বলছে সামনে হেঁটে যেতে। মানে কি ? দেয়াল টপকে যেতে বলে না কি ব্যাটা? নিশ্চয়ই গুগলের মাথা খারাপ হয়েছে অথবা আমার কোথাও বড় ধরণের গোলমাল হয়েছে! আশে পাশে কোন লোকজনের নামগন্ধও নেই। মাত্র ২ ঘন্টা আগে সম্পূর্ণ নতুন এক দেশে নেমে কিভাবে কিভাবে যেন আটকে গিয়েছি জংগলের ভেতর এক কবরস্থানের ভেতর! সাথে একখানা মোবাইল, যার ভেতর থেকে একজন যন্ত্র মানবী সেই একঘেয়ে ঘ্যানঘ্যান কন্ঠে বেকুবের মত বলে চলছে “Proceed to straight, সামনে যাও”। খালি দুপুর বেলা বলে তখনও ভয়ে সিটকে পরে যাই নি এই আর কি! এই ঘটনা রাতে ঘটলে সেই প্রাগেই মনে হয় দাঁত লেগে ফিট হয়ে পরে থাকতাম! এইবার প্রথমবারের মত ম্যাপ বন্ধ করে কবরস্থানের ভেতর ঘুরতে শুরু করলাম – অন্য কোনও পাশে কোন গেট পাওয়া যায় কি না।

প্রায় মিনিট দশেক ঘোরার পর দেখি এক কোনা থেকে হালকা শব্দ হচ্ছে। ভুত-প্রেত বিশ্বাস করি না ঠিক আছে কিন্তু ঐ পরিস্থিতিতে বুক কেঁপে উঠবে না এমন বীরপুরুষ আমি না তা স্বীকার করি। আস্তে আস্তে এগুলাম শব্দ লক্ষ্য করে। গিয়ে দেখি একদম এক কোনায় কিছু পুরানো কবরের ওপাশ থেকে ‘হুফ-হুফ’ টাইপের এক ধরণের শব্দ আসছে কিন্ত কোন মানুষ চোখে পড়ছে না। বন্য প্রাণী-ট্রানী নাকি? এইবার সত্যিই প্রচন্ড ভয় পেলাম! কবরস্থানে শিয়াল থাকা স্বাভাবিক ব্যপার, আর যে জংগল তাতে চিতাবাঘ বা হায়েনা হলেও অস্বাভাবিক কিছু না। এতদিন NatGeo আর Discovery তে এরকম ‘জান বাঁচানো ফরজ’ টাইপের পরিস্থিতি দেখছি, কিন্তু জীবনে কখনও সত্যি সত্যি এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে কল্পনাতেও ছিল না!

বুকের ধুকপুক সামলে ব্যাগপ্যাক ফেলে দৌড়ে কোনদিক যাব ভাবছি, এমন সময় দেখি আস্তে আস্তে একটা মানুষের মাথে উঠে এলো ওপাশ থেকে! গায়ে জিন্সের ওভারওল পড়া, হাতে বেলচার মত কিছু একটা। কবর খুঁড়ছে, আর মাটিতে কোপ দেয়ার সময় ঐ রকম ‘হুফ-হুফ’ শব্দ করছে। আমার ধরে তখন প্রাণ ফিরে আসার মত অবস্থা! ক্লান্তিতে মাটিতেই বসে পরলাম। লোকটাও মাথা তুলে আমাকে দেখে বেশ অবাক ! জামাজুতো পরে ব্যাগপ্যাক ঘাড়ে কাউকে সে কস্নিনকালেও কবরস্থানে ঢুকতে দেখেনি নিশ্চিত! আমি কিছু বলার আগে নিজেই হেঁটে এলো আমার দিকে। কাছে এলে ইংরেজীতে জিগ্গেস করলাম – “পথ হারিয়ে ফেলেছি ।“ মোবাইলে ম্যাপ দেখিয়ে বললাম “এই হোটেলে যাব কিন্তু কবরস্থানে ঢুকে বসে আছি। বের হব কিভাবে ?” উত্তরে ভাংগা ভাংগা ইংরেজীতে ব্যাটা যা বলল তাতে আমার আবারও আক্কেল-গুড়ুম হবার যোগাড়! “একদিন তো এখানেই আসতে হবে, সুতরাং বেরিয়ে যাবার এত তাড়া কিসের? বরং নতুন কাটা কবরটাতে ঢুকে জায়গাটা দেখে যাও।” ব্যাটা বলে কি! এই উত্তর শুনে এইবার আবার একটু আগের আতংকটা আবার কিছুটা ফিরে এলো। পাগল-টাগল নয়তো, কিংবা আরোও ভয়ংকর সাইকোপ্যাথ! হাসবেন না। অজানা জায়গায় জংগলের ভেতর করবস্থানে আমার মত এরকম অদ্ভত প্রস্তাব শুনলে আপনিও এর চাইতে ভাল কিছু ভাবতে পারতেন না বাজী ধরে বলতে পারি!

