পায়ের তলায় খড়ম নেই, আছে জলের কলতান। সামনে স্রোতস্বিনী নদী আপন গতিতে এগিয়ে চলেছে, দুপাড়ে মানবজীবন আপনার চোখে ধরা দিচ্ছে অদ্ভুত সব রূপে। লঞ্চের ভেঁপুর আওয়াজে হুটহাট ঘোর কেটে যাচ্ছে। কানে হেডফোন, সেখানে হয়তো বাজছে শ্রেয়া ঘোষাল আর বাবুল সুপ্রিয়’র গান-

‘ফুটপাতে ভীড় জাহাজের ডাক ফিরে চলে যায়…’

প্যাডেল স্টিমারের নাম অনেকেই শুনেছেন। যারা শোনেননি, তাদের জন্যে বলি, এই জলযানের বয়স প্রায় একশো বছর, কোনটা হয়তো সেঞ্চুরী পূরণ করে ফেলেছে আরও অনেক আগেই। দুপাশে দুটো প্যাডেল দিয়ে পানি কেটে সামনে এগিয়ে যায় বলেই এগুলোর নাম প্যাডেল স্টিমার। বিশ্বজুড়ে এই প্যাডেল স্টিমার আছে হাতেগোনা অল্প কিছু। সেগুলোর মধ্যে চারটা আবার আমাদের দেশেই আছে, সপ্তাহে একবার করে সেগুলো সদরঘাট থেকে বুড়িগঙ্গা নদীর বুক চিরে ছুটে যায় দক্ষিণ বঙ্গের দিকে। ঢাকা থেকে সপ্তাহে চারদিন বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ এবং একদিন খুলনা পর্যন্ত যায় এই প্যাডেল স্টিমারগুলো। একইভাবে আবার ফিরেও আসে ঢাকায়।

প্যাডেল স্টিমার, রকেট সার্ভিস, লেপচা, টার্ন, মাশহুদ, অস্ট্রিচ

বিআইডাব্লিউটিসি’র এই পরিবহনের কাগুজে নাম রকেট সার্ভিস। এই নাম শুনলে অনেকেই হাসেন, সাতাশ ঘন্টায় খুলনায় পৌঁছে যে জলযান, সেটার নাম কি করে রকেট হয়? কিন্ত একটা সময়ে এই প্যাডেল স্টিমারগুলোই ছিল দেশের সবচেয়ে দ্রুততম জলযান। সেকারণেই হয়তো এই সার্ভিসের নামকরণ করা হয়েছে রকেটের নামে। মধুমতি আর বাঙালী নামে দুটো আধুনিক স্টিমারও আছে রকেট সার্ভিসের বহরে, তবে ঐতিহ্য ধরে রেখেছে লেপচা, টার্ন, অস্ট্রিচ আর মাশহুদ নামের সেই পুরনো স্টিমারগুলোই।

খুলনা পর্যন্ত যেতে প্যাডেল স্টিমারগুলো সময় নেয় প্রায় সাতাশ ঘন্টা। সন্ধ্যায় সদরঘাট থেকে ছেড়ে মধ্যরাতে চাঁদপুর পৌঁছে এটি। সেখান থেকে আবার যাত্রা শুরু করে বরিশাল পৌঁছায় পরদিন সকালে। বরিশালে আধঘন্টার যাত্রাবিরতি শেষে পানি কেটে আবার এগিয়ে যেতে থাকে স্টিমার। নলছিটি, ঝালকাঠি, কাউখালি, হুলারহাট(পিরোজপুর), বড় মাছুয়া আর সন্ন্যাসী পেরিয়ে রাতে পৌঁছে মোড়েলগঞ্জ, আর সপ্তাহে একদিন এই রকেট স্টিমার সার্ভিস যায় খুলনা পর্যন্ত। নদীতে পর্যাপ্ত নাব্যতা না থাকায় খুলনায় চলাচল মাঝে অনেকদিন বন্ধ ছিল।

পৃথিবী এখন আধুনিক হয়ে গেছে। যাত্রাপথেও সেই আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। সড়কপথে এখন খুলনা যেতে সময় লাগে দশ ঘন্টার মতো। আর বিমানে গেলে যশোর ঘুরে খুলনা পৌঁছানো যায় তিন ঘন্টারও কম সময়ে। সময় এখন অনেক দামী। তাহলে কেন আপনি পুরো একদিনেরও বেশি সময় খরচ করে কেন নৌপথে রকেট সার্ভিসে চড়ে খুলনা যাবেন? তাড়া থাকলে অবশ্যই রকেট সার্ভিস আপনার জন্যে নয়। রকেটে চড়ার পেছনে কারনটা অবশ্যই ঐতিহ্য।

প্যাডেল স্টিমার, রকেট সার্ভিস, লেপচা, টার্ন, মাশহুদ, অস্ট্রিচ

লেপচা, টার্ন, অস্ট্রিচ আর মাশহুদ নামের এই প্যাডেল স্টিমারগুলো যেন একেকটা টাইম মেশিন, মূহুর্তের মধ্যে আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে অতীতে। ভেতরের অবকাঠামো এখনও পুরাতন সাজসজ্জা ধরে রেখেছে। কাঠের ডিজাইন করা আসবাব, পুরনো আমলের বাঁকানো সিঁড়ি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে ষাট-সত্তর দশকের কথা। রানী এলিজাবেথ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ মুজতবা আলী, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস- সবার পায়ের ছাপ পড়েছে এই প্যাডেল স্টিমারগুলোতে, সেটা হয়তো অনেকে জানেনও না!

