ফুলন দেবী তার প্রথম স্বামী পুট্টিলালের বাড়িতে গেলেন। এখন তিনি ডাকাত দলের সদস্য। তার সাথে আছে বিরাট ডাকাতের দল। প্রাক্তন স্বামীর গ্রাম আক্রমণ করে ইতিমধ্যে যা যা পেয়েছেন, লুটপাট করেন ফুলন দেবীর ডাকাত দল। অতঃপর পুট্টিলালকে টেনে নিয়ে ঘরের বাইরে নিয়ে আসেন। জনসমক্ষে পুট্টিলালকে শাস্তি দেন ফুলন। তারপর পুট্টিলালকে খচ্চরের পিঠে উল্টা করে বসিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে আসেন। বন্দুক দিয়ে মারাত্মক প্রহার করে জখম করেন পুট্টিলালকে। অর্ধমৃত অবস্থায় পুট্টিলালকে ফেলে চলে গেলেন ফুলন দেবী। 

কিন্তু কেনো এই ফুলন দেবী তার প্রাক্তন স্বামীর উপর নির্মম নির্যাতন চালালেন? কিভাবে এই নারী হলেন দুর্ধর্ষ দস্যুরানী ফুলন দেবী? যদি শুধু গল্পের এই অংশ পড়েই মনে করেন, ডাকাত দলের সদস্য হওয়া ফুলন দেবীকে আপনি একজন উন্মাদ নারী হিসেবেই ভেবে নেন, যদি মনে করেন তিনি তার স্বামীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, তাহলে এই গল্পের পরবর্তী অংশে আপনি পরিচিত হতে যাচ্ছেন ফুলন দেবীর আরেকটি উপাখ্যানের।

*

এক একর জায়গা জুড়ে শুধুই নিম গাছের বাগান। ফুলন দেবীর পিতা ভেবেছিলেন নিমগাছগুলো বিক্রি করে দুই মেয়ের বিয়ে দিবেন। তিনি নিচু জাতের মানুষ। মাল্লা সম্প্রদায়। নৌকা চালানো যার পেশা। নিচু জাতের বলে তাকে বেশ কটাক্ষ পেতে হয় সমাজে। তার উপর জন্ম দিয়ে ফেলেছেন দুই মেয়ে। নিচু জাতের ঘরে মেয়ে জন্মানো মানেই বিশাল হ্যাপা। ঘাড়ের বোঝা। বাড়তি চাপ। মানুষটা তাই নিজের এক একর জমিতে নিম গাছ লাগালেন, গাছগুলো বড় হবে, মেয়েদুটো বড় হবে। তারপর গাছ বিক্রয়ের টাকায় বড় মেয়ে ফুলন আর ছোট মেয়েটার বিয়ে দেবেন। বলা ভাল, জামাই পক্ষকে যৌতুক দেবেন। যেন জামাই করুণা করে ফুলন দেবীকে বিয়ে করবে সেইজন্য কিছু উপঢৌকন দেয়া আর কি!

ফুলন দেবী, দ্যা ব্যানডিট কুইন, দস্যুরানী, গনহত্যাকারী নারী, গনধর্ষণের স্বীকার, প্রতিবাদী নারী

কিন্তু, ফুলন দেবীর পিতার কপাল কিঞ্চিত খারাপ৷ তিনি নিজের জমির নিম গাছের গুণাগুণ কাজে লাগিয়ে মেয়ের বিবাহ দিতে পারলেন না, ভাল জামাই খুঁজে পেলেন না। কারণ, এইসময়ে তিনি পিতৃহারা হলেন এবং তার নিজের আপন বড় ভাই সংসারের সব সম্পত্তির উত্তরাধিকার ঘোষণা করল নিজেকে। ফুলনের পিতা যেন বড় ভাইয়ের এই বিশ্বাসঘাতকতায় তীব্র আঘাত অনুভব করলেন। তখন তার কন্যা ফুলনের বয়স মাত্র ১১।

