খেলা ও ধুলা

উপমহাদেশীয় আবেগ বনাম প্রফেশনালিজম: একটি পাইপলাইনের আক্ষেপ!

মোশারফ জিটু:

এখনো মনে আছে ১৯৯৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপেই প্রথম ভালোভাবে খেলা দেখা শুরু করি। শচীন টেন্ডুলকার আর ব্রায়ান লারা তখন ক্রিকেটের বড় দুই নক্ষত্র। পরে যদিও লারার ক্রেজটা ধীরে ধীরে কমে যায়, কিন্তু টেন্ডুলকারের জনপ্রিয়তা আকাশ-ছুঁয়ে যায়। ওই বিশ্বকাপের মাঝপথেই ইংল্যান্ড থেকে টেন্ডুলকার ভারত ফিরলেন তার বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে। শেষকৃত্য সম্পন্ন করে আবার কেনিয়ার সাথে ম্যাচের আগেই ইংল্যান্ড ফিরলেন। ব্যাট করতে নেমে সেঞ্চুরী, আকাশের দিকে তাকিয়ে পিতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে উদযাপন – মনে দাগ কেটে রাখার মতো ঘটনা।

সোজা বাংলায় এ ঘটনা দু’ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

এক. উপমহাদেশীয় আবেগী দৃষ্টিভঙ্গিতে মহান কাজ করেছেন শচীন। পরিবারকে সময় দেয়ার চেয়ে দেশকে বড় করে দেখেছেন। ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়েছেন।

দুই. প্রোফেশনাল দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন (মানে ইউরোপীয় কিংবা অষ্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদেরও দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি দেখেন), তবে পরিবারকে সময় দেওয়া উচিত ছিল।

ক্রিকেটার না হয়ে ডেস্ক জব করলে সম্ভবত শচীনও দ্বিতীয় কাজটিই করতেন। অষ্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের প্লেয়ার হলেও দ্বিতীয় কাজটিই করতো, তারা অন্য সব ডেস্ক জবের মতোই খেলাকে তাদের শুধুমাত্র প্রফেশনের মতোই ট্রিট করে। তাই দেখবেন অতিমাত্রায় ইঞ্জুরিপ্রবণ হলে কিংবা বয়সের সাথে শরীর কুলিয়ে না পারলে বা খেলাটা উপভোগ না করলে ত্রিশের কোটায় এসেই খেলা ছেড়ে দেয় তারা।

নিঃসন্দেহে শচীন বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন। ক্রিকেটের অনেক রেকর্ড এখনো অবসরের পরও তার। ভারতবর্ষে তার এমন অবদানের জন্য মানুষজন ক্রিকেট-ইশ্বর হিসেবেই ট্রিট করে তাকে। একটা সময় পর্যন্ত ভারতীয় দলে তার বিকল্প হিসেবে কাউকে ভাবাই যেতো না, শেষের কয়েক বছর কোহলি-রায়না কিংবা রোহিত শর্মাদের উত্থানের পর বেছে বেছে ম্যাচ ও সিরিজ খেলতো শচীন। হয়তো এভাবে ক্যারিয়ারটা কিছুটা দীর্ঘায়িত করতে সুবিধা হয়েছে। ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করার ব্যাপারে পরে লিখছি।

ইংলিশ-অষ্ট্রেলিয়ান এমনকি নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা ত্রিশের কোটায় এসে ক্রিকেট ছেড়ে দেয়ার কারণ তাদের শুধু প্রফেশনালিজমই না, বরং আরো কিছু ফ্যাক্টর কাজ করে। একটি হলো, যত ভালো প্লেয়ারই হোক তার বিকল্প দ্রুতই তৈরী হয়ে যায়। কারো জায়গাই চিরস্থায়ী নয়। তাই, বল টেম্পারিংয়ের জন্য স্মিথ-ওয়ার্নারদের শাস্তি দিয়ে বাদ দিতে দু’বার ভাবতে হয়নি তাদের। আরেকটি বড় কারণ হলো তাদের ক্রিকেট অবকাঠামো এতই শক্ত ও মানসম্মত যে দ্রুত পাইপলাইনের প্লেয়াররা এসে হাল ধরতে পারে। গত ওডিআই ওর্য়াল্ডকাপে ভরাডুবির পর প্রায় পুরো ইংলিশ টিমই পাল্টে ফেলেছে। ফলাফল তারা এখন ওডিআইতে বেশ শক্তিশালী টিম।

