বলিউডে কত তারকা এসেছেন, চলে গেছেন, ঝরে পড়েছেন অকালে, কতজন হারিয়ে গেছেন কতভাবে। কারো কথা লোকে মনে রেখেছে, কারোটা রাখেনি। কত অদ্ভুত গল্পের জন্ম দিয়েছেন বলিউড তারকারা, পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন সিনেমার বাইরের নানা কারণে; লোকজন গালগল্প করেছে সেসব নিয়ে, চায়ের কাপে উঠেছে ঝড়। পাড়ার মহিলারা একজন আরেকজনের সঙ্গে দেখা হলেই হয়তো চর্চা করেছেন সেসব নিয়ে, কলেজের উঠতি তরুণ-তরুণীদের গবেষণার বিষয়বস্তু হয়তো ছিল প্রিয় বা অপ্রিয় তারকার কাণ্ড-কারখানা। তবে হলফ করে বলা যায়, পারভিন ববিকে নিয়ে যতো গবেষণা লোকে করেছে, এমনটা বোধহয় বলিউডের আর কোন তারকাকে নিয়েই হয়নি। পারভিন ববি, বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া একটা নাম, আশির দশকে যারা হিন্দি সিনেমার ভক্ত ছিলেন, তাদের হৃদয়ে কাঁপন তোলা একটা নাম!

বলিউডে তাকে কেউ কেউ ডাকতো ‘গুজরাট কি গুড়িয়া’, যেটার বাংলা অর্থ গুজরাটের মেয়ে। গুজরাটে জন্ম বলেই এই নাম। জুনাগড় নামের শহরমতোন একটা জায়গায় এক মুসলমান পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। বাড়িতে পড়াশোনার কড়াকড়ি ছিল। পারভিন নিজেও ইংরেজীতে গ্র‍্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই খানিকটা ওয়েস্টার্ন ধাঁচের ফ্যাশন ট্রেন্ড অনুসরণ করতেন, বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় তারাও সেভাবে বাধা দিতেন না। বিয়ের চৌদ্দ বছর পরে তাদের ঘর আলো করে এসেছিলেন পারভিন, কিন্ত মাত্র দশ বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়েছিলেন তিনি।

মিডিয়ায় ক্যারিয়ার গড়ার ব্যপারে কিশোরী বয়স থেকেই আগ্রহী ছিলেন পারভিন। দেখতে সুন্দরী, দারুণ ফিগার, বেশ লম্বা- সব মিলিয়ে বলিউডের জন্যে পারফেক্ট প্যাকেজই ছিলেন তিনি। বিভিন্ন ম্যাগাজিনের সুন্দরী প্রতিযোগীতায় মাঝেমধ্যেই নিজের ছবিটবি পাঠাতেন। গুজরাটের পত্রিকায় হুটহাট দেখা মিলতো তার। এভাবেই একবার বোম্বের একটা ম্যাগাজিন থেকে ডাক এলো ফটোসেশনের, সেটা ১৯৭২ সালের কথা, পারভিনের বয়স তখন তেইশ বছর। প্রফেশনাল মডেলিঙের শুরুটা সেবছরই। তার আবেদনময়ী চেহারা বলিউডের লোকজনের নজরে আসতে দেরী হলো না। বলিউডে অভিষেক পরের বছর, ক্রিকেটার সেলিম দুররানীর বিপরীতে ‘চরিত্র’ নামের সিনেমা দিয়ে। ব্যবসায়িকভাবে ফ্লপ হয়েছিল সিনেমাটা, তবে দাগ কেটে রেখে গিয়েছিলেন পারভিন।

বলিউডে পারভিনের ক্যারিয়ার বেশীদিনের নয়, ক্যালেন্ডারের পাতায় হিসেব করলে সংখ্যাটা এগারো বছরের। অভিনয় করেছিলেন মোট সাতান্নটা সিনেমায়। এরমধ্যে দারুণ কিছু কাজ রয়েছে। ‘মজবুর’, ‘সুহাগ’, ‘কালা পাহাড়’, ‘নমক হালাল’, ‘অমর আকবর অ্যান্থনি’, ‘দিওয়ারে’র মতো সিনেমায় দেখা গেছে তাকে। সমসাময়িক নায়িকাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন; হেমা মালিনী, রেখা, শাবানা আজমী, জিনাত আমান, জয়া ভাদুড়ি বা রীনা রায়দের সঙ্গে একই কাতারে উচ্চারিত হতো তার নাম। তবে একটা জায়গায় বাকী সবাইকেই পেছনে ফেলেছিলেন তিনি বিশাল ব্যবধানে, সেটা ফ্যাশনে। তার ড্রেস সেন্স ছিল অসাধারণ, সেটা এখনকার ফ্যাশন স্পেশালিস্টরাও স্বীকার করেন। জিনাত আমানকে সেক্স সিম্বল ডাকা হতো সেই সময়ে, কিন্ত লোকে বলতো, পারভিন ববি বোরখা পরে সামনে এলেও নাকি জায়গাটা থেকে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করে!

