সিনেমা হলের গলি

অক্টোবর- বরুণ ধাওয়ানের ‘অভিনেতা’ হয়ে ওঠার ছবি!

বরুণ ধাওয়ান- বলিউডে বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকাদের একজন। করণ জোহর পরিচালিত ‘স্টুডেন্ট অফ দ্য ইয়ার’ ছবির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা বরুণের সাড়ে ছয় বছরের ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত কোন ফ্লপ ছবি নেই। আজকের দিনে এসেও পুরো ১০০ শতাংশ সাফল্যের হার বজায় রাখা সত্যিই অভাবনীয় একটি বিষয়। বরুণের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি, কেননা একজন অভিনেতা হিসেবে তার রেপুটেশন যে একদমই ভালো নয়।

বরুণ মানেই অনেকের কাছেই স্রেফ মাত্রাতিরিক্ত চড়া, অতি অভিনয়। ‘স্টুডেন্ট অফ দ্য ইয়ার’ থেকে শুরু করে জুড়ুয়া ২ পর্যন্ত তার ক্যারিয়ারের প্রথম নয়টি ছবির মধ্যে এক বাদলাপুর বাদ দিলে, বাকি আটটি ছবিতেই তার রোলগুলো প্রায় একই ধাঁচের ছিল। সেগুলোতে যেমন ছিল না কোন বৈচিত্র্য, তেমনি একজন প্রকৃত অভিনেতা হিসেবেও কখনোই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে উঠতে পারেননি তিনি। ফলে তার ছবিগুলো বক্স অফিসে যতই রমরমিয়ে চলুক না কেন- শিক্ষিত, চিন্তাশীল ও রুচিশীল দর্শকদের কাছে ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া তো দূরে থাক, তার নাম শুনলেই নাক সিঁটকাত অনেকে, সেই সাথে প্রচুর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও হাসি-তামাশা তো আছেই।

তবে বরুণ সম্পর্কে দর্শকের যে দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলছি, সেটি মাস তিনেক আগেও যতটা প্রাসঙ্গিক ছিল, এখন আর ততটা নেই। বরং এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। তারকার তকমা ঝেড়ে ফেলে বরুণ এখন একজন অভিনেতা হয়ে উঠেছেন। তার সম্পর্কে মানুষের চিরাচরিত ধারণা পুরোপুরি ভাঙতে হয়ত এখনও কিছুটা সময় লাগবে, কিন্তু তারপরও এমন অনেকেই এখন আছেন যাদের কাছে সময়ের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতাদের নাম জানতে চাওয়া হলে বরুণের কথাও অবশ্যই উল্লেখ করবেন।

যে ছবিটির মাধ্যমে এই সবকিছু সম্ভব হয়েছে, সেটির নাম ‘অক্টোবর’। ছয় বছরে টানা নয়টি হিট ছবিতে অভিনয় করেও বরুণ দর্শকের কাছ থেকে যে সম্মান পাননি, সুজিত সরকারের পরিচালনায় মাত্র একটি ছবি করেই তা আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। এমনকি সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক ‘সাঞ্জু’তে রনবীর কাপুর যদি অবিস্মরণীয় পারফরম্যান্স উপহার না দিতেন, তাহলে এই দাবি করাও বোধহয় অমূলক ছিল না যে বলিউডে মূলধারার ছবিতে এখন পর্যন্ত বছরের সেরা অভিনেতা বরুণই!

অথচ অক্টোবর ছবিতে বরুণের অভিনয় করার কথাই ছিল না। সুজিত সরকার ও জুহি চতুর্বেদী মিলে যখন এ ছবির কাহিনী লিখছিলেন, তাদের মাথায় ঘুণাক্ষরেও আসেনি বরুণের নাম। তারা একদমই নতুন কোন মুখ চাইছিলেন এ ছবিতে অভিনয় করার জন্য। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, দরকার হলে এমন কাউকে তুলে আনবেন যে কিনা অভিনয়ের অ-টা না জানলেও সমস্যা নেই, তারাই নিজেদের মত করে গড়ে নেবেন সেই অভিনেতাকে। এবং দর্শকের সামনে হাজির করবেন একেবারে ফ্রেশ কিছু। কিন্তু তাহলে শেষ পর্যন্ত বরুণ কেন? সে কাহিনী বেশ চমকপ্রদ।

বরুণ যখন অক্টোবর ছবির জন্য চুক্তিবদ্ধ হন, তখনও তার বদ্রিনাথ কি দুলহানিয়া মুক্তিই পায়নি। কাজ শুরু হয়নি জুড়ুয়া টু-রও। অর্থাৎ তখন পর্যন্ত বরুণের সাতটি ছবি মুক্তি পেয়েছে। অথচ ওই সাতটি ছবির একটিও দেখেননি সুজিত। ফলে বরুণের অভিনয়দক্ষতা সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না তার। কিন্তু একদিন সুজিতের অফিসে গিয়ে অক্টোবর ছবির কাহিনী সম্পর্কে জেনেই সেটির প্রেমে পড়ে যান বরুণ। তার মনে হয়, যে করেই হোক এই ছবিতে তাকে অভিনয় করতেই হবে!

