অনেক সময়েই আমাদের মুরুব্বী বা তরুণদের মধ্যে এক শ্রেনীকে বলতে শুনি, পাকিস্তান আমলই তো ভালো ছিল, একাত্তরের যুদ্ধ না হলে আজ আমরা পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবেই ভালো থাকতাম। অনেক মুরুব্বী গোত্রের মানুষজন তো রীতিমত দীর্ঘশ্বাস ফেলেন! “আইয়ুব খানের আমলই ভালা আছিল, যা উন্নয়ন হওয়ার তখনই হইছে”, “আইয়ুব খান খুব কড়া লোক ছিল, ডান্ডা দিয়া সব সোজা রাখতো” এমন বাহারি প্রশংসা বাণী ঝরে পড়ে তাদের মুখে। পাকিস্তান নামের একটা গণহত্যাকারী নির্লজ্জ জঙ্গীবাদের আঁতুড়ঘরের জন্য কষ্টে তাদের বুক ফেটে যায়।

এদের কথাবার্তা শুনি আর অবাক হয়ে ভাবি, কিভাবে এই দেশটা স্বাধীন হলো? একটা দেশের বিশাল অংশের মানুষ যেখানে আজও তাদের বাপ-মা, ভাই-বোন, স্বজন-স্বজাতির খুনী জালিম নরপিশাচদের জন্য কান্নাকাটি করে, বংশপরিক্রমায় পাকিস্তানপ্রেম লালন করে হৃদয়ে, আফসোস করে কেন পাকিস্তান ভেঙ্গে গেল, সেখানে সেই দেশের স্বাধীন হওয়া কতটা কঠিন ছিল? কতটা অসম্ভব ছিল? এরা কি জানে তাদের গাদ্দার বাঙ্গালী ভাইয়েরা, যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সেই কঠিন সময়ে বেইমানী করে পাকিস্তানীদের সাথে হাত মিলিয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গণহত্যা চালিয়েছিল, যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর পেয়ারা পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল জন্মভূমিকে পায়ে দলে, তারা এখন কি জঘন্য নোংরা আর নির্লজ্জ জীবনযাপন করছে? তাদের বেইমানীর মাশুল তারা আজ ৪৭ বছর ধরে কিভাবে দিচ্ছে? জানে এরা?

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে দালালী করবার পর যারা স্বাধীন বাংলাদেশকে অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানের নাগরিক হতে পাকিস্তানের ফিরে গিয়েছিল, সেই বেঈমানেরা আজ ৪৭ বছর পরেও পাকিস্তানের নাগরিকত্ব পায়নি। শিক্ষা, চিকিৎসার মত মৌলিক সুযোগ-সুবিধাগুলো কখনোই না পাওয়া এই বেঈমানেরা বাস করে পাকিস্তানের সবচেয়ে জঘন্য আর নোংরা এলাকাগুলোতে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো যে পাকিস্তানের জন্য তারা একাত্তরে নিজের দেশের সাথে, রক্তের সাথে, স্বজাতির সাথে বেইমানী করেছিল, যে পাকিস্তানের মন জয় করার জন্য, নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য তারা গত ৪৭ বছর ধরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষেদাগার আর চক্রান্ত চালিয়েছে, সেই পাকিস্তানী সরকার এতদিন তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করলেও অতি সম্প্রতি তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বিবেচনার ঘোষণা দেয়। আর সাথে সাথে পাকিস্তানের বিভিন্ন দল এদেরকে নাগরিকত্ব দেয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভে নামে। তাদের একটাই কথা— বেইমানদের নাগরিকত্ব দেওয়া যাবে না। পাকিস্তানের জনগণ শত হলেও বেইমান চেনে, মজার ব্যাপার না?

পাকিস্তানপ্রেমী এই বেইমান বাঙালির সংখ্যা বর্তমানে ২৮ লাখ। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে করাচির ১০৫টি বসতিতে। ওরাঙ্গি টাউন, ইব্রাহিম হায়দারি কলোনি, বিলাল কলোনি, জিয়াউল হক কলোনি, মূসা কলোনি, মাচার কলোনি এবং ল্যারির বাঙালি পাড়ায় বাঙালি বসতি সবচেয়ে বেশি। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হচ্ছে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের মুহুর্তে পাকিস্তানের বর্তমান ভূখণ্ডের বাইরে থেকে যারা এসেছিল, তাদের বলা হয় মুহাজির। এই মুহাজিররা পাকিস্তানের জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। এদের রাজস্থানী, কনকানি, মারাঠী, হায়দরাবাদী বংশোদ্ভূত মুহাজিরদের বেশিরভাগেরই অবস্থান সিন্ধ প্রদেশে। এই জাতিগোষ্ঠীরাও নিপীড়িত, তবে পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের একটা বড় অংশ এই মুহাজিরদের সহর্মমিতার চোখে দেখলেও, তাদের প্রতি একটা সদ্ভাব বজায় রাখলেও একাত্তরে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা বেইমান বাঙালিদেরকে দেখা হয় চরম অপমানের চোখে। পাকিস্তানের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জনগোষ্ঠী হচ্ছে বাঙ্গালী।

