ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ আসরটিকে স্মরণ করতে গেলে ওয়াকিবহাল যেকোনো ফুটবল ভক্তের মাথায় প্রথমে যে দুইটি শব্দ আসার কথা তা হলো, বিতর্ক আর বিষ্ময়।

১৯৬৬-র ইংল্যান্ড বিশ্বকাপটিকে ঘিরে যে পরিমাণ আন্তর্জাতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল তাতে কেউ যদি ঐ আসরটিকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত আসর বলেও আখ্যা দেয় তাতে খুব একটা দ্বিমত করার জায়গা থাকবে না। ৩১টি আফ্রিকান রাষ্ট্রের বিশ্বকাপ বয়কট করা, রেফারিদের বিরুদ্ধে একাধিক ম্যাচে ইচ্ছাকৃত পক্ষপাতের অভিযোগ, স্বাগতিক রাষ্ট্রকে ফিফা কর্তৃক বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়েছে এমন দাবি- কোন বিতর্কটা ছিল না সেই বিশ্বকাপে?

কিন্তু ঐ বিশ্বকাপটিকে মানুষ শুধু বিতর্কের জন্য মনে রেখেছে এমন দাবি করা অন্যায় হবে। বিতর্কের ফাঁকে ফাঁকে ৬৬-র বিশ্বকাপ দুনিয়াকে উপহার দিয়েছিল চমৎকার সব ফুটবলীয় মুহূর্ত। টুর্নামেন্টজুড়ে স্যার ববি চার্লটনের নায়কোচিত পারফর্ম্যান্স, বিশ্ব আসরে ‘তরুণ’ ফ্রাঞ্জ ব্যাকেনবাওয়ারের (ঐ আসরের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় নির্বাচিত হন ব্যাকেনবাওয়ার) আবির্ভাব, আর সব কিছু ছাড়িয়ে ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ ইউসেবিওর দুর্ধর্ষ গোলোৎসব- স্রেফ ফুটবলীয় কারণ বিবেচনায় রাখলেও যে ৬৬-র ইংল্যান্ড বিশ্বকাপকে ভোলার কোনো উপায় নেই।

১৯৬৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিতর্কটি জন্ম নেয় বল মাঠে গড়ানোর বহু আগেই। ১৯৬৪ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বকে কেন্দ্র করে ফিফা একটা উদ্ভট নিয়মের পত্তন ঘটায়। ফিফার এই নতুন নিয়মানুসারে আফ্রিকান অঞ্চলের বাছাইপর্ব থেকে জিতে আসা আফ্রিকান দল তিনটিকে বিশ্বকাপে খেলতে হলে এশিয়া অঞ্চলের তিন আঞ্চলিক বিজয়ীর সঙ্গে আগে তাদের প্লে-অফ খেলতে হত। অর্থাৎ, শত শত বছর ধরে ঔপনিবেশিক শোষণের শিকার হয়ে আসা আফ্রিকান মহাদেশের সামান্যতম প্রতিনিধিত্ব বিশ্বকাপে থাকুক, এইটুকু নিশ্চিত করার সদ্দিচ্ছাও ফিফার ছিল না। একটি বিশ্ব আসরে যেখানে অন্তর্ভুক্তিই হওয়া উচিত আয়োজক সংস্থাটির মূল লক্ষ্য, সেখানে তাদের বিরুদ্ধে এইরকম নির্লজ্জ ‘কাঠামোগত বৈষম্য’ আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলো কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল আরও একটি রাজনৈতিক বিতর্ক।

ঘোষিত বর্ণবাদী রাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১৯৫৮ সালে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকান সরকারকে তাদের বর্ণবাদী নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করার জন্য তখন গোটা বিশ্বের নানা দেশ তাদেরকে একঘরে করার নানা প্রয়াস নিচ্ছিল। আফ্রিকার ফুটবল সংস্থাটিও সেই নিয়তেই তাদেরকে বহিষ্কার করেছিল। কিন্তু ১৯৬৩ সালে ফিফা দক্ষিণ আফ্রিকাকে তাদের আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশনের সদস্যপদ ফিরিয়ে দিলে তা আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে বিশালে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটায়। এই দুইটি ঘটনার সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া হিসেবে আফ্রিকার ৩১টি দেশ ১৯৬৬ বিশ্বকাপটিকে বর্জন করে।

কিন্তু নিয়তির ভাবগতি বোঝা অসম্ভব। নইলে যেই বিশ্বককোপে একটি আফ্রিকান রাষ্ট্রও অংশগ্রহণ করেনি সেই বিশ্বকাপের ট্র্যাজিক হিরো ও সর্বোচ্চ গোলদাতা কেন এমন একজন মানুষ হবেন যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা আফ্রিকার মোজাম্বিকে!