সুজিত তাকে বলেন, “আমরা তো এ ছবির জন্য একদম নতুন কোন মুখ চাইছি। এই ছবির মাধ্যমেই যার অভিষেক হবে।” তখন বরুণ সুজিতকে যা বলেছিলেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য, “আমি আজ পর্যন্ত যত ছবি করেছি, সেগুলো কোন ছবিই নয়। মনে করুন অক্টোবর দিয়েই নতুন করে অভিষেক হবে আমার!” অক্টোবর ছবির কাহিনীর প্রতি বরুণের এই তীব্র ভালো লাগাই সুজিতকে বাধ্য করে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে। নতুন কাউকে কাস্ট করার বদলে তিনি বরুণকে নিয়ে নেন দানিশ ওয়ালিয়া ওরফে ‘ড্যান’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বরুণও তার স্বাভাবিক স্যালারির অর্ধেকের বিনিময়েই কাজ করেন ছবিটিতে।

আরও পড়ুন- সাঞ্জুর সাফল্যে সঞ্জয় দত্তের ক্যারিয়ারের পুনর্জীবন?

‘জুড়ুয়া টু’ ছবিতে অভিনয়ের পরপরই শুরু হয় অক্টোবরের শুটিং। তাই বরুণের জন্য কাজটা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। একে তো তিনি এর আগে কখনও এমন সাদামাটা, গ্ল্যামারহীন চরিত্রে অভিনয় করেননি, তার উপর জুড়ুয়া টুর ভূত তখনও চেপে ছিল তার কাঁধে। তাই যতই চেষ্টা করছিলেন স্বাভাবিকভাবে অভিনয় করার, তার অভিনয়ের মাত্রা খুব বেশি চড়া হয়ে যাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে বরুণের মনে হতে শুরু করে, আসলেই বুঝি অভিনয়টা তার দ্বারা হবে না। এরকম সেন্সিটিভ একটি ছবিতে অভিনয় করা তার কাম্ম নয়।

কিন্তু ওই যে আগেই বলেছিলাম, সুজিতের ইচ্ছা ছিল প্রয়োজনে হাতে ধরে অভিনয় শেখাবেন ড্যান চরিত্রে অভিনয় করা ছেলেটিকে। বরুণের ক্ষেত্রে সেটিই করলেন তিনি। তাকে বোঝালেন, অভিনয়কে স্রেফ অভিনয় বলে মনে করলে কখনোই সফল হওয়া যাবে না। বরং চরিত্রের মধ্যে ঢুকে গিয়ে, চরিত্রটিকে অনুভবের চেষ্টা করতে হবে। তাহলে ভেতর থেকেই অভিনয়টা বেরিয়ে আসবে, নিজের কোন কষ্ট করা লাগবে না। বরুণ যাতে চরিত্রের সাথে একাত্ম হয়ে যেতে পারেন, এজন্য বহু পথ বাতলে দিলেন সুজিত। তার মধ্যে অন্যতম হলো সকালবেলা বরুণ যেন ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে মোবাইল ফোন ঘাঁটতে শুরু না করেন। তার বদলে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই মনে করতে হবে যে তিনিই ড্যান, তার ভালোবাসার মানুষটি কোমায় রয়েছে। হাই পিচের অভিনয় করে করে বরুণের মধ্যে যে মানসিক অস্থিরতা চলে এসেছিল, সেগুলো দূর করতেও সুজিত নানাভাবে সাহায্য করেন। তারপরও যদি কোনদিন বরুণের ভেতর থেকে ড্যানসুলভ অভিনয় বের না হতো, কোনরকম জোর করতেন না তিনি। বলতেন, “আজ তাহলে শুটিং প্যাক আপ করি। কাল থেকে আবার কাজ শুরু করা যাবে।”

বরুণের ভাষায়, “সুজিতদার কাছ থেকে যে পরিমাণ ভালোবাসা আমি পেয়েছি কাজ করার সময়, অন্য কোন পরিচালকের কাছ থেকে তার সিকি পরিমাণও পাইনি। এমনকি আমার নিজের বাবার সাথে কাজ করার সময়ও না।” এভাবে প্রচন্ড ভালোবাসা আর স্নেহ দিয়েই বরুণের মত অভিনয়-না-পারা অভিনেতার ভেতর থেকে সত্যিকারের মেথড অ্যাক্টিং বের করে এনেছিলেন সুজিত। তাই তো অক্টোবর ছবি দেখতে বসে পর্দায় আশ্চর্যরকমের সাদামাটা বরুণকে দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়।

