ইনসাইড বাংলাদেশ

সম্পর্কটা রক্তের নয়, অস্তিত্বের!

একটি সম্পর্কের গল্প বলবো। সম্পর্কটি রক্তের নয়। সম্পর্কটি ক্রোমোসোমেরও নয়। সম্পর্কটি অস্তিত্বের।

রক্তের সম্পর্কবিহীন মানুষগুলো, একটা সময় পর ব্লাডলাইন অতিক্রম করে ফেলে।

একদল মানুষকে অপরিমেয় চাপে রেখে তৈরী করা হয় সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা।

তারা ভাই ভাই… রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই ভাই… একই মায়ের উদরে উত্‍পন্ন না হয়েও তারা ভাই।

তারা সহোদর… কখনো সহোদরের চেয়েও বেশি… তারা ব্যান্ড অব ব্রাদার্স।

এই সম্পর্কের গাঢ়ত্ব ঘনত্ব ও শক্তি কেবল তারাই বুঝতে পারে, যারা এই সম্পর্কে জড়িয়েছে!

একটা সম্পর্ক তো এতো সহজে তৈরী হয় না, একটা সম্পর্কের ভিত তো এতো সহজে গড়ে উঠে না।

সম্পর্কের শুরুটা সাদামাটা …

ঢাকা সেনানিবাসের ISSB (Inter Services Selection Board) তে কিছু ছেলেমেয়ে আসে।

সম্পর্কের শুরুটা হয় ওখানে। ওদেরকে কল আপ করা হয়েছে, কারণ ওরা আগ্রহী। ওরা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে।

স্বপ্ন দেখলেই তো তা আর বাস্তবে ধরা দেয় না… যোগ্যতাও লাগে।

ISSB এই যোগ্যতার খোঁজ করে। ৪দিনের এসিড টেস্টের মাধ্যমে খুঁজে বের করে, লিডারশিপ কোয়ালিটির A টু Z কার কার আছে। অতঃপর ISSB নির্বাচন করে ঐ সকল ক্যান্ডিডেটদের, যাদের আছে সামরিক বাহিনীকে কমান্ড করার যোগ্যতা। ISSB গ্রীনকার্ড দেয় ওদের।

সম্পর্কের শুরুটা হয় ওখানে।

৩দিনের আইকিউ, পার্সোনালিটি, সাইকোলজিকাল, ফিজিক্যাল,মেরিট ও ইন্স্ট্যান্ট রিফ্লেক্সের উপর দেওয়া ক্রমাগত পরীক্ষার চাপ, বাদ পড়ে যাওয়ার দুঃশ্চিন্তা ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রেশারে পিষ্ট হয়ে, যখন ডেপুটি প্রেসিডেন্টের থেকে সবুজ রঙা কাগজটি হলুদ খামে করে নিয়ে বের হয়,আনন্দের অশ্রু আপনা আপনি বের হয়ে যায়।

গ্রুপমেট কিংবা রুমমেটদের মধ্যে সিলেক্টেডদের জড়িয়ে ধরে, এই আনন্দ অশ্রু বিসর্জন— ISSB এর প্রতিটি ৪র্থ দিনের একটি সাধারণ দৃশ্য। গ্রীনকার্ড প্রাপ্তদের ISSB এর মাননীয় প্রেসিডেন্ট স্পিচ দেন,কনগ্রেটজ করেন, বলে দেন পরবর্তী করণীয়।

সম্পর্ক সেদিন বিকেল থেকে কোষ বিভাজন শুরু করে। এরপর দল বেঁধে CMHএ চূড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা। সম্পর্ক এখানে মাইটোসিস মিয়োসিস, সকল বিভাজন সম্পন্ন করে। হাসি ঠাট্টা আনন্দে কেটে যাওয়া CMH এর দিনগুলি ফুরিয়ে যায়। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ক্যান্ডিডেটদের বিএমএতে রিপোর্টিং ডেট জানানো হয়। আদেশ আসে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার।

সেনাবাহিনী, পিলখানা ট্র্যাজেডি, বিডিআর বিদ্রোহ

ঐ সম্পর্কের কোষ বিভাজন করানো ছেলেমেয়েগুলো অনেক সময় একসাথেই বিএমএতে যাওয়ার প্ল্যান বানায়,দুই একজন হয়তো আলাদা।

গন্তব্য ফাইনাল ডেস্টিনেশন একটাই: “বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি”।

চির উন্নত মম শির…

Bangladesh Military Academy: বিশ্বমানের সকল সামরিক একাডেমির মতো, বিএমএতে কেবল গতকালটাই একটা সহজ দিন ছিলো।

আজকেও হার্ড ডে,টুমরো হার্ডার ডে।

সম্পর্ক শুরু করা ছেলে মেয়েগুলোর বিভিন্ন গ্রুপ BMAতে রিপোর্ট করে এবং সেই রাতেই তারা জীবনের এমন এক ভয়াবহ অর্থ বুঝে,যে অর্থ সবার বুঝতে হয় না।

