টেকি দুনিয়ার টুকিটাকি

অল্প দামে এত কিছু!

ক্রেতাদের হাতে অল্প বাজেটে ভালো কনফিগারেশনের স্মার্টফোন তুলে দেয়ার ব্যাপারে চীনা মোবাইল ব্র‍্যান্ড শাওমির বেশ সুনাম আছে। ফ্ল্যাগশিপ কিলার হিসেবেও ইতিপূর্বে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছিল শাওমি। তারই ধারাবাহিকতায় মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারী এই প্রতিষ্ঠানটি এবার নিয়ে এসেছে নতুন একটি স্মার্টফোন, যেটার নাম দেয়া হয়েছে পোকোফোন এফ-ওয়ান বা পোকো এফ-ওয়ান। চারদিকে এখন পোকোফোনের জয়জয়কার, মোবাইল দুনিয়ায় ভালো সাড়া ফেলে দিয়েছে তিনশো ডলার দামের এই স্মার্টফোনটি।

একটা স্মার্টফোন কেনার সময় একজন ক্রেতা কি চান? ভালো পারফরম্যান্স, সুন্দর বিল্ড কোয়ালিটি, ক্যামেরায় দারুণ ছবি তোলা যাবে আর ব্যাটারী ব্যাকাপ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না- এই তো? কিন্ত এগুলোর সবকিছু একটা ফোনের মধ্যেই পেতে চাইলে পছন্দের ফোনটা খুঁজতে গিয়ে মোটামুটি মাথা খারাপের জোগাড় হয়। এই ফোনের এটা ভালো তো আরেক ফোনের অন্যটা, একটা ফোনের মোটামুটি সবকিছু ভালো লাগার পরে দেখা যায় সেটার হয়তো ক্যামেরা পারফরম্যান্স সুবিধার নয়, নইলে ব্যাটারি ব্যাকাপ কম… আর বাজেটের একটা ব্যাপার তো থাকেই। কিন্ত চাহিদার সবটুকু যদি একটা ফোনেই পাওয়া যায়, কেমন হবে তখন? আর সেই মোবাইলের দাম যদি হয় হাতের নাগালে, তখন তো আকাশের চাঁদ হাতে পাবার মতোই একটা ব্যাপার ঘটবে! 

পোকোফোন এফ ওয়ান, শাওমি, স্মার্টফোন, স্ন্যাপড্রাগন

শাওমির নতুন রিলিজ হওয়া এই পোকোফোন এফ-ওয়ান এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটাই ঘটিয়ে ফেলেছে! আকর্ষণীয় ডিসপ্লে, স্ন্যাপড্রাগন ৮৪৫ চিপসেটের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, দারুণ ক্যামেরা আর ৪০০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ারের জায়ান্ট ব্যাটারি সমৃদ্ধ এই স্মার্টফোনটি এখন মিড-বাজেট স্মার্টফোনগুলোর মধ্যে চাহিদার শীর্ষে অবস্থান করছে। ইতিমধ্যেই ভারতের বাজারে অফিসিয়ালি বিক্রি শুরু হয়েছে এই মোবাইলটি, বাংলাদেশেও অফিসিয়ালি এটি রিলিজ পাবে বলে জানিয়েছে শাওমি কর্তৃপক্ষ। তবে ইতিমধ্যেই আনঅফিসিয়ালি এই মোবাইলটি আমাদের দেশে চলে এসেছে, পাওয়া যাচ্ছে বসুন্ধরা সিটি এবং যমুনা ফিউচার পার্কের বিভিন্ন মোবাইল দোকানে। বর্তমানে এই স্মার্টফোনের ৬/৬৪ ভার্সনটির দাম ২৮-৩০ হাজারের মধ্যে। 

এখন চলুন, এক নজরে দেখে আসা যাক, কি আছে এই স্মার্টফোনটিতে, কেন মানুষের এত আগ্রহ এই পোকোফোনকে নিয়ে!  