অধিকাংশ আফ্রিকান রাষ্ট্র ৬০এর দশকে স্বাধীনতা অর্জন করলেও ৭০এর দশকের আগ পর্যন্ত মোজাম্বিক আর এঙ্গোলা পর্তুগিজদের অধীনস্থই ছিল। ফলে ঐ অঞ্চলগুলির প্রতিভাবান খেলোয়াড়েরা বিশ্বকাপে অংশ নেন পর্তুগালের হয়ে। এদের মধ্যে ছিলেন পর্তুগালের তৎকালীন অধিনায়ক, মোজাম্বিকে জন্ম নেওয়া মিডফিল্ডার মারিও কোলুনা ও তর্কযোগ্যভাবে পর্তুগাল ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড়, ‘কালো চিতা’ ইউসেবিও।

১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর্তুগাল দলটি তাদের বহু প্রতিপক্ষের কাছে অপরিচিত হলেও মানের দিক থেকে তাঁরা টুর্নামেন্টের সেরা দলগুলির একটি ছিল। এই দলটিকে ভালো করে চিনতে গেলে আমাদেরকে ৬০ এর দশকের দুর্দান্ত বেনফিকা দলটি সম্পর্কে একটু জানতে হবে। হাল আমলে আমরা যাকে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ নামে চিনি ১৯৫৫ সালে সেই টুর্নামেন্টটি ইউরোপিয়ান কাপ নামে প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটায়। ইউরোপিয়ান কাপের প্রথম পাঁচটি আসরের প্রত্যেকটিই জিতেছিল ডি-স্টেফানো, পুসকাসের রিয়াল মাদ্রিদ। ১৯৬০-৬১ মৌসুমে তাদেরকে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দিয়েছিল তাদেরই চিরশত্রু, ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা। তবে রিয়াল মাদ্রিদের ফাঁকা করে দেওয়া ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যের সিংহাসনটির দখল বার্সেলোনা নিতে পারেনি। বরং ইউরোপ সেরার মুকুট উঠেছিল পর্তুগালের একটি ক্লাবের মাথায়, যার নাম বেনফিকা। ১৯৬০-৬১ মৌসুমের ইয়রোপিয়ান কাপের ফাইনালে বেনফিকা ৩-২ গোলে পরাজিত করে বার্সেলোনাকে।

পরের মৌসুমে আবারও ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে ওঠে বেনফিকা। ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদকে ৫-৩ গোলে পরাস্ত করে জিতে নেয় টানা দ্বিতীয় ইউরোপিয়ান কাপ। ঐ দশকে বেনফিকার আর কাপটা ছুঁয়ে দেখা না হলেও আরো তিনবার দলটি ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে উঠতে সক্ষম হয়েছিল। হাঙ্গেরিয়ান কোচ বেলা গুটম্যানের নেতৃত্বাধীন সেই বেনফিকা দলটি ঠিক কী মানের ফুটবল খেলত তা বোঝানোর জন্য এই পরিসংখ্যানটিই যথেষ্ট হওয়া উচিত, ৬০ এর দশকে বেনফিকা পাক্কা আটবার পর্তুগিজ লিগের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

ষাটের দশকের বেনফিকা দলটিকে নিয়ে এত কিছু লেখার কারণ এই যে, ঐ দলের সদস্যদের নিয়েই গড়ে উঠেছিল ১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর্তুগিজ দলের নিউক্লিয়াস। ২০১০ বিশ্বকাপের স্পেনকে বুঝতে গেলে আমাদের যেমন গোর্দিওলার বার্সেলোনাকে চিনতে হয়, ঠিক তেমনই ৬৬র পর্তুগাল দলটিকে চিনতে গেলে আমাদের চিনতে হবে ঐ দশকের বেনফিকা দলটিকে। অধিনায়ক ও দলের মিডফিল্ডের প্রধান কাণ্ডারি মারিও কোলুনা, দুই উইংয়ে খেলা এন্তোনিয়ো সিমোয়েজ ও হোসে আগুস্তো পিন্টো, এবং আক্রমণভাগে নেতৃত্ব দেওয়া হোসে তোরেস ও ইউসেবিও- এরা প্রত্যেকেই ক্লাব ফুটবল খেলতেন বেনফিকায়। ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন চমৎকার ফুটবলার। এবং তার চেয়েও বড় কথা, একসঙ্গে বহু ম্যাচ খেলার এবং বহু ট্রফি জেতার অভিজ্ঞতা ছিল তাঁদের। ফলে বোঝাপড়াটা ছিল চমৎকার।

