বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরি ঘামাতে লাগলেন। দেশের জন্য মারাত্মক দুশ্চিতায় আছেন তিনি। তাঁর উপর ভার পরেছে বিদেশ থেকে সাহায্য আনবার। তিনি চেষ্টা চালাচ্ছেন। আমেরিকা মানা করে দিয়েছে। জাতিসংঘও মানা করে দিয়েছে, তাদের যুক্তি “এই যুদ্ধ পাকিস্তানের নিজস্ব ঝামেলা, এইটা তারাই মেটাবে, আমাদের নাক গলানো উচিৎ হবে না”। চৌধুরি সাহেব হাল ছাড়লেন না, তিনি চেষ্টা চালাতেই থাকলেন।

এমন একটি সংগঠন এগিয়ে আসলো, যাদের কাছে কোন রাজনৈতিক ব্যাপার স্যাপারের থেকে মানবতা বড় হয়ে দেখা দিলো। লন্ডনের “peace news” পত্রিকার কিছু সম্পাদক ও পাঠক সমাজ মিলে তৈরী করলেন অপারেশন ওমেগা। এলেন কনেট আর পল কনেট নামে দুই স্বামী-স্ত্রী লন্ডন থেকে ভারতে আসলেন, উদ্দেশ্য খাদ্য-সামগ্রী, ঔষধ পত্র বিতরনে সাহায্য করা। এলেন কনেটের ইচ্ছে ছিলো, সরাসরি বাংলাদেশে ঢুকে সাহায্য পৌছে দেয়া। গর্ডন স্ল্যাভেন নামের এক বৃটিশ উকিলের সাথে দুইদিন নৌকায় যাত্রা করে তিনি পৌছালেন যশোরের শিমুলিয়া গ্রামের এক গীর্জায়। এমন সময় পাকিস্তানী মিলিটারি সেখানে হামলা চালালে সে নিজেকে নান বলে পরিচয় দেন। পাকিস্তানী মিলিটারি তাকে জানায়,

“nun doesn’t wear jeans”

এরপর তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তাকে আদালতে নিয়ে গেলে সেখানেও তিনি জানান বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের নামে চালানো এই আদালতের কোন ভিত্তি নেই। আদালত তাকে ক্ষমা চাইতে বলে এবং ক্ষমা চাইলে কয়েক ঘন্টা পর ছেড়ে দিবে জানানো স্বত্ত্বেও তিনি ক্ষমা চাননি। তাকে দুই বছরের জেল দেয়া হয়।

পল কনেট কলকাতায় তখন ত্রাণ বিতরনে, ছবি তোলাতে ব্যস্ত। পাকিস্তান বেতারের খবরে শুনতে পান, অপারেশন ওমেগার দুইজন কর্মী অনধিকার চর্চা বশতঃ পুর্ব পাকিস্তানে ধরা পরেছে এবং আটক আছে। সে সাথে সাথে বুঝে যায়, এই দুইজনকে। তিনি কলকাতা থেকে লন্ডন ও সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান। জেলখানায় থাকা অবস্থাতেই এলেন বুঝতে পারেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। না খেয়ে না খেয়ে তিনি দুর্বল হয়ে পরেন। সময় কাটানোর জন্য তিনি এক টুকরো কাপড়ে দিন ও বারের হিসেব রাখতেন সেলাই করে। দু মাস কারাদন্ড ভোগ করে তিনি মুক্তি পান।

এই দম্পতি শুধু যে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলো, তা নয়। আমেরিকা আমাদের দেশসহ আরও অনেক দেশে পাওয়ার প্লান্টের নাম করে বর্জ্য পদার্থ ব্যবস্থাপনার কৌশল ফাঁদতে চেয়েছিলো, ৯৬ সালে এই দম্পতি আবারও বাংলাদেশে আসেন এবং বাংলাদেশকে এই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেন।

২০১৩ সালের অক্টোবরের ১ তারিখে, এ দম্পতিকে বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতা যুদ্ধের বন্ধু হিসেবে বিশেষ সম্মাননা জানান। বাংলাদেশের মানুষদেরকে পল কনেট জানান, “অনেক দেশ আছে যাদেরকে ব্রিটিশেরা স্বাধীনতা দিয়েছিলো, কিন্তু আপনারা রক্ত, অশ্রু আর অসীম বেদনা দিয়ে এই দেশকে অর্জন করেছেন। এই স্বাধীনতাকে নষ্ট করবেন না।”

যে তথ্যটি জানাতে লোভ সামলাতে পারছি না, সেটি হলো, এই মহান দম্পতি তাদের সেই সন্তানের নাম রাখেন – ‘পিটার উইলিয়াম মুজিব’!

তথ্যসুত্র: ডেইলি স্টার। নভেম্বর ১, ২০১৩

Comments
Spread the love