পারফরম্যান্স- প্রথমে বিল্ড কোয়ালিটিতে যাওয়া উচিত ছিল, তবে সেখানে আমরা যাবো সবার শেষে। পারফরম্যান্স দিয়েই শুরু করি। পারফরম্যান্সে শাওমি খুব একটা ছাড় দেয় না কখনোই। পোকোফোন এফ-ওয়ানেও দেয়নি, এই মোবাইলে প্রসেসর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে স্ন্যাপড্রাগনের চিপসেট, আর গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট হিসেবে আছে অ্যাড্রেনো ৬৩০ জিপিইউ। টেকনিক্যাল টার্মগুলো বুঝতে যাদের সমস্যা হচ্ছে, তারা জেনে রাখুন, বাজারের সেরা পারফরম্যান্স সমৃদ্ধ প্রসেসর আর জিপিইউ ঠেসে দেয়া হয়েছে এই স্মার্টফোনের ভেতরে। মাত্র ত্রিশ হাজার টাকায় এই পারফরম্যান্সের স্মার্টফোন বাজারে পাওয়া যাবে, এটা মাসদুয়েক আগে বললে কেউ বিশ্বাসই করতো না হয়তো! 

তিনটি ভার্সনে বাজারে এসেছে পোকোফোন এফ-ওয়ান। বেজ ভ্যারিয়েন্টটি ৬ গিগাবাইট র‍্যাম এবং ৬৪ গিগাবাইট স্টোরেজসমৃদ্ধ। এছাড়াও ৬/১২৮ এবং ৮/২৫৬ গিগাবাইটের আরও দু’টি ভার্সন রিলিজ পেয়েছে পোকোফোনের। রেগুলার ইউজে ল্যাগিঙ এর দেখা পাবার কোন সম্ভাবনাই নেই, হেভি গেমিং করতে পারবেন অনায়াসে। দরকারী সব সেন্সরও দেয়া হয়েছে, তবে নেই এনএফসি। মোবাইলের পেছনের অংশে থাকা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরটি যথেষ্ট ফার্স্ট এবং অ্যাকুরেট। অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে দেয়া হয়েছে অ্যান্ড্রয়েড ওরিও, আর ইউজার ইন্টারফেস হিসেবে থাকছে শাওমির চিরচেনা MIUI এর ৯.৬ ভার্সন। জানা গেছে, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অ্যান্ড্রয়েড পাই-এর আপডেট চলে আসবে এই স্মার্টফোনে।

ডিসপ্লে- পোকোফোন এফ-ওয়ানে দেয়া হয়েছে ৬.১৮” আইপিএস এলসিডি ফুল এইচডি প্লাস ডিসপ্লে। নচযুক্ত এই ডিসপ্লেটি যথেষ্ট ভাইব্রেন্ট এবং কালারফুল। একদম ওপরের দিকে আছে ফ্রন্ট ক্যামেরা এবং ইনফ্রারেড সেন্সর, স্ক্রিন রেশিও ১৮.৭:৯। ডিসপ্লের পিক্সেল ডেনসিটি ৪০৩ পিপিআই। প্রোটেকশান হিসেবে ডিসপ্লেতে ব্যবহার করা হয়েছে থার্ড জেনারেশনের কর্নিং গরিলা গ্লাস। 

পোকোফোন এফ ওয়ান, শাওমি, স্মার্টফোন, স্ন্যাপড্রাগন

ক্যামেরা- একটু নড়েচড়ে বসা যাক এবার। স্মার্টফোন কেনার সময় এই একটা সেগমেন্টে লোকের আগ্রহটা থাকে সবচেয়ে বেশি। ক্যামেরা ভালো মানেই স্মার্টফোন ভালো- এমন ধারণায় বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা কিন্ত কম নয়। আর মোবাইল কোম্পানীগুলোও বাজেট স্মার্টফোনের বেলায় পারফরম্যান্স ভালো দিলে ক্যামেরা ভালো দেয় না, ক্যামেরা ভালো দিলে পারফরম্যান্স হয় মিডিওকার। পোকো এফ-ওয়ান সেই চিরচেনা ধারাটাও খানিকটা বদলে দিয়েছে। না, এই স্মার্টফোনের ক্যামেরা স্যামসাং বা আইফোনের ফ্ল্যাগশিপগুলোর সঙ্গে তুলনা করার মতো কিছু নয়, তবে ৩০০০০ টাকা প্রাইসট্যাগ হিসেবে তুলনা করলে এই মোবাইলের ক্যামেরাকে যথেষ্টই ভালো বলতে হবে।