পারভিন ববি, মহেশ ভাট, অমিতাভ বচ্চন, স্কিজোফ্রেনিয়া

ইংলিশ কিংবা দেশী, যেকোন স্টাইল, যেকোন ঘরাণার ফ্যাশনে তিনি ছিলেন মানানসই। সিনেমায় সাহসী পোষাকের প্রচলনটা পারভিন ববি আর জিনাত আমানের হাত ধরেই হয়েছিল। চরিত্রের প্রয়োজনে পোষাকের ব্যপারে আপত্তি ছিল না তার কখনোই, অভিনেত্রীদের সাহসী হতে হয়, এই বার্তাটা ওরা দুজনই ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সত্তরের দশকে।

পারভিন কখনও বিয়ে করেননি। ‘লাভ লাইফ’ ব্যপারটাও ভালো ছিল না তার জন্যে, বেশ ক’বার প্রেমে পড়েছেন, সম্পর্কে জড়িয়েছেন, কিন্ত টেকেনি একটাও। পরিচালক মহেশ ভাটের সঙ্গে তার প্রেমের কাহিনীটা বলিউডের মুখরোচক গল্পে পরিণত হয়েছিল। কিন্ত বেশীদিন টেকেনি সেটা, পারভিনের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক আচরণ দেখতে পেয়ে মহেশ সরে আসেন একটা পর্যায়ে, ফিরে যান তার স্ত্রীর কাছেই। এর আগে পারভিন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন সহ-অভিনেতা কবির বেদী আর ড্যানি ড্যাংজঙপা’র সঙ্গে।

১৯৭৯ সালের এক রাতে আচমকাই পারভিনের ফ্ল্যাটে অস্বাভাবিক একটা দৃশ্যের সম্মুখীন হয়েছিলেন মহেশ ভাট। ফ্ল্যাটের চাবি ছিল তার কাছে, ঢুকেই তিনি অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখলেন না। হাতড়ে সুইচবোর্ড খুঁজে বের করলেন, লাইট জ্বলে উঠতেই চমকে উঠলেন। ছুরি হাতে বেডরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন পারভিন ববি, মহেশকে দেখে খানিকটা আশ্বস্ত হলেন যেন। ফিসফিস করে বললেন, ওরা সবাই আমাকে মেরে ফেলার জন্যে খুঁজছে। ওরা কারা, সেই প্রশ্নের জবাব পেলেন না মহেশ।

কয়েকবার জিজ্ঞেস করেও ফল হলো না কোন। পারভিন যখন মিডিয়ায় কাজ শুরু করেছেন, তখন উগ্রপন্থী মুসলিম সংগঠনগুলোর নাম দিয়ে তার কাছে চিঠি পাঠানো হতো। একটা মুসলমান মেয়ে সিনেমায় অভিনয় করছে, আবেদনময়ী হিসেবে পুরো ভারত তাকে জানছে এটা হয়তো কট্টরপন্থী কেউ কেউ মেনে নিতে পারেনি। সেসব গল্প পারভিনের কাছে শুনেছিলেন মহেশ। ভাবলেন, সেসব কিছুই হবে হয়তো। কিন্ত এতবছর বাদে সেই উড়োচিঠিগুলোর ভয় কেন মাথায় আসবে, এটাও ভাবলেন আবার। কিন্ত কোন সমাধান পেলেন না।

কিন্ত মহেশ বুঝতে পারেননি, সে রাতের সেই আচমকা দৃশ্যটা আসলে বড়সড় একটা অঘটনের শুরু ছিল। এরপর থেকে নিয়মিতই ব্যপারগুলো ঘটতে শুরু করলো। কোন একটা ব্যপারে ভীষণ ভয়ে থাকতেন, কে বা কারা যেন তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে, তার পেছনে লেগে আছে বলে বারবার দাবী করতেন। কিন্ত বিশ্বাসযোগ্য কিছু বলতে পারতেন না আবার আশেপাশের মানুষজনকে ঠিকঠাক বোঝাতে না পেরে রেগেও যেতেন। একটা সময়ে এমন অবস্থা হলো, ঘর থেকে বের হওয়াই বন্ধ করে দিলেন। সিনেমায় তিনি চুক্তিবদ্ধ, নিয়ম করে শুটিঙে যেতে হয়, তার জন্যে সিনেমার শুটিং থেমে থাকে, শিডিউল ফাঁসানোর অভিযোগ আসতে থাকে তার বিরুদ্ধে। মহেশ তাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেলেন, রোগ ধরা পড়লো না, সবটাই হ্যালুসিনেশন বলে উড়িয়ে দিলেন চিকিৎসক।

