বলিউড সুপারস্টার অক্ষয় কুমারের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘প্যাডম্যান’-এর কল্যাণে অরুণাচালাম মুরুগানান্থামের জীবনকাহিনী নিশ্চয়ই আর অজানা নেই কারও। কিন্তু মহেশ খান্ডেলওয়ালের কাহিনী কয়জন জানেন? তিনিও কিন্তু প্রায় একইভাবে তার গোটা জীবনটি উৎসর্গ করেছেন নারীরা যাতে স্বল্পমূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন পায় তা নিশ্চিত করার কাজে। এবং এ কথা বলাই বাহুল্য যে তার কাহিনীও কোন অংশে কম রোমাঞ্চকর নয়।

৬৫ বছর বয়সী মহেশের জন্ম উত্তর প্রদেশের এক ছোট্ট গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই তিনি একটি বিষয় লক্ষ্য করে এসেছেন যে কম দামে স্যানিটারি ন্যাপকিন পাওয়া না যাওয়ায় নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারীদের কতটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এই বিষয়টি নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন যাবত গবেষণা চালান, এবং উপায় খুঁজতে থাকেন যে কীভাবে নারীদের জন্য এমন কোন স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রস্তুত করা সম্ভব, যা একাধারে পরিবেশবান্ধব ও দামের দিক থেকেও খুবই সাশ্রয়ী।

এ ব্যাপারে মহেশ নিজেই বলেন, ‘আমি নিজে যেহেতু একজন পুরুষ, তাই নারীদের ঋতুস্রাবের ব্যাপারে আমার জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত। তাই আমি এ বিষয়ে অনেক পড়ালেখা করেছি, নারীদের সাথে সামনাসামনি কথা বলেছি, এবং এটি নিয়ে ব্যাপক আকারে গবেষণাও চালিয়েছি।’

বৃন্দাবনে রেড ক্রস কুটির সহযোগিতায় মহেশ সহনীয় মাত্রার স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রস্তুতের একটি খসড়া মডেল নির্মাণ করেন, এবং সেই মডেল অনুসারেই সরাসরি নিন্মবিত্ত পরিবারের নারীদের সহযোগিতায় দ্রব্য উৎপাদনও শুরু করে দেন। বর্তমানে তিনি ছয়টি স্যানিটারি ন্যাপকিনের একটি প্যাকেট বিক্রি করছেন, যার দাম ধরা হয়েছে মাত্র ১০ রুপি। এত কম মূল্যেও যে স্যানিটারি ন্যাপকিন পাওয়া যেতে পারে, এ বিষয়টি এতদিন মানুষের ধারণারও বাইরে ছিল।

স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রস্তুত ছাড়াও মহেশ এমন একটি ম্যাশিনও ডিজাইন করেন যার সাহায্যে একদিনে ২,০০০ প্যাকেট স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করা সম্ভব। তার এই উদ্যোগ এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে সম্প্রতি দীপালয়া নামের একটি এনজিওর সহযোগিতায় আইআইটি দিল্লীর শিক্ষার্থীরা তার কাছ থেকে একটি স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রস্তুতকারী ম্যাশিন ক্রয় করে রাজাস্থানের দুর্গম এলাকায় কম দামে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহের কাজ শুরু করে দিয়েছে। এবং তারা এ কাজটি করছে কোন রকমের লাভের আশা ছাড়াই। উৎপাদন খরচ যা, শুধু সেটুকু অর্থেই গরিব নারীদের হাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন পৌঁছে দিচ্ছে তারা।

সমগ্র ভারতবর্ষে প্রায় পঞ্চাশ কোটি নারীর প্রতি মাসে স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাস্তবে স্যানিটারি ন্যাপকিন হাতে পায় খুবই কমসংখ্যক নারী। পাশাপাশি স্যানিটারি ন্যাপকিনের অভাবে অনেকে অনেক অস্বাস্থ্যকর উপায়ও অবলম্বন করে, যা থেকে শুরুতে তাদের ইনফেকশন, এমনকি শেষমেষ প্রাণহানিরও ঝুঁকি দেখা দেয়। এছাড়া ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কোটি কোটি কিশোরী ও তরুণী স্যানিটারি ন্যাপকিনের অভাবে মাসে অন্তত চার থেকে পাঁচদিন স্কুক-কলেজে যেতে পারে না। এবঙ উপার্জনশীল নারীদেরও মাসের এই বিশেষ সময়টিতে খুবই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

সবমিলিয়ে কম দামী স্বাস্থ্যকর স্যানিটারি ন্যাপকিনের অভাবে ভারতবর্ষ জুড়ে অগণিত নারী স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায় মহেশ কিংবা ‘প্যাডম্যান’ ছবির অরুণের মত আরও অনেক মানুষ যদি সাশ্রয়ী-স্বাস্থ্যকর স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদন ও বন্টনের মত একটি মহান কাজে ব্রতী হয়, এবং এ কাজগুলো শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই সীমাবদ্ধ না রেখে গোষ্ঠী পর্যায়েও ছড়িয়ে দেয়া যায়, কেবল তবেই সত্যিকারের এগিয়ে যাবে এ অঞ্চলের নারীরা!

Comments
Spread the love