পোকোফোনের রিয়ারে আছে ডুয়াল ক্যামেরা সেটআপ। এরমধ্যে প্রাইমারী সেন্সর হিসেবে আছে সনি’র আইএমএক্স-৩৬৩ সিরিজের বারো মেগাপিক্সেলের একটি সেন্সর, সেটার অ্যাপারচার f/1.9, অন্যটি ৫ মেগাপিক্সেলের f/2.0 অ্যাপারচার যুক্ত ডেপথ সেন্সর। প্রাইমারী সেন্সরের ইমেজ সাইজ ১.৪ মাইক্রন হওয়ার ফলে ছবির শার্পনেস যথেষ্ট ভালো আসে। পোকোফোন এফ-ওয়ানের ডে-লাইট ফটোগ্রাফি দুর্দান্ত, ছবির ডিটেইল এবং শার্পনেস যথেষ্ট ভালো। পোট্রেইট মুডে তোলা ছবিগুলোও যথেষ্ট অ্যাকুরেট আসে, পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ড ঠিকঠাকভাবে ব্লার করতে পারে। রিয়ার ক্যামেরায় আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নামে আলাদা একটা মুডও আছে। 

পোকোফোন এফ ওয়ান, শাওমি, স্মার্টফোন, স্ন্যাপড্রাগন

ফ্রন্ট ক্যামেরা হিসেবে আছে বিশ মেগাপিক্সেলের f/2.0 অ্যাপারচার যুক্ত একটি সেন্সর। সেলফি নিয়ে কারো কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। ইনফ্রারেড প্রযুক্তির সাহায্যে অন্ধকারেও  নিখুঁতভাবে ফেইস আনলক করতে পারে পোকোফোন। রিয়ার ক্যামে লো-লাইট ফটোগ্রাফিতে সামান্য নয়েজ এবং গ্রেইনের দেখা মিলবে, শার্পনেস এবং ডিটেইলও কম দেখাবে। এছাড়া রাতের বেলায় ক্যামেরার শাটার স্পিডও খানিকটা কমে যায় দিনের চেয়ে। এছাড়া রিয়ার ক্যামেরা দিয়ে 4K রেজুলেশানের ভিডিও করা যাবে, তবে সেক্ষেত্রে ইমেজ স্টেবিলাইজেশন কাজ করবে না। ফুল এইচডি ভিডিও’র ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক ইমেজ স্টেবিলাইজর কাজ করবে, ফলে ভিডিও ধারণের সময় নড়াচড়া নিয়ে খুব একটা ভাবতে হবে না। 

পোকোফোন এফ ওয়ান, শাওমি, স্মার্টফোন, স্ন্যাপড্রাগন

ব্যাটারি- স্ন্যাপড্রাগন ৮৪৫ হচ্ছে এই মূহুর্তে সবচেয়ে শক্তিশালী মোবাইল চিপসেট, সেটার সঙ্গে ৪০০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ারের ব্যাটারি মানে একবার ফুলচার্জে ন্যুন্যতম দেড়দিনের ব্যাটারি ব্যাকআপ নিশ্চিত। ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন ছাড়া এই প্রসেসর ব্যবহার করা হয় না। ডিজাইন স্লিম রাখার জন্যে ব্যাটারি ব্যাকআপও ৩০০০-৩৫০০ এর মধ্যেই রাখা হয়। কিন্ত পোকো এফ-ওয়ান যেহেতু ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন নয়, সেকারণেই ডিজাইন স্লিম রাখার বাধ্যবাধকতাও ছিল না নির্মাতাদের। একারণেই ১০ ন্যানোমিটারের এই চিপসেটের সঙ্গে জায়ান্ট ব্যাটারি ব্যাকআপের এই দুর্দান্ত কম্বিনেশনের দেখা মিলেছে।