এইদিকে বড় ভাইয়ের ছেলে মায়াদীন ছিল বেশ বেপরোয়া। সে ফুলনের বাবার জমির নিমগাছগুলো বিক্রি করতে শুরু করে দিলো। ফুলন দেবী রীতিমতো হতবাক। মায়াদীনের এতো সাহস হয় কি করে যে সে তাদের জমির নিমগাছ নির্বিচারে কেটে কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে! ফুলন দেবী প্রতিবাদ করলেন, তিনি মায়াদীনকে সবার সামনে বললেন, তুমি একটা চোর, তুমি একটা চোর।

মায়াদীন এই অপমান নিতে পারল না। সে ঠিক করল, ফুলনের বিয়ে সে নিজেই দিবে। সে খুঁজে টুজে বের করল ফুলনের চেয়ে তিনগুণ বেশি বয়স্ক এমন একজন লোভী লোলুপ পুরুষকে। তার সাথে বিয়ে ঠিক হলো ফুলনের, লোকটার নাম পুট্টিলাল। যৌতুক হিসেবে দেয়া হবে একটা গরু।

গরুর বিনিময়ে বিয়ে করা পুট্টিলাল যেন কিশোরী ফুলনকে পেয়ে নিজের সব পুরুষালী ঝাল মিটাতে ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। কতই বা বয়স ফুলনের তখন, এগারো- বারো। এই বয়সের একটা মেয়ে শারিরীক সম্পর্ক করবার পক্ষে কতটা নিরাপদ, কতটা প্রস্তুত সেটা না ভেবেই পুট্টিলাল রীতিমতো ধর্ষণই করতেন নিজের বউ ফুলনকে। ফুলন বাঁধা দিতে চাইলে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যেত। অত্যাচার নেমে আসত ফুলনের উপর।

দিনের পর দিন এই অসহ্য মানসিক যন্ত্রণা আর নিতে পারছিলেন না ফুলন। তিনি কোনো কোনোবার বাবার কাছে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, বাবার বাড়িতে আসলেই সমাজের লোকলজ্জার ভয়ে ফুলনকে আবার বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাঠানো হতো শ্বশুরবাড়িতে। কারণ, মাল্লা বর্ণের হিন্দুদের সমাজে স্বামী পরিত্যক্ত নারীকে ভাবা হতো চরিত্রহীনা। চরিত্রহীনা মেয়ের পিতা মাতা পরিচয় কে দিতে চাবে! তাই মেয়েকে ঠেলে দেয়া হতো পুট্টিলালের কাছে। পুট্টিলাল আবারো পুরানো কায়দায় ধর্ষণ, নির্যাতন চালাতেন, অবস্থা এমন ফুলনের কাছে পুট্টিলাল মানেই এক মূর্তিমান আতঙ্ক।

তিনি আর সইতে পারলেন না। যা হবার হবে এমন একটা মানসিকতা চলে এসেছিল। তিনি স্বামীর বাড়ি স্থায়ীভাবে ছেড়ে চলে আসলেন বাবার বাড়িতে। এবার তাকে বুঝিয়েও পাঠানো গেল না। ফলে, কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল মাল্লা সমাজে। নিশ্চয়ই এই মেয়েটি চরিত্রহীনা।

ফুলনের নামে যখন লোকে নানান কথা বলছে তখন সে লড়াই করছে তার বাবার হারানো নিম গাছের জমি ফেরত পাওয়ার জন্য। ফুলন জন্মেছিলেন উত্তরপ্রদেশের ছোট্ট এক গ্রাম ‘ঘুরা কা পুরয়া’তে। এই গ্রামের আশেপাশে ছিল কতিপয় জমিদার ঠাকুরদের বসবাস। যারা গরীবদের সম্পত্তি লুটে নিত, কখনো করতো নির্যাতন। ফুলনদের সম্পত্তিও এই জমিদার ঠাকুররা দখল করেছিল। আর এই কাজে তাদের সাহায্য করেছে মায়াদীন। ফুলন তাই মায়াদীনের বিপক্ষে লড়াই শুরু করেছিল। এমনিতেই সমাজ ফুলনের বিপক্ষে, তার উপর সে দাঁড়িয়েছে মায়াদীনের বিরুদ্ধে। ফলে জমিদার ঠাকুররাও ক্ষেপে গেল ফুলনের উপর।

