৮০টি ইনজেকশন, রোগীর মৃত্যু এবং ইত্তেফাকের অপসাংবাদিকতা!

সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই হাজার হাজার রোগীর মাঝে যে রোগীটি কমন, তা হলো বিষক্রিয়া। আরও স্পেসিফিকভাবে বললে, ওপিসি বা অরগানো ফসফোরাস কম্পাউন্ড জাতীয় বিষক্রিয়া আক্রান্ত রোগী। সাধারণত, কীটনাশকগুলোতে ওপিসি থাকে। কেউ এক্সিডেন্টালি, কেউ বা ইচ্ছাকৃতভাবে সুইসাইডাল এটেম্পট হিসেবে ওপিসি সমৃদ্দ এই বিষ গ্রহন করে ফেলে। ওপিসি নামক এই বিষ জাতীয় পদার্থটি, এসিটাইল কোলিন্সটারেজ নামক এক প্রকার এনজাইম উৎপাদনে বাঁধা প্রদান করে, ফলে এসিটাইলকোলিন নামক নিউরোহরমোনটি শরীরের স্নায়ুকোষের প্রান্তে জমা হতে থাকে। সাধারণত, এটি জমা থাকার কথা না, কিন্তু এই বিষের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে এটি জমতে থাকে, ফলশ্রুতি হিসেবে মাংশপেশী দুর্বল অনুভব, পেশীতে ব্যাথা হওয়া, পেশীর কোনো কোনো জায়গা শক্ত হয়ে যাওয়া, পরবর্তীতে প্যারালাইজ হয়ে যেতে পারে।

আমাদের শরীরে অনেক রিসেপ্টর আছে, এদের একেকজনের কাজ একেক রকম। তবে এরা প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট কিছু পদার্থ গ্রহন/রিসিভ করে এবং উপযুক্ত প্রতিবেদন সৃষ্টিতে সাহায্য করে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের এমন একটি রিসেপ্টর হলো নিকোটিনিক এসিটাইলকোলিন রিসেপ্টর। ওপিসি-এর কারণে এসিটাইলকোলিন্সটারেজ এনজাইম উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, অতিরিক্ত এসিটাইলকোলিন এই নিকোটিনিক এসিটাইলকোলিন রিসেপ্টরকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করতে থাকে, ফলে নিকোটিনিক এক্সপ্রেশন প্রকাশ পেতে থাকে। যার মধ্যে রয়েছে, মাথা ব্যাথা, শ্বাসকষ্ট, শরীর কাঁপতে থাকা এবং রোগী তাতে কোমা-তেও চলে যেতে পারেন। আবার মাসকেরেনিক রিসেপ্টর উত্তেজিত হলে বুক চেপে আসা, শ্বাস নিতে গেলে শো শো আওয়াজ হওয়া, ঘাম-লাল বেশী বেশী হওয়া, প্রস্রাব হয়ে যাওয়া – এসব হতে পারে। এ সময় চোখের তারা বলা হয় যেটাকে, অর্থাৎ পিউপিল একদম ছোট হয়ে যায়, একে বলা হয় মায়োসিস।

তো, এমন রোগী আসলে প্রথমেই আমাদের যেটা দায়িত্ব, আমরা তার কাপড় খুলে নিবো, কাপড়ে বিষ থাকতে পারে, ত্বকের সাথে বিষ থাকলে তা পরিষ্কার করে ফেলবো, অর্থাৎ প্রাথমিক চিকিৎসা তো দেবই। পাশাপাশি খুব অল্প কথায় তার হিস্টোরি নিয়ে ভাইটাল এক্সামিনেশনগুলো, পালস, প্রেশার, টেম্পারেচার এসব দেখে নিবো। এরপর স্পেসিফিক ম্যানেজমেন্ট শুরু করে দিতে হবে।

দুনিয়া জুড়ে ওপিসি পয়জনিং-এ যে ঔষধটি ব্যবহৃত হয়, তার নাম এট্রোপিন। এটি শিরাতে, অর্থাৎ ইন্ট্রাভেনাস (আইভি) র‍্যুটে প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু কতটুকু?

যতোক্ষন না পেশেন্ট এট্রোপিনের প্রতি ফার্মাকোলিজেকেল রেসপন্স করছে। এর জন্য আগে জানতে হবে এট্রোপিন কি বস্তু, এর কাজ কি। আমরা যদি সেসব নাও জানি, তাহলে যতোটুকু না জানলেই না, সেই ফার্মাকোলজিকেল ইফেক্টগুলো হলো- পালস দ্রুততা প্রাপ্ত হবে (ট্যাকিকার্ডিয়া), মুখের অভ্যন্তর শুকিয়ে আসবে এবং মোস্ট ইম্পর্টেন্টলি পিউপিল বা চোখের তারা, প্রসারিত হবে, যাকে বলে মাইড্রিয়াসিস। এসব অর্জিত হলে, এই অবস্থাকে বলা হবে এট্রোপিনাইজেশন। রোগীকে ততোক্ষন এট্রোপিন প্রয়োগ করতে হবে, যতোক্ষন তার এট্রোপিনাইজেশন না হয়। এটি প্রয়োগের নিয়ম হলো, ১-৫ মিগ্রা এট্রোপিন প্রয়োগ করতে হবে, এবং প্রতি পাঁচ মিনিট পর এই ডোজ দ্বিগুন করতে হবে। অর্থাৎ, এই মুহুর্তে আমি যদি ৫ মিগ্রা এট্রোপিন পুশ করি, তার ঠিক পাঁচ মিনিট পর ১০ মিগ্রা, পাঁচ মিনিট পর ২০ মিগ্রা, পাঁচ মিনিট পর ৪০ মিগ্রা। এভাবে এট্রোপিনাইজেশন যতক্ষন অর্জিত না হবে, ততক্ষন পর্যন্ত এট্রোপিন প্রয়োগ করে যেতেই হবে।

যে এম্পুলে এট্রোপিন থাকে, (ছোট্ট কাচের পোটলা, যেটাতে ইঞ্জেকশন দেয়ার তরল থাকে), সেগুলোতে সাধারণত প্রতি মিলি-তে ১মিগ্রা করে এট্রোপিন থাকে। এবার, একটু হিসেব করেন। যে মুহুর্তে আপনাকে ৪০ মিগ্রা এট্রোপিন দিতে হবে, আপনার তখন ৪০টি এম্পুল ভাঙতে হবে, ৪০টি ইঞ্জেকশন দিতে হবে। তার ৫ মিনিট পরে ৮০টি।

পাঠক, আপনি কি বুঝতে পারছেন, ওপিসি পয়জনিং এ ১৫০-২০০ ইঞ্জেকশন যে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার?

সলিমুল্লাহ মেডিকেল থেকে পাশ করা ডাক্তার অনিন্দ্য শামস, তিনি জানান, ইন্টার্নশীপ চলাকালে তাকে একবার একজন ওপিসি বিষক্রিয়া আক্রান্ত রোগীকে ৪০০ এম্পুল ভেংগে ৪০০ ইনজেকশন দিতে হয়েছিল, এবং সে রোগী তার জীবন ফিরে পেয়েছিল। পাঠক, এম্পুলগুলো কাঁচের তৈরী। এতো শত এম্পুল ভাঙতে গিয়ে চিকিৎসকদের হাত কেটে যাওয়া খুবই নিত্ত নৈমিত্তিক ঘটনা। কেউই শখ করে এম্পুল ভাঙতে যায় না। তারা আপনার, আমার জন্যই হাত কাটে, এম্পুল ভাঙ্গে, ইনজেকশনে সে এম্পুল থেকে মেডিসিন নিয়ে পুশ করে আপনার আমার দেহে।

এতো বড় লেখাটি হয়তো কখনোই লেখার প্রয়োজন হতো না, যদি না ‘ইত্তেফাক’-এর মতো, এতো প্রাচীন একটি দৈনিক পত্রিকা সম্পুর্ণ বিনা পড়াশুনায় এই নিয়ে একটি মুর্খতাপুর্ণ খবর প্রকাশ করতো গতকাল (২১শে জুলাই, ২০১৬)। শিরোনামটি ছিল – “রোগীর শরীরে উপর্যুপরি ৮০ ইনজেকশন, পরে মৃত্যু”।  অর্থাৎ, কেউ যদি খবরটি নাও পড়ে, তবুও সে জেনে যাবে, এতোগুলো ইনজেকশন দেয়ার কারণেই সে রোগীর মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ ঐ রোগীর মৃত্যুর জন্য ইনজেকশনই দায়ী। নিউজটি দেওয়াও হয়েছে ইত্তেফাকের প্রথম পাতায়। অথচ, হেডলাইনে এই কথা বলা নেই যে, রোগী বিষক্রিয়া আক্রান্ত হয়েছিলেন অজ্ঞান পার্টির দ্বারা। খবর পড়লেও যে আপনার কনফিউশন দূর হবে, তা কিন্তু না। খুব যত্ন করে সেখানে লেখা হয়েছে,

“গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখান থেকে বুধবার সকালে তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়। কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিত্সকরা মন্টুর চিকিত্সার জন্য তার আত্মীয়-স্বজনকে দ্রুত বিভিন্ন নামের ৩৫টি ইনজেকশন নিয়ে আসতে বলেন। তারা দ্রুত ইনজেকশন নিয়ে এলে ইন্টার্ন চিকিত্সক ৩৫টি ইনজেকশনই পুশ করেন। পরে আরো ৪৫টি ইনজেকশন আনিয়ে সবগুলোই মন্টুর শরীরে পুশ করার কিছুক্ষণ পরে তার মৃত্যু হয়।”

রোগীকে গুরুতর অসুস্থ্ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হলেও, সাংবাদিকের খবর উপস্থাপনের ঢং অনুযায়ী, সেই অসুস্থতায় রোগীর মৃত্যু হয়নি, বরং মৃত্যু হয়েছে উপর্যুপরী ইনজেকশন দেয়ার কারণে।

এতোক্ষন ধৈর্য ধরে যদি উপরের অংশটুকু পড়ে থাকেন, তাহলে আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করি, ইত্তেফাকের এই সাংবাদিকের নৈতিক অবস্থানটি আসলে কি? তিনি কি নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সংবাদটি লিখেছেন নাকি এন্টি-ডাক্তার সেন্টিমেন্ট ঢেলে লেখাটি সাজিয়েছেন? একটি বিষয়ে ন্যুনতম জ্ঞান না রেখে কিভাবে তিনি এভাবে একিউজেশন দিতে পারেন? সেই অধিকার কি তিনি রাখেন? আমাদেরকে একটা ব্যাপারে সাহায্য করবেন? প্লিজ? আমাদেরকে শুধু বলবেন কি, আমাদের কি করা উচিত? আমরা বই-পত্রে, প্রফেসরদের থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি, যা শিখেছি, আমরা সেভাবে চিকিৎসা করবো নাকি আপনারা যেভাবে চান, সাংবাদিকেরা যেভাবে চায়, সেভাবে করবো? প্লিজ, এইটা আমাদের জানাবেন? আমরা জানতে চাই, কারণ আমরা বাঁচতে চাই। পরিবার রেখে গ্রামে, উপজেলায় চিকিৎসা দিতে আমরা এ কারণে যাই না, যাতে আমরা লাশ হয়ে ফিরি পরিবারের কাছে। আমরা বাঁচতে চাই, ঠিক যেভাবে আপনারা চান। আমরা আলাদা কেউ না, আমরা আপনাদেরই ভাই, বোন, সন্তান। চিন্তা-ভাবনা না করে, সম্পুর্ন আবেগের বশে আমাদের গায়ে হাত তুলবার আগে একটাবার কি এ কথাটা ভাবতে পারবেন?

এই সাংবাদিক ভাইয়েরাই কিন্তু নিজ দরকারে, নিজেদের বা পরিবারের অসুস্থতায় হাসপাতালে আসেন, তখন আবার সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে, রিপোর্টার্স ফোরামের কার্ড দেখিয়ে একটু গরম দেখান। কিন্তু সত্যি কথা কি জানেন? আমরা ঠিকই চিকিৎসা দিয়ে যাই। হিপোক্রেটিক ওথ এর ৮ নং পয়েন্টে বলা আছে,

“I will not permit considerations of age, disease or disability, creed, ethnic origin, gender, nationality, political affiliation, race, sexual orientation, social standing or any other factor to intervene between my duty and my patient”

যে শপথ গ্রহন করে এই পবিত্র পেশায় আগমন, সে শপথের ব্যতিক্রম করতে যে জানি না! জানি না বলেই হয়তো, এদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধে গনহত্যার মাস্টারমাইন্ড গোলাম আজমেরও দীর্ঘদিন চিকিৎসা হয় দেশের সবচেয়ে এক্সপিরিয়েন্সড জায়গায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে; সেই শপথের কারণেই হয়তো বুকের ভেতর ঘৃণার আগুন নিয়েও সেবা দিয়ে যেতে হয়েছে এই নরপশুকে।

সে নরপশুকেই সেবা দিয়ে গিয়েছি যখন আমরা, এসব সাংবাদিক আর এমন কি ব্যাপার। তবে, এসব রিপোর্টের উদ্দেশ্যটা কিন্তু খুব পরিষ্কার। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি দেশের মানুষের বিরুপ মনোভাব সৃষ্টি করা এবং বিদেশে চিকিৎসা নিতে উদবুদ্ধ করা। এসবের পেছনে কলকাঠি কারা নাড়াচ্ছে, তা জানতে হলে যেতে হবে আরও অনেক গভীরে।

ভালো থাকুক এ দেশ। ভালো থাকুক এ দেশের মানুষেরা। যে এম্পুল ভাঙতে গিয়ে হাত কেটেছে, সে কাটা হাতে এম্পুল ভাংবার অপরাধে হয়তো মার খাবো, তবে জেনে রাখুন, মার খাওয়া শেষে আবারও আপনার জন্য সে কাটা হাতে এম্পুল ভেংগে যাবো। কথা দিলাম।

– নিশম সরকার

পঞ্চম বর্ষ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

2 thoughts on “৮০টি ইনজেকশন, রোগীর মৃত্যু এবং ইত্তেফাকের অপসাংবাদিকতা!

Comments are closed.