ভারত আশির দশকে বিশ্বকাপ জিতেছে, গাভাস্কার-কপিল দেবের মতো প্লেয়ার পেয়েছে কিন্তু নব্বইয়ের দশকে তাদের পাইপলাইন অত শক্ত হয়তো ছিলো না যে দ্রাবিড়, গাঙ্গুলী, শচীনদের বাদ দিয়ে দ্রুত কাউকে তাদের জায়গায় বসাবে। গ্রেগ চ্যাপেল হয়তো গাঙ্গুলীদের বাদ দিয়ে ভিলেন হয়েছে, তবে ইন্ডিয়ান ক্রিকেটে পূজনীয় প্লেয়ারদের বাদ দিয়ে সাহসও দেখিয়েছে। আবেগের বাইরে এসে প্রফেশনাল হয়ে টিমে বুড়োদের জায়গা নড়বড়ে করতে তার ভূমিকা বেশ জোরালো ছিলো।

গাঙ্গুলীদের ব্যাচ ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের ভিত বেশ শক্ত করে দিয়েছে, তারপর ধোনী এসে প্রফেশনালি হ্যান্ডেল করেছে। এখন কোহলিরা বিশ্রামের জন্য বিভিন্ন সিরিজেই খেলে না, তাতে তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু ওঠে না। আজ থেকে বিশ বছর আগে স্বয়ং শচীনও যদি কোহলির মতো বিশ্রাম চাইতো, তবে তার দেশপ্রেম নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তো উঠতোই, সাথে তার জনপ্রিয়তা ঠিক কতটা নিচে নামতো তা বুঝতে জটিল হিসেব-নিকেশ করতে হতো না! ভারতের মতো আবেগী ক্রিকেট জাতিও যে এখন এসব ব্যাপার মেনে নেয়, তার প্রধান কারণ তাদের শক্ত পাইপলাইন। কোহলির মতো দলের সেরা প্লেয়ার না খেললেও এশিয়া কাপে তারা খুব বড় সমস্যায় পড়তে হয়নি। অথচ শচীনের সাথে প্রায় সমান তালে পাল্লা দিয়ে রান তোলা পন্টিংরা যখন অবসরে চলে গেছে শচীন তখনও খেলে যাচ্ছিলেন, হয়তো দলে তখনো তার বিকল্প কাউকে ভাবতে ভয় পাচ্ছিল টিম ম্যানেজমেন্ট।

গ্যারি সোবার্স, ক্লাইভ লয়েড, মাইকেল হোল্ডিং, গর্ডন গ্রিনিজ, ওয়ালশ, অ্যামব্রোস বা লারাদের পরবর্তী প্রজন্মগুলো শুধু শক্ত পাইপলাইনের অভাবে, দূরদৃষ্টিহীন ক্রিকেট ম্যানেজমেন্টের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে!

শ্রীলংকান ক্রিকেটের স্বর্ণযুগ এসেছে রানাতুঙ্গার হাত ধরে। জয়সুরিয়া-ডি সিলভারা ছিলো তার দলের সম্মুখযোদ্ধা। রানাতুঙ্গা নিজে কি খুব আহামরি খেলতো? আমি খুব বেশি ম্যাচ দেখিনি, খুব সাদামাটা মনে হয়েছে। তবে নেতৃত্বগুণ দিয়ে দলকে অনেকদূর নিতে সাহায্য করেছে। তারপর ভাস-মুরালিধরণ আর তারপর সাঙ্গাকারা-জয়বর্ধনেদের ব্যাচ শেষে এখন হাবুডুবু খাচ্ছে। তাদের ক্রিকেটে অনিয়ম নিয়ে প্রায়ই সংবাদ হচ্ছে। এখন মিডিয়ায় শ্রীলংকার ক্রিকেটের সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমালোচক সেই স্বর্ণযুগের নেতা রানাতুঙ্গাই!

বাংলাদেশের ক্রিকেটেও ট্রানজিশন পিরিয়ড ঘনিয়ে এসেছে। স্পষ্টতই আগামী বিশ্বকাপের পরই পালাবদল শুরু হবে। ২০২৩-২৪ এর পর হয়তো বর্তমান সিনিয়রদের কাউকেই দেখা যাবে না। আমরা কতটা প্রস্তুত?

