বাংলা সাহিত্যে গত কয়েক বছর ধরে তরুণ লেখকদের সাইন্স ফিকশন, থ্রিলার, হরর, মিস্ট্রি জনরায় গল্প লিখতে বেশি দেখা যাচ্ছে। মুষ্টিমেয় কিছু তরুণ এখনো ক্লাসিক লিখে চলছেন। বর্তমানে জনপ্রিয় পোর্টাল এগিয়ে-চলো.কমের সম্পাদক মুক্তার বিন রফিক আমার উপর দায়িত্ব দেন, গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে একজন সাহিত্যিকের সাহিত্যকেন্দ্রিক ভেতরকার গল্প তুলে নিতে। দায়িত্ব দেওয়া হয় অনেকটা নিভৃতে থাকা সময়ের জনপ্রিয় তরুণ লেখক ওবায়েদ হককে জানার। সাহিত্য নিয়ে আমার যে জ্ঞান তাতে সমৃদ্ধ সাহিত্য বিষয়ক সাক্ষাতকার নেব এই দুঃসাহস করে উঠতে পারি নি। সাথে নিলাম সময়ের তরুণ কথা সাহিত্যিক ‘সাইফুদ্দিন রাজীব’কে। আমার চেষ্টা ছিল একজন লেখক আরেকজন লেখককে কীভাবে জানতে চান! তরুণ লেখক আরেক তরুণকে কতটা পড়েন? জানতে চেষ্টা করলাম সামগ্রিক সাহিত্য নিয়ে ওবায়েদ হকের ভাবনা। সাক্ষাৎকারটি গতানুগতিক প্রশ্নোত্তর পর্ব ছাড়িয়ে সাইফুদ্দিন রাজিবের কল্যাণে হয়ে উঠলো সমৃদ্ধ সাহিত্যের নিখাদ আলোচনা।

সোহেল নূর: শুরুতেই বাউন্সার দিয়ে স্বাগত জানাতে ইচ্ছে করল- ওবায়েদ আপনার লেখক পরিচিতিতে লেখা আছে “বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা উল্টিয়ে লেখকের পরিচয় পাওয়া সম্ভব নয়। লেখক যুবক, নাকি বৃদ্ধ, শিক্ষিত নাকি অশিক্ষিত, ধনী নাকি গরিব এগুলো অপ্রাসঙ্গিক। লেখকের পরিচয় পাওয়া যাবে প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠার মাঝের পৃষ্টাগুলোতে। কালো কালো হরফের লেখাগুলোকে লেখক সন্তান মনে করেন, সন্তানের পিতা হিসেবেই তিনি পরিচিত হতে চান।” অনেকেই আপনার এই ব্যতিক্রমী লেখক পরিচিতি পছন্দ করে। এমন ব্যতিক্রমী লেখক পরিচিতি দেয়ার ভাবনাটি কি করে মাথায় এলো? এটা কী সচেতনভাবে নিজেকে আসলেই লুকিয়ে রেখে পাঠককে দেয়া লেখকের চ্যালেঞ্জ; শুধু বইয়ের কালো অক্ষরগুলো থেকেই লেখকের দর্শন; বার্তা খুঁজে বের করুন, নাকি নিজের লেখার প্রতি আত্মবিশ্বাস- হ্যাঁ, আমি লিখেছি কিছু একটা- এর মাঝেই আমার পরিচয়? নাকি পাঠককে ‘গাটস’ দেখানো?

ওবায়েদ হক: কোন দেশে যেন একটা লাইব্রেরি আছে, যেখানে কোন বইয়ের মলাট নেই, লেখকের নাম নেই। পাঠক প্রভাবমুক্ত হয়ে পড়তে পারে। আমিও তাই চেয়েছি, আমার ব্যাক্তিজীবন যেন পাঠকের মনে প্রভাব না ফেলে।

সাইফুদ্দিন রাজিব: আমি তবে একটা একটা মজার গল্প শেয়ার করি। ফেসবুকের এক নারী পাঠক আমাকে একশতভাগ নিশ্চিত করলেন, সোহেল নূরই ওবায়েদ হক! আমি একটু উল্টো করে জানতে চাই, আপনিই বলেন সোহেল নূর ভদ্রলোকটা আসলে কে?

