সিনেমা হলের গলি

ফোবিয়া- ভিন্ন এক ভয়ের সিনেমা

Syed Nazmus Sakib
Syed Nazmus Sakib

ফোবিয়া শব্দের শাব্দিক অর্থ ভয়। তবে শুধু ভয় বললে ফোবিয়াকে পুরোপুরি বোঝা যাবে না কারণ ভয় বুঝানোর ইংরেজিতে ইতিমধ্যেই ফিয়ার নামের আরেকটি শব্দ আছে। ফোবিয়া শব্দের গভীরে প্রবেশ করলে আরও গভীর অর্থ পাওয়া যাবে। ফোবিয়া বলতে প্রধানত এক ধরনের মানসিক অবস্থাকে বুঝায়। এই অবস্থায় থাকা ব্যক্তি কোন বস্তু বা স্থানকে ভয় পায় বা সেটা দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে জিনিসটাকে ভয় পাওয়া হচ্ছে, বাস্তবে এটার কোন অস্তিত্বই নাই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- একজন মানুষ দূরে রাস্তায় পড়ে থাকা কোন রশিকে সাপ ভেবে ভয় পাচ্ছেন এবং ভয়ের পরিমাণ এতটাই বেশি থাকে যে, সেটি আসলেই সাপ নাকি রশি, তা কাছে গিয়ে দেখার সাহসও তার নেই। সুতরাং ফিয়ারের চেয়ে ফোবিয়ার অবস্থা আরও বেশি ভয়াবহ সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই।

ভয়াবহ অবস্থা থেকে এবার একটু এন্টারটেইনমেন্টে আসি। এই বছর বলিউডে ফোবিয়া নামের একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। সেই সিনেমা নিয়ে আলোচনার জন্যই এই লেখার অবতারণা। আশার ব্যাপার হচ্ছে, এই সিনেমার শেষে কোন আইটেম সং না দিয়ে সেটাকে টিপিকাল বলিউড সিনেমা না বানিয়ে একদম অন্যরকমের একটি সিনেমাই বানানো হয়েছে।

সিনেমার কাহিনী গড়ে উঠেছে মেহেক নামের একজন শিল্পীকে নিয়ে। একদিন নিজের বাসায় ট্যাক্সিতে করে ফেরার পথে ট্যাক্সিচালক একটি নির্জন স্থানে গিয়ে মেহেককে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এরপরের দৃশ্যে দেখা যায়, মেহেক রাস্তায় পড়ে আছে।

এই ঘটনার পর থেকে মেহেকের জীবন একদম পাল্টে যায়। সে অ্যাগোরাফোবিয়া নামের এক রোগে আক্রান্ত হয়। এই ফোবিয়া যাদের থাকে তারা পাবলিক প্লেসে আসতে ভয় পায়। শিল্পী মেহেক, যে কিনা পাখির মতো উড়ে বেড়াতো, সে নিজের জীবনকে চার দেয়ালে আবদ্ধ করে নেয় এই ফোবিয়ার কারণে। এমন অবস্থায় মেহেকের বয়ফ্রেন্ড তাকে নিয়ে একটি ফ্ল্যাটে উঠে যেই ফ্ল্যাটের মালিক নিখোঁজ। একদিন মেহেক জানতে পারে এই ফ্ল্যাটের মালিক আসলে খুন হয়েছেন। আর তার চেয়েও অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, মেহেক জানে, সেই খুনি কে!