যাত্রাপথে প্রায় ত্রিশটা নদী পেরিয়ে যায় রকেট সার্ভিসের এই স্টিমারগুলো। বাংলাদেশের আর কোন লঞ্চ, স্টিমার বা অন্য যেকোন ধরণের জলযানই এক ট্রিপে এতগুলো নদী পেরোয় না। এদিক দিয়ে এই রুটটাকে দেশের সবচেয়ে লম্বা নৌপথও বলা যেতে পারে। বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, মেঘনা, ডাকাতিয়া, আঁড়িয়াল খাঁ, কীর্তনখোলা, সুগন্ধা, বিষখালী, গাবখান চ্যানেল, সন্ধ্যা, কচা, মংলা, পশুর, বলেশ্বর, রূপসা সহ আরও অনেক নদীর ওপর দিয়ে ছুটে চলে রকেট সার্ভিসের এই স্টিমারগুলো।

প্যাডেল স্টিমার, রকেট সার্ভিস, লেপচা, টার্ন, মাশহুদ, অস্ট্রিচ

অনেকগুলো জেলা আর শত শত গ্রামকে পাশ কাটিয়ে আপনমনে ছুটে চলে এসব স্টিমার। একেকটা নদীর একেক রূপ, একই নদীর আবার সকালে এক চেহারা, বিকেলে অন্যরকম! নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যরকম একটা রূপ আপনার চোখে ধরা পড়বে এই স্টিমারে চড়লে। নদী আর নদীর পানিকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর জীবন খুব কাছে থেকে দেখতে পাবেন আপনি। দেখতে পাবেন জীবনানন্দের রূপসী বাংলার অনন্য সৌন্দর্য। কোথাও জেলেদের মাছধরা, কোথাও পাল তোলা নৌকার সারি আবার কোথাওবা নদীর দুপাশ জুড়ে বিস্তৃত ধানক্ষেত, কৃষকের ব্যস্ততা। পেরিয়ে যাবেন হাটবাজার, নদীর বুকে সন্ধ্যা নামার দৃশ্য হৃদয়ে অন্যরকম একটা অনূভুতি তৈরি করবে। এমন অদ্ভুত বৈচিত্র‍্যময় ভ্রমণ আর কোথাও পাওয়া যাবে না, বাংলাদেশে তো অন্তত নয়।

শুধু রকেট স্টিমারে চড়তেই প্রতিবছর হাজার হাজার বিদেশী পর্যটক ছুটে আসেন বাংলাদেশে, তাদের ‘টু ডু লিস্টে’র সবার ওপরের দিকেই থাকে এই প্যাডেল স্টিমারে ভ্রমণটা। অথচ আমাদের দেশের অনেকে জানেই না এই প্যাডেল স্টিমার সার্ভিস সম্পর্কে। রকেট সার্ভিসের এই জলযানগুলো বিখ্যাত হয়ে আছে এর খাবারের জন্যেও। এগুলোর ক্যান্টিনের খাবারের সুনাম তো বিশ্বজোড়া। রকেটে চড়লে ভূনাখিচুড়িটা চেখে দেখতে ভুলবেন না একদমই।

প্যাডেল স্টিমার, রকেট সার্ভিস, লেপচা, টার্ন, মাশহুদ, অস্ট্রিচ

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কেবিন আছে রকেট সার্ভিসের স্টিমারগুলো। আর ডেকের যাত্রীদের জন্যে আছে সাধারণ টিকেটের ব্যবস্থা। ডেকের টিকেট সদরঘাট আর বাদামতলী ঘাটেই পাওয়া যায়। আর কেবিনের টিকেটের জন্যে আপনাকে যেতে হবে মতিঝিলের বিআইডাব্লিউটিসি’র অফিসে। সদরঘাট থেকে খুলনা পর্যন্ত যেতে মানভেদে খরচ পড়বে তিনশো থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত।

প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা সরকারকে ভর্তুকী দিতে হয় এই রকেট সার্ভিসের পেছনে। যথাযথ প্রচারণা নেই, মানুষ জানেও না এগুলোর কথা। তাই বছরের পর বছর ধরে লোকসান দিয়ে আসছে শতবর্ষী এই জলযানগুলো। হয়তো কোন একসময় বন্ধ করে দেয়া হবে ঐতিহ্যবাহী এই পরিবহনটা। সেরকম কিছু ঘটার আগেই ঘুরে আসুন ঐতিহ্যবাহী এই জলযানগুলোতে করে। এগুলো দেশের সম্পদ, সেভাবেই ব্যবহার করুন। ঝড়-তুফানে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা তো নেই, তবে ভ্রমণকারীদের নস্টালজিয়ায় অবশ্যই ডুবিয়ে মারবে এই প্যাডেল স্টিমারগুলো, সেটা নিশ্চিত!

তথ্য ও ছবি কৃতজ্ঞতা- অপু নজরুল, ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশ ফেসবুক গ্রুপ, বিডিনিউজ ২৪ ডটকম।

Comments
Spread the love