মায়াদীন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উলটা ফুলনকে চোরের অভিযোগ দিয়ে গ্রেফতার করালো পুলিশ দিয়ে। মায়াদীন পুলিশকে কিছু বলেছিল কি না কে জানে! পুলিশ জেল হাজতে তিনদিন ফুলনকে ধর্ষণ করল। স্বামীর সাথেই সে পেরে উঠেনি, পুলিশের সাথে কিভাবে পারবে আর! তিনদিনের হাজতবাস শেষ হলো বটে কিন্তু সমাজে আর বাস করার সুযোগ পাওয়া গেলো না। তাকে সমাজচ্যুত করা হলো। নিজের পরিবার তাকে বর্জন করল, তাকে বর্জন করল তার মাল্লা সম্প্রদায়।

*

সমাজ বর্জিত ফুলন এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে তার উপর চোখ পড়ে ডাকাত দলের। তখন তার বয়স ষোল। ডাকাত দল তাকে অপহরণ করে। ডাকাত দলের নেতা বাবু গুজ্জর। বাবু গুজ্জর ফুলনের শরীরের দিকে নজর দেন, তার লোভী মন কামুক হয়ে ওঠে। একরাতে সে ফুলনের উপর জোরপূর্বক শারিরীক সম্পর্ক করতে চায়। কিন্তু, দলের দ্বিতীয় প্রভাবক নেতা বিক্রম দেখে ফেলে। সে বাবু গুজ্জরকে বাঁধা দেয় এবং সংঘর্ষের এক পর্যায়ে সে বাবু গুজ্জরকে হত্যা করে।

ইতিপূর্বে ফুলন পুরুষদের পুরুষালী কামুক চরিত্র দেখেছে, প্রতিবাদী চরিত্র দেখেনি, পুরুষ যে কখনো কখনো নারীকে বাঁচাতে পারে এটা জানা ছিল না ফুলনের। সে বিক্রমের সাহস দেখে মুগ্ধ হয়। তাদের মধ্যে এক প্রেমময় সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। ফুলনকে বিয়ে করে বিক্রম পত্নীর মর্যাদা দেন। ফুলনও ডাকাত দলের বর্তমান নেতা বিক্রমের সাথে ডাকাত দলে নাম লেখান। কারণ, তার মনে এরই মধ্যে জমে গেছে অগণিত প্রতিশোধের নেশা। শরীরে অনেকগুলো অবৈধ দাগ মুছে দিতে ফুলন ঠিক করলেন তিনি এবার নামবেন প্রতিশোধের মিশনে। বিক্রম মাল্লার কাছ থেকে ডাকাতির পাঠ নেন৷ কিভাবে বন্দুক চালাতে হবে, কিভাবে রেল ডাকাতি হবে, কিভাবে গ্রাম লুট করতে হবে সব শিখেন ফুলন।

আর তারপরেই ফুলন দেবী যার জন্য সমাজবর্জিতা হলেন গেলেন তার বাড়িতে। তার স্বামী পুট্টিলাল যে কিনা তাকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছে , জোরপূর্বক তাকে শারিরীক সম্পর্কে বাধ্য করেছে, সেই পুট্টিলালকে জনসম্মুখে শ্বাস্তি দেন ফুলন দেবী। আর দিনে দিনে তিনি হয়ে উঠেন দুর্ধর্ষ দস্যু রানী।  

