রাজনীতি নাকি জননীতি

যেভাবে একটি দেশে শুধুই “দুটি বড়” রাজনৈতিক দল থেকে যায়!

আমাদের দেশের জাতীয় নির্বাচনের সময় টিভি, সংবাদপত্র আর ইন্টারনেটে কেবলই দুটো প্রধান রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি দেখবেন। এমনটা কি শুধু আমাদের মতন দেশেই হয়? মোটেই না! বছরখানেক আগে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন শুধু দুটি দলই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এমনটা সত্যি পৃথিবীর আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশের বেলাতেও। এমন না সেসব দেশে আর কোন রাজনৈতিক দল নেই।

অবশ্যই আরও ছোট অনেক রাজনৈতিক দল সেসব দেশে আছে, যেমনটা আমাদের দেশেও আছে। দীর্ঘদিন ধরেই ছিল এসব দল। বরং একটা সময় হয়ত জনসমর্থনে যথেষ্ট এগিয়েও ছিল এসব দল। কালের বিবর্তনে এখন আর আগের মতন গুরুত্ব বহন করে না। তাহলে কী করে বাংলাদেশসহ আরও অন্যান্য দেশে প্রধান রাজনৈতিক দলের সংখ্যা দুই হয়ে যায়, এমন কৌতুহল কখনো হয়েছে? আপনার এমন কৌতুহল হোক, আর নাই হোক উত্তরটা দিচ্ছি!

ধরুন কোন এক বনে সিংহ পরিবারের রাজত্বে দীর্ঘদিন ধরে সব প্রাণী সুখে শান্তিতে বসবাস করত। তবে বনের বাসিন্দারা এখন আর আগের মতো অতটা স্বস্তিতে নেই। কয়েকদিন পরপরই নানারকম জটিলতা দেখা দিচ্ছে, আগের সেই সুখ-শান্তির দিন কেমন যেন হারিয়ে যাচ্ছে। ঐ অবস্থায় এসে সিংহ পরিবার সিদ্ধান্ত নিল যে, পার্লামেন্ট ডেমোক্রেসি প্রবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। কিছু নির্বাহী ক্ষমতা রাণী সিংহীর কাছে রেখে বাকি প্রশাসন এবং আইন ও বিচার বিভাগের দায়িত্ব চলে যাবে পার্লামেন্টের কাছে। এখন এর জন্য তো একজন সরকার প্রধান অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করতে হবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। পুরো বনেই সাজ সাজ রব পড়ে গেল নির্বাচন নিয়ে। পুরো অঞ্চলের সব পশুপাখিরা খুবই উত্তেজিত এই নির্বাচন নিয়ে, তাদের বনের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচন বলে কথা। তারাও এখন দুনিয়ার অন্যান্য দেশের মতন আধুনিক হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্যে রাণী প্রথমেই সব পশুপাখিকেই প্রার্থী দিতে বলল। কিন্তু সব পশুপাখির তো প্রচার প্রচারণার অত ক্ষমতা নেই, অনেকে আবার অন্যান্য জটিলতায় রাজনীতিতে আসতে খুব একটা আগ্রহীও না। তো দিনশেষে দেখা গেল, সাতজন প্রার্থী তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দলের ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী হবার জন্যে লড়বে। বানর, গরিলা, কচ্ছপ, পেঁচা, নেকড়ে, বাঘ এবং সাপ, এই সাতের মধ্যে যুদ্ধটা।

কিন্তু নির্বাচনটা হবে কী উপায়ে? রাণীর উপদেষ্টা দেখালেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে পদ্ধতিতে নির্বাচন হয় সেসব। এর মধ্য থেকে রাণীর দেখলেন ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা থেকে শুরু করে ভারত আর বাংলাদেশেও একটা নিয়মে নির্বাচন হয়, তার সেই “ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট” সিস্টেমটাই পছন্দ হল। এই নিয়মে নির্বাচন শেষে যে একজন সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে সেই শুধুমাত্র বিজয়ী হবে এবং সরকার গঠন করবে। নিঃসন্দেহে খুবই ভালো একটা পদ্ধতি বলে মনে হয়েছে রাণীর, সাথে আমাদেরও। কিন্তু যতটা ভালো মনে হচ্ছে, পুরো বিষয়টা মোটেই এতো ভালো না।

তো নির্বাচনের দিন আসল। চারিদিকে উৎসবের আমেজ, যেন নববর্ষ। রাণী সেদিন পুরো বনে ছুটি ঘোষণা করল, তার আহ্বানে বনের সব পশুপাখি তাদের জীবনের প্রথম ভোটটি দিয়ে আসল। সারাদিন ভোট গ্রহণ শেষে, রাণী টিভিতে ভাষণ দিলেন। সব পশুপাখিকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য ধন্যবাদ দিলেন। এবার ফলাফল প্রকাশের পালা।

