সিনেমা হলের গলি

এই পদ্মাবত একান্তই বানসালীর

সঞ্জয় লীলা বানসালির পদ্মাবত না মিথিক্যাল রানী পদ্মিনীর কোন গল্প নাইবা মালিক মুহাম্মদ জায়সীর পদ্মাবত থেকে নেয়া কোন কল্পকথা। রতন সিং ছিলেন, আলাউদ্দিন খিলজী ছিলেন, মালিক কাফুর, জালালুদ্দিন, আমীর খসরু সাহেবও ছিলেন কিন্তু ছিল না আরও অনেক কিছুই। ইতিহাস থেকে ঝট্য পালি, কমলা দেবী ছিল না; আলাউদ্দিনের অন্যান্য স্ত্রীরা। মালিক কাফুর আরও আগে থেকে ছিল, আলমাস বেগ ছিল না, রতন সিং এর স্ত্রী পদ্মিনী ছিল পদ্মাবতী না, আদতে পদ্মিনী ছিল না কিনা তাও নিশ্চিত না। কাব্য থেকে হীরামন পাখি ছিল না, রতন সিং সিংহলে হীরামনের কথা শুনে পদ্মিনীর রুপে মুগ্ধ হয়ে আসা কেউ ছিল না, রতন সিং দেভপালের সাথে সম্মুখ লড়াইয়ে মৃত্যুবরণ করে। রতন সিং এর দুই স্ত্রী পদ্মিনী আর নাগমতি রতনের দাহ আগুনে সতীদাহ করে মরে। এসব কিছুই ছিল না বানসালীর পদ্মাবতে। তাই বলা যায় ইতিহাস থেকে কেবল চরিত্র নিয়ে নিজস্ব ঢঙে গল্প লিখে সেটি সিনেমায় দেখাতে চেয়েছেন বানসালী। এখন কথা হচ্ছে সেখানে কতটা সফল তিনি!

বানসালীর কাজ নিয়ে আমার মুগ্ধতা কম। তাঁর খামোশি, ব্ল্যাক আর গুজারিশ ছাড়া আর কোন সিনেমাই আমার বিশেষ পছন্দের নয়। ক্যামেরার কাজ, গ্র্যাঞ্জিওর, ক্লাসিক মিউজিক্যালের চেয়েও আমার কাছে বেশি জরুরী সিনেমার গল্প আর চরিত্র চিত্রন। সেখানে বানসালী খুবই দুর্বল। যদিও বাজিরাও মাস্তানিতে অনেকটাই ঢাকা পড়ে গিয়েছিল সে দুর্বলতা তবুও অভিযোগ কিছু ছিলই। বানসালী হিস্টোরিক্যাল ড্রামা বানাতে বেশি পছন্দ করেন কিন্তু প্রতি ক্ষেত্রেই তাঁর গল্প হয় খুবই সাদামাটা, একরৈখিক। দর্শক প্রথম থেকেই জেনে যায় যে শেষে কী হবে, বানসালী যা নতুনত্ব আনেন তা হল প্রেজেন্টেশনে। চরিত্র চিত্রনে তাঁর ভয়াবহ দুর্বলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। খামোশি, হাম দিল দে চুকে সানাম আর ব্ল্যাকে প্রেমকে যিনি দক্ষ কুমার হয়ে মাটি থেকে ভালোবাসার আদলে গড়ে তুলেছেন তাকে এখন ক্রমাগত হুটহাট চরিত্রদের প্রেমে মাতাল করিয়ে দিতে দেখলে বিরক্ত বোধ হয়। এত সহজিয়া প্রেম কি মানায়? বাজিরাও মাস্তানিতেও বুকে তীর লেগে প্রেম, এখানেও তাঁর থেকে ভিন্ন কিছু নয়। রামলীলায়ও ভায়োলেন্স থেকেই প্রেমের উৎপত্তি। প্রথমে আঘাত তারপর ভালবাসার মলম। পাঁচ মিনিটের ভেতর প্রেমে পাগল দুই নায়ক-নায়িকা।