ফুলন দেবী তারপর একের পর এক ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়তে থাকেন। দলে তার বেশ গুরুত্ব আজকাল। শুধু দলের একজন তাকে সহ্য করতে পারে না। ঠাকুর সম্প্রদায়ের ডাকাত শ্রীরাম। ঠাকুরদের সাথে মাল্লাদের ব্যবধান এতটাই বেশি ছিল যে, তারা এক জায়গায় পানির পাত্রও রাখতে পারত না। শ্রীরাম বিক্রম মাল্লা আর ফুলন দেবীর প্রভাব অস্বীকার করতে চাইত। সে ঠাকুর সম্প্রদায়ের, তাই নেতৃত্ব তারই পাওয়া উচিত এমন মনে করত। এমনকি বিক্রম তাকে দলের ভার দিতেও চেয়েছিল। কিন্তু, দলের যারা আবার নিচু জাতের তারা ভয় পেতো শ্রীরাম নেতা হলে সে ঠাকুর সম্প্রদায়ের স্বার্থ দেখবে, তাদের অবহেলা করবে। ফলে দলে তৈরি হলো দুইটা পক্ষ। শ্রীরাম বুঝতে পারল ফুলন দেবীকে যদি সরিয়ে দেয়া যায় তাহলে বিক্রম অর্ধেক শেষ। সে দুইবার চেষ্টা চালিয়ে বিক্রমকে হত্যা করল এবং ফুলনকে অপহরণ করালো।

অপহরণের পর ফুলনকে নিয়ে আসা হলো বেহমাই গ্রামে। এই গ্রামে সবার সামনে ন্যাংটা করে উপস্থাপন করা হলো ফুলনকে। বলা হলো, ফুলন দলের নেতা বিক্রমের হত্যাকারী। তাকে যেনো সবাই শাস্তি দেয়। গ্রামবাসী ফুলনের উপর ক্ষেপে যায়। শুরু হয় ফুলনের জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক অধ্যায়।

শাস্তিস্বরুপ প্রথম শ্রীরাম ফুলনকে ধর্ষণ করে। তারপর এক এক করে বহু ঠাকুরে তাঁর উপর যৌন ও শারীরিক নির্যাতন করে। যতক্ষণ না ধর্ষণ করতে করতে তারা ক্লান্ত হতো ততক্ষণ চলত এই নির্যাতনের পালা। শ্রীরাম তাঁকে অনেকবার মাল্লা বেশ্যা নামে গালা গালি করেন। তিন সপ্তাহের অধিক সময় তাঁর উপর অমানুষিক অত্যাচার করা হয়।

২৩দিন পর ফুলন নিজেকে ঠাকুর সম্প্রদায়ের গ্রাম বেহমাই-এ নিজেকে আবিস্কার করে। ঠাকুররা ভেবেছিল ধর্ষিত হতে হতে সে বুঝি মরে গেছে। তাই তাকে রাস্তায় ফেলে রাখে। সেখান থেকে অবশেষে এক ব্রাহ্মণ ব্যক্তির সাহায্যে ফুলন গরু গাড়ি করে বেহমাই থেকে পলায়ন করেন।

এইদিকে বেহমাই গ্রাম থেকে পালানোর পর তার প্রেমিক, স্বামী বিক্রমের এক বন্ধু মান সিং জানতে পারে ফুলনের অবস্থার কথা। মান সিং ফুলনকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। মান সিং এর সাহায্যে মুসলিম এক ডাকাত সর্দার বাবা মুস্তাকিমের কাছে পৌঁছায় সে।বাবা মুস্তাকিমের কাছে ফুলন যায় কিভাবে প্রতিশোধ নেয়া যাবে সেটা জানতে। বাবা মুস্তাকিমের সাহায্যে মান সিং আর ফুলন মিলে গড়ে তোলে নতুন একটি ডাকাত দল।

