প্রতিবারই একাডেমী এওয়ার্ড বা অস্কার আসর হাজির হয় অভাবনীয় নানা চমকপ্রদ ঘটনা নিয়ে। ঘটে যাওয়া আলোচিত এসকল ঘটনার কোন কোনটি বিস্ময়কর, অপ্রত্যাশিত, আবার কোন কোনটি বেশ মজার হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। এরকমই বিশেষভাবে স্মরনীয় কিছু আলোচিত সমালোচিত ঘটনার উল্লেখ থাকছে এই লেখায়।

স্বল্পতম দৈর্ঘ্যের অস্কার বক্তব্য

১৯৯১ সালে জ্যঁ পেশি ৬৩ তম অস্কারে “Good fellas” মুভিতে অভিনয় করে সেরা পার্শ্ব চরিত্র (পুরুষ) ক্যাটাগরিতে অস্কার পান। বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষনার পর মূলমঞ্চে এসে আবেগাপ্লুত কন্ঠে তার Acceptance speech-এ মাত্র দুটি লাইনে ছয়টি শব্দ উচ্চারণ করেন- “It’s my privilege. Thank you.” ইতিহাসে এটিই ক্ষুদ্রতম অস্কার স্মারক বক্তৃতা হিসেবে অভিহিত।

অস্কারমঞ্চে নগ্ন আগন্তুক

১৯৭৪ সালের ৪৬ তম আসরের শো চলাকালীন সময়ে হোস্ট ডেভিড নিভেন যখন এলিজাবেথ টেলরকে স্টেজে আমন্ত্রন জানাতে বিভিন্ন বিশেষনের আশ্রয় নিচ্ছেন, ঠিক তখন হঠাত্‍ তার পিছন দিক দিয়ে এক নগ্ন লোক দৌড়ে স্টেজ অতিক্রম করে। তবে হোস্ট নিভেন অত্যন্ত কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে তার বক্তব্য অংশটুকু পড়ে শেষ করে এলিজাবেথ টেলরকে আসতে আমন্ত্রণ জানান।

বেস্ট পিকচারে ভুল ছবির নাম ঘোষণা

গতবারের অস্কারের একটি অকস্মাৎ দারুণ মুহূর্ত রয়েছে! তবে এমন একটি নাটকীয় পরিস্থিতির যে সৃষ্টি হবে, সেটাই বা কে জানতো! কমেডিয়ান হিসেবে ভালোই সুনাম সেবারের অস্কার উপস্থাপক জিমি কিমেলের। নামজাদা এ কমেডিয়ান স্বভাবসুলভ রসিকতার মধ্য দিয়েই শুরু করে অস্কারের আনুষ্ঠানিকতা। তিনি মাইক হাতে পেয়েই বলতে শুরু করছিলেন, “আমি আজ গাইতেও আসিনি, নাচতেও আসিনি, হাসাতেও আসিনি”। এই বলে সেরা ছবির অস্কারজয়ী হিসেবে ‘লা লা ল্যান্ড’-এর নাম ঘোষণা করেছিলেন তিনি। ‘লা লা ল্যান্ড’-এর কলাকুশলীরা মঞ্চে উঠে সবাইকে ধন্যবাদ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন। এর মধ্যেই উপস্থাপক জিমি কিমেল ফের মঞ্চে এসে জানান, ভুল করে ‘লা লা ল্যান্ড’ ছবির নাম ঘোষণা করা হয়েছে”। এরপর দর্শক সারিতে বসে থাকা সকলের সামনে হাতে থাকা খামটি খুলে দেখানো হয় বেস্ট পিকচারের নাম। যাতে লেখা ছিল বেরি জেনকিন্স পরিচালিত ‘মুনলাইট’-এর নাম।

শেইম অন ইউ মিঃ বুশ

একাধারে রাজনৈতিক বক্তা এবং প্রামাণ্যচলচ্চিত্র নির্মাতা মাইকেল মুর এবং মাইকেল ডনভান ২০০৩ সালে “Bowling for columbine” এর জন্য বেস্ট ডকুমেন্টারি ফিচার ফিল্মে অস্কার লাভ করেন। মুর তার বক্তব্যে অস্কার একাডেমীকে ধন্যবাদ দিয়েই শুরু করেন। তবে খানিক পরেই মুর তত্‍কালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক আক্রমনের জন্য তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাজানো নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করেন। মুর তার অস্কার বক্তব্য শেষে বারবার চিত্‍কার দিয়ে “শেইম অন ইউ মিস্টার বুশ” বলতে বলতে স্টেজ ত্যাগ করেন।

নাম বিভ্রাট

নাম নিয়ে অস্কারে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তিটি ঘটে ১৯৩৩ সালে ৬ষ্ঠ আসরে। শ্রেষ্ঠ পরিচালক ক্যাটাগরিতে দুজন ফ্রাঙ্ক নমিনেশন পেয়েছিলেন। একজন ফ্রাঙ্ক কাপরা এবং অপরজন ফ্রাঙ্ক লয়েড। উপস্থাপক উইল রর্জাস ভুলবশত বিজয়ীর নাম ঘোষনায় শুধু ফ্রাঙ্ক শব্দটি ব্যবহার করেন। যার ফলে স্টেজে দুজন ফ্রাঙ্কই প্রায় চলে আসেন। ফ্রাঙ্ক কাপরাকে একই সময়ে স্টেজে উঠতে দেখে ফ্রাঙ্ক লয়েড পরে স্টেজ থেকে নেমে যান। কিন্তু শেষ চমকটি যে বাকি! দূর্ভাগ্যবশত ঠিক তখনই ফ্রাঙ্ক কাপরাকে জানানো হয় যে, এ বছরের পুরস্কারটির প্রকৃত বিজয়ী ফ্রাঙ্ক লয়েড!

প্রথম অস্কার প্রত্যাখান

চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকারদের সর্বোচ্চ সংস্থা ছিল “স্ক্রিন রাইটার্স গিল্ড” । ১৯৩৬ সালে অস্কার ঘোষণার সময়ে সংস্থাটির দাবিদাওয়া নিয়ে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই “THE Informer” ছবির চিত্রনাট্যের জন্য অস্কার মনোনয়ন পান ডাডলি নিকলস। কিন্তু ডাডলি “স্ক্রিন রাইটার্স গিল্ডে”র সক্রিয় কর্মী হওয়ায় এ পুরস্কারের লোভে আন্দোলন থামাননি। বরং ইতিহাসে প্রথমবারের মত অস্কার মনোনয়ন প্রত্যাখ্যান করেন।

“দ্যা গডফাদার” ছবিতে ভিটো করলিওনি চরিত্রের জন্য মার্লোন ব্রান্ডো সেরা অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করলেও তা গ্রহনে অস্বীকৃতি জানান। তিনি অস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে “নেটিভ আমেরিকান রাইটস” এর আন্দোলনকারী কর্মী সাচিন লিটলফেদ্যারকে নেটিভ আমেরিকান পোশাকে তার একটি লিখিত বার্তাসহ প্রেরণ করেন। সাচিন মঞ্চে আসেন ঠিকই, কিন্তু ব্রান্ডোর পক্ষ থেকে পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তার লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনাতে চান। যদিও দীর্ঘ এ বার্তাটি পড়ে শুনানোর অনুমতি তাকে দেয়া হয়নি। তবে চিঠিতে যা লেখা ছিল তার সারসংক্ষেপ হল – “নেটিভ আমেরিকানদের অধিকার খর্ব এবং তাদের হাসির পাত্র বানানো হচ্ছে! যেখানে পৃথিবীর হাজার হাজার মানুষ চিকিত্‍সার অভাবে ভুগছে, সেখানে আমি কি করে এ পুরস্কারের এতগুলো টাকা গ্রহন করি?” ব্রান্ডোই প্রথম ব্যক্তি যিনি নেতিবাচক কোন চরিত্রে অভিনয় করেও তার চমকপ্রদ অভিনয় শৈলীর জন্য অস্কার পান।

চরম প্রতিশোধ

৮২তম অস্কার আসরটি চলচ্চিত্রপ্রেমী ও বোদ্ধাদের কাছে এক স্মরনীয় অধ্যায় হয়েই থাকবে। অস্কার ইতিহাসে সে বছরই (২০১০ সালে) প্রথমবারের মতো শ্রেষ্ঠ পরিচালক ক্যাটাগরির পুরস্কারটি কোন নারী নির্মাতার হাতে উঠে। সেই সাথে নির্মাতার “দ্যা হার্ট লকার” বেস্ট পিকচার/ফিল্ম এওয়ার্ডটিও অর্জন করে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে ঐ অস্কার আসর চলচ্চিত্রানুরাগীদের মনে বিশেষভাবে জায়গা মনে থাকবে অন্য আরেকটি কারণে। সেবারের অস্কারজয়ী শ্রেষ্ঠ পরিচালক ক্যাথরিন বিগেলো যাদের পরাজিত করে বেস্ট ডিরেক্টর এওয়ার্ডটি পান তাদের মধ্যে যে তার প্রাক্তন স্বামী জেমস ক্যামেরুনও ছিলেন! বিগেলোর একসময়ের সহযোদ্ধা এবং অনুপ্রেরণাও যে ছিলেন এই Avatar নির্মাতা। এদিক থেকে প্রাক্তন স্বামীকে পিছনে ফেলে জুরি বোর্ডের বিচারে বিগেলোর শ্রেষ্ঠত্ব যেন এক অঘোষিত প্রতিশোধ।

Comments
Spread the love