১৯৬৬ সালেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার সুযোগ পায় পর্তুগাল। ফলে বহু প্রতিপক্ষের কাছেই ঐ পর্তুগাল দলটি ছিল বিশ্রী এক দুর্বোধ্য রহস্যের মতো।

১৯৬৬ সালের ১৩ই জুলাই পর্তুগাল বিশ্বকাপের মূল পর্বে তাঁদের প্রথম ম্যাচটি খেলে। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে অনুষ্ঠিত গ্রুপ সি-এর সেই খেলায় পর্তুগালের প্রতিপক্ষ ছিল হাঙ্গেরি। ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটেই বেনফিকা উইঙ্গার হোসে আগুস্তো পিন্টোর গোলে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। ৬০ মিনিটের মাথায় হাঙ্গেরি গোল শোধ করে দেয়। কিন্তু এই পর্তুগিজ দলটি এত সহজে ভেঙ্গে পড়ার দল ছিল না। ৬৭ মিনিটের মাথায় আবার গোল করেন হোসে আগুস্তো পিন্টো। ৯০ মিনিটে আরো একটি গোল করে জয়টিকে নিশ্চিত করে ফেলেন পিন্টোর ক্লাব সতীর্থ সেন্টার-ফরোয়ার্ড হোসে আগুস্তো তোরেস। গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচটি পর্তুগাল জেতে ৩-১ গোলে।

১৬ই জুলাই এই ওল্ড ট্র্যাফোর্ডেই গ্রুপ পর্বে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে পর্তুগাল মুখোমুখি হয় বুলগেরিয়ার। ১৭ মিনিটের মাথায় বুলগেরিয়ার ইভান ভুস্তভ নিজেই নিজেদের জালে বল জড়িয়ে ফেললে পর্তুগাল ১-০ গোলে এগিয়ে যায়। ৩৮ মিনিটে পর্তুগালের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন ইউসেবিও। এই গোলের মধ্য দিয়েই শুরু হয় ৬৬ বিশ্বকাপে ‘ব্ল্যাক প্যানথারের’ গোলবন্যা। দ্বিতীয় অর্ধেও একই রকম আক্রমণাত্মকভাবে খেলতে থাকে পর্তুগাল। ৮১ মিনিটে ‘দয়ালু দানব’ (দ্য কাইন্ড জায়েন্ট) নামে খ্যাত আগুস্তো তোরেসের গোলে শেষ পর্যন্ত পর্তুগাল ৩-০ পরাজিত করে বুলগেরিয়াকে।

পর্তুগালের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জটা আসে ১৯শে জুলাইয়ে। লিভারপুল শহরে, এভারটনের মাঠ গুডেসন পার্কে তাদের মুখোমুখি হয় লাতিন আমেরিকান পরাশক্তি ব্রাজিল। দুই ম্যাচ জিতে যদিও পর্তুগাল কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলেছিল, কিন্তু গত আসরের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলাটিকে যাতে শিষ্যরা কোনোক্রমেই হালকাভাবে না নেয় তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে বেশ বদ্ধপরিকর ছিলেন পর্তুগালের ব্রাজিলিয়ান কোচ ওট্টো মার্টিনস গ্লোরিয়া। ব্রাজিলের অবস্থা তখন খুবই নাজুক। গ্রুপ পর্বে হাঙ্গেরির কাছে ৩-১ গোলে পরাস্ত হওয়া ব্রাজিলকে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে হলে পর্তুগালের বিরুদ্ধের ম্যাচটি জিততেই হত। ইনজুরি সমস্যায় জর্জরিত ব্রাজিল প্রথম ম্যাচেই হারিয়েছিল তাঁদের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় গারিঞ্চাকে। ১৯৬২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোঁকা হয়ে যায় যখন পর্তুগাল ডিফেন্ডার মোরাইয়ের ট্যাকলে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন ব্রাজিল কিংবদন্তী পেলে। বলে রাখা ভালো, পেলে আগে থেকেই একটা হাঁটুর ইনজুরি বয়ে বেড়াচ্ছিলেন। নইলে ডান গোড়ালিতে আঘাত পাওয়ার পর বাম হাঁটু ধরে কাতরাতে কাতরাতে মাঠ ছাড়ার অন্য কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