দেখা গেল সবচেয়ে বেশি ২০% ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে নেকড়ে প্রার্থী। গরিলা, বানর, বাঘ, পেঁচা, কচ্ছপ আর সাপ এরপর পর্যায়ক্রমে ভোট পেয়েছে ১৯%, ১৮%, ১৩%, ৯% এবং ৬%। রাণী ফলাফলে সন্তুষ্ট, নেকড়েকে নিয়োগ দিলেন সরকার প্রধান হিসেবে। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ নেকড়ের শাসন শুরু হল।

কিন্তু রাণী সন্তুষ্ট হলেও বনের অন্যান্যপ্রাণী কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারল তারা আসলে একটা ফাঁকির ভেতর আছে। নেকড়ে ২০% ভোট নিয়ে ক্ষমতায় চলে গেলেও, বনে বাকি ৮০% পশুপাখি চায় না নেকড়ে ক্ষমতায় যাক। তারা কিন্তু অনান্য প্রার্থীদের ভোট দিয়েছিল। তাও তো মাত্র ৭ জন প্রার্থী দাঁড়িয়েছিল বলে! যদি ২০ জনের মতো প্রার্থী দাঁড়াত, তাহলে হয়ত নেকড়ে আরও কম শতকরা ভোট নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হত। আপনিও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এই পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত প্রাধান্যই পাচ্ছে না। কিন্তু সত্যি বলতে এই সিস্টেমের ঝামেলার এ কেবল শুরু!

দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থা চলতে থাকলে আরও একটা সমস্যা দেখা দেয়। সেটা হচ্ছে উপরে যা বলছিলাম “টু পার্টি সিস্টেম”। কীভাবে এমনটা হয় সেটা দেখতে হলে আমাদের আরও কয়েক দফা ঐ জঙ্গলের নির্বাচন খেয়াল করা উচিত।

আরও চার বা পাঁচ বছর পর নির্বাচনের সময় আসল আবার! বনের সবার গত নির্বাচনের ফল মনে আছে। কচ্ছপ আর সাপকে যারা ভোট দিয়েছিল তারা বুঝতে পারছিল যে নতুন করে এদের ভোট দিয়ে তেমন কোন লাভ হবে না। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিল অন্য কাউকে ভোট দেয়ার। কচ্ছপ ভোটাররা চিন্তা করল তাদের ৯% ভোট দিয়ে কাকে জেতালে তাদের সুবিধা হয়। তারা হিংস্র নেকড়েকে পছন্দ করে না, আর গরিলাকে খুব বেশি পছন্দ না করলেও গরিলা নিয়ে তাদের তেমন কোন আপত্তি নেই। আর সাপের ভোটাররা প্রথমে তাদের মতনই হিংস্র বাঘকে ভোট দিতে চাইল। কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালে নেকড়ে অনেক প্রপাগান্ডা চালায় তাদের কাছাকাছি মানসিকতার প্রার্থী বাঘ নিয়ে। তাতে বিভ্রান্ত হয়ে শেষে সাপের সব ভোট যেয়ে পড়ল নেকড়ের ব্যালটে।

ফলাফলে দেখা গেল, নেকড়ে এবার ২৬% ভোট নিয়ে দ্বিতীয় হয়ে গেছে আর কচ্ছপের সব ভোট নিয়ে গরিলা পেয়েছে ২৮% ভোট! বানর, বাঘ আর পেঁচা সেই আগের মতোই ১৮%, ১৫% এবং ১৩% ভোট নিয়ে আছে। এই মেয়াদে পার্লামেন্টে বসল গরিলা। সাপ আর কচ্ছপ ভোটের ময়দান থেকে হারিয়েই গেল।

এরপর আবার যখন তৃতীয় দফা সেই বনে নতুন নির্বাচনের সময় আসল, তখন পেঁচার সমর্থকরা সবাই গতবারের নির্বাচনের কথা মনে করল। তারা ভেবে দেখল যে, তাদের ক্ষমতায় যাবার আর কোন সম্ভাবনা নেই। তাই পেঁচা ভোটাররা বিকল্প চিন্তা শুরু করল। তারা গত নির্বাচনের সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া গরিলা আর নেকড়ের মধ্যে কাকে এইবার ভোট দিবে সেটা নিয়ে ভাবতে লাগল।

নির্বাচনি প্রচারণায় উভয় গরিলা আর নেকড়ে উভয়ই পেঁচার ভোটারদের নিজেদের করে নেয়ার জন্যে বিপক্ষের নামে নেগেটিভ ক্যাম্পেইন করতে লাগল। যেহেতু পেঁচার সাথে গরিলা কিংবা নেকড়ে কারোই কোন সরাসরি শত্রুতা বা বন্ধুত্ব নেই তাই এইসব নেগেটিভ ক্যাম্পেইনের ফাঁদে পড়ে পেঁচার ভোট দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। বড় অংশটা ভোট দিল নেকড়েকে, ছোট অংশটা ভোট দিল গরিলাকে।

