১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৬ বছরের পুরা ঝড়টা গিয়েছে ইউরোপের উপর দিয়ে এবং দুইটা বিশ্বযুদ্ধেই সবচেয়ে বড় পার্ট ছিলো জার্মানির। তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়েছে ইচ্ছা করে আর মোটামুটি জোর করেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধিয়েছে (অনেকেই মজা করে বলে যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধটা হচ্ছে না কারণ জার্মানি ঠাণ্ডা আছে!) 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকে জোসেফ স্টালিনের সাথে ‘একে অপরকে আক্রমণ করবো না’-এর মতো অলিখিত চুক্তি করে যৌথবাহিনী দিয়ে পোল্যান্ডের কাতিনসহ পুরা ইউরোপে লক্ষ লক্ষ ইহুদি ও সাধারণ মানুষ হত্যা, পুরা ইউরোপ দখল করে নেয়ার হিটলারের স্বপ্ন প্রায় সফল হয়েই যাচ্ছিল। কিন্তু যুদ্ধে একের পর এক সাফল্য হিটলারকে করে তোলে অতি-আত্মবিশ্বাসী, স্টালিনের সাথে রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভুলে সে আক্রমণ করে বসে সোভিয়েত ইউনিয়নকে। যুদ্ধে হারের মুখ দেখা শুরু হয় প্রবল পরাক্রমশালী নাৎসি বাহিনীর এবং দেড় বছরের মধ্যে করুণ পরাজয়। বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে জার্মানি কতটা কোণঠাসা হয়ে গিয়েছিল তার একটা ছোট্ট উদাহরণ হলো- পুরো বিশ্বযুদ্ধেই অক্ষত থাকা হিটলারের বার্লিনে শেষ ১ বছরে প্রায় ৬৯ হাজার টন(!) বোমা ফেলে ‘এ্যালায়েড ফোর্স’!

বিশ্বযুদ্ধ শেষে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) মিলে প্রথমে ১৯৪৫-এ ‘পোষ্টডাম কনফারেন্স’ এবং পরে ১৯৫৭-এ ‘প্যারিস শান্তি চুক্তি’ অনুযায়ী ঠিক করে জার্মানি, ইতালি আর জাপান ক্ষতিপূরণ দিবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিপূরণ দিবে জার্মানি, তারপর ইতালি আর জাপান। কোন দেশকে কে কত টাকা ক্ষতিপূরণ দিবে সেটা ঠিক করা হয় সেই দেশে যুদ্ধের ফলে কি পরিমাণ বাড়িঘর/রাস্তাঘাট/ব্রিজ নষ্ট করা হয়েছে, প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট হয়েছে এবং কি পরিমাণ মানুষ মারা হয়েছে (মানুষের জীবনের দাম টাকা দিয়ে মাপা সম্ভব না!) সেই অনুযায়ী। এবং এটা ঠিক করে জয়ী পক্ষ। সেই হিসাব অনুযায়ী ২০০৪ সাল পর্যন্ত জার্মানি শুধু পোল্যান্ডকেই দিয়েছে ৫২৫ (মতান্তরে ৬৪০) বিলিয়ন ইউরো, গ্রীসকে ২৭৯ বিলিয়ন ইউরো (১৯৯০ সাল পর্যন্ত)। ইহুদি হত্যার ক্ষতিপূরণ হিসাবে ইসরায়েলকে কত বিলিয়ন দিয়েছে, সেটা এখনো অজানা।

জার্মানি যে কাজটা ইউরোপে করেছে ৫/৬ বছরে, সেই একই কাজ আমাদের সাথেও হয়েছে। মাত্র ৯ মাসে ৩০ লক্ষ মানুষ মারার রেকর্ড পৃথিবীর আর কোনো যুদ্ধে নাই। এটা করেছে পাকিস্তান। সেই সময়ে পাকিস্তানের মূল আয়ের উৎস ছিল পাট, যার পুরোটাই উৎপাদন হতো পূর্ব পাকিস্তানে। প্রধান কল-কারখানা সব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে আর পুর্ব পাকিস্তানে যা ছিল সেগুলোরও মুনাফা যেতো পশ্চিম পাকিস্তানে। এতো কিছুর পরও সম্ভবত ২০১০ (বা কাছাকাছি) সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার দায়ে পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে “ক্ষমা চাওয়া”র প্রস্তাব দেয়া ছাড়া আমরা আর কিছু করি নাই, কখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে বলি নাই আমাদের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, চাইও নাই কোনোদিন।

সেই পাকিস্তান আজকে আমাদের কাছে ৭০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চায়! কোথায় যাব! ওরা একবারও ভাবে নাই যে এখন আমরা যদি ২০১৬ সালে এসে পাকিস্তানের কাছে ৭১’র গণহত্যা, রাস্তাঘাট/সেতু নষ্ট করা এবং পুরো দেশটাকে একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার জন্য ক্ষতিপূরণ চাই (এ্যাসেট ভ্যালুয়েশনের মাধ্যমে সেটা করা সম্ভব), তাহলে যে টাকাটা আসবে সেটা তো পাকিস্তানকে বিক্রি করে দিলেও শোধ করা যাবে না!

অনেক হয়েছে, ইনাফ ইজ ইনাফ। রাষ্ট্রীয়ভাবে পাকিস্তানের কাছে ৭১’র জন্য ক্ষতিপূরণ চাওয়া এবং কড়ায়-গন্ডায় সেটা আদায় করার সম্ভবত এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। সরকার কি বিষয়টা ভেবে দেখবে?

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-