১৯শে জুলাইয়ের ঐ ম্যাচটিকে ব্রিটিশ মিডিয়া ও ফুটবলভক্তরা দেখছিলেন ইউসেবিও বনাম পেলের লড়াই হিসেবে। ইনজুরি পেলেকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেওয়াতে গুডেসেন পার্কের দর্শকেরা তাই যারপরনাই কষ্ট পেয়েছিলেন। অবশ্য অনবদ্য ফুটবল দেখার যে আশা নিয়ে তারা মাঠে এসেছিলেন তাদের সেই আশা দিনশেষে ভালোমতোই পূরণ হয়েছিল।

ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে ১৫ মিনিটের মাথায়। এন্তোনিয়ো সিমোয়েজের ডি বক্সের বাইরে থেকে বল পাস করেন আচমকা জায়গা বদলে ফেলা ইউসেবিওর কাছে। বাম প্রান্ত দিয়ে বাইলাইনের কাছে পৌঁছানো ইউসেবিও পরাস্ত করেন তাঁর মার্কারকে। তারপর মাপা একটা ক্রস করেন গোলপোস্টের দিকে। ক্রসটা সামলাতে গিয়ে ব্রাজিল গোলকিপার মাঙ্গা বলটাকে একটা বিপজ্জনক অঞ্চলে ঠেলে দেন। এই সুযোগের জন্যই যেন অপেক্ষা করে ছিলেন সিমোয়েজ। নিকট দূরত্ব থেকে দেওয়া এক হেডে এই উইঙ্গার পর্তুগালকে এগিয়ে দেন ১-০ গোলে।

২৭ মিনিটের মাথায় আবার গোল করে পর্তুগাল। ডি-বক্সের ভেতর থেকে দুর্দান্ত এক হেডে পর্তুগালের লিডকে ২-০ নিয়ে যান ইউসেবিও।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের অহংবোধে যেন আঘাত লাগে। লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে ব্রাজিলের খেলোয়াড়েরা। দ্বিতীয় অর্ধে সেই উদ্যমের ফলও পায় তারা। ৭৩ মিনিটে ডি-বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া রিল্ডোর বাম পায়ের শটে গোল ব্যবধানকে অর্ধেক নামিয়ে আনে পেলে-গারিঞ্চাবিহীন ব্রাজিল। ব্রাজিলের খেলোয়াড় ও দর্শকেরা যেন একটু আশাবাদী হয়ে উঠতে শুরু করেন। তবে, এই আশাবাদ টিকে থাকে আর মাত্র ১২ মিনিট।

৮৫ মিনিটের মাথায় একটা কর্নার পায় পর্তুগাল। প্রথম দফাতে সেই কর্নারটি পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হয় ব্রাজিলের রক্ষণভাগ। বলটা যেয়ে পড়ে ইউসেবিওর পায়ের সামনে। ডান পা দিয়ে মারা নেট কাঁপানো এক হাফ-ভলিতে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্ন চুরমার করে দেন ব্ল্যাক প্যানথার। খেলার শেষ ফল, পর্তুগাল ৩-১ ব্রাজিল।

তিন ম্যাচে তিন জয় নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে পর্তুগাল। আর রাজ্যের হতাশা ও গ্লানি নিয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় ১৯৬২ বিশ্বআসরের চ্যাম্পিয়নরা।

কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালকে খেলতে হয় উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে। উত্তর কোরিয়ার সাফল্য সন্দেহাতীতভাবে ঐ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমক ছিল। রহস্য আর গোপনীয়তায় ঘেরা রাষ্ট্রটির ফুটবল দল সম্পর্কে বিশ্ববাসীর কোনো পূর্ববর্তী ধারণাই ছিল না। তাই ডিপিআরকে (উত্তর কোরিয়ার প্রশাসনিক নাম) যখন গ্রুপ পর্বে ইতালিকে হারিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের বাইরের প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিল তখন গোটা দুনিয়া পুরোদস্তুর তাজ্জব বনে গিয়েছিল।

