সিনেমা হলের গলি

অস্কারে বাংলাদেশি সিনেমা ও একটি আক্ষেপ!

অস্কারে ফিল্ম সাবমিশন ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে গিয়েছে অনেক বছর ধরেই। স্বল্প বাজেটে ভালো স্ক্রিপ্ট আর ভালো অভিনেতাদের নিয়ে মোটামুটি মানসম্মত সিনেমা ইমপ্রেস দেয় বলেই হয়তো অস্কার সাবমিশন তাদের প্রাইম টার্গেট হয়ে গেছে। গত বছর আকরাম খানের ‘খাঁচা’ নিয়ে দীর্ঘ একটি লেখা লিখেছিলাম। কীভাবে সিনেমাহলে সিনেমা নামমাত্র সময়ের জন্য মুক্তি দিয়ে অস্কারে সাবমিশন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল ইমপ্রেস। সিনেমা মুক্তির ৪ দিন আগে সেই সিনেমা মুক্তি দেয়ার ঘোষণা প্রথম দেয়া হয়। ইফতেখার ফাহমির সিনেমা নিজেরাই এডিট করে টেলিভিশন প্রিমিয়ার করে ফেলতেও তাদের দ্বিধা হয় না।

এমনই এক একচেটিয়া রাজতন্ত্রে এবার বাঁধা আসলো। বাঁধা বলতে তারা চেষ্টার ত্রুটি করেনি, ‘কালের পুতুল’ আর ‘কমলা রকেট’ দিয়ে চেষ্টা করেছিল অস্কার সাবমিশন দৌড়ে আসার। আগাথা ক্রিস্টির ‘And Then There Were None’- এর অসাধারণ গল্প নিয়ে যে জগাখিচুড়ি বানিয়েছে তারা ‘কালের পুতুল’ নামে, তা অস্কারে পাঠালে মানইজ্জত কিছু থাকতো না বৈকি। তো তারা ভরসা করলো ‘কমলা রকেট’ নিয়ে।

শাহাদুজ্জামানের দারুণ দুটো ছোট গল্প নিয়ে নূর ইমরান মিঠুর বুদ্ধিদীপ্ত স্ক্রিনপ্লেতে প্রাণ পেয়েছিল ‘কমলা রকেট’, অভিনেতারাও ছিলেন দারুণ। কিন্তু সমস্যা হল আবারও সেই নামমাত্র সিনেমাহলে মুক্তি দেয়া আর স্বল্প বাজেটে পাট চুকিয়ে ফেলা। একজন নির্দেশক কখনোই বলবেন না যে প্রোডিউসার আরও কিছু টাকা বেশি দিলে আরও বেটার-ওয়েল মেইড ফিল্ম বানাতে পারতাম কারণ এদেশে নির্দেশকরা জিম্মি তাদের হাতে। কিন্তু আমরা দর্শকরা জানি, দেখি বলেই বলতে পারি যে হয়তো বাজেট আরও বেশি থাকলে একই নির্দেশককে হয়তো অনেক জায়গায়, অনেক শটে কম্প্রোমাইজ করতে হতো না।

আর এই নো কম্প্রোমাইজ, ডিরেক্টর-প্রোডিউসারের একজোট হয়ে কাজ করা, ভালো স্ক্রিপ্ট আর ওয়েল মেইড ফিল্মের দারুণ একটা উদাহরণ এ বছরেই বাংলা সিনেমা দেখেছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, সে সিনেমা অস্কার সাবমিশনের নমিনেশনেও যায়নি। সিনেমাটির নাম- ‘মাটির প্রজার দেশে’। এত সুন্দর বাংলা সিনেমা আমি শেষ কবে দেখেছি মনে করতে পারছি না! আমি যখন ‘মাটির প্রজার দেশে’ দেখলাম আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না এমন সিনেমা এভাবে পাদপ্রদীপের আড়ালে থেকে গেল ও যাবে। আমার দেখা সেরা বাংলা সিনেমা না হলেও। হয়তো এটা বলতেই পারি আমার দেখা অন্যতম ওয়েল মেইড বাংলা সিনেমা। কী দারুণভাবে গ্রামের সবুজকে ধারণ করেছিলেন বিজন, কী অসাধারণ অভিনয় দিয়ে মুগ্ধ করেছেন অভিনেতারা। অথচ এমন একটা সিনেমা অস্কারে সাবমিশনের জন্য নমিনেশন পর্যন্ত যায়নি! যায়নি, কারণ সেখানে নিজেদের সিনেমা সাবমিটই করেননি বিজন-আরিফুর।

সাবমিট করেননি কেন জানতে গিয়ে জানলাম বাংলা সিনেমার আরেকটি কালো অধ্যায়ের কথা। অস্কারে সিনেমা পাঠানোর জন্য নিজেদের সিনেমাকে যদি অন্যান্য সিনেমার সাথে কম্পিট করার জন্য পাঠাতে হয় তাহলে অস্কার সাবমিশন ও সিলেকশন কমিটিকে ২৫ হাজার টাকা জমা দিতে হয়। যে প্রোডিউসার নিজের সর্বস্ব দিয়ে একজন নির্দেশকের স্বপ্নে ভরসা রাখছে, যে নির্দেশক প্রোডিউসারের কাছ থেকে পাওয়া টাকা, নিজের জমানো টাকা দিয়ে বিদেশী টেকনিশিয়ান এনে সিনেমাকে আরও নিখুঁত বানানোর চেষ্টা করছে তারা কেন অস্কারে সিনেমা পাঠানোর আশায় গাঁটের টাকা খরচ করবে? নিজের সৃষ্টিশীলতা, নিজের স্বপ্ন আর নিজের সিনেমাটার দাম কী তবে পঁচিশ হাজার টাকা? পঁচিশ হাজার টাকা নির্ধারন করবে তাদের সিনেমা অস্কারে যাবার যোগ্য কীনা? দুঃখিত- এই কাজ বিজন, আরিফুর করেননি। তারা পাঠাননি ‘মাটির প্রজার দেশে’ অস্কার সাবমিশনের জন্য।

তবে খুশি হয়েছি ‘কমলা রকেট’ না পাঠিয়ে ‘ডুব’কে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অস্কারে পাঠানোর সিদ্ধান্তে। অস্কারে একটা সিনেমার সাফল্য সিনেমার কন্টেন্টের পাশাপাশি আরও অনেক কিছুর ওপর ডিপেন্ড করে। প্রাথমিক সিলেকশনের পর সিনেমার কলাকুশলীদের সেই সিনেমা নিয়ে অনেক ক্যাম্পেইন করতে হয়, বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিকদের কাছ থেকে রিভিউ সংগ্রহ করতে হয়। এসব কিছুই হয়তো করতো ‘মাটির প্রজার দেশে’ টিম, কিন্তু তাদের লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ডই তো দেয়া হল না। আর অন্যদিকে ইমপ্রেস এসবের কিছুই করে না, অস্কারে সাবমিশনের জন্য মনোনয়ন পাওয়া মাত্রই তাদের লগ্নিকৃত টাকা তারা উঠিয়ে নেয় বিভিন্ন দিক থেকে তারপর সেটার রিভিউ সংগ্রহে আর ক্যাম্পেইনে তাদের কোন দায়ই থাকে না।

এদিক থেকে ‘ডুব’ এগিয়ে থাকবে কারণ মোস্তফা সরয়ার ফারুকি ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম এরিনায় অনেক পরিচিত আর ‘ডুব’- এর মেকিং প্লাস ইরফানের মতো ইন্টারন্যাশনাল স্টার থাকার কারণে ক্যাম্পেইনেও অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে। আর রিভিউর দিক থেকে অনেক রিচ ‘ডুব’ প্রথম থেকেই। সেদিক থেকে ‘ডুব’- এর জন্য শুভকামনা রইল, কিন্তু মনের ভেতর খচখচ করে যাবে ‘মাটির প্রজার দেশে’র অস্কারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব না করতে পারার বেদনাই। দিস ফিল্ম ডিজার্ভস মাচ মোর রিকগনিশন এন্ড লাভ ফ্রম বাংলাদেশ এন্ড ইন্টারন্যাশনাল অডিয়েন্স অলসো…

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close