পারভিন ববি, মহেশ ভাট, অমিতাভ বচ্চন, স্কিজোফ্রেনিয়া

তবে মহেশ ক্ষান্তি দিলেন না। পারভিন ববিকে তিনি নিজের চেয়ে বেশীই ভালোবেসে ফেলেছিলেন সেই সময়টায়। ভালোবাসার শক্তি তো দুঃসময়েই বোঝা যায়, মহেশ লেগে রইলেন। পরীক্ষায় ধরা পড়লো, প্যারানয়েড স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত পারভিন, একারণেই নিজের চারপাশের সবাইকে শত্রু ভাবেন তিনি। অনেক ডাক্তার দেখানো হলো, সবার এক কথা- ইলেক্ট্রিক শক ছাড়া এই রোগের চিকিৎসা নেই। মহেশ ভাট রাজী হলেন না এই প্রস্তাবে। পারভিনের সাবেক দুই প্রেমিক কবির বেদি আর ড্যানি ড্যাংজ্যাঙ্গপাও ওদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। মহেশকে পরামর্শ দিলেন, পারভিনকে আমেরিকায় নিয়ে যেতে।

অবস্থার আরও অবনতি হতে লাগলো দিনে দিনে। পারভিনকে খাওয়াদাওয়া করানোও মুশকিল হয়ে পড়লো, তার শুধু মনে হতো, কেউ খাবারের মধ্যে বিষ মিশিয়ে রেখেছে বুঝি! একারণে পারভিনের প্লেটের খাবার প্রথমে মহেশকে একটু খেয়ে দেখাতে হতো। অনেক কষ্টে তাকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে, ঔষধে কোন বিষটিষ নেই। বলিউড থেকে পারভিন তখন নিজেকে গুটিয়ে এনেছেন, সিনেমার কাজ করছেন খুব কম। সপ্তাহে পাঁচদিন ভালো থাকেন তো দুইদিন তাকে ধরেবেঁধে রাখা লাগে। ছায়ার মতো তার পাশে পাশে থাকেন মহেশ ভাট, বলা তো যায় না, কখন প্যানিক অ্যাটাক হয়!

কিন্ত এতসব করেও লাভ হলো না, একটা সময় মহেশকেই শত্রু ভাবা শুরু করলেন পারভিন। তার মনে হতে লাগলো, এই লোকটা সারাদিন আমার পেছনে লেগে থাকে কেন? নিশ্চয়ই আমাকে মারার ফন্দি আঁটছে ব্যাটা! পারভিনের চিকিৎসার দায়িত্বে যে মনোবিদ ছিলেন, তিনি তখন মহেশ ভাটকে পরামর্শ দিলেন কিছুদিন পারভিনের থেকে দূরে থাকতে। মহেশ তখন তার পরিবারের কাছে ফিরে এলেন। এতদিন পারভিনকে সময় দিতে গিয়ে সিনেমাকে ভুলেই ছিলেন। নতুন সিনেমার কাজে হাত দিলেন তিনি, নাম ছিল ‘অর্থ’। তার আর পারভিন ববির প্রেমের গল্পটাকেই একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছিলেন তিনি এই সিনেমায়। এটা ১৯৮২ সালের ঘটনা।

মাস কয়েক পর ব্যাঙ্গালোরের বাড়িতে ফিরলেন পারভিন, তার চিকিৎসা তখনও চলছে, তবে বেশ স্বাভাবিক তিনি তখন। খবর পেয়েই মুম্বাই থেকে ছুটে গেলেন মহেশ ভাট। দুজনে একসঙ্গে কাটালেন বেশ কিছুদিন। মহেশ তখন হয়তো কল্পনা করেননি যে, সুখের দিনগুলো খুব শীঘ্রই শেষ হতে যাচ্ছে। একরাতে অন্তরঙ্গ মূহুর্তে হুট করেই পারভিন মহেশকে উদ্ভট একটা পরিস্থিতিতে ফেললেন, বললেন, তার অথবা ইউজির(ইউজি কৃষ্ণমূর্তি, মহেশ ভাটের এক দার্শনিক বন্ধু) মধ্যে যেকোন একজনকে বেছে নিতে। মহেশ যদি ইউজির সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন, তাহলে পারভিন সেটা মেনে নেবেন না। মহেশের হুট করেই মনে হলো, অনেক হয়েছে, আর মেনে নেয়া যায় না, সবকিছুর একটা সীমা আছে। তিনি বেরিয়ে এলেন পারভিনের ফ্ল্যাট থেকে। মহেশ নিজের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সে রাতে নাকি পারভিন তাকে ডাকতে ডাকতে তার পেছনে ছুটে এসেছিলেন, একদমই বিবস্ত্র অবস্থায় ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন এই অভিনেত্রী।