এতদিন যে গ্ল্যামারাস বরুণকে আমরা দেখেছি, তার ছিটেফোঁটাও নেই এ ছবিতে। বরুণের হাতে অস্ত্র বলতে শুধু তার অসাধারণ চরিত্রটি, আর সেই সাথে তার অভাবনীয় অভিনয়। এই দুইটি জিনিসকে কাজে লাগিয়েই বাজিমাত করে দিয়েছেন বরুণ। নিশ্চিতভাবেই বলে দেয়া যায় যে অক্টোবর দেখার পর বরুণের অভিনয় নিয়ে কারও মনে আর কোন সংশয়ের জায়গা থাকবে না।

আরও পড়ুন- সাইফের ডুবন্ত ক্যারিয়ার বাঁচিয়ে রাখলো স্যাকরেড গেমস!

বরুণ তার অন্যান্য ছবির জন্য গড়ে ২৫ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত প্রমোশন করে থাকেন। সেখানে অক্টোবর ছবির প্রমোশনের জন্য তার সময় নির্ধারিত হয়েছিল মাত্র চারদিন। এ কথা জানতে পারার পর আকাশ থেকে পড়েছিলেন বরুণ। তিনি নিজেও জানেন, এখন পর্যন্ত তার সেরা ছবি অক্টোবরই। এই ছবিই তাকে দর্শকের সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করবে। তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি চেয়েছিলেন যতটা সম্ভব বেশি প্রমোট করবেন এই ছবিটিকে, যাতে দর্শকেরা ছবিটি দেখতে হলমুখী হন। অথচ সেখানে তাকে প্রমোশনের জন্য এত কম সময় দেয়া হয়েছে! তৎক্ষণাৎ সুজিত সরকারের অফিসে ফোন করেন তিনি। তাকে বলা হয়, জেনেবুঝেই এত কম সময় দেয়া হয়েছে প্রমোশনের জন্য। কারণ বেশি বেশি প্রমোশন করতে গেলে মুখ ফসকে কাহিনী ফাঁস করে দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে!

ঠিক একই কারণে ছবির ট্রেইলারেও বলতে গেলে কিছুই খোলাসা করা হয়নি। ট্রেইলার দেখে তাই দর্শক বুঝতেও পারেনি, কী বিষয় নিয়ে নির্মিত হয়েছে ছবিটি, কী আশা করে তারা দেখতে যাবে ছবিটি। তাই ছবিটি মুক্তির পর যা হওয়ার তা-ই হয়েছিল। খুবই স্লো স্টার্ট করেছিল ছবিটি। প্রথমদিন যারা ছবিটি দেখতে গিয়েছিলেন, তাদের সংখ্যা নেহাতই হাতেগোণা। বরুণের ডাইহার্ড ফ্যান ছাড়া আর কেউই যায়নি ছবিটি দেখতে। ছবিতে কী আছে সে সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা ছাড়াই দর্শক টিকিট কেটে ছবি দেখতে যাবে, সেই দিন কি আর আছে!

তবে প্রথমদিন অল্প যে কয়জন ছবিটি দেখেছিল, তাতেই যা কাজ হবার হয়ে গিয়েছিল। মুগ্ধ ও বিমোহিত চিত্তে হল থেকে বেরিয়েছিল ওইসব দর্শকেরা। তাই দারুণ ওয়ার্ড অফ মাউথ পেয়েছিল ছবিটি। সেই সাথে সমালোচকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা তো রয়েছেই। তাই দ্বিতীয় দিন থেকেই হলে ছুটতে শুরু করে দর্শক- তাদেরও জানতে হবে কী জাদু আছে অক্টোবরে! ফলে মাত্র ২০ কোটি রুপি বাজেটের ছবিটি, যেটি নিয়ে খুব একটা প্রচারণাও চালানো হয়নি, সেটিই শেষ পর্যন্ত আয় করে প্রায় ৫৫ কোটি রুপি!

তারচেয়েও বড় কথা, এই ছবির মাধ্যমে একাধারে যেমন বরুণের শতভাগ হিটের রেকর্ড অক্ষুণ্ণ থাকে, পাশাপাশি একজন অভিনেতা হিসেবেও দর্শকের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা পান তিনি। তাই তো এ ছবির সাফল্যের পর বরুণ বলেন, “আমার জীবনে নেয়া সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তটি হলো অক্টোবরে কাজ করা। এই ছবিটি আমার জীবনে না আসলে আমি অভিনেতা হয়ে উঠতে পারতাম না।”

আরও পড়ুন- রনবীর যেভাবে ‘সাঞ্জু’ হয়েছিলেন!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close