যেই মাঠে তাঁরা ব্রাজিলকে হারিয়েছিল সেই গুডেসন পার্কেই ২৩শে জুলাই উত্তর কোরিয়ার মুখোমুখি হয় পর্তুগাল। উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এই যে তাদের প্রসঙ্গে তাদের প্রতিপক্ষদের বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিল না। আমাদের মনে রাখতে হবে এই সময়টি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বৈপ্লবিক অগ্রগতির বহু আগের কথা। ফলে ভিডিও ফুটেজ দেখে উত্তর কোরিয়ার শক্তিমত্তা ও দুর্বলতাগুলোকে শনাক্ত করার সুযোগ পর্তুগালের কাছে ছিল না। গুডেসন পার্কে উপস্থিত হওয়া একজন দর্শকও মনে হয় না কোনোদিন পর্তুগাল বনাম উত্তর কোরিয়ার ঐ ম্যাচটিকে ভুলতে পেরেছিলেন। খেলা শুরুর মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যে ৩ গোলের লিড নেয় উত্তর কোরিয়া! গুডেসেন পার্কের দর্শকরা আর উত্তর কোরিয়ান খেলোয়াড়েরা ততক্ষণে ভাবতে শুরু করেছিলেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনটি ঘটা এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু, পরের এক ঘন্টা লিভারপুল শহর ও গোটা বিশ্ব যা দেখেছিল তা কোনো অঘটন নয়।

উপস্থিত সবাই চাক্ষুস করেছিল কীভাবে একক নৈপুণ্যে একটি দলকে খাদের কিনারা থেকে উদ্ধার করা সম্ভব। ঐ দিনের পরে ইংলিশ ফুটবলভক্তদের কাছে ইউসেবিও আর কোনো ব্যক্তিমানুষ ছিলেন না, পরিণত হয়েছিলেন একটা মিথে। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ঐ ম্যাচে ইউসেবিও গোল করেছিলেন ৪ টি। আরেকটি গোল করানোতেও রেখেছিলেন উল্লেখযোগ্য অবদান। মাত্র ৩৫ মিনিটের ব্যবধানে খেলার স্কোর ৩-০ থেকে বদলে পরিণত হয়েছিল ৩-৪ এ। ৯০ মিনিট শেষে পর্তুগাল খেলাটি জিতেছিল ৫-৩ গোলে। আর টুর্নামেন্টে ৭ গোল করা কালো চিতা তাঁর খেলা দিয়ে উদ্বেলিত করে ফেলেছিল গোটা ফুটবলবিশ্বকে।

সেমিফাইনালে পর্তুগাল মুখোমুখি হয় স্বাগতিক ইংল্যান্ডের। খেলাটা মাঠের গড়ানোর আগেই এই ম্যাচটিকে নিয়ে একটা বিশাল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। পূর্ববর্তী শিডিউল অনুযায়ী ইংল্যান্ড-পর্তুগাল সেমিফাইনালটি লিভারপুল শহরে হওয়ার কথা ছিল। পর্তুগাল আগে থেকেই লিভারপুল শহরে অবস্থান করছিল এবং গ্রুপ পর্বের শেষ ও কোয়ার্টার ফাইনালটাও তারা সেমিফাইনালের জন্য নির্ধারিত ভেন্যু গুডেসন পার্কে খেলেছিল।

আকষ্মিকভাবে ফিফা সিদ্ধান্ত নেয় খেলাটি লিভারপুল শহরে নয় বরং লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে হবে। ইংল্যান্ড ইতিমধ্যেই লন্ডনে অবস্থান করছিল। অনেকে মনে করেন যে ভেন্যু পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটা যা যতটা না ফিফার ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল আয়োজক রাষ্ট্রের ফুটবল ফেডারেশনের। ২৫ তারিখে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের তরফ থেকে ফিফাকে একটি লিখিত অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। জল আরও ঘোলা হয় যখন ফিফা অভিযোগটিকে সাথে সাথে প্রত্যাখ্যান করে।

ব্যাপারটিকে স্বাগতিক দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব মনে হওয়ার আরো একটি বড় কারণ ছিল ফিফার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্টেনলি রুস নিজেও জাতীয়তায় ছিলেন একজন ব্রিটিশ। বিশ্বকাপ আয়োজক কমিটির আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছিল এই যে, টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচটি সবচেয়ে বেশি দর্শক ধারণে সক্ষম স্টেডিয়ামটিতেই হওয়া উচিত।