সম্পর্ক এলাবোরেট করে। কোম্পানী টু কোম্পানী সম্পর্কের জাল মজবুত হয়। সম্পর্কটি কোষ বিভাজন করতে করতে একটি শিশুর সাইজে পরিণত হয়। শিশু সম্পর্ক বিএমএর ভয়াবহতায় কেঁদে উঠে, শাউট পাঙ্গা পানিশমেন্টে সে ভীত হয়,BSMএর নামে চিত্‍কার করে। এতো এতো প্রেশারে শিশু চ্যাপ বড় হয়,ভয় পায় না। সম্পর্ক মজবুত হয়।

২৪ঘণ্টার একদিনে দুই চা চামচ ভাত, ২০/২২মিনিটের ঘুম নিয়ে ওরা দাঁড়িয়ে থাকে। ব্রাদারহুডের সূচনা তো ওখানে।

এক জন আরেকজন কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে নেওয়া,৫মিনিট, ১০মিনিট, একটা বিস্কিট ৬/৭জনে মিলে ভাগ করে খাওয়া ব্রাদারহুডের ঘোষণা দেয়।

ব্রাদার্স ফ্রম ডিফরেন্ট মাদার্স – এককথায় বলে ক্যাডেট।

এটা এমন এক অনুভূতি,এমন এক সম্পর্ক- যা লিখে কোন সিভিলিয়ানকে বুঝানো যাবে না, এক টুকরো বিস্কিট ৬জনে মিলে খাওয়ার কী তৃপ্তি!

বিএমএর প্রেশার ও হার্ড শিডিউল এই শিক্ষাটা প্রতিদিন একটু একটু করে দেয়। তোমার ভাইয়ের নেসেসিটি তোমার চেয়ে বড়। ট্রেনিং, কমরেডশিপ, ব্রাদারহুড, ইউনিটি- সৈনিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

সম্পূর্ণ কোর্সশেষ করে, এরা যখন পাস আউট হয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীতে যোগ দেয়, তারা তাদের বিএমএর শিক্ষাকে ভুলে যায় না। পিওপিতে পাস করা সর্বকনিষ্ঠ তরুণ অফিসাররা শপথ নেয়। যোগ দেয় বিভিন্ন ইউনিটে, তাই বলে ভুলে যায় না ভাইদেরকে।

সামরিক চাকুরীর কঠিন অনুশাসন রুলস রেগুলেশনের মাঝে, সুযোগ পেলেই ভাইয়েরা দেখা করা,হ্যাং আউট করা, রেজিমেন্টেশনের গল্প, বিএমএতে ভয় পাওয়া দিনগুলোর গল্প ঘুরেফিরেই আসে।

সামরিক চাকরী এমন একটা চাকরী, যেখানে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে মনে হয়, জীবনের সবচে বড় ভুলটা করেছি ডিফেন্সে এসে, অথচ ইউনিফর্মটা পরার পর বুকটা ফুলে উঠে।

এই তো জীবন BAND OF BROTHERS দের। BROTHER IN ARMS দের সাথে। প্রতিটি কোর্সমেট এখানে সিম্পলি সহোদর ভাইয়ের চেয়েও বেশি। কারণ একটা কোর্সের প্রতিটা ছেলেকে একাডেমিতে একসাথে প্লাস্টার করে ডিফেন্স ওয়াল বানাইয়া ফেলা হয়েছে। এই বন্ধন,সম্পর্কের বন্ধন কী সহজে ছুটানো যায়?

ওরা একসাথে একটি দেহ… যেখানে দেহের যেকোন অংশে ব্যথা পাওয়ার কারণে পুরো শরীরে সে ব্যথা অনুভূত হয়। সহোদর হারানোর ব্যথা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটা অনুমানও করা যায় না।

জেনারেল মেন্ডেলের মতো পৃথিবী বিখ্যাত জেনারেলদের অনেক কোটেশন আছে সৈনিকদের ভাতৃত্ববোধ নিয়ে। যার মূল কথাঃ একজন সৈনিকের চোখে পানি মানায় না।

হ্যা, একজন সৈনিককে কড়াত দিয়ে চিড়ে ফেললেও,সে এক ফোঁটা অশ্রু ফেলবে না। হি ইজ ট্রেইন্ড।

কিন্তু যে ভাইয়ের ঘামে মাখামাখি হয়ে সৈনিক তার ট্রেনিং করলো, যে ভাইয়ের সাথে তার এতো এতো স্মৃতি,এডভেঞ্চার, তাকে চোখের সামনে যখন মেরে ফেলা হলো কাপুরুষের মতো, অথচ কিছুই করতে পারা গেলো না, এই ব্যাথায় চোখে পানি আসাটাই স্বাভাবিক। যার চলে যায়, সে ই তো বুঝে বিচ্ছেদে কী যন্ত্রণা!

২০০৯ সালের ২৫ফেব্রুয়ারীতে শহীদ হওয়া সকল সেনাকর্মকর্তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

সেনাপরিবার আপনাদেরকে কোনদিনো ভুলবে না। সম্পর্কের মায়াজাল ছিন্ন করে কোর্সমেট সিনিয়র, জুনিয়র অফিসার্স, জেসিও এনসিও সোলজারদের কাঁদিয়ে গেছেন আপনারা।

আপনারা থাকবেন যতোদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থাকবে। সেনাবাহিনী কখনো ভুলে যায় না।

রেস্ট ইন পিস অফিসার্স। আল্লাহ আপনাদের এবং সেনাপরিবারের সহায় হোন।

লেখক- আবু সায়ীদ নূর আহমেদ

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close