পাকিস্তানি গণমাধ্যম দ্য ডনের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, শুধু করাচিতেই তিন লক্ষেরও বেশি বাঙালি বসবাস করে। তাদের বেশিরভাগ পোশাক শ্রমিক হিসেবে এবং বাসাবাড়িতে কাজ করে। এছাড়া তাদের একটা বড় অংশ খুবই নিম্নমানের কাজ করে জীবনধারণের জন্য। এদের প্রায় সবারই পূর্বপুরুষ একাত্তরে তৎকালীন পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াত ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ ধর্ম ব্যবসায়ী বেইমান দলের পাশাপাশি চীনপন্থী কিছু বাম দল দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানীদের সাথে মিলে। সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙ্গালীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পালিয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য, বাকিরা যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানীদের বন্দী দশা থেকে মুক্ত হয়ে জন্মভূমিতে ফেরেন। কিন্তু বাঙ্গালীদের একটি বেইমান অংশ পাকিস্তান প্রেমে মশগুল হয়ে ভুলে যায় নিজ দেশকে। তারা একাত্তরেও পশ্চিম পাকিস্তান জুড়ে প্রচারণা চালিয়েছিল যে পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের দালালেরা পাকিস্তানের বীর সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ চালাচ্ছে, পাকিস্তান ভাঙ্গার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে পাকিস্তানীরা হেরে যাওয়ার পর শুরু হয় তাদের বাংলাদেশবিরোধীতার দ্বিতীয় পর্ব।

পাকিস্তানিদের মন জয়ে, পাকিস্তানের নাগরিকত্বের লোভে এরা বাংলাদেশের দুর্নাম করতে থাকে। এরা সবচেয়ে বাড়ে ২০১৩ সালে একাত্তরের নরপিশাচ আলবদর, আলশামস, রাজাকারের বিচারের রায় কার্যকরের মুহুর্তে। জ্বি, ঠিক ধরেছেন, ছাত্রসংঘের প্রধান, আলবদর কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসীর বিরোধিতা করে পাকিস্তানে যে প্রতিবাদ মিছিল আর সভা-সমাবেশ হয়েছিল, তার একয়টা বড় অংশের নেতৃত্ব দিয়েছিল এই বেইমান বিশ্বাসঘাতকগুলো। এখনো এরা নিয়মিত বাংলাদেশবিরোধী সভা-সমাবেশ করে গেলেও তাদের পাকিপ্রভুদের মন গলাতে পারেনি, সামান্য নাগরিকত্বটুকুও জোটেনি আজো। বেইমান বলে কথা, নিজের দেশের সাথে, মাটির সাথে বেইমানি করা এই নির্লজ্জ বিশ্বাসঘাতকদের একটা ফুটো পয়সা দিয়েও বিশ্বাস করে না পাকিস্তানীরা।

এই দীর্ঘ বেইমানীর মাশুল তারা গুনছে খুবই জঘন্যভাবে। দ্য ডন এর একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, নাগরিকত্ব না থাকায় এবং কোন বৈধ ডকুমেন্ট না থাকায় কোন ব্যবসা বা কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারে না এই বাঙ্গালিরা। এমনকি কেউ কেউ গোপনে কাজ করলেও পুলিশের হাতে ধরা খেলে থাকতে হয় কারাগারে। 

