ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

‘কওমী জননী’ ও একজন ‘পলিটিশিয়ান’ শেখ হাসিনা!

জিয়াউর রহমান নাকি বলেছিলেন, ‘আই উইল মেক দ্য পলিটিক্স ডিফিকাল্ট।’ আর গত কয়দিন ধরে আমার মনে হচ্ছে এখনকার পলিটিক্স ডিফিকাল্ট না, একেবারে ‘মেক দ্য পলিটিক্স ইম্পসিবল’ হয়ে যাচ্ছে!

চিন্তা করে দেখুন, এই সেই হেফাজত যারা ৫ বছর আগে একইভাবে স্কুল কলেজ বন্ধ করিয়ে ঢাকা এসে শতাব্দীর অন্যতম বড় তাণ্ডব চালিয়ে গিয়েছিল, তারাই এখন দলে দলে এসে শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দিচ্ছে! রাজনীতিতে ক্যারট এন্ড স্টিকের এরকম তুখোড় ব্যবহার এদেশে এত লার্জ স্কেলে আর কখনো হয়েছে বলে আমার স্মরণ পড়ছে না। যে হেফাজত আড়াই হাজার লোক মরেছে বলে মিথ্যাচার করেছিল, তারাই শেখ হাসিনাকে ‘কওমী জননী’ উপাধি দিয়ে বগল বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফিরছে। আমার বিশ্বাস শেখ হাসিনার চরমতম রাজনৈতিক শত্রুও এই কাণ্ড দেখে গালে হাত দিয়ে বসে আছে।

দীর্ঘমেয়াদে এই কাণ্ডের কোনো সরাসরি সুফল আওয়ামী লীগ পাবে না, আবার এই কাণ্ড থেকে দল হিসেবে তাদের কোনো ক্ষতিও হবে না। তবে এর অন্যান্য প্রতিক্রিয়া কী কী হতে পারে, সেটি বিবেচনা করা যাক।

লাভের বিষয়টি হতে পারে যে এখন কওমী মাদ্রাসার কারিকুলাম যেহেতু মাস্টার্স সমমানের হয়েছে, এর মানে কওমীরা এখন শিক্ষার দুনিয়াদারি ব্যবহারের বিষয়টি আরো গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে বলেই বোঝা যায়। সেক্ষেত্রে হয়তো তাদের কারিকুলাম রিভিউ করার একটি সামাজিক আলাপ হতে পারে এবং ধীরে ধীরে কিছু দুনিয়াদারি বিদ্যাও কওমীতে অন্তর্ভূক্ত হতে পারে। মূল কথা হেফাজতিরা দেশের মূল জনস্রোতে অর্থনৈতিক কন্ট্রিবিউশনে ঐ দূর আগামীতে দুই চার পয়সা যোগ দিলেও দিতে পারে।

দ্বিতীয় লাভটা উভয় তরফে হয়েছে। হেফাজতিদের ট্রিগার পয়েন্টটা পরিস্কার হয়ে গেছে। এদেরকে হালকা লাঠির বাড়ি আর লাঠি লজেন্স, এই দুইটার উপরে রাখলে তারা পলিটিক্সে তেমন বড় কোনো ঝামেলা তৈরি করবে না। আর হেফাজতিরাও জানে যে তারাও একটু গাল টাল ফুলিয়ে কিছু বিষয় আবদার করলে সেটা তারা পেয়ে যাবে। কাজেই, এখানে উভয় পক্ষের উইন উইন সিচুয়েশন।

আশংকার বিষয় হচ্ছে হেফাজতিরা যদি এখন নিজেদেরকে ‘আওয়ামী লীগের নিজেদের লোক’ ভেবে আবদারের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তখন একটা বিপদ হবে। যেমন কাদিয়ানিদেরকে অমুসিলম ঘোষনার দাবি তারা এখনই বাজারে ছাড়ছে। দেশে কয় ঘর কাদিয়ানি আছে আমার জানা নেই, এদেরকে সরকারিভাবে মুসলমান ডাকলে কি খ্রেষ্টান কি নাস্তিক ডাকলে জাতির কী লাভ বা ক্ষতি সেটাও আমার ধারণায় নেই। মানে এগুলোর কোনো দুনিয়াদারি বিষয় না। কিন্তু নুইসেন্স তৈরির জন্য এগুলো ভালো ইস্যু। দৃশ্যমান দুর্বল প্রতিপক্ষ থাকলে মোল্লারা লাঠিসোটা নিয়ে নামতে জোশ পায়। সেটা তসলিমা নাসরিন কি কাদিয়ানি- এরকম সাইজে ছোট এবং সরকারের সাথে কোনো প্রেম-ট্রেম নেই, এরকম প্রতিপক্ষ হইলে ভালো। কাজেই, মোল্লারা আবার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে যদি ‘কাদিয়ানি কাটো’ স্লোগান নিয়ে মাঠে নামে, তখন দেয়ার মতো এনাফ রেলের জমি না থাকলে বিপদ হবে!

সবচাইতে বড় ঘটনা এইখানে কী হইছে সেটা এবার বলি।

এই ঘটনার মাধ্যমে দেশে হেফাজতিদের বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারে তলানিতে নেমে গেছে। এই পলিটিক্সটা শেখ হাসিনা তুখোড় খেলেছেন, আমি দেখেই মজা পেয়েছি। তেতুল হুজুরের রেপুটেশন এখন তেতুলের চাইতেও কম হয়ে গেছে। আমাদের তৃণমূল সমাজে, মানে যেখানে আমার আপনার মতো মধ্যবিত্ত জ্ঞানী কুতুবরা নেই, সেখানে এই হেফাজতিদের একটা বিশ্বাসযোগ্যতার সম্মান ছিল যে এরা দুনিয়াদারির লোভে না, বরং আখেরাতের লোভে আন্দোলন করে। এ কারণে তাদের ‘শাপলা চত্ত্বরে আড়াই হাজার শহীদ’-এর গল্পটি গ্রামেগঞ্জে ব্যাপক বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছিল।

কিন্তু এই হুলুস্থুল মাখামাখি আমাদের পলিটিক্যাল পেরিফেরিতে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে এভরি ম্যান হ্যাজ এ প্রাইস। ইফ ইয়্যু পে দ্য রাইট প্রাইস, ইয়ু ক্যান হ্যাভ গলফ বয় এরশাদ, অর তেতুল হুজুর।

শেখ হাসিনা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বাংলাদেশ নির্বাচন, নির্বাচন জরিপ

আগামীতে হেফাজতের পক্ষে পাবলিক সেন্টিমেন্ট দখল করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হবে। যে কোনো ইস্যুতে তারা তালবে এলেম গরীব এতিম ছেলেপেলেদের রাস্তায় নামাতে পারবে বটে, কিন্তু রাস্তার পাশের ফুটপাতে দাঁড়ানো লোকটা তাদেরকে আর সহজে বিশ্বাস করবে না।

তবে আওয়ামী লীগের কোনো লাভ ক্ষতি নেই। তাদেরকে আগে যারা গালি দিতো, তারা গালি দিবেই। আর আগে যারা ভালো পেত, তারা এখনও একই পরিমাণ ভালো পেতেই থাকবে!

*

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles