সিনেমা হলের গলি

প্যাডম্যান: ম্যাড স্টোরি, স্যাড স্টোরি!

দুনিয়াকে বদলে দিতে চাইলে, আপনার চারপাশের মানুষগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চাইলে বোধহয় পাগল হওয়া ছাড়া উপায় নেই। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা অর্বাচীন কুসংস্কার আর ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে সমূলে উৎপাটন করতে নামলে লোকে আপনাকে পাগল বলবেই, কটুক্তি হজম করেই এগিয়ে যেতে হবে। হাল ছেড়ে দিলেন, তো হেরে গেলেন। সেটাই সেলুলয়েডের পর্দায় আমাদের জানাচ্ছেন লক্ষ্মীকান্ত চৌহানরূপী অক্ষয় কুমার। সুপারম্যান-ব্যাটম্যান-আয়রনম্যান তো অনেক দেখেছে রূপালী পর্দা, বলিউড এবার দেখে নিলো ‘প্যাডম্যান’কে।

সত্যি ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র, অক্ষয়পত্নী টুইঙ্কেল খান্নার লেখা ‘দ্য লিজেন্ড অব লক্ষ্মীপ্রসাদ’ থেকে নির্মিত হয়েছে এই সিনেমার স্ক্রীপ্ট। দক্ষিণ ভারতের অরুণাচলম মুরুগানান্থমের জীবনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যে গল্পটা লিখেছিলেন টুইঙ্কেল, সেটাকেই এবার বড় পরিসরে পর্দায় হাজির করেছেন স্বামী-স্ত্রী মিলে। নিজের এলাকা কোয়েম্বাটোরে একেবারেই নিজের উদ্যোগে অল্প দামে মহিলাদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করেছিলেন অরুণাচলম, ভেঙেছিলেন সামাজিক সব ট্যাবু আর ভ্রান্ত সংস্কার।

শুনতে মজা লাগলেও, অরুণাচলমের পথচলাটা সহজ কিছু ছিল না, প্রতিটা পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল এই মানুষটাকে, পড়তে হয়েছে নানা বিপাকে। স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, পরিবারের সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছিল দূরত্বের। লোকে দেখে হাসতো তাকে, পাগল খেতাব দিয়ে প্রায় একঘরে করে রাখার বন্দোবস্তও করে ফেলেছিল সবাই। অরুণাচলমের সেই সংগ্রামী গল্পটাকেই মধ্যপ্রদেশের প্রেক্ষাপটে সিনেমায় দেখতে পাবেন দর্শকেরা।

পেশায় লোহার কারিগর লক্ষ্মীকান্ত চৌহান, সদ্য বিবাহিত, স্ত্রী গায়ত্রীর প্রতি অসীম প্রেম তার। জীবনসঙ্গীনীর ভালোমন্দ সবকিছু দেখভাল করার দায়িত্ব তার, এমনটাই ভাবে সে। হুট করেই একদিন তার নজরে পড়ে, পিরিয়ডের সময় তার স্ত্রী নোংরা কাপড় ব্যবহার করছে, যে কাপড়টা দিয়ে হয়তো সে নিজের সাইকেলও পরিস্কার করতো কিনা সন্দেহ। শুধু তার স্ত্রীই নয়, তার ছোট দুই বোন, এলাকার হাজারো নারী, কিংবা পুরো দেশের কোটি কোটি কিশোরী থেকে মধ্যবয়স্কা নারীরই মাসের চার-পাঁচটে দিন এই নোংরা কাপড়ের টুকরাই সম্বল। স্যানিটারি প্যাডের দাম নাগালের অনেক বাইরে, সেটা ব্যবহার করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে উপায়?

সেই উপায়ের খোঁজেই নামলো লক্ষ্মীকান্ত। নাওয়াখাওয়া কাজকর্ম ভুলে সে পড়লো স্যানিটারী প্যাডের পেছনে। তুলা আর কাপড় দিয়ে নিজেই তৈরী করার চেষ্টা করলো সে, কিন্ত কাজে দিলো না তার চেষ্টা। যেভাবেই হোক, একটা উপায় বের করেই ছাড়বে সে, স্ত্রী আর বোনেদের সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্ব তার, সেই দায়িত্বকে তো পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না লক্ষ্মীকান্ত।

প্যাডম্যান, স্যানিটারি প্যাড, ট্যাবু, পিরিয়ড, সোনম কাপুর, রাধিকা আপ্তে, অক্ষয় কুমার

কি করেনি সে! স্ত্রীকে দিয়ে নিজের তৈরী করা প্যাডগুলো পরীক্ষা করিয়েছে, নিজের অন্তর্বাসের ভেতরে প্যাড পরে পরীক্ষা করেছে, লোকজনের সামনে অপদস্থ হয়েছে, স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে, বোনেরা ঘর ছেড়েছে তার পাগলামীর যন্ত্রণায়, শেষমেশ সে নিজেই ঘরবাড়ি গ্রাম ছেড়ে জেদের বশে সে চলে এসেছে শহরে। হার সে মানবে না, যেভাবেই হোক, দামী স্যানিটারী প্যাডের বিকল্প কিছু সে বানিয়েই ছাড়বে, যাতে ভারতের নারীরা অপরিচ্ছন্নতার হাত থেকে রক্ষা পায়।

কিন্ত পথচলার প্রতিটা পদক্ষেপেই তাকে সইতে হয়েছে লাঞ্ছনা আর গঞ্জনা, তার জন্যে তার পরিবারের মানুষগুলোও শিকার হয়েছে কটুক্তির। ভারতবর্ষের যেকোন মফস্বল, গ্রামাঞ্চল কিংবা অনুন্নত এলাকায় নারীদের ‘মাসিক’, ‘পিরিয়ড’ কিংবা ‘স্যানিটারি ন্যপকিন’ শব্দগুলো একেকটা ট্যাবুর নাম। এই সময়ে নারীকে অপবিত্র মনে করা হয়, ঘরের ঋতুবতী কিশোরী মেয়ে থেকে শুরু করে মধ্যবয়স্ক নারীরাও মাসের এই চার-পাঁচটা দিন পুরুষসঙ্গ থেকে দূরে থাকেন। যেখানে ঔষধের দোকানে স্যানিটারি প্যাড বিক্রি করা হয় কাগজে মুড়িয়ে অবৈধ পণ্যের মতো করে, সেখানে তো এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক।

চৌদ্দ-পনেরো বছরের একটা মেয়েকে তথাকথিত অপবিত্রতার অজুহাত দিয়ে রাতে ঘরের বাইরে শুতে পাঠানোটা যে অমানুষিক একটা আচরণ, সেটা অনেকে বোঝেই না। তাদের কাছে এটাই নিয়ম, এগুলোই রীতি-রেওয়াজ। পিরিয়ডের মতো স্বাভাবিক একটা শারীরিক প্রক্রিয়াকে বেশীরভাগ মানুষ ভাবে অসুখ, বা অপবিত্র কোন ঘটনা। লক্ষ্মীকান্ত হাত দিয়েছেন এসব ভ্রান্ত কুসংস্কারের মূলে, দর্পভরে ঘোষণা করেছেন, এসব রীতি-রেওয়াজ বেকুবদের বানানো, বুদ্ধিহীনেরাই এসব মানে। আর এজন্যেই তাকে ছাড়তে হয়েছে ভিটেমাটি, হতে হয়েছে সবার বিরাগভাজন।

ঠিক সেই মূহুর্তেই তার জীবনে আগমন ঘটে পরীর। পরীর আগমনে লক্ষ্মীকান্তের জীবন বদলে গেল, এমনটা নয়। কিন্ত কি করতে হবে, কিভাবে করতে হবে, সেই দিশাটা পরীর কাছেই পাওয়া গেল। এরপরেও সংগ্রাম আছে, লড়াই আছে। মানুষের মনে চেপে বসা অন্ধ বিশ্বাসের ভূতকে দূর করা তো সহজ কিছু নয়। আবার লক্ষ্মীও তো হাল ছাড়ার পাত্র নন। তিনি তো শপথ করে বেরিয়েছেন, যে সম্মানটুকু খুইয়েছেন, সেটা নিয়েই বাড়ী ফিরবেন বলে। এরমধ্যে কোথাও ত্রিভুজ প্রেমের হাতছানি হানা দেয়, মিষ্টি মধুর সেই প্রেমের শুরুটা হতে হতেই যেন শেষ হয়ে গেল। সেসব নিয়েই সিনেমার গল্প। সুন্দর সাদামাটা জমিনে পরিচ্ছন্ন উপস্থাপন। পরীর চরিত্রে সোনম কাপুর দারুণ। লক্ষীকান্ত হিসেবে অক্ষয় অসাধারণ, আর প্রায় প্রতিটা দৃশ্যেই মুগ্ধতা উপহার দিয়েছেন গায়ত্রীরূপী রাধিকা আপ্তে।

প্যাডম্যান, স্যানিটারি প্যাড, ট্যাবু, পিরিয়ড, সোনম কাপুর, রাধিকা আপ্তে, অক্ষয় কুমার

সিনেমার পরিচালনায় ছিলেন দক্ষিণী পরিচালক আর বালকী। যত্নের ছাপ ছিল পুরো সিনেমাতেই, যদিও কিছু দৃশ্যে ভ্রু কুঁচকে উঠেছে হুটহাট। কিছু দৃশ্য মনে হয়েছে আরোপিত, না থাকলেই বোধহয় ভালো লাগতো। কয়েকটা ব্যপারে প্রশ্ন জাগতে পারে মনের ভেতরে, তবে নিখুঁত বলে তো দুনিয়ায় কিছু নেই। স্ক্রীনপ্লে প্রশংসার দাবীদার, পরিচালক নিজেই স্ক্রীপ্ট লিখেছেন, সঙ্গ দিয়েছিলেন স্বানন্দ কিরকিরে। অমিত ত্রিবেদীর মিউজিক কম্পোজও শ্রুতিমধুর। দুর্দান্ত কিছু নয়, তবে শুনতে ভালো লাগে। অক্ষয়ই এই সিনেমার প্রাণ, ওয়ান ম্যান আর্মি। তবে ফোকাসটা তার ওপরে এতটাই বেশী ছিল যে, বাকীদের খানিকটা ঝাপসাই মনে হবে।

সব বাধা পায়ে মাড়িয়ে লক্ষ্মীকান্তের সাফল্যের সিঁড়ি তরতর করে বেয়ে ওঠাটা হয়তো খানিকটা বেখাপ্পা লাগবে, তবুও প্যাডম্যান দেখা যায় শুধু অক্ষয় কুমারের জন্যে। এই মূহুর্তে বলিউডের অন্য কোন অভিনেতা নিজের অন্তর্বাসে স্যানিটারি ন্যাপকিন আর কৃত্রিম রঙ ঢুকিয়ে অভিনয় করবেন আমার জানা নেই। তবে সামাজিক সমস্যা নিয়ে সিনেমা করতে করতে অক্ষয় নিজেকে একটা বৃত্তে বন্দী করে ফেলছেন কিনা, সেটা এবার মনে এলো। তবে তার পরবর্তী সিনেমার নাম ‘গোল্ড’ জানার পরে সেই ভাবটা উবে যেতেও সময় লাগেনি।

সিনেমাটা উপভোগ্য, তারচেয়ে বেশী উপভোগ্য শেষদিকে অক্ষয়ের বক্তব্য। খানিকটা ইমোশনালও হয়ে যেতে পারেন কেউ কেউ। ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে ওর কথাগুলো তো তুলে এনেছে এখানকার অধিবাসীদের প্রাত্যহিক জীবনের গল্পটাই, তাদের ভাবনাগুলো, তাদের ভুল বিশ্বাসগুলো। অরুণাচলম তার এলাকাটা বদলে দিয়েছিলেন, কিন্ত ভারতবর্ষ পুরোটা তো বদলায়নি, এখানকার মানুষের মানসিকতাও বদলায়নি। পাকিস্তান যেমন ‘স্যানিটারি প্যাডে’র ওপর সিনেমা হওয়ায় এটাকে সেদেশে নিষিদ্ধই করে দিল!

অক্ষয়কে ধন্যবাদ, এমন ট্যাবুগুলোকে সিনেমার পর্দায় তুলে এনে বিবেকের হাতুড়ি দিয়ে ভাঙতে সাহায্য করার জন্যে। কোটি কোটি না হোক, দশ জন, বিশ জন নারীও যদি এরপর থেকে ডিসপেনসারীতে গিয়ে এটা ওটা সেটা আকারে ইঙ্গিতে না দেখিয়ে ‘স্যানিটারি প্যাড’ শব্দটা উচ্চারণ করতে পারে, ঘরের পুরুষেরা যদি মাসিকের ক’টা দিন নারীকে নারী না ভেবে, অপবিত্র না ভেবে মানুষ ভাবা শুরু করতে পারে, তাহলেই হয়তো অক্ষয় বা অন্যদের এই পরিশ্রমটা সার্থক হবে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close