স্রেফ ভাবুন তো! আপনি কোন চাকুরী করতে পারবেন না, কোন ব্যবসা করতে পারবেন, কোন সম্মানজনক কাজ করবার সুযোগ পাবেন না, বরং যদি লুকিয়ে করতে গিয়ে ধরা পড়েন, তাহলে আপনার সরাসরি জায়গা হবে কারাগারে। অদ্ভুত না? নিম্নমানের কাজ করা এসব বাঙালিকে পরবর্তীতে ছেড়ে দিলেও তাদেরকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। পাকিস্তানপ্রেমী এই বাঙালিদের চলাফেরা এবং সাধারণ কাজ কর্ম করা জন্য ‘ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড’ নামের অস্থায়ী একটি কার্ড দেয় সরকারি দপ্তর। খুব চড়া দামে প্রাপ্ত এ কার্ডও সকলের ভাগ্যে জোটে না।

এসব বাঙালিকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার বৈধতা দিলেও সে কাগজপত্র আর পুনরায় বৈধ করা হয়নি। এছাড়া পাকিস্তানের জাতীয় তথ্য রেজিস্ট্রি দপ্তর (এনএডিআরএ) পুরোনো এ কার্ডের বৈধতার নবায়ন করতে রাজি নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। এনএডিআরএ থেকে বলা হয়, তাদের কার্ড নবায়ন করা হবে না। কারণ তারা বাংলাদেশি, পাকিস্তানি নয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এরপরেও এদের কোন আফসোস নেই, এখনো এরা জোর গলায় বলে, একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে এরা ঠিক কাজই করেছিল। এখনো তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে পাকিস্তানী সাজার, পাকিস্তানের নাগরিক হওয়ার! কি অমর ভালোবাসা! আহা!

অথচ পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ কোনভাবেই ভুলতে পারে না কতটা নিমকহারাম আর বিশ্বাসঘাতক এরা। তাই গত বছর পাকিস্তানের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এই বাঙালিদেরকে স্থায়ী নাগরিকত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রচন্ড প্রতিবাদের সম্মুখীন হয়। রাজণইতিক দলগুলো বিশেষ করে সিন্ধি রাজনৈতিক দলগুলো প্রবল প্রতিবাদ জানায়, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরেও করাচিতে প্রেস ক্লাব অভিমুখে বিক্ষোভ করে ‘জয় সিন্ধ মাহাজ’ নামে একটি দল। বাঙালিদের বৈধকরণের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে দলটির প্রধান আবদুল খালিক জুনেজো বলে, ‘সরকারের উচিত এদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া এবং তার আগে নিশ্চিত করা যে, তারা যেন ভোট দিতে বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য অধিকার ভোগ করতে না পারে।’

আচ্ছা, ভাবুন তো একবার, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কোনভাবে যদি বাঙ্গালিরা জিততে না পারতো, তাহলে আমাদের অবস্থা কি হতো? যেই পাকিস্তানে গত ৪৭ বছর ধরে পাকিস্তানীদের মন জয় করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসার পরেও, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ, বিষেদাগার করে আসার পরেও, মনে-প্রাণে পাকিস্তান ধারণ করার পরেও যেখানে লাখ লাখ বাঙ্গালী নিকৃষ্ট দাসের চেয়েও অধম জীবনযাপন করছে, সেই পাকিস্তানে আমরা যারা “পাকিস্তান থাকলেই ভালো হইত, আইয়ুব খানের আমলই ভালো ছিল” বলে হাহাকার করি, আমাদের কি দশা হত? আমরা পাকিস্তানে কি হিসেবে বিবেচিত হতাম? যেখানে আমরা একাত্তরে পাকিস্তানী নরপিশাচদের পক্ষ নিয়ে লাখ লাখ বাঙ্গালীকে নির্বিচারে জবাই আর গণহত্যা চালানোর পরেও বিহারীদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছি, খাস্য-পানি-চিকিৎসা-শিক্ষার মত মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করে মেইনস্ট্রিম বাঙ্গালীদের সাথে মিশে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছি, এমনকি রাজনৈতিক বিবেচনায় এই নরপিশাচদের বাংলাদেশের নাগরিকত্বও দিয়ে দিয়েছি, সেখানে পাকিস্তানের জণগণ ও সরকার আজো বাঙ্গালীদের নিন্মস্তরের ড্রেনের কীট ছাড়া আর কিছু ভাবে না!

বলুন তো, একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশ না হলে আজ পাকিস্তানে আপনি কতটা নিকৃষ্ট বেইমান হিসেবে বিবেচিত হতেন? পাকিস্তানী ভাইদের জন্য হাহাকার করা আগে, পাকিস্তান প্রেমে দিওয়ানা আর মশগুল হবার আগে এই কথাটা ভেবেছেন কখনো?

তথ্য ও ছবি কৃতজ্ঞতাঃ 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-