ধর্ষণের ১৭ মাস পেরিয়ে গেছে। এখন ১৯৮১ সাল। ১৪ ফেব্রুয়ারি, আজকের হিসাবে ভালবাসা দিবস। এই দিবসে অত্যাচারী শ্রীরাম আর লালারামকে খুঁজতে আবার বেহমাই গ্রামে প্রবেশ করে ফুলন দেবী। গ্রামে তখন চলছিল একটি বিয়ের উৎসব।ফুলন ও দলের সদস্যরা সম্পূর্ন গ্রাম খুঁজেও শ্রীরাম আর লালারামের সন্ধান পাননি। ফুলন রামভ্রাতৃদ্বয়কে তাঁর নিকট অর্পন করার জন্য গ্রামবাসীকে আদেশ করেন। ফুলনের মতে গ্রামবাসীরা ভ্রাতৃদ্বয়কে গোপনে পালিয়ে রেখেছে। কিন্তু গ্রামবাসীরা এই কথা অস্বীকার করেন।

কিন্তু তাদের খুঁজতে গিয়ে ফুলন তার উপর নির্যাতন চালানো দুই ঠাকুরকে চিনে ফেলে। সে তীব্র ক্রোধে ফেটে পড়ে। তার রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে। মনে পড়ে যায় তেইশ দিনের অমানবিক যন্ত্রণার কথা। ক্রোধে অন্ধ হয়ে সেখানে উপস্থিত ২২ ঠাকুরকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে ফুলন। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘বেহমাই হত্যাকাণ্ড’ বা ‘বেহমাই গণহত্যা’ নামে কুখ্যাত। সে যে বাইশজনকে মেরেছে সবাই অপরাধী না, বেশিরভাগই নিরপরাধ। কিন্তু, ক্রোধের বশেই সে হত্যা করে এই ২২ ঠাকুরকে।

বেহমাই হত্যাকাণ্ডের জন্য সেই সময়ের উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ভি.পি সিং পদত্যাগ করার জন্য বাধ্য হয়েছিলেন। ফুলনদেবী জনপ্রিয় হয়ে উঠে দস্যুরাণী নামে। যদিও ফুলন ছিলেন ডাকাত কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে ফুলনের প্রতি মানুষ সহানুভূতিশীল হয়ে উঠে। সেই সময়ে উত্তর প্রদেশের শহরে দূর্গাদেবীর বেশে ফুলনের মূর্তি বিক্রয় হয়েছিল। বিশেষ করে নিচু জাতের মানুষের কাছে ফুলন দেবী এক নমস্য নারীতে পরিণত হন। তাদের কাছে ফুলন ন্যায়বিচারের প্রতীক, লড়াই করার, প্রতিবাদের প্রতীক।

*

ফুলন সারাজীবনে ৩০ টারও বেশি ডাকাতির সাথে যুক্ত ছিলেন। গণহত্যা চালিয়েছেন ঠাকুরদের উপর। পুলিশ তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাকে চাপ দেয়া হচ্ছে, তার বাবা মাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দলের অনেক সদস্যকে পুলিশের হাতে ধরা খেতে হয়েছে। কিন্তু, তিনি এমনি এমনি তো আর ধরা দেবেন না পুলিশের কাছে। শেষমেশ তিনি শর্ত দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন পুলিশের কাছে। তার শর্তগুলো ছিল-

১। ফুলন ও তার অন্যান্য সঙ্গীরা কেবল মধ্যপ্রদেশে আত্মসমর্পণ করবে, বিচারের জন্য তাদের উত্তরপ্রদেশে নেওয়া যাবে না।
২। তাদের ফাঁসি দেয়া যাবে না এবং ৮ বছরের বেশি সময় কারাবাস হবে না।
৩। মায়াদিন কর্তৃক অবৈধভাবে দখল করা জমি ফুলনের পিতাকে ফেরত দিতে হবে।
৪। ফুলনের পিতা-মাতাকে মধ্যপ্রদেশে পাঠিয়ে দিতে হবে এবং
৫। সরকার ফুলনের ভাইকে চাকরি দেওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করবে।