একবার ফুলচার্জ দিলে দেড় থেকে দুইদিন ব্যাকআপ পাবেন অনায়াসে। স্ক্রীন অনটাইম পাওয়া যাবে নয়ঘন্টার বেশি। আছে ফার্স্ট চার্জিঙের ব্যবস্থা, মোবাইলের সঙ্গে দেয়া ফার্স্ট চার্জার দিয়ে ১:৪৫ ঘন্টায় ফুল চার্জ দেয়া সম্ভব। হিটিং ইস্যুর দেখাও খুব একটা পাওয়া যাবে না। হেভি গেমিং করলে ফোন সামান্য গরম হতে পারে, কিন্ত সেটা হাতে লাগার মতো কিছুই নয়। এছাড়া এই মোবাইলে আছে লিকুইড কুলিং টেকনোলজি। শাওমির দাবী, এই টেকনোলজি ফোনকে দ্রুত ঠান্ডা হতে সাহায্য করবে।

বিল্ড কোয়ালিটি- পোকোফোনের এই স্মার্টফোনটিতে মোটামুটি সবকিছুই আছে। কিন্ত কিছু একটা খুঁত না থাকলে কি করে হয়? সেরকমটা ভেবেই শাওমি হয়তো দুর্দান্ত মালমশলাযুক্ত এই ফোনটাকে মুড়ে দিয়েছে প্লাস্টিকের আবরণে। হ্যাঁ, পলিকার্বনেট বলে যে বস্তটাকে ডাকা হচ্ছে, সেটা আদতে মেটালের মতো দেখতে একটু ভালোমানের প্লাস্টিক ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ফোনের এই একটা ব্যাপারই চোখে লাগার মতো। হাতে নিলে প্রিমিয়াম কোন ফিল তো পাওয়া যাবেই না, বরং মনে হবে দশ-বারো হাজার টাকা দামের কোন মোবাইল হাতে নিয়েছেন বুঝি! এখন তো দশ-বারো হাজার বাজেটেও মেটাল বডির স্মার্টফোন পাওয়া যায়! অবশ্য এটা বিজনেস ট্রিক ছাড়া আর কিছুই নয়। এক ফোনের ভেতরে সবকিছু দিয়ে দিলে শাওমিরই অন্যান্য মডেলের ফোনগুলো লোকে কেনই বা কিনবে বলুন? তবে যারা প্রিমিয়াম লুক চান, তাদের জন্যে পোকোফোনের ৮/২৫৬ গিগাবাইট ভার্সনের একটি আর্মার্ড এডিশন বাজারে এনেছে শাওমি। সেটার দামও একটু বেশিই পড়বে। 

পোকোফোন এফ ওয়ান, শাওমি, স্মার্টফোন, স্ন্যাপড্রাগন

বাজারে এখন শাওমির মি-৮ বা ওয়ানপ্লাস সিক্সের সাথে ভালোই টক্কর দিচ্ছে পোকোফোন এফ-ওয়ান। ইন্ডিয়াতে অনলাইন স্টোর ফ্লিপকার্টে রিলিজ হয়েছিল এই স্মার্টফোনটি, দুপুর বারোটায় বিক্রি শুরু হবার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে প্রথম রিটেইলে থাকা পাঁচ লক্ষ স্মার্টফোন! বিল্ড কোয়ালিটি ছাড়া মোটামুটি সব স্পেসিফিকেশনেই মি-৮ বা ওয়ানপ্লাস সিক্সের মতো ফ্ল্যাগশিপ ডিভাইসের সাথে টক্কর দেয়ার ক্ষমতা রাখে পোকোফোন এফ-ওয়ান, আর এটার দামও অন্য দুটো মোবাইলের চেয়ে প্রায় দশ-পনেরো হাজার টাকা কম। আমরা মধ্যবিত্ত লোকজন মোবাইল কিনতে গেলে সাধ্যের মধ্যে সেরাটা খুঁজি সবসময়, পোকোফোন এফ-ওয়ান সেই সাধ্যের মধ্যে সবটুকু সুখ নাগালের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে বলেই হয়তো এটার এত চাহিদা!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close