তিনি একজন সাংসদ, সেইসঙ্গে যোগ্যতাবলে একটি শীর্ষস্থানীয় ঔষধ প্রস্ততকারী সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর, রাজনৈতিক পদাধিকার বলে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট, বলা হচ্ছে নাজমুল হাসান পাপনের কথা। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার কাছে চট্টগ্রাম টেস্টে হারের পর টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম সাংবাদিকদের কাছে জানিয়েছিলেন, দলে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে ঠিকঠাক অবগত নন তিনি। আর সেই প্রসঙ্গেই মাইক্রোফোনের সামনে পাপন মেতে উঠেছিলেন মুশফিকের কড়া সমালোচনায়।

নাজমুল হাসান পাপন মূলত ক্রিকেটের মানুষ নন, বিসিবি সভাপতির চেয়ারে বসার আগে খেলাটা নিয়ে খুব একটা খোঁজখবর রাখতেন, তা আমাদের জানা নেই। এখনও যে মাঠের ক্রিকেটটা খুব ভালো বোঝেন তিনি, এমনটাও নয়। নিউজিল্যান্ডে সাকিবের ডাবল সেঞ্চুরীকে দেড়শো আর পঞ্চাশে ভাগ করার কথাটা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। তবে একটা কাজ তিনি ভালোই পারেন, মিডিয়ার সামনে ক্রিকেটারদের বিপক্ষে সরাসরি সমালোচনায় মুখর হতে। এর আগে তাঁর সমালোচনায় জর্জরিত হয়েছেন নাসির হোসেন, সাকিব আল হাসান; এবার মুশফিকুর রহিমও রেহাই পাননি তার তীর্যক বাক্যবাণ থেকে।

সাংবাদিকদের সামনে পাপন প্রথমেই বলেছেন-

“সমস্যা মুশফিকের। এছাড়া আমার আর কিছু বলার নেই। মাশরাফি ক্যাপ্টেন্সি করে না? ও কখনও এরকম সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। সাকিবকে দেয়া হয়েছে টি-২০, হি উইল নেভার ফেস, আমি লিখে দিতে পারি।”

এখানে জাতির বিবেকের কিছু বলার আছে। দলের সর্বেসর্বা সবকিছুই এখন কোচ। স্রষ্টার ইচ্ছে ছাড়া যেমন গাছের একটা পাতাও নড়ে না, বাংলাদেশ দলেও হাতুড়ুসিংহের ইচ্ছে বা অনুমোদন ছাড়া কিছুই ঘটে না। কে খেলবে কে খেলবে না, স্কোয়াডে কে থাকবে কে থাকবে না এসব তো বটেই, কে কোন পজিশনে ব্যাটিং করবে সেসবও তিনিই ঠিক করে দেন বলেই গুজব। মুশফিক বলেছেন তিনি দলে নিজের ভূমিকা খুঁজে পাচ্ছেন না। কথাটায় ভুল কিছু আছে? তার কিপিং নিয়ে আছে সমালোচনা, রক্ষণাত্মক অধিনায়কত্বের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তো অহরহই পড়ছে ম্যাচে, ব্যাটসম্যান হিসেবেও নামছেন ছয়ে। মুশফিক আসলে কে? ব্যাটসম্যান নাকি কীপার-ব্যাটসম্যান? অধিনায়ক হিসেবে মাঠে এবং মাঠের বাইরে যে সিদ্ধান্তগুলো তার নেয়ার কথা, সেগুলোয় শতকরা কয়টা মুশফিকের মাথা থেকে আসছে, কয়টা কোচের চাপিয়ে দেয়া- কেউ প্রশ্ন তুলেছে কি? অধিনায়কত্ব ব্যপারটা মুশফিক উপভোগ করতে পারছেন কিনা, নাকি সেটা তার গলায় ফাঁস হয়ে চেপে বসছে, সেটা জানতে চেয়েছেন কেউ? যত দোষ সবই কি মুশফিক ঘোষ?

ব্যাটিং অর্ডারের ওলট-পালট প্রসঙ্গে নাজমুল হাসান পাপন বলেছিলেন- “আগের দিনও আমি খবর পাঠিয়েছি মুশফিককে চারে নামতে।” একটা টেস্ট ম্যাচ চলাকালীন এই আদেশ দেবার অধিকার কি জনাব নাজমুল হাসান পাপন কিংবা কোন বোর্ড প্রেসিডেন্টের আছে? দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের দল নির্বাচনের জন্যে গতকাল নির্বাচক-কোচ-অধিনায়ক সহ বিসিবির কর্তারা হাজির হয়েছিলেন সভাপতির বাসভবনে। দল ঘোষনার জন্যে নির্বাচকদের রাখা হয়েছে কেন তবে? বিসিবির কোন কর্তা বা নাজমুল হাসান পাপন কি দিনের পর দিন বিকেএসপি বা অন্যান্য ভেন্যুতে বসে প্রথম শ্রেণীর ম্যাচের একটা দিন পুরো দেখেছেন? তাহলে দল নিয়ে মাতামাতিতে বোর্ড প্রেসিডেন্ট বা বিসিবি কর্তাদের কাজ কি? সর্ব কাজের কাজী হয়ে সবকিছু যদি প্রেসিডেন্টকেই করতে হয়, তাহলে বাকীদের পেছনে শুধুশুধু বেতন খরচা কেন করছে ক্রিকেট বোর্ড?

