ছেলে মেয়ে কম্বাইন্ড ক্লাসরুম। নবম শ্রেণী। ২০০৩ সাল।

কেমিস্ট্রি ক্লাস হচ্ছে। স্যার পর্যায় সারণি বুঝাচ্ছেন, বললেন, “পিরিওডিক টেবিল”। ঐ পাশ থেকে নাদিম বলে উঠলো- “হ্যাঁ স্যার বুঝছি, পিরিওড!” এর পর মেয়েদের দিকে তাকিয়ে কুৎসিত ইঙ্গিত আর পৈশাচিক হাসি। সবগুলো ছেলে মুচকি হাসছে। এদিকে সবগুলো মেয়ের মাথা নিচু। পারলে মাটির সাথে মিশে যায় মেয়েগুলো, কারও কারও চোখে তীব্র ক্ষোভ, কিন্তু কিছু বলার নেই। বলতে জানে না তারা।

সমবয়সী ছেলে-মেয়ে, একই সাথে বেড়ে উঠেছি। ক্লাস সিক্সে সামার ভ্যাকেশনের আগেও নাদিমরা আর আমরা একই মাঠে ক্রিকেট খেলেছি। ভ্যাকেশনের মধ্যেই পিরিওড হলো প্রথম, আর খেলা হলো না মাঠে। চেনা মুখগুলোর মাঝে একটা অচেনা দেয়াল, ভেদ করার উপায় জানি না। ওদের সাথে আমাদের প্রথম দূরত্ব সৃষ্টি হলো।

ক্লাস এইটে এসে হঠাত করে দেখলাম, আমার চেয়ে খাটো ছেলে সহপাঠীরা ঠাশ করেই আমার মাথা ছাড়িয়ে তরতর করে বেড়ে উঠছে। কি অদ্ভুত! ওরা আর আমরা এক জগতের বাসিন্দা নই এখন। একই ক্লাসরুমে পাশাপাশি বেঞ্চে বসে পিরিওডের ব্যথায় কুঁকড়ে যেতাম। কিন্তু মুখ স্বাভাবিক করে রেখে ক্লাস করার চেষ্টা করতাম, যাতে ওরা বুঝতে না পারে। তখনও ভালো মতো প্যাড সামলে চলতে পারতাম না। লেকচারে একটুও মন দিতে পারতাম না, সারাক্ষণ টেনশন, আতংক। প্রতি ক্লাসের শেষে বাথরুমে যেয়ে চেক করতাম। পাজামায় যদি এক ফোঁটা দাগ লাগে, তাহলে ক্লাসের সবাই কি বলবে?

পরীক্ষার রুটিন দিলে পড়ার শিডিউল পরে দেখতাম, আগে পিরিওডের শিডিউল দেখে নিতে হতো। কোন পরীক্ষার সময় পিরিওড থাকবে, সেক্ষেত্রে আগেই কতটুকু পড়া তৈরি করে রাখতে হবে। কারণ পিরিওড নিয়ে তো ভালো করে পড়তে পারবো না পরীক্ষার আগে। কতবার ভালো প্রিপারেশন নিয়েও ভালো লিখতে পারি নাই, ব্যথায় শান্ত হয়ে বসতেই পারছিলাম না। লুজ পেইজ নেবার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে টিচারকে ডাকবো, দাঁড়ালেই ঝপঝপ করে একগাদা রক্ত ঝরবে। সেটা কাপড়ে লেগে যেতে পারে। ভেজা অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি শরীরে। ওদিকে না দাঁড়ানোয় টিচার ভাবলেন আমি বেয়াদব, বকা খেলাম এক্সাম হলের মধ্যে। পরীক্ষার মুল্যবান সময়ের মধ্যে দুইবার টয়লেটে যেতে হতো, সময় নষ্ট হতো গড়ে ২০-৩০ মিনিট।

স্কুলে কোন দিন দাগ লেগে গেলে বেঞ্চ ছেড়ে উঠতাম না। সবাই চলে গিয়ে ক্লাস ফাঁকা হয়ে গেলে ধীরে ধীরে বের হতাম। একবার খেয়াল করিনি, একটু খানি দাগের জন্য প্রায় একমাস আমাকে পচানি শুনতে হয়েছে। ছেলেদের থেকে, এমন কি মেয়েদের থেকেও! “জানিস, ওর স্কার্টে কালকে…। হাহাহা হিহিহি…। স্কুলে আসে কেন…? ছিঃ ঘিন্না…।” নিজেকে ভালো করে বুঝে উঠতে না পারার সেই বয়সে এই নির্মম পচানি গুলো মনের মধ্যে ক্ষতের মতো রয়ে গেছে।

নাদিমের হয়তো এখন আর মনে নেই। কিন্তু সেই কুৎসিত হাসিটার কথা মনে হলেই সেই তেরো চোদ্দ বছর বয়সের আমি কোথা থেকে চলে আসে? মনের ভেতরে কোথাও না কোথাও আমি এখনো মাথা হেঁট করে মাটির দিকে তাকিয়ে আছি, আমার পাশের বান্ধবীর চোখে পানি। বারো বছর পরেও এই স্মৃতিটা মুছে যায়নি।

এই রাখ ঢাক, শরীর সম্বন্ধীয় সাধারণ জ্ঞানটুকু নিয়ে গড়িমসি করতে করতে আমরা আমাদের ছেলে সন্তানদের আবেগ ও বিবেকশুন্য নির্বোধে পরিণত করছি ধীরে ধীরে। সেই সাথে আমাদের মেয়ে সন্তানদেরকেও করে তুলছি জড়োসড়ো কাঠের পুতুল।

না, কো এডুকেশন বন্ধ করে দেয়া কোন সমাধান না। মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলবো নাকি? স্কুল আলাদা করলেন, কোচিংও আলাদা করলেন। চলে গেলো বন্ধুরা দূরে। কালকের খেলার সাথী আজকে পিরিওড সর্বস্ব এক আজব প্রাণী হয়ে গেলো, যাদের চাইলেই মুচকি হাসি দিয়ে বিব্রত করা যায়। আচ্ছা সহপাঠীদের বাদ দিলাম। বাসায় বাপ ভাই আছে না? তাঁরা একশো বার নামাজ পড়তে ডাকেন, রোজার দিনে সেহরী করতে ডাকেন। মেয়ে পিরিওডের দুর্বলতা নিয়েও সারাদিন না খাওয়ার ভান করে থাকে, কারও একবারও মনে হয় না এটা ঠিক না? মেয়ের কি হয়েছে? জ্বর! বাবা নাপা খাওয়াবার জন্য পিড়াপীড়ি করতে থাকেন, কেন? কি ক্ষতি হয় যদি মেয়েকে ব্যথা নিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে ভাই পছন্দের আইসক্রীম কিনে নিয়ে এলে? বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝিয়ে বললে? অথবা বাবা বাজারে যাবার সময় মেয়ে অন্য দশটা সদাইয়ের মতো প্যাড আনার কথাটাও সাধারণ ভাবেই বললে?

অনেক পুরুষই তাঁর স্ত্রী বা প্রেমিকার পিরিওডের ব্যপারে জানেন। হ্যাঁ, সেই মানুষটার সাথে ভালোবাসার সাথে যৌনতাও মিশে আছে, তাই হয়তো এটা শেয়ারিং হয়। কিন্তু পিরিওড কোন যৌন ব্যপার না। এটা শরীরের অন্য সাধারণ প্রক্রিয়ার মতোই স্বাভাবিক। বেশ কষ্টকর, ঝামেলাজনক, কিন্তু মেয়েদের সুস্থতার চিহ্ন। তাহলে কেন এটা নিয়ে আলাদা করে কথা বলতে হবে? কারণ আজও অনেকে মেয়ে লোকলজ্জার ভয়ে স্যাঁতস্যাঁতে কাপড় ব্যবহার করে, আজও দামী প্যাড ব্যবহারকারী মেয়েরাও অনেকে আট ঘন্টার বেশি একটা প্যাড ব্যবহার করে রোগ বাঁধায়। বারবার টয়লেটে যেতে দেখলে কানাকানি হয়। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, অফিসে আজও মানুষ “আপা, রোজা না?” বলে জঘন্য রসিকতা করে। পড়া ভালো করে তৈরি না করা অথবা অফিসের কাজ দিতে দেরী হওয়ায় অযথা কথা শুনতে হয়। মন না চাইলেও শখের ট্যুর অথবা প্রোগ্রাম মিস করতে হয়, এবং মিথ্যে বলতে হয় পরে। এই লজ্জার চক্র ভাঙতে যারা মুখ খোলে, নোংরা বাক্যের তিরে সেই মুখ ঝাঁজরা করে দেয়া হয়।

কোন ছেলে যদি নিজের প্রথম বীর্যপাতের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চায়, করুক। আমি কাউকে ছোট করছি না। কিন্তু মেয়েদের পিরিওডের সাথে তুলনা করার নিয়ত নিয়ে যারা শেয়ার করছেন, সাথে সেই স্ট্যাটাসে নারীদের কটাক্ষও করেছেন মনের সুখে। আবার বলেছেন, সমানাধিকার বলে কথা। এই অংশটা তাঁদের জন্য।