এই সিনেমার সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে কেন্দ্রীয় মেহেক চরিত্রে অভিনয় করা রাধিকা আপটের দুর্দান্ত অভিনয়। এক সেকেন্ডের জন্যও মনে হয়নি যে তিনি অ্যাগোরাফোবিয়াতে আক্রান্ত নন, এতটাই অসাধারণ ছিল তার বড় বড় চোখের এক্সপ্রেশন। ফোবিয়াতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত প্রচণ্ড ভয় পেলে অনেক জোরে জোরে হাঁপাতে থাকেন বা নিঃশ্বাস নিতে থাকেন। এই কাজটা রাধিকা অনেক অসাধারনভাবে করেছেন তার ক্যারেক্টারের খাতিরে। এর আগে অনেক সিনেমা আর আহল্যা এর মতো দারুণ শর্টফিল্মে কাজ করলেও কেন্দ্রীয় চরিত্রে এটিই রাধিকার প্রথম সিনেমা। পুরো সিনেমা রাধিকার কাঁধেই ছিল, সিনেমার ৮০% দৃশ্যে তিনি একাই নিজের ফ্ল্যাটে অভিনয় করেছেন আর তিনি খুব ভালভাবেই সামলেছেন এই সিনেমা। এই ক্যারেক্টারের জন্য তিনি বেশ কিছু রোগীর সাথে দেখা করেছেন, তাদের সাথে কথা বলেছেন অ্যাগোরাফোবিয়া নিয়ে। তবে সবচেয়ে বড় সহযোগিতা সম্ভবত পেয়েছেন নিজের সার্জন বাবা আর মায়ের কাছ থেকে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া সাইকোলজি আর মেডিক্যাল এর অনেক বই তাকে এই ক্যারেক্টারে প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করেছে।

সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন Pavan Kirpalani। সিনেমার কাহিনীও লিখেছেন তিনি, সঙ্গে ছিলেন Pooja Ladha Surti আর Arun Sukumar। রাধিকার অভিনয় বের করে আনার ব্যাপারে পরিচালকের ভূমিকা যে কম বয়, সেটা আশা করি আর আলাদা করে বলতে হবে না। দারুণ পরিচালনা করেছেন পরিচালক। এর আগে হরর সিনেমা বানালেও, হরর সিনেমাতে সাইকোলজি তিনি এবারই প্রথম মিশিয়েছেন আর এই ব্যাপারে তিনি সফল। আলাদা করে বলতে হয় সিনেমার সেট ডিজাইন আর চমৎকার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের কথা, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে যেমন থাকার কথা, ঠিক তেমনটাই ছিল, যেটা সবসময় গায়ে একটা ছমছমে ভাব বজায় রাখবে।

দর্শক সমালোচক সবার কাছ থেকে প্রশংসা পেলেও শেষ পর্যন্ত বক্স অফিসে ছবিটি সফল হয়নি। এর পেছনে মূল কারণ ছিল এই সিনেমার পুওর মার্কেটিং। অনেকে এই সিনেমার সাথে রামগোপাল ভারমার ১৯৯৯ সালের kaun সিনেমার কিছুটা মিল পেলেও (সেখানেও একটি বাসায় একটি একা মেয়েকে নিয়ে কাহিনী গড়ে উঠে) পরিচালক আর রাধিকা- দুইজনেই এই ধরনের বক্তব্যকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে দুটি একেবারেই আলাদা সিনেমা।

অ্যাগোরাফোবিয়াকে কাল্পনিক কোন ফোবিয়া ভেবে থাকলে ভুল করবেন, এটি আসলেই মারাত্মক এক ধরনের ফোবিয়া। গ্রিক শব্দ অ্যাগোরা (যার অর্থ পাবলিক স্কয়ার) আর ফোবিয়া থেকে এই শব্দটি এসেছে। শুধু তাই না, গ্রীসে অ্যাগোরা নামের একটি পাবলিক স্কয়ারও রয়েছে। বিশ্বের অনেক নামীদামী লেখক থেকে শুরু করে অভিনেতা, গায়ক গায়িকা এই ফোবিয়াতে আক্রান্ত ছিলেন। তার মাঝে সাইকোলজির গুরু ফ্রয়েডও ছিলেন।

ফোবিয়া সিনেমার ফিনিশিংটা খুবই অদ্ভুত ধরনের। অনেকের কাছে খুব বেশ ভাল লাগবে, আবার অনেকের কাছে ভাল লাগবে না। তবে এটি এমন এক ধরনের সাইকোলজিক্যাল হরর, যেটা আপনাকে ভয় পাওয়ানোর সাথে সাথে ভাবাবে। আর এখানেই ফোবিয়া আর দশটি সিনেমা থেকে আলাদা। অবশ্য এই কথা সিনেমার পোস্টার দেখলেও বোঝার কথা!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close