সরকার ফুলনের সব কয়টি শর্ত মেনে নেয়ার কথা জানালে বেহমাই হত্যাকাণ্ডের প্রায় দু’বছর পর আত্মসমর্পণ করেন তিনি। ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় ৮,০০০ দর্শকের উপস্থিতিতে আত্মসমর্পণ করে ফুলন দেবী। ফুলন পরিধান করেছিলেন একটি খাকী পোশাক। সাথে ছিল একটি লাল চাদর। মাথায় ছিল একটি লাল কাপড় যা বেহমাই গ্রামে চলানো যৌন অত্যাচার ও নির্যাতনের পর প্রতিশোধের প্রতিক রুপে তিনি মাথায় বেধেছিলেন। কাঁধে ছিল একটি বন্দুক। হাতজোড় করে তিনি জনসাধারনকে নমস্কার জানান। দেবী দূর্গা ও মহাত্মা গান্ধীর ছবির সামনে তিনি বন্দুকটি রেখে আত্মসমর্পণ করেন।

ফুলন দেবী, দ্যা ব্যানডিট কুইন, দস্যুরানী, গনহত্যাকারী নারী, গনধর্ষণের স্বীকার, প্রতিবাদী নারী

*

১৯৯৪ সাল। জেল থেকে যখন বের হলেন তখন ফুলন যেনো এক নতুন মানুষ। বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলেন পরের বছর। তারপর ফুলন রাজনীতিতে জড়ালেন এগারো বছরের জেল জীবনের শেষে।১৯৯৬ সালে সমাজবাদী পার্টি ফুলনকে মির্জাপুর আসনে নির্বাচন করার জন্য বাছাই করে। ফুলন জিতে যান সেই আসন থেকে, যদিও তাকে ঠাকুর সম্প্রদায় সহ্য করতে পারছিল না। ভারতীয় জনতা পার্টি ও বেহমাই হত্যাকাণ্ডে নিহত ঠাকুরের স্ত্রীদের ঘোর আপত্তি ছিল, তবুও জয়ী হন ফুলন দেবী।

২০০১ সাল। ফুলন দেবী তখনো মির্জাপুরের সাংসদ। জুলাইয়ের ২৫ তারিখ দিল্লীর সংসদ থেকে বেরিয়ে আসলেন ফুলন দেবী। চমৎকার পরিবেশ। কিন্তু, মুহুর্তেই ঘটে গেল এক বিরাট দূর্ঘটনা। আচমকাই বেশ কয়েকটি গুলি ছোঁড়া হলো ফুলন দেবীকে লক্ষ্য করে। তার দেহরক্ষী আহত হলেন, কিন্তু ফুলন দেবী হলেন নিহত। ফুলনের আততায়ী শের সিং থানায় আত্মসমর্পণ করে স্বীকার করলেন ফুলন হত্যাকাণ্ডের কথা। বেহমাই গ্রামের ফুলনের গণহত্যার প্রতিশোধ নিতেই শের সিং তাকে হত্যা করেন বলে জানান।

*

আর এভাবেই যবনিকাপাত ঘটে যায় এক দুর্ধর্ষ দস্যু রানীর। তাকে নিয়ে বাংলায় সিনেমা হয়েছে ফুলন দেবী নামে, ‘দ্যা ব্যানডিট কুইন’ নামে তাকে নিয়ে সিনেমা পরিচালনা করেন শেখর কাপুর। যেটি আবার নিষিদ্ধও হয়। তার আত্মজৈবনিক বইও লেখা হয়েছে। তবু তিনি থেকে গেছেন এক অমীমাংসিত চরিত্র হিসেবে। তাকে কিভাবে বিবেচনায় নেবেন- আপনি ধর্ষিতা বলবেন, ডাকাত বলবেন না গণহত্যার এক নৃশংস খুনী বলে চিনবেন নাকি বলবেন গণমানুষের নেতা- সেই সিদ্ধান্তের মীমাংসার ভারটুকু আপনার হাতেই থাকুক। 

আরও পড়ুন- 

 

Comments
Spread the love