ফলে পূর্বপ্রস্তুতিহীন পর্তুগালকে ৫ ঘন্টা ধরে বাসে করে লিভারপুল থেকে লন্ডনে আস্তে হয়। পুরো ব্যাপারটা এমনই শেষ মুহূর্তে ঘটানো হয়েছিল যে, পর্তুগালকে একটু বিশ্রাম করে নেওয়ার সুযোগ দিতে ম্যাচটিকে ২৬ জুলাই দুপুর তিনটা থেকে সরিয়ে ঐ দিনেরই সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় নিয়ে যাওয়া হয়।

এতকিছুর পরও ম্যাচটি মোটেই মানের দিক থেকে চমৎকারের চেয়ে কম কিছু হয়নি। ইংল্যান্ড পর্তুগালের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে নেমেছিল। ইংলিশ মিডফিল্ডার নোবি স্টাইলসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ইউসেবিওকে ম্যান-মার্ক করে রাখার। এই কাজে যে নোবি স্টাইলস এতখানি সফল হতে পারবেন তা বোধহয় ইলিশ ম্যানেজমেন্টও ভাবতে পারেনি। পুরো ম্যাচজুড়ে ব্ল্যাক প্যান্থারকে ছায়ার মতো অনুসরণ করলেন স্টাইলস। পর্তুগালের ঐ দলটিতে আরো বহু ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু এই ম্যাচটি ছিল সমানে-সমানে লড়াই। একে তো তাঁরা স্বাগতিকদের বিরুদ্ধে খেলতে নেমেছিল, তার উপর এইটিই ছিল ওয়েম্বলিতে পর্তুগালের প্রথম ম্যাচ। ভেন্যু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শেষ মুহূর্তে হওয়ায় একটি নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময়টুকুও পর্তুগাল পায়নি।

তবে সেইদিন পর্তুগালের হারের পিছনে ফিফার পক্ষপাতদুষ্টতা আর নোবি স্টাইলসের দুর্দান্ত মার্কিংয়ের চেয়েও বড় একটি কারণ ছিল। সেই কারণটির নাম স্যার ববি চার্লটন। চারপাশে চলমান সকল বিতর্ককে মাথা থেকে সরিয়ে ফুটবলে কীভাবে মনোযোগ দিতে হয় সেইটা সেদিন ববি চার্লটন দেখিয়ে দিয়েছিলেন। দুই অর্ধে দেওয়া তাঁর দুই গোলেই নিশ্চিত হয়েছিল ইংল্যান্ডের ফাইনালে ওঠা। ৮২ মিনিটে অবশ্য পর্তুগাল একটা পেনাল্টি পেয়েছিল. যেইটা থেকে গোলও করেছিলেন ইউসেবিও। কিন্তু ততক্ষণে বেশি দেরি হয়ে গেছে। ইংল্যান্ড ২-১ গোলে পরাজিত করে পর্তুগালকে। সেদিনের ম্যাচ শেষে ইউসেবিওর কান্না অনেক দিন পরেও পর্তুগাল ভক্তদের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতিগুলোর একটা হয়ে ছিল। পরে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে ইংল্যান্ডই বাগিয়ে নেয় ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ট্রফিটি।

পর্তুগাল তৃতীয় স্থান নির্ধারনী ম্যাচে হারায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে। বিশ্বকাপের তৃতীয় সেরার খেতাব নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের।

ইংল্যান্ড ঐ বিশ্বকাপ জেতার যোগ্য দল ছিল না এমন দাবি করা ঠিক হবে না। তবে ভেন্যু পরিবর্তনের গোটা নাটকটা না হলে সেদিন খুব অনায়াসেই খেলার ফল অন্যরকম হতে পারত।

পরের দুই দশকে পর্তুগাল আর বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার সুযোগই পায়নি। তবে পর্তুগালের পক্ষে যে ফুটবলে কিছু একটা করে দেখানো সম্ভব প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে এই বিশ্বাসের সঞ্চার ঘটেছিল ১৯৬৬ এর দুর্দান্ত পর্তুগাল দলের নায়কোচিত পারফর্ম্যান্সের কারণেই।

*

এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনুন ক্যাসপারস্কি ল্যাবের সব পণ্য, খুব সহজে। অনলাইনে পেমেন্ট, অনলাইনেই ডেলিভারি!

Comments
Spread the love