ওবায়েদ হক: এই প্রশ্নটা অনেক পুরনো। নূর ভাই আমার স্বজন, বন্ধু আবার পাঠকও। আমার ধারণা স্বজনপ্রীতি থেকেই তিনি আমার জন্য প্রচার প্রচারণায় রত। যদিও তিনি স্বীকার করবেন না। আরেকটা ব্যাপার হলো, বই প্রকাশের ব্যাপারে শুরু থেকেই উনার উষ্কানী ছিল। বইয়ের প্রচারণায় আমার অনীহা দেখে, আমার আব্রু রক্ষায় তিনি নিজেই নগ্ন হলেন। কিছু পাঠকের স্তুতি সমালোচনা উনার উৎসাহের আগুনে ঘী ঢাললো। আমি নিজেও উনার প্রচারণায় বহুবার বিরক্ত হয়েছি, আমাকে ঠেলেঠুলে বাংলা সাহিত্যের মগডালে তুলে দিয়েছেন তিনি। আমি এই বিরক্তি উনার কাছে প্রকাশও করেছি, কিন্তু তিনি তখন ভক্তের অধিকারের দোহাই দিয়ে আমার মুখবন্ধ করে দিয়েছেন। আমি স্বভাবে অন্তর্মূখী, প্রকাশক পাঠকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা আমার জন্য অতটা সহজ নয়। নূর ভাই আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। যোগাযোগ, প্রচার সব যেহেতু উনিই করেন, মানুষ ভেবে নিয়েছে, আলবত তিনিই লেখক।

সাইফুদ্দিন রাজিব: সোহেল নূর এ বিষয়ে কী বলবেন?

সোহেল নূর: আমি এই নিয়ে কিছু না বলি। কেউ আমাকে ওবায়েদ হক ভাবলে আমার তো আপত্তির কিছু দেখি না। হাহাহা। উনার বাকী কথাগুলোর ব্যাপারে আমার কোন মন্তব্য নেই। সমকালীন লেখকদের অনেকেই ওবায়েদ হককে সাহিত্যের মগডালে বসিয়েছেন। গুড রিডসে কিংবা বইয়ের গ্রুপগুলোতে এই সময়ের তরুণ লেখকদের অনেকেরই প্রশংসা বাক্য পাওয়া যায় তাকে নিয়ে। এই নিয়ে মত দ্বিমত না জানিয়ে আমি বরং ওবায়েদ হকের কাছে জানতে চাই- আপনার মনে ক্ষোভ কিংবা দুঃখ কাজ করে না? আপনার বইয়ের পাঠক; ভক্তরা আপনাকে না আমাকেই তাদের উচ্ছ্বাস; ভালোলাগা মন্দলাগা ব্যক্ত করে। আপনাকে (আক্ষরিক অর্থে) পুছেই না।

ওবায়েদ হক:

আমার বরং সুবিধা হয়। কারো উচ্ছাস অথবা প্রশংসার জবাবে আমি সাধারণত নিরুত্তর থাকি। এমন নয় যে আমার ভালো লাগে না। ভালো লাগাটাই ভয়। স্তুতির নেশা ভয়ংকর নেশা, লেখকেরা তখন নিজের জন্য লিখতে পারেন না, পাঠকদের মন জুগিয়ে লেখেন।

সাইফুদ্দিন রাজিব: সাহিত্য বিষয়ে আলোকপাত করা যাক, ঠিক কিভাবে কথাসাহিত্যে এলেন, বিস্তারিত বললে কোন খিদে অনুভব করে