যা হোক, ভয়ে ভয়ে ব্যাটাকে বললাম “তা তো একদিন ফিরে আসবই এখানে সন্দেহ নেই, কিন্তু আপাতত এখান থেকে বের হয়ে হোটেলে যেতে চাই। দরকার পরলে গোসল-টোসল সেরে ফ্রেস হয়ে আবার এসে ঢুকে পরা যাবে, সমস্যা কি!” আমার উত্তর শুনে লোকটা এবার হেসে ফেলল। হাসি দেখে জানে আমার দ্বিতীয়বারের পানি এল। বুঝলাম সেও ঠাট্টা করছিল। বলল “চল, তোমাকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে আসি । হোটেলটা পাশেই, আগে হাঁটা পথটা কবরস্থানের ভেতর দিয়েই ছিল। কয়েকমাস আগে বাউন্ডারীটা বড় করায় এখন হাঁটা পথটা বাউন্ডারীর একপাশ দিয়ে চলে গিয়েছে। মাত্র কয়েকমাস আগেই হয়েছে বলে মনে হয় এখনও গুগল ম্যাপে আপডেট হয় নি।” হাঁটতে হাঁটতে জানলাম সে এই কবরখানার গোরখোদক। আগে কলেজে ম্যাথ পড়াতো। অর্থাৎ প্রফেসর টাইপের। প্রায় ২৫ বছর পড়ানোর পর তার মনে হয়েছে কি হবে গণিতের যুক্তিতে জীবন কাটিয়ে দিয়ে! তাই চাকরী ছেড়ে এখন যখন যা ইচ্ছে তাই করে।

অবশেষে হোটেলে!

গত প্রায় ১ বছর ধরে এই গোরস্থানের কবর খুঁড়ছে। মাঝে মাঝে লরি চালায়, আবার ইচ্ছে করলে জাদুঘরের গাইড হিসেবে কাজ করে এমনকি এক অপেরা দলে স্যাক্সোফোনও বাজায় মাঝে মাঝে! মুক্ত জীবন যাকে বলে! আজব এক চরিত্র! ভাল লাগল কথা বলে! প্রায় ৫-৬ মিনিট হেঁটে আমাকে পৌঁছে দিল হোটেলের উঠোনের দরজায়। গল্প করতে ভালই লাগছি । একটু বসতে আমন্ত্রন জানালাম সাথে একপ্রস্থ গলা ভেজানো ড্রিংকসের অফার। উত্তর দিল “তোমার সাথে বসে ড্রিংস করার সময় আমার আছে কিন্তু ঐ ভদ্রলোকটার যে খুব তাড়া। তার যে আর সময় নেই। “অবাক হয়ে জিগ্গেস করলাম, “কার সময় নেই? কোন ভদ্রলোকের কথা বলছ?” উত্তর দিল “যার জন্য কবরটা খুঁড়ছিলাম, সে । তার তো কবরে ঢুকতে হবে একটু পরেই। কবরটা খোঁড়া শেষ না হলে সে ঢুকবে কোথায়?” হা হা করে হেসে উঠে হ্যান্ডশেক করে বিদায় দিলাম আমার কবরস্থানের এই রসিক নতুন বন্ধুকে। রুমে চেক-ইন করে যখন শাওয়ার নিচ্ছিলাম মনে পড়ছিল ওর শেষ রসিকতাটুকু। আসলেই মানুষের সময় নেই – বেঁচে থাকতে তো নয়ই, এমন কি মরার পরও ব্যস্ততা!

এভাবেই শুরু হলো আমার পূর্ব ইউরোপের ভ্রমণ – অভাবিত, অসাধারণ, গা-কাঁপানো এক অভিজ্ঞতা দিয়ে!

জঙ্গল ও কবরস্থানের ভিডিও দেখুন এই লিংকে

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close