তিনি আরো বলেছেন- ম্যাচের প্রথম দিন শেষেই সাকিব-মিরাজ-তাইজুলদের সঙ্গে আমি বসেছি, স্ট্র‍্যাটেজি নিয়ে আলাপ করেছি। খেলার সময় আমরা সাজেশান দেই, অনেকেই সাজেশান দেয়…” এরচেয়ে হাস্যকর ব্যপার আর কি হতে পারে? একটা আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ চলছে, এরমধ্যে কোন দলের বোর্ড প্রেসিডেন্ট এসে খেলোয়াড়দের ‘স্ট্র‍্যাটেজি’ বাতলে দিচ্ছেন বলে কম্মিনকালেও শোনেনি কেউ! সাকিব-মিরাজ-তাইজুলদের কি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা নেই? তাঁরা কি এই প্রথম ক্রিকেট খেলতে নেমেছেন? আর স্ট্র‍্যাটেজি ঠিক করার দরকার হলে সেটার জন্যে কোচ আছেন, অধিনায়ক আছেন, খেলোয়াড়েরা আছেন। আপনার তো এই কাজ করার কথা নয়। স্ট্র‍্যাটেজি যদি আপনাকেই ঠিক করে দিতে হয়, এত বেতন, এত তোষামোদ করে কোচ রাখা হয়েছে কিজন্যে? সবাই সাজেশান দেয় কথাটার মানে কি? অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট বাগধারাটি ভুলে গেলে দলের ধ্বংসই অনিবার্য।

মাইক্রোফোন সামনে পেলে তিনি অনেককিছুই বলে ফেলেন, সবটা বলা ঠিক হচ্ছে কিনা এমনটাও ভাবেন না বোধহয় অনেক সময়। নইলে মুশফিককে নিয়ে তার এমন কঠোর সমালোচনা পত্রিকার পাতায় ঠাঁই করে নিতো না, সামাজিক যোগাযোগনাধ্যমে সমালোচনার বিষয়বস্তুও হতো না। কি বলা দরকার, কতটুকু বলা দরকার এই পরিমিতিবোধটা তার কাছে আমরা আশা করি, খেলোয়াড়েরা আশা করে, কারণ অফিশিয়ালি নাজমুল হাসান পাপনই তাদের অভিভাবক। তিনি ওদের বকতে পারেন, ধমক দিয়ে দুটো কথাও বলতে পারেন, কিন্ত সেটা জনসম্মুখে নয়। মুশফিক বাংলাদেশের টেস্ট ক্যাপ্টেন, কারো হাতের পুতুল বা পায়ের ফুটবল নন যে ইচ্ছে হলেই আছাড় দিলাম, মন চাইলো লাথি মারলাম। টেস্ট ক্যাপ্টেনের সম্মানটা বাকী দেশগুলো, তাদের বোর্ড কিভাবে দেয় সেটা একটু খোঁজ নিয়ে দেখা উচিত তার।

এখন তিনি সবকিছুই অস্বীকার করছেন, তবে আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে কিছু একটা বলে সেটাকে অস্বীকার করাটা বোকামী, সবকিছুই রেকর্ড করা থাকে। হয়তো বোর্ড প্রেসিডেন্ট মুশফিকের অধিনায়কত্বে অসন্তুষ্ট, হতেই পারে এমনটা। মুশফিক যে খুব আক্রমণাত্নক মানসিকতার অধিনায়ক তেমন কিছুই নয়। মুশফিককে সরিয়ে দেয়ার কথাও বিসিবির চিন্তাভাবনায় থাকতে পারে। কিন্ত সেরকম কিছু হলে সেই সিদ্ধান্তটা মুশফিককে জানিয়েই নেয়া হোক। এর আগে মুশফিককে ওয়ানডে অধিনায়ক থেকে সরিয়ে দেয়ার কথাটাও কষ্ট করে তাকে জানাতে পারেনি বোর্ড। সংবাদমাধ্যম থেকেই খবর পেয়েছিলেন মুশফিক, তিনি আর ওয়ানডে অধিনায়ক নন। তেমন কিছু আর কখনোই না হোক।

টেস্ট ক্যাপ্টেন হাতের মোয়া নন, যে চাইলেই খেয়ে নিয়ে একগ্লাস পানি গিলে ফেললাম। তাকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়া বোর্ডের দায়িত্ব, দল নির্বাচন ও পরিচালনায় তার সর্বোচ্চ অধিকার নিশ্চিত করা বোর্ডের কর্তব্য। কিন্ত আফসোস, আমাদের বিসিবি উল্টো পথেই হেঁটে গেল সবসময়! আমরা ক্রিকেট ভক্তরা চাই যার যা দায়িত্ব সেটা সে পালন করে যাক। কেউ সব ব্যপারে নাক গলাবে, আর কেউ নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকবে, সেটাও আমরা চাই না।

Comments
Spread the love