মাসিক! ঋতুস্রাব! পিরিয়ড! রজঃস্রাব!

হ্যাঁ আপনি ঠিকই দেখছেন। আমি মাসিক নিয়েই কথা বলছি। শব্দটা শুনলেই কেমন আশেপাশের লোকজন থতমত খেয়ে যায়। চোখ কুঁচকে তাকায়! মেয়েদের কান গরম হয়ে যায়। পুরুষরা হয় অ্যাভয়েড করে, অথবা সাইল্যান্ট মুড অন করে দেয়। যুগ যুগ ধরে এমনটাই চলে আসছে। যেদিন কোন মেয়ের প্রথম মাসিক হয়, সেদিনই একটা অলিখিত চুক্তি হয় সমাজের সাথে, বিষয়টি আড়ালে রাখতে হবে।

তবে বেশ কিছু দেশে, কিছু জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম মাসিকের দিনটি উদযাপন করা হয় উৎসবের আমেজে। বিশেষ করে সাউথ ইন্ডিয়া ও ঘানাতে। উড়িষ্যা, কর্নাটক এবং তামিল নাড়ুতে কোন মেয়ের প্রথম মাসিকের দিনটিতে তাকে সাজিয়ে, তার পছন্দের খাবার রান্না করে এলাকার সবাইকে দাওয়াত দিয়ে, দিনটি উদযাপন করা হয়। তবে এই আয়োজনের উদ্দেশ্য খুব একটা মহৎ নয়। আসলে মেয়ের পিরিয়ড হয়েছে, সে এখন বিয়ের জন্য উপযুক্ত হয়েছে, বড়ো হয়ে গেছে এই বিষয়টি জানান দিতেই এই উৎসব এর আয়োজন করা হয়।

এদিকে, বাংলাদেশের ৯৯% মেয়ে প্রথম মাসিকের কথা শুধুমাত্র মায়ের সাথে শেয়ার করে। বাবার সাথে শেয়ার করে ১% এরও কম মেয়ে। মাসিক বিষয়টিও বেশিভাগ মেয়ে জানে মা, বোন কিংবা বান্ধবীর কাছ থেকে। তবে, যার কাছ থেকেই মেয়েরা মাসিক নিয়ে জানুক, একটা জিনিস বলতে কেউই ভোলে না যে, এই মাসিক বা পিরিয়ড কিন্তু মেয়েদের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার।

আসলেই কি বিষয়টা শুধুই মেয়েদের? কিন্তু কেনো?

এর কারণ, আমাদের দেশে মাসিক নিয়ে কেউ কথা তো বলতেই চায় না উলটো অনেক ধরণের ট্যাবু জড়িয়ে আছে আমাদের মন-মানসিকতা জুড়ে। যেমন মাসিকের বিষয়টি লজ্জার, তাই ছেলেদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলা যাবেনা। আর খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে প্রচলিত ট্যাবু হলো, মাসিকের সময় টক খাওয়া যাবেনা, খেলে মাসিকের রক্তপাত বেশি হয়। মাছ-মাংস খেলে মাসিকের রক্তে দূর্গন্ধ হয়। এই সময় গাছ ধরলে, গাছ মরে যায়। বাড়ির বাইরে গেলে, জ্বীনের আছর লাগে। মাসিক হলে প্রথম কয়েকদিন গোসল করা যায় না। মাসিক হলে মেয়েরা নাপাক হয়ে যায়, তাই তাদের আলাদা ঘরে রাখা হয়, রান্না ঘরে ঢুকতে দেয়া হয় না। এসব বিষয় কুসংস্কার হতে হতে আমাদের বোধে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব কুসংস্কারের কোন ভিত্তি নেই। বরং মাসিক হলে মেয়েদের শরীর থেকে যে পরিমান রক্ত বেরিয়ে যায়, সেই পরিমান রক্ত আবার তৈরি নাহলে, অ্যানিমিয়া হতে পারে। দেখা দিতে পারে আয়রন স্বল্পতাসহ নানা ধরণের শারীরিক সমস্যা। তাই মাসিকের সময় তাদের দরকার পুষ্টিকর খাবার। এ সময় মেয়েদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকেও বিশেষ খেয়াল রাখা উচিত।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বেশিরভাগ মেয়েই মাসিকের সময় পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। প্যাড এর কথা অনেকে জানেনা। কর্মসূত্রে দেশের বেশকিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়, মাসিক নিয়ে। সেইসব মেয়েদের অনেকেই কাপড়ের মধ্যে বালু ভরে ব্যবহার করে মাসিকের সময়। কেউ কেউ কাপড়ও পায় না। তাই মাসিকের দিনগুলোতে একা একা ঘরে লুকিয়ে থাকে। অনেকেই আছে যারা মাসের পর মাস একই কাপড় ব্যবহার করে মাসিকের সময়। একটা কাপড়ই পরে থাকে দুই-তিনদিন। আর দাদীর কাছে গল্প শুনতাম, মাসিকের কাপড় তারা লুকিয়ে লুকিয়ে শুকাতো। যাতে বাড়ির ছেলেদের চোখে না পরে। সেক্ষেত্রে প্রায় সময়ই শ্যাওলা ধরা দেয়ালে, অন্ধকারে, কাপড়গুলো শুকাতে দিতো।

ফলে, সেগুলো তো ঠিকমতো শুকাতোই না বরং স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশের কারণে কাপড়ের ভাঁজে পোকামাকড়রা ঘর বাঁধতে পারতো অনায়াসে। আর সেই কাপড়ই ব্যবহার করতো তারা। এই অস্বাস্থ্যকর মাসিক ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, ফলটা সাথে সাথে কেউই পায়না। অস্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনা ধীরে ধীরে একদিন ঠেলে দেয় জরায়ু রিলেটেড ভয়াবহ সব অসুখের দিকে, যা মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে। শুধু জরায়ুর অসুখই নয়, অনেক মেয়েই মাসিকের সময় প্রচন্ড পেট ব্যথায় ভোগে। সঠিক সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ না নিলে, একটা সময় তাদের সিস্টের সমস্যা দেখা দেয়। তখন যেতে হয় ছুরি-কাঁচির নীচে।

একটা সুস্থ বাচ্চা জন্ম দেবার জন্য এবং একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য একজন মেয়ের মাসিকের সময় সঠিক পরিচর্যা দরকার। যেটাকে বলে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি বা মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। তবে বিষয়টি নিয়ে অনেক মেয়েই খুব একটা যত্নবান নয়। বিশেষ করে কিশোরী মেয়েরা জানেনা অনেক কিছুই, তাদের প্রথম মাসিকের অভিজ্ঞতা হয় ভয়াবহ। দেশের ৪০% মেয়ে ভয় পেয়ে কিংবা স্কুলে মাসিকবান্ধব টয়লেট না থাকায়, মাসিকের সময় স্কুলে যায় না। যা পরবর্তিতে তাদের স্কুল থেকে ঝড়ে যাবার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্য স্কুল ও পরিবার থেকেই মেয়েদের মাসিক বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে। মায়ের পাশাপাশি, বাবাকেও জানতে হবে মাসিক লজ্জার নয়, মাসিক অসুখ নয়, মাসিক স্বাভাবিক একটি বিষয়।

কাজের জন্য গিয়েছিলাম নেত্রকোনার হাওড় এলাকায়। সেখানে একেবারে দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত লোকেরা পর্যন্ত সুযোগ পেলে অনর্গল কথা বলে মাসিক নিয়ে। স্কুলের কিশোরী মেয়েরা বলছে, মাসিকের সময় তারা কি সাহায্য চায় পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে। তাদের বন্ধুরা কথা দিচ্ছে, আমার বান্ধবীর মাসিক হলে তাকে সব ধরনের সাহায্য করবো। একজন কৃষক বাবা বলছেন, আমি আমার সঞ্চয়ের কিছু টাকা রেখে দেবো, মেয়ের প্যাড কেনার জন্য। মা বলছেন, মাসিকের সময় মেয়ের পুষ্টির বিষয়টি যাতে সঠিক হয়, সেটি আমি খেয়াল রাখবো। স্কুলের শিক্ষকরা জানাচ্ছেন, আমরা স্কুলে মাসিকবান্ধব টয়লেট তৈরি করবো। নিরাপদ পানি, ঢাকনাসহ ঝুড়ি, সাবানের ব্যবস্থা করবো! তার মানে যারা চুপ থাকে তারাও সুযোগ পেলে কথা বলতে চান মাসিক নিয়ে।

কাজ করতে করতে আমি হেঁটে আসি আমার কৈশোর থেকে। মাসিক শব্দটা কখনো মুখে নিতে পারতাম না। স্কুলে গিয়ে মাসিক হলে, টিচারকে বলতাম ‘শরীর খারাপ’ বাড়ি যাবো। প্যাড শেষ হয়ে গেলে মাকে গিয়ে বলতাম। প্রচন্ড পেটব্যথা হলে বাবাকে বলতাম পেটব্যথা, অষুধ এনো। সে বাজার থেকে ফেরার সময়, মেট্রো বা ফ্ল্যাজিল সাথে কিছু স্যালাইন নিয়ে ফিরতেন। তারপর আম্মা হয়তো কোন কাগজে অষুধের নামটা লিখে কয়েক ভাজ করে কাজের ছেলেকে পাঠাতেন, এই কাগজটা ডিসপেন্সারিতে দিলেই হবে, কিছু বলা লাগবেনা, দেখলেই বুঝবে। কাগজে মোড়ানো প্যাডের প্যাকেট নিয়ে বাবা কখনো ফিরলে সেটা মায়ের হাতে দিতেন, আর আমরা বোনরা লজ্জায় মরে যেতাম, ইশ! বাবা জেনে গেলো আমার মাসিক হয়েছে!

কিন্তু এখন অইসব ছেলে-মেয়েদের দেখে আমি সাহস পাই, বুঝি মাসিক নিয়ে চুপ থাকা মানে ব্যাপারটা অনেকটাই, চুপ থাকলেন তো হেরে গেলেন টাইপ। নীরবতা ভেঙ্গে এগিয়ে আসা মানেই অনেকগুলো সমস্যার সমাধান। খেয়াল রাখুন মাসিকের জন্য একজন মেয়ে হিসেবে আপনি পিছিয়ে পরছেন না তো? মাসিককালীন হরমোন্যাল কারনে মানসিক এবং শারীরিক একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায় মেয়েরা। একজন ভাই, বন্ধু, স্বামী, প্রেমিক, কলিগ হিসেবে এই সময় আপনার কাছের মানুষটির পাশে থাকুন। তাদের প্রয়োজনীয় যত্নটুকু নিশ্চিত করুন। বিশেষ করে বাবা হিসেবে, মাসিকের দিনগুলোতে হয়ে উঠুন মেয়ের নির্ভর-বন্ধু। ঘর থেকে শুরু হোক যাত্রা, এরপর যেখানে যেভাবে পারেন মেয়েদের সাহায্য করুন মাসিকের সময়।

ভারতে মাসিক নিয়ে তৈরি হচ্ছে সিনেমা, সোশ্যাল মুভমেন্ট। আমাদের দেশেও শুরু হয়েছে মুভমেন্ট, যেখানে আপনার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। ২০১৪ সাল থেকে সারাবিশ্বে ২৮মে পালিত হচ্ছে, ‘মাসিক স্বাস্থ্যবিধি দিবস’। বাংলাদেশেও দিনটি পালিত হয়। মাসিক নিয়ে সভা হয়, সেমিনার হয়। আছে এমএইচএম প্ল্যাটফর্ম। ‘ঋতু অনলাইন’ নামে তৈরি করা হয়েছে ওয়েবসাইট, চাইলেই আপনি মাসিক সংক্রান্ত যেকোন তথ্য জানতে পারেন সেখান থেকে।

মাসিকের সাথে মেয়েদের ভবিষ্যৎ, অ্যাকচুয়ালি গোটা মানবসভ্যতার উৎপত্তির ইতিহাস জড়িয়ে আছে। আর এই ২০১৮ সালে বসে আপনি যখন ভাবছেন আপনার মেয়ে-বোন-বান্ধবী; ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট, সাঁতারু, বিজ্ঞানী, মহাকাশচারী হোক, তখন কেনো কিছু ট্যাবু দিয়ে, মাসিককে আড়াল করে রাখবেন? যা কিনা প্রতিটি মেয়ের জীবনের এক প্রাকৃতিক বাস্তবতা। সরকার থেকে শুরু করে, বিভিন্ন বেসরকারি অর্গানাইজেশন কাজ করে যাচ্ছে, কুসংস্কার ভেঙ্গে মাসিক বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে। এ বছর মাসিক স্বাস্থ্যবিধি দিবস এর হ্যাশট্যাগ ছিলো #নোমোরলিমিটস।

কোন সীমাবদ্ধতা নয়, সময় হয়েছে খোলস ছেড়ে বের হবার। সচেতন মানুষ হিসেবে আপনি কি এখনো চুপ থাকবেন?

Comments
Spread the love