একটি দেশের নিরাপত্তা হুমকি দু’ধরণের হতে পারে। একটিকে বলা হয়- ‘প্রচলিত নিরাপত্তা ভাবনা’, অন্যটিকে বলা হয়- ‘অপ্রচলিত নিরাপত্তা ভাবনা’। প্রচলিত নিরাপত্তা ভাবনা আমরা সহজেই বুঝতে পারি। সরাসরি সামরিক আগ্রাসন বা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যদি কোন দেশের যে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, সেটিকে প্রচলিত বা ট্রেডিশনাল নিরাপত্তা বলা হয়। অন্যদিকে পরিবেশগত বিপর্যয়, জ্বালানী সঙ্কট বা এমন ধরণের যে ঘটনা গুলো একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেললে তাকে অপ্রচলিত বা নন-ট্রেডিশনাল নিরাপত্তা বলা হয়। বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত নিরাপত্তাজনিত হুমকি যে একদম নেই, সেটা বলা যাবে না। তবে, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রে ‘অপ্রচলিত নিরাপত্তা’ হুমকিই সব থেকে বড় হুমকি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন দুটি অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে চিন্তা করা যাক।

অপ্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে কী কী বিষয় আসতে পারে? শুরুতে যেমনটা বলছিলাম- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশগত বিপর্যয়, জ্বালানী সঙ্কট, খাদ্য সঙ্কট, পানি সঙ্কট, মানবিক নিরাপত্তা- ইত্যাদি অপ্রচলিত নিরাপত্তা ভাবনার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এগুলোর মধ্যে সব থেকে বড় অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকি কোনটি? প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কথাই বলতে হবে। আমরা সবাই জানি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমগ্র পৃথিবীতেই যে পরিবর্তন সূচীত হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ গুলোর তালিকায় অন্যতম। সব থেকে দুঃখের ব্যাপার হল, এই জলবায়ু পরিবর্তন বা উষ্ণায়ন বা কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের কোন রকম ভূমিকা না থাকলেও, ফলাফল ভোগের ক্ষেত্রে সবার আগে আমাদেরকেই ক্ষতির শিকার হতে হবে! এর লক্ষণ হিসেবে লবণাক্ততার কথা বলা যেতে পারে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ইতিমধ্যেই মারাত্মক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত এবং ভবিষ্যতের জন্য অন্যতম মারাত্মক সমস্যাটি হচ্ছে জ্বালানী সমস্যা। একটি দেশের উন্নতির অন্যতম পরিমাপক হচ্ছে তাদের বিদ্যুতের ব্যবহার। আর এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমরা প্রধাণত খণিজ জ্বালানীর উপরেই নির্ভরশীল। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে খণিজ জ্বালানীর মজুদ শেষ হয়ে আসছে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক থেকে বাংলাদেশ এই মুহুর্তে সংকটজনক অবস্থায় থাকলেও, অর্থনৈতিক ভাবে বাংলাদেশের উন্নতি কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা। কিন্তু এই উন্নতি হঠাৎ করেই মুখ থুবড়ে পড়বে যদি চাহিদানুযায়ী বিদ্যুতের যোগান নিশ্চিত না হয়। হঠাৎ করেই বিশাল বিপর্যয়ের মুখে পড়বে আমাদের অর্থনীতি এবং তার সাথে সাথে অন্যান্য সেক্টর গুলো। সরকারের পরিকল্পনা প্রণয়নকারী এবং বিদ্যুৎ- জ্বালানী খাতে জড়িত যেকোন ব্যক্তিই এই হুমকির ব্যাপারটা জানেন। আরো ২০ বা ৫০ বছর পর দেশে বিদ্যুতের যে চাহিদা তৈরি হবে, সেটা যোগান দেয়ার পরিকল্পনা যদি এখন থেকেই না করা হয়, তবে মারাত্মক বিপর্যয়ের শিকার হতে হবে আমাদের।

মূলত একারণেই সরকারের অগ্রাধিকার পাওয়া বৃহৎ প্রকল্প গুলোর মধ্যে একাধিক বিদ্যুৎ-কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু দেদারসে বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছেনা। সেখানে আবার আমাদের সামনে চলে আসছে প্রথমে আলোচিত অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকি- পরিবেশ বিপর্যয়। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। তেল এবং গ্যাসও অফুরন্ত নয়। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন আমাদের করতেই হবে। এ এক অদ্ভূত জটিল উভয়সংকট। একারণেই সরকার ঝুঁকছে বিকল্প এবং কার্যকরী এক মাধ্যমের দিকে- পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প! তার আগে দেখে নেয়া যাক, নবায়নযোগ্য অন্য মাধ্যম গুলো আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে কোন ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা।

নবায়নযোগ্য অন্যান্য মাধ্যমের মধ্যে আছে- নদীর স্রোত, বায়ু এবং সূর্যালোক। আমাদের দেশে নদীর অভাব নেই, কিন্তু নদী থাকলেই যে জলবিদ্যুৎ তৈরি করা যাবে- এমনটা সত্যি নয়। নদীতে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ, স্রোতের গতিবেগ সহ আরো অনেক প্যারামিটার আছে যার উপরে এটা নির্ভর করে। বায়ুশক্তি বা সৌরশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রচুর জায়গার দরকার হয়,যেটা বাংলাদেশের নেই। বাংলাদেশে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত উন্মুক্ত প্রান্তর বা মরুভূমি নেই যেখানে এ ধরণের বিদ্যুত-কেন্দ্র নির্মাণ করা যেতে পারে। সরকার এবং বিভিন্ন এন.জি.ও-এর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য সোলার-প্যানেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলেও সেটা সীমিত গন্ডির মধ্যে সাধারণ গৃহস্থলির প্রয়োজন মেটাতেই সক্ষম, বৃহৎ আকারে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তার ভূমিকা খুব সামান্যই। তাই ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে, কয়লার মত ক্ষতিকর জ্বালানীর থেকে বরং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বেশি কার্যকরী।

আরও পড়ুন- ‘খাটের তলায় মুক্তিযুদ্ধ’ এবং একজন ‘ডিগবাজী’ খাওয়া বুদ্ধিজীবীর কথা…

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যে ঝুঁকি সেটাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। চেরেনোবিল বা ফুকুশিমার মত ঘটনা যদি এদেশে ঘটে, তাহলে মুহুর্তের মধ্যে আমাদের দেশ তেজস্ক্রিয় বোমায় পরিণত হবে। আমাদের এত ভূমি নেই যে, একটা বিশাল অংশকে আমরা পরিত্যক্ত করে রেখে দেব। এরকম কিছু ঘটলে পুরো বাংলাদেশটাই পরিত্যক্ত হয়ে যাবে! এছাড়াও আমাদের মত দেশের ক্ষেত্রে এই ধরণের প্রকল্পের অর্থের যোগানের ব্যাপারটাও গুরুত্বপূর্ণ। বলা হচ্ছে,রূপপুর পারমাণবিক প্ল্যান্টে প্রস্তাবিত তৃতীয় প্রজন্মের অত্যাধুনিক রিয়্যাক্টরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্বিতীয় প্রজন্মের রিয়্যাক্টরের (যেগুলো জাপানের ফুকুশিমা প্লান্টে ব্যবহৃত হয়েছিল) তুলনায় অনেক উন্নত, তাই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিরাপত্তার ঝুঁকিও অনেক কম। সেই সাথে, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে যে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হবে, সেগুলো রাশিয়াই নিয়ে যাবে বলে আমরা জেনেছি।

আবার তৃতীয় প্রজন্মের রিয়্যাক্টর ব্যবহৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল প্রায় ৬০ বছর যা অন্যান্য জ্বালানি নির্ভর উৎপাদন কেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে, প্লান্ট স্থাপনার প্রাথমিক ব্যয় বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক কম অপারেটিং খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অর্থনৈতিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ লাভজনক।বর্তমানে সমগ্র বিশ্বে ৪৫০ টি পারমাণবিক পাওয়ার-প্ল্যান্ট কার্যকর রয়েছে, নির্মাণাধীন রয়েছে আরো ৬০ টি। এর মধ্যে সব থেকে বেশি রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, এরপর ফ্রান্স,জাপান, রাশিয়া, কোরিয়া এবং ভারতে। এরমধ্যে ফ্রান্সের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৭২ ভাগ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে। নির্মাণাধীন ৬০ টির মধ্যে সব থেকে বেশি রয়েছে চীনে, এরপর রাশিয়া এবং ভারতে (তথ্যসূত্র- IAEA). এই পরিসংখ্যাণ গুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে যেসব দেশকে আমরা সুপার-পাওয়ার হিসেবে বিবেচনা করি (অর্থনৈতিক দিক থেকে) সেসব দেশে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পরমাণু বিদ্যুতের ব্যবহার এখনো অনেক বেশি। যদিও এদের অনেকের ভূমির পরিমাণ বেশি হওয়াতে অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তিগুলোকেও এরা কাজে লাগাতে পারে। আবার এদের অনেকে উন্নত দেশের সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করে এখন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জ্বালানী ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।

এই যখন অবস্থা, তখন বাংলাদেশের সামনে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়া আর কোন ভালো অপশন আছে কি? তবে আমাদের নিজেদের লোকজনদের তো আমরা চিনি! তাই দুশ্চিন্তা থেকেই যায় যে, দুর্নীতি, অসচেতনতা এবং অজ্ঞতার ফলে এরা কোন বড় ধরণের বিপর্যয় ঘটিয়ে ফেলবে না তো! ভূমিকম্প সহিষ্ণু প্রযুক্তি, তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত রি-অ্যাক্টর, রাশিয়ার পারমাণবিক বর্জ্য নিয়ে যাওয়া- সব কিছুর পরেও ঝুঁকির ব্যাপারটা মাথা থেকে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে হলে ক্রমাগত বিদ্যুতের যোগান দরকার, সেদিকে মনযোগী না হলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যেই বিশাল বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে। এরকম অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের আর কোন সহজ, নিরাপদ এবং গ্রহণযোগ্য উপায় আপনার জানা আছে কি?

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-