কিছু মনে করবেন না, বাংলাদেশে, সারা বিশ্বে প্রতিবছর কত লাখ নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে মারা যায়, সে খবর রাখেন? জরায়ুতে, ওভারিতে সিস্ট নিয়ে আপনার আশেপাশে কতজন মেয়ে ঘুরছে জানেন? অতিরিক্ত ব্লিডিং এর জন্য রক্তশুন্যতায় ভুগছে, কয়েকমাস পরপর রক্ত দিতে হচ্ছে, রক্ত শুন্য হয়ে মারা যাচ্ছে, এমন সংখ্যাও কম নয়। কেউ বলতে পারবেন পৃথিবীতে কতজন পুরুষ বীর্যপাত হতে গিয়ে মারা যায়? সমানাধিকার চাচ্ছেন তো পুরুষরা? বেশ, নিশ্চিত করুন আপনার মা, আপনার বোন, প্রেমিকা, স্ত্রীর যাতে জরায়ুমুখ ক্যান্সার না হয়। পিরিওডের ব্যথায় যেন একা অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে পচতে না হয়। পিরিওডের জন্য কোন মেয়েকে যেন গালি খেতে, মুচকি হাসি দেখতে না হয়। এই সংখ্যাটা শুন্যের কোঠায় নিয়ে আসুন, আপনাদের সমানাধিকার আসবে।

বীর্যের কারণে অণ্ডকোষে ব্যথা হয় বলে দাবী করলেন। অস্বীকার করছি না। ধরুন, এই ব্যথাকে তুলনা করছি হাত মচকে যাবার সাথে। এবার আসুন ভাবি, একজন সুস্থ মেয়ের সারাজীবনে প্রায় ৪৫০ বার পিরিওড হয়। সেই ব্যথা যদি হয় ঐ হাত কুপিয়ে কেটে ফেলার মত, তাহলে জীবনে “সাড়ে চারশত বার” তাঁকে ঐ ব্যথার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এবার বলুন, কিসের সাথে কিসের তুলনা দিচ্ছেন? এসএসসি আর এইচএসসির এক্সামের সময়েও পিরিওডের অসহ্য ব্যথা নিয়ে এক্সাম দিয়েছি, প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা দিয়েছি ল্যাবে দাঁড়িয়ে। বীর্যপাতের জন্য এই কষ্ট করতে হয়েছে আপনাদের?

আপনাদের গর্ভে ধারণ করার শুরুটাতো হয়েছে ঐ কোন একটা পিরিওড থেকেই। সেটাকে সম্মান দেয়ার, সেটা যাদের হয়, তাঁদের নিরাপদে রাখার, সচেতন করার দায়িত্ব কেন এড়িয়ে যাবেন?

অশ্লীল কোন ব্যপারটা জানেন? “কিছু জিনিশ গোপন রাখাই ভালো/ এসব নিয়ে আমাদের পরিবারে কথা বলে না/এরপর বাসরঘরে কি করছেন তার কথাও বইলেন।” এই অর্থহীন চিন্তা দিয়ে কিছু মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার প্রথাটা অশ্লীল। পিরিওডের কারণে মেয়েদের উপরে যে অপমানজনক কুসংস্কারগুলো চাপিয়ে দেয়া হয়, সেগুলো অশ্লীল। সমাজের অর্ধেক মানুষের শারীরিক কষ্ট আর অসুবিধার দিনগুলোকে এক্কেবারে অস্বীকার করাটা অশ্লীল, কেউ প্রকাশ করতে চাইলে তাকে অযথা থামিয়ে দেয়া বা গালাগাল করা অশ্লীল। ঐ মুচকি হাসিটার মতো একটা ইঙ্গিতবাহী স্ট্যাটাস দেয়া অশ্লীল।

যে বয়সে বন্ধুর কষ্ট দেখে নাদিমের উচিৎ ছিলো টিফিনের বাক্স এগিয়ে দিয়ে বলা, “দোস্ত, তোর আজকে কষ্ট করে লাইন দিয়ে টিফিন কিনতে হবে না, আমার থেকে খা।” সেই বয়সে নাদিম অশ্লীল রসিকতা করে তারই সমবয়সী, তারই সহপাঠীর মনে কুৎসিত দাগ ফেলে দিয়ে গেছে। নাদিমরা আছে, যেকোন মেয়ের পিরিওড সংক্রান্ত লেখার নিচে কমেন্ট সেকশন একটু ঘুরে আসুন, দেখতে পাবেন। বীর্যপাতের স্ট্যাটাস কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ ফান হিসেবেই নিয়েছে। সেখানে কিন্তু নোংরা ভাষায় গালিগালাজ বা প্রতিবাদ তেমন নেই। নাদিমরা তৈরি হতেই থাকবে, যতদিন অযাচিত আড়াল থাকবে।

নাদিমদের তৈরি হওয়া ঠেকাতে ট্যাবু থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এখন থেকেই।

কার্টেসি- শক্তি নেটওয়ার্ক

Comments
Spread the love