নাঈম অঙ্কন: মজা বা Fun আর শান্তি বা Peace সম্পূর্ণ আলাদা দুইটা জিনিস। কিন্তু আমরা এই দুইটার মধ্যে পার্থক্যটা অনেক সময়ই ধরতে পারি না। এজন্যই আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই অশান্তিতে ভুগি। আমি খুবই কম জানা একজন মানুষ। তাই আমার চিন্তার সাথে আপনাকে সহমত হতেই হবে এমন কোন কথা নেই। আপনি দ্বিমত হলেও কোন সমস্যা নেই, তবে আমার লেখা পড়ে আপনি মনে কষ্ট পেয়ে থাকলে তার জন্য আমি অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

Fun খুবই সহজলভ্য। টাকা খরচ করে বা ক্ষমতার জোড়ে Fun কেনা যায়। তবে আমার জন্য যেটা Fun, অন্যকারও জন্য সেটা বিরক্তির কারণও হতে পারে। যেমন ধরুন, কোন একটা বিশেষ দিন উপলক্ষে কোন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল একটানা তিন-চার দিন ধরে উঁচু ভলিউমে মাইকে দেশাত্মবোধক গান বাজালে এটা তাদের জন্য Fun. নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের Fun. অথচ এই দেশটা স্বাধীন করতে যেই মুক্তিযোদ্ধা নিজের শরীরে বুলেট খেয়েছিলেন, তিনি কিন্তু বর্তমানে অনেক বৃদ্ধ। তার কাছে কিন্তু একটানা তিনদিনের উঁচু ভলিউমের গান সহনীয় নয়। অসুস্থ তার বৃদ্ধ শরীরে ঘুম প্রয়োজন। অথচ তিনি ঘুমাতে পারেন না। প্যারাডক্স। একজন মুক্তিযোদ্ধা যখন দেশাত্মবোধক গানের অত্যাচারে নির্ঘুম জেগে থাকেন, তখন সেটা খুবই কষ্টকর একটা প্যারাডক্স।

আবার থার্টি-ফার্স্ট রাতের আমাদের পটকা-আতশবাজির শব্দেও কানে বালিশ চাপা দিয়ে ঘুমানোর আপ্রাণ ব্যার্থ চেষ্টা করেন কত শত বাবা। কারণ পরদিন সকালে আমাদের ঘুমানোর অবসর থাকলেও, বাবারা কিন্তু অফিসে যান। জ্বি। ঠিকই পড়ছেন। অনেক বাবারই বছরের প্রথম দিনটাও অফিস ছুটি থাকে না। এই বাবাগুলো অফিসে যান; আর আমরা উনাদের কষ্টের উপার্জনের টাকা দিয়েই পটকা কিনে তুমুল Fun করে উনাদেরই রাতভর যন্ত্রণা দেই। কী লাভ ভাই? বছরের প্রথমদিন এত fun করেও তো আপনারা অনেকেই peace এর দেখা পান না। বছরের বাকী ৩৬৪ দিন তো অশান্তির স্ট্যাটাসই পোস্ট করেন।

আমি নিজেও পটকা ও আতশবাজি পুড়িয়ে আনন্দ করার বিপক্ষে নই। আনন্দ করার প্রয়োজন আছে। খুব প্রয়োজন আছে। আমি কেবল মনে করি যে, যেকোন উদযাপন এমনভাবে অথবা এমন কোন নির্দিষ্ট স্থাণে হওয়া উচিত যেন তাতে করে অন্য মানুষের কোন অসুবিধা না হয়। আমি ৬ বছর প্রবাসে ছিলাম। আমি এমনকি ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডেও, থার্টিফার্স্ট উদযাপন যাদের কালচার, তাদেরকেও আবাসিক এলাকায় হইচই করে অন্যের ঘুম নষ্ট করতে দেখিনি।

আমার এমনিতে ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারে দাঁড়ি আছে। তার উপর আবার এতসব মাতব্বরি কথা বলে ফেললাম। তাই অনেকেই আমাকে “কাঠমোল্লা হুজুর কোথাকার” বলে গালি দিচ্ছেন। আমার তাতে কষ্ট নেই। আমার কষ্ট অন্য কোথাও। আমার কষ্ট হচ্ছে সারা রাত ধরে যখন দিনের পর দিন মাইকে ওয়াজ চলে। সেই ওয়াজের কারণে যখন আমার ধর্মভীরু নামাজি অসুস্থ দাদু ঘুমাতে পারেন না, তখন আমার কষ্ট হয়। আবারও প্যারাডক্স। ধর্মভিরু পাঁচওয়াক্ত নামাজি একটা মানুষ যখন ওয়াজের যন্ত্রনায় নির্ঘুম রাত কাটিয়ে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে ফজরের নামাজ মিস করেন, তখন সেটা খুব কষ্টের একটা প্যারাডক্স। আবারও বলছি, আমি ওয়াজেরও বিপক্ষে নই। আমি জাস্ট অন্য মানুষের যন্ত্রণা সৃষ্টি করে চালানো ওয়াজের বিপক্ষে। মনে রাখতে হবে যে, শহর পুড়লে দেবালয় অক্ষত থাকে না।

এবারে Peace এর কথা বলি। Peace খুব একটা সহজলভ্য নয়। টাকা দিয়ে peace কেনা যায় না। তবে সাধনা করলে peace পাওয়া যায়। সাধনাটা হচ্ছে, আরেকজনের জন্য ঝামেলা তৈরি না করার সাধনা। সাধনাটা হচ্ছে, খুবই খুবই সিম্পল লাইফস্টাইল নিজের ভেতর ধারণ করার সাধনা। মনে রাখবেন, Peace ই আমাদের আল্টিমেট চাওয়া।

May the peace be upon all. সবার ওপরে শান্তি বর্ষিত হোক। আসসালামু আলাইকুম। শুভ নববর্ষ ২০১৮।

Comments
Spread the love