ফলে এই নির্বাচন শেষে নেকড়ে ৩৪% ভোট নিয়ে আবার ক্ষমতায় চলে আসল, আর একটু পিছিয়ে থাকা গরিলা ৩৩% ভোট নিয়ে প্রধান বিরোধীদল। বানর আর বাঘ আগের মতোই ১৮% আর ১৫% ভোটারের ভোট নিয়েই তৃতীয় আর চতুর্থ হল। কচ্ছপ আর সাপের পর রাজনীতির মাঠ থেকে পেঁচাও নিজেদের সরিয়ে নিল।

আরও কয়েক বছর পর নতুন আরেকটা নির্বাচনের সময় এসে পড়ল। এবারের নির্বাচনে পিছিয়ে থাকা বাঘ আর বানর ভোটাররাই জয়ী বিজয়ীর পার্থক্য গড়ে দেবে, এমনটাই দেশ বিদেশী সকল পর্যবেক্ষক বলাবলি করছে।

বানর ভোটাররা গরিলাকে খুব একটা পছন্দ না করলেও তারা নেকড়েকে একেবারেই পছন্দ করে না। আবার বাঘের জন্যে নেকড়ে জয়ী হওয়াটাই অপেক্ষাকৃত স্বাচ্ছন্দ্যের। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই নির্বাচনে সব বানরের ভোট গেল গরিলার ব্যালটে আর সব বাঘের ভোট গেল নেকড়ের ব্যালটে। ফলাফল ৫১-৪৯ এ গরিলা নেকড়েকে হারিয়ে দিল।

এরপর থেকে কোন নির্বাচনে হয়ত নেকড়ে জিতে যায় আবার কোনবার গরিলা। এই দুই দলের মধ্যেই ক্ষমতার অদল বদল হতে থাকে। এভাবেই জঙ্গলটায় কেবল দুইটা প্রধান রাজনৈতিক দল থেকে যায়, যারা পালা করে ক্ষমতায় যায়। এমনটা এই কারণে হচ্ছে না যে জঙ্গলের সব পশুপাখি এমনটা চায়… কিন্তু ম্যাথমেটিক্স বলে যে, “ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট” সিস্টেম সবসময়ই “টু পার্টি সিস্টেম” এ এসে শেষ হতে হয়।

তবে এইরকম সময়ে এসে হয়ত জঙ্গলের অনেক পশুপাখি মনে করা শুরু করল, তৃতীয় কোন দলকে ভোট দিয়ে আবার ক্ষমতায় নিয়ে এসে এই সিস্টেম বদলে দেয়া যায়। কিন্তু সত্যিতে এটাই “ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সিস্টেম” এর সবচাইতে বিচ্ছিরি পরিণতির সৃষ্টি করে। স্পয়লার ইফেক্ট!
ভয় পাবেন না, কোন সিনেমা বা কোন টিভি সিরিজের সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত পর্বের স্পয়লার বলে দিচ্ছি না। এখন যে ঘটনার ব্যাখ্যা করব সেই অবস্থাকে ইংরেজীতে “স্পয়লার ইফেক্ট” বলে।

ধরুন, বছরের পর বছর ধরে গরিলা আর নেকড়ে অদল বদল করে শাসন করে চলল। এরপর কোন একসময় বাঘের মনে হল, তার একসময় মোটামুটি ভালো জনসমর্থন ছিল। এইবার সে আবার নির্বাচনে অংশ নিতে চায়, সবকিছু বদলে দিতে চায়। তারা অনেক টাকা পয়সা খরচ করে পুরোদমে ক্যাম্পেইন করতে লাগল।

ভোটের দিন এসে চলে গেল এবং ফলাফলে দেখা গেল বাঘ পেয়েছে ১৫% এর মতো ভোট আর গরিলা ঠিকই প্রায় ৫০% এর মতো ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছে। অন্যদিকে নেকড়ে ৩৫% এর মতন ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়ে গেছে। মনে আছে নিশ্চয়ই, অনেক আগে একটা সময় বাঘ সমর্থক সবাই নেকড়ের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। এই নির্বাচনে বাঘ যাদের ভোট পেয়েছে, তারা কিন্তু নেকড়ের সমর্থনে চলে যাওয়া সে ১৫% ভোটার! গরিলা আর বাঘের তেমন কোন কমন সমর্থক না থাকায় গরিলা তেমন কোন ভোটার হারায়নি।

তবে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হুট করে এতদিন পর বাঘ এতো টাকা পয়সা খরচ করে ক্যাম্পেইন করল কীভাবে? বাঘ নির্বাচনে আসায় যাদের সবচাইতে বড় লাভ হয়েছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে সেই গরিলা পার্টির কিন্তু টাকার কোন অভাব নেই। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, বাঘের দল টাকাটা কার কাছ থেকে পেয়েছিল!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close