বলছিলাম শচীনের দীর্ঘায়িত ক্যারিয়ারের কথা। আমাদের ক্রিকেটে সাকিব, মুশফিকদের ইনজুরি নিয়ে খেলার প্রবণতাটা তাদের ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করতে সহায়ক হচ্ছে কি? মাঠে নেমে তামিম এক হাতে খেলে বীর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, সাধুবাদ অবশ্যই প্রাপ্য। কিন্তু হাতে চোট নিয়ে এশিয়া কাপে যাওয়ার কি প্রয়োজন ছিল? সব প্রশ্নের একই উত্তর ঘুরে ফিরে আসবে যে বিকল্প নেই তাই তাদের বাধ্য হয়েই যেতে হচ্ছে। পাইপলাইনের প্লেয়ার নেই, যারা হাল ধরবে। কিন্তু আমাদের ক্রিকেট, ক্রিকেট বোর্ড কতটা প্রফেশনাল? শ্রীলংকার মতো থাকবে, নাকি ভারতের মতো হবে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় বোধহয় এখনই!

এ কথার জন্য হয়তো অনেকেই রাগান্বিত হবেন, তবু বলি। মাশরাফির মতো চোট জর্জরিত হয়ে কতজন প্লেয়ার খেলে যাচ্ছে? ফাস্ট বোলাররা এমন ইনজুরিপ্রবণ হলে দ্রুত অবসর নেয়। মাশরাফি ফাস্ট বোলার থেকে মিডিয়াম ফাস্ট বোলার হয়ে এখনো খেলে যাচ্ছেন, কিংবা খেলে যেতে হচ্ছে কারণ তার মতো এমন কনসিস্টেন্ট কোন বোলার টিম পায়নি এখন অবধি! অনেকে দেশপ্রেমের কথা বলবেন, তা হয়তো ঠিক। তর্কে যাব না। তবে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে এমন আহত কাউকে নিয়মিত খেলিয়ে যাওয়ার রিস্ক নিতো? নাকি এমন বোলার বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতো?

এশিয়া কাপ, সময়সূচী, মাশরাফি বিন মুর্তজা

একটি অপ্রিয় সত্য কথা হলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জাতীয় সাফল্য অতটাই কম যে, তারা এমনই হীনমনা যে, খেলার সাফল্য দিয়ে অতি-উচ্ছ্বসিত হয়, খেলার মাঝে দেশপ্রেম খোঁজে আর নিজ নিজ জায়গায় সততা বলুন, আর দেশপ্রেম বলুন, সব কিছুতেই ঠনঠন! অলিম্পিকে পদকের তালিকায় উপরের দেশগুলো দেখুন, তাদের সব খেলাই তাদের কাছে জাস্ট এনাদার জব। দেশের সাফল্য আসতে তার জন্য অবকাঠামো লাগবে, সঠিক পরিচর্যা লাগবে। আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশ শুধু মানসিকতার কারণে একটি পদকের জন্য তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকে!

মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের ক্রিকেট টিকে আছে হাওয়ার ওপর। সৃষ্টিকর্তাপ্রদত্ত ট্যালেন্ট ছাড়া প্রকৃতভাবে পরিচর্যা পেয়ে উঠে আসা প্লেয়ার নেই বললেই চলে, যারা কিনা দলের হাল ধরবে! মাশরাফির মতো আর কাউকে চাই না যে ইনজুরির সমূহ সম্ভাবনা নিয়ে দিনের পর দিন খেলে যাবে, মুশফিকের মতো ভাঙ্গা-পাঁজর নিয়ে জোর করে খেলে যাবে। বরং চাই এমন অবস্থা তৈরী হোক যখন সামান্য ইনজুরি নিয়েও কাউকে বাধ্য হয়ে খেলতে নামতে না হয়। গাঙ্গুলী-টেন্ডুলকারদের পর কোহলি-রোহিতদের জেনারেশন যেভাবে উঠে এসেছে, সেভাবেই উঠে আসা উচিত মাশরাফি-সাকিবদের পরবর্তী ব্যাচগুলো থেকে। মানসিকতা পরিবর্তন না হলে এ আধুনিক ক্রিকেটে টিকে থাকাটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close