ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

বড্ড হিপোক্রেট জাতি আমরা!

আনন্দ কুটুম

আমি স্রেফ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম মাত্র একটি হিপহপ গান গেয়েই একজন নায়িকা পুরো জাতীর শিক্ষা গুরু হিসেবে আবির্ভূত হলেন। ভালো তো… ভালো না?

আসুন একটু পেছনে ফিরে যাই। হুমায়ূন আহমেদ নামে একজন খেয়ালী লেখক সাহিত্য রচনা শুরু করলেন। এক শ্রেণীর মানুষ চিৎকার দিয়ে বললেন, “জাত গেলো, জাত গেলো। এটা কোন সাহিত্য হল? জাতি এই সাহিত্য থেকে কি শিখবে?” যে জাতির সাহিত্য থেকে শেখার এতো আগ্রহ, তারা কখনোই আহমদ ছফা পড়ে দেখলো না, হুমায়ূন আজাদ পড়ে দেখলো না, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসে তাদের বড্ড অরুচী।

মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী যখন সিনেমা বানানো শুরু করলেন তখন আবার রব উঠলো, “জাত গেলো, জাত গেলো। ইহা কোন সিনেমা হল? এই সিনেমা থেকে জাতি কি শিখিবে?”। যে জাতীর সিনেমা থেকে শেখার এতো আগ্রহ, তারা তানভীর মোকাম্মেলের সিনেমা দেখতে গেলো না, তারেকের সিনেমা দেখলো না, তৌকিরের সিনেমাও দেখলো না। ফারুকীর সিনেমা থেকে শিক্ষা নিতে জাতি এতো তৎপর যে বাকিদের সিনেমার দিকে ফিরে তাকানোর ফুরসৎই মেলে না।

জয়া আহসান রাজকাহিনী সিনেমায়, হাত দিয়ে যোনী দেখিয়েছে বলে পুরো জাতীর ইজ্জৎ ধুলিস্যাত। রব উঠলো, “জয়ার কাছ থেকে নতুন প্রজন্ম কি শিখবে কি শিখবে?” কিন্তু সেই জয়াই যখন বিসর্জনের মত অসাম্প্রদায়িক একটি সিনেমা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হল, তখন জাতি তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে শিক্ষা নিতে প্রস্তুত নয়।

এবার শুরু হয়েছে, নুসরাত ফারিয়াকে নিয়ে। নুসরাত ফারিয়া ছাড়া যেন এদেশে আর কোন নায়িকা নেই। আর কারো কাছ থেকে জাতি শিখতে আগ্রহী না। নুসরাত ফারিয়ার কাছ থেকেই শিখতে হবে। ভাবটা এমন যে নুসরাত ফারিয়া এই জাতিকে শিক্ষা দেওয়ার এক মহা গুরুভার কাধে তুলে নিয়ে বসে আছেন।

একজন শিল্পী খেয়ালী হবে, সৃষ্টিশীল হবে, আপন মনে সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করবে এটাই তো স্বাভাবিক। সেগুলো কারো পছন্দ হবে, কারো হবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। বিয়ে বাড়িতে, ঈদ পুজোতে ফুল ভলিউমে যে শাকিরা, কেটি পেরি, জ্যাক্সন বা এরিক চালায়া নাচেন, সেই গানের কয়টা লাইন আপনি ঠিক মত বোঝেন? যে আপনাকে পটাকা গানের সব লাইন বুঝতেই হবে? এই মাথার দিব্বি আপনারে কে দিয়েছে? নুসরাতের গায়কী বুঝেন নাই, আবার শুনেন। ভালো না লাগলে ইগনোর করেন। এতো বুঝার দরকার কি?

যাদের এতো শুদ্ধ সঙ্গীত শোনার ইচ্ছা, তারা কয়জন সুফী সঙ্গীত শুনেন? কয়জন আছেন যে নজরুল গীতিকে অনুধাবন করেন? শিখতে যদি কিছু হয়ই তবে নজরুল/লালন থেকে কিছু শেখেন। নুসরাত ফারিয়ার অর্ধ উলঙ্গ গান থেকে কেন শিখতে হবে? নুসরাত কাপড় খুইলা নাচছে বইলা শিল্প সংস্কৃতির বহু ইজ্জৎ গেছে? আর সংসদে দাঁড়াইয়া যখন বিরোধী দলের গুষ্টি উদ্ধার কইরা মমতাজ আপায় গান গায় তখন শিল্প সংস্কৃতির ইজ্জৎ যায় না?

ভাবটা এমন যে পুরা ইয়াং জেনারেশন স্কুল কলেজে যাওয়া বাদ দিয়া ইউটিউব থেকে মিউজিক ভিডিও থেকে শিক্ষা নেয়। তাই মিউজিক ভিডিও হইতে হবে শালীনতায় টইটুম্বর। ইয়াং জেনারেশনের শেখার আর কোন যায়গা নেই, নুসরাতের গান থেকেই শিখতে হবে। নুসরাতই এ জাতীর এক মাত্র শিক্ষিকা। আহারে জাতি…

বড্ড হিপোক্রেট জাতি আমরা। আমরা হুজুগেই নাচি। কারণ ছাড়াই নাচি। একজন গান গেয়েছে, কাপড় খুলে নেচেছে আপনার ভালো লাগেনি ইগনোর করেন। তাকে এতো পাত্তা দেওয়ার কি আছে? কেন রে ভাই, একজন বিনোদন কর্মীর কি দায় পড়েছে আপনাকে শিক্ষা দেওয়ার। আপনার শিক্ষার ইচ্ছা, বই পড়েন। লাইব্রেরীতে হাজারে হাজারে বই। কয়টা পড়েছেন? গুগোল করে দেখুন শেখার জন্য পুরো দুনিয়াটাই পড়ে আছে। অজায়গা কুজায়গা থেকে শিক্ষা নেওয়া বন্ধ করেন। আর অযথা লাফালাফি বন্ধ করেন। শিল্পীকে তার স্বাধীনতাটুকু ভোগ করতে দিন। আপনিও আপনার স্বাধীনতা ভোগ করুণ। ভালো না লাগলে ইগোনর করুণ। যা ভালো লাগে তা নিয়ে কথা বলুন, তাই শুনুন। সেটাই উত্তম পন্থা।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close