তাই পদ্মাবতেও রতন সিং আর পদ্মাবতীর ভালোবাসা জমে ওঠে না, হৃদয়ে জায়গা করে নেয় না। যেমনটা জায়গা করে নেয় জায়সীর পদ্মাবতে হীরামনের মুখে শোনা পদ্মিনীর রূপগান, রতনের সমুদ্র পাড়ি দেয়া, ইত্যাদি। তাই খিলজীর চরিত্রে মনোযোগ দেই। রনভীরের জন্য আলাদা সময় করে বানসালী চরিত্রটি রিরাইট করেছেন বলে মনে হল। তা না হলে পদ্মিনী আর রতনকেও কেন ছাপিয়ে যাবে খিলজী! এটা ঠিক যে দর্শক মন সলিড এন্টাগনিস্টের প্রেমে তাকে দেখার আগে থেকেই পড়ে থাকে কিন্তু রাজপুতানা মর্যাদা, শৌর্য-বীর্য যেখানে মুখ্য সেখানে খিলজী চরিত্রে এমন অভিনয়ের সুযোগ করে দেয়া ও স্ক্রিন টাইমের আধিক্য কর্নী সেনাদের মুখে চপেটাঘাত ছাড়া বৈ কিছু না। কিন্তু মিথিক্যাল শৌর্যে যাদের গোঁফে তা হয় তাদের মস্তিষ্কও যে ওই গোঁফের আগায় ঝোলে। তাই বানসালী রাজপুতানাদের সাহসিকতা আর বীরত্বের যে প্রচারাধিক্য দেখিয়েছেন তা বলাই সার। তাই তো সিনেমা শেষে শহীদ আর দীপিকা অর্থাৎ রতন সিং আর পদ্মাবতীকে ছাপিয়ে মনে দাগ কেটে যায় রনভীর আর জিম সার্ভ অর্থাৎ খিলজী আর মালিক কাফুর। চরিত্রের রসায়ন জমে নি রতন আর পদ্মাবতীর, জমে নি খিলজী আর মেহেরুন্নিসার, জমে নি পদ্মাবতী আর নাগমতিরও। কিন্তু জমেছে খিলজী আর মালিক কাফুরের। তারা দুজনই টেনে নিয়ে গেছে পুরো সিনেমা, যা আরও আধঘন্টা ছোট করা যেত সহজেই। প্রয়োজনীয় রসায়ন বাদ দিয়ে ডায়লগবাজী আর অতি সাহসিকতা স্ক্রিনপ্লেকে দুর্বল করে দিয়েছে।

দীপিকাকে মাস্তানিই বলে মনে হবে এখানে, তবে মাস্তানির ড্যাম কেয়ারনেস পদ্মাবতী থেকে কেড়ে নিয়েছেন পরিচালক। আর শহীদ যেন শীতল, সৌম্য রাজপুত রাজা যার কাছে কোন উত্তর নেই খিলজীর চাতুর্যের। কখনো বিস্ফোরিত হবে হবে বলে মনে হচ্ছিল, কিন্তু শহীদের অভিনয়ের মতোই অবিস্ফোরিত থেকে যায় রতন সিংহের ক্রোধ ও প্রতিশোধ। অন্যদিকে রনভীর নিজেকে যেন পশু সাজিয়েছে, ব্যক্তি রনভীরের এনার্জি আর উচ্ছলতাকে দশগুণ করে সাথে আদিম হিংস্রতা এনে কোন এক ডোথরাকি হার্ডের খাল সাজিয়েছে নিজেকে রনভির খলজী চরিত্রে। অন্যদিকে জিম সারভ দিয়েছে সেই পশুকে সহজাত সঙ্গ। বনের ক্ষুধার্ত চিতাকে যেমন করে সঙ্গ দেয় ধূর্ত শিয়াল তেমনি করে জিম চরিত্র প্রয়োজনে আনা মেয়েলি অভিনয় আর কম্পমান ডায়লগ ডেলিভারিতে মুগ্ধ করেছে।

সঞ্জয় লীলা বানসালী অত্যন্ত পরিশ্রমী নির্দেশক। তাঁর নির্মিত এই সিনেমাটিকেও পোহাতে হয়েছে অনেক বাঁধা-বিপত্তি। তবুও তাঁর কাজ যেহেতু সৃজনশীল সুতরাং ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষেত্রে সেসব প্রেক্ষাপট আমলে আনাটা ঠিক হবে না বলেই আমার ধারণা। বলিউডে কিছু প্রোপাগ্যান্ডা ও ইস্যু বেইজড সিনেমার একটা চল শুরু হয়েছে, যা রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রেই আপাতত সীমাবদ্ধ ছিল, যেমন- টয়লেট এক প্রেম কথা, প্যাডম্যান, ইত্যাদি। সেদিক থেকে সিনেমার সাবজেক্টকে (রিলিজিয়াস?) হিস্টোরি প্রোপাগ্যান্ডা বেইজড করার মতো ডিসিশন নেয়াটাই বানসালীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বানসালীর সিনেমা দেখে এটা মানতেই হবে যে এটা বানসালীর কল্পিত গল্পের সিনেমা। ঐতিহাসিক সিনেমা হিসেবে পদ্মাবতীকে তো বলাই যাবে না, এখানে ঐতিহাসিক চরিত্রের উপস্থিতি কেবল অলঙ্কার মাত্র। কাউকে ভালো কিংবা খারাপ দেখানো যদি নির্দেশকের উদ্দেশ্য থেকেই থাকে তাহলে খারাপ চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা সবচেয়ে বেশি স্ক্রিনটাইম পায় না ও সবাইকে ছাপিয়ে যায় না। সেদিক থেকে বানসালী নিঃসন্দেহে একটা স্মার্ট সিনেমা বানিয়েছেন, কিন্তু এরকম সিনেমাকে মুক্তি দেবার মতো স্মার্ট দর্শক এখনো তৈরি হয়েছে কিনা সেটাও হয়তো তাকেই ভাবতে হবে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close