পারভিন ববি, মহেশ ভাট, অমিতাভ বচ্চন, স্কিজোফ্রেনিয়া

সম্পর্ক চুকেবুকে যাওয়ার পরে পারভিন ১৯৮৩ সালে ভারত ছাড়লেন। কয়েকটা দেশ ঘুরলেন আধ্যাত্নিক শান্তির আশায়, পরে থিতু হলেন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেখানে পাঁচ বছর ছিলেন। তবে ঝঞ্ঝাটবিহীন ভাবে ছিলেন, এটা বলা যাবে না মোটেও। জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে একবার প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ছাড়া বিমানে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল তার, অসংলগ্ন কথাবার্তা শুনে তাকে পাঠানো হয়েছিল মানসিক রোগীদের হাসপাতালে। সেখানকার জেনারেল ওয়ার্ডে আরও ত্রিশজন রোগীর সঙ্গে রাখা হয়েছিল তাকে। কয়েকদিন সেখানে কাটাতে হয়েছিল তাকে, খবর পেয়ে আমেরিকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত নিজে এসে দেখা করেছিলেন তার সঙ্গে, পারভিনের ছাড়া পাবার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনিই। ১৯৮৯ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। এরমধ্যেও তার অভিনীত সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, যেগুলোর শুটিং হয়তো আগে করে গিয়েছিলেন তিনি।

ভারতে যখন তিনি পা রাখলেন, পারভিনকে তখন চেনা যায় না। মুটিয়ে গেছেন অনেকটা, সেই কমনীয়তা বিলীন হয়ে গেছে কোথায় যেন! তার আসার খবর পেয়ে সাংবাদিকেরা সাক্ষাৎকার নিতে ছুটে এলেন তার ফ্ল্যাটে। সেসব সাক্ষাৎকারে একেকটা বোমা ফাটালেন তিনি। সত্যি-মিথ্যা যাচাই করার সময় নেই, খবরের কাগজে শুধু শিরোনাম হচ্ছে- আজ পারভিন বলছেন, অমিতাভ বচ্চন তাকে খুনের চেষ্টা করেছেন, কাল বলছেন, অমিতাভ বচ্চন নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিশাল মাফিয়া ডন, কিছুদিন বাদে বলছেন, ১৯৯৩ সালের বোমা হামলার সঙ্গে সঞ্জয় দত্ত জড়িত, তার কাছে প্রমাণ আছে!

স্কিজোফ্রেনিয়ার সমস্যা তার যায়নি, সবাইকে তখনও সন্দেহ করতেন। সাংবাদিকেরা সাক্ষাৎকার নিতে এলে একটা রেকর্ডারে তিনিই উল্টো তাদের কথাবার্তা রেকর্ড করে রাখতেন। তাকে নিয়ে উল্টোপাল্টা কিছু লেখা হয়েছে শুনলেই সেই পত্রিকা আর সাংবাদিকদের ‘অমিতাভ বচ্চনের এজেন্ট’ নাম দিয়ে দিতেন তিনি। বিগ-বি’র ওপরে তার এত ক্ষোভের কারণটা কি ছিল কে জানে! অমিতাভের সঙ্গে তিনি আটটা সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন, ব্যবসায়িকভাবে সবগুলোই ছিল দারুণ সফল। সিনেমার শুটিং করতে গিয়েই দুজনের প্রেম হয়েছিল বলে গুজব আছে, তবে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আমেরিকা থেকে ভারতে ফিরে আসার পরে তো পারভিন একবার অভিযোগ করেছিলেন, অমিতাভের ভাড়া করা গুণ্ডারা নাকি একবার তাকে কিডন্যাপ করে কোন এক অজানা দ্বীপে নিয়ে গিয়েছিল, তার মুখে প্লাস্টিক সার্জারি করেছিল তারা, তার কানের নীচের অংশে নাকি একটা ডিভাইসও বসিয়ে দিয়েছে সেই লোকগুলো। নিদর্শন হিসেবে কানের নীচে একটা কাটা দাগ তিনি দেখিয়েছিলেন সবাইকে। পারভিনের দাবী ছিল, তার ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেয়ার জন্যেই নাকি অমিতাভ বচ্চন তার শরীরে সার্জারী করিয়েছিলেন। সেই ‘তথাকথিত’ সার্জারীর ফলেই নাকি তিনি এমন বেঢপ মুটিয়ে গিয়েছিলেন!

পারভিন ববি, মহেশ ভাট, অমিতাভ বচ্চন, স্কিজোফ্রেনিয়া

কার বিরুদ্ধে তার অভিযোগ ছিল না? ভারতের সরকার থেকে আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধান, সিআইএ থেকে মোসাদ, প্রিন্স চার্লস থেকে শুরু করে কেজিবি- সবাই নাকি তাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। একাধিকবার তিনি এসব নিয়ে কোর্টে পিটিশনও দায়ের করেছেন, প্রতিবারই খারিজ হয়ে গেছে তার আরজি। তিনকূলে আপন বলতে তেমন কেউ ছিল না তার, বাবার দিকের আত্নীয় স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না, কাউকে চিনতেনও না। আর তিনি সিনেমায় নাম লেখানোর পরেই মামা-খালারা ভুলে গিয়েছিলেন যে পারভিন নামে তাদের কোন ভাগ্নী আছে!

জীবনটা তার এভাবেই কেটেছে। কিছু মানুষ তাকে ঘৃণা করেছে, তার কথাবার্তা বা কর্মকাণ্ডে কেউ হেসেছে, কেউবা করুণার দৃষ্টিতে দেখেছে। মৃত্যুতেও তিনি কারো ভালোবাসা পাননি, সেই মৃত্যুটাও ছিল কি রহস্যময়, কত অবহেলা জড়িয়ে ছিল সেই মৃত্যুর সঙ্গে। ২০০৫ সালের বাইশে জানুয়ারী নিজের ফ্ল্যাটের ভেতরে তার মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। তিনটে দিন তার লাশটা পড়েছিল নিজের ফ্ল্যাটে, কেউ খবর নিতে আসেনি। দরজার সামনে তিনদিনের দুধের প্যাকেট, খবরের কাগজ এসব জমে থাকায় সন্দেহ হয়েছিল প্রতিবেশীদের। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে উদ্ধার করেছিল তার গলে যাওয়া মৃতদেহ। পায়ে ছিল ব্যান্ডেজ বাঁধা, পাশেই একটা হুইলচেয়ার। সম্ভবত সেটা থেকেই পড়ে গিয়েছিলেন পারভিন।

হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিলেন ডাক্তারেরা। পাকস্থলীতে মদ ছাড়া অন্যকিছু পাওয়া যায়নি। সন্দেহবাতিকগ্রস্থ হওয়ায় ঘরে একটা কাজের লোকও রাখতেন না তিনি। আচ্ছা, ঘরে একটা মানুষ থাকলে কি সেদিন বেঁচে যেতেন পারভিন? কেউ একজন হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারতেন তাকে, হয়তো তিনি বেঁচে থাকতেন আরও কিছুদিন। তবে মরে গিয়েই ভালো হয়েছে বোধহয়, বেঁচে থেকে তো মানুষের ঘৃণার পাত্র হওয়া ছাড়া আর কিছুই করছিলেন না। মানসিক সমস্যাটা তাকে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে দেয়নি এতগুলো বছর, বেঁচে থাকলে হয়তো আরও বেশী ভুগতে হতো।

জীবিত পারভিন ববিকে একটা সময়ের পরে সবাই এড়িয়ে চলেছে, মৃত্যুর পরেও কেউ এলো না তার দেহের সৎকার করতে। ভালোবাসার টানে ছুটে এলেন শুধু একটা মানুষ, তিনি মহেশ ভাট। তিনিই উপস্থিত থেকে পারভিনের দাফনের ব্যবস্থা করেন। আমেরিকায় গিয়ে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন তিনি, তবে তার শেষকৃত্য করা হয়েছিল মুসলিম রীতিতেই। পারভিন মারা যাওয়ার পরের বছরে মহেষ ভাট ‘ওহ লামহে’ নামের একটা সিনেমা প্রযোজনা করেছিলেন, অনেকেই জানেনা, সেটা ছিল পারভিনের সেমি বায়োগ্রাফি ফিল্ম।

পারভিন ববি, বলিউডের একটা অমীমাংসিত রহস্য হয়েই বেঁচে থাকবেন হয়তো চিরকাল, যে রহস্যের সমাধান করার সাধ্য নেই কারো।

তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া, ফ্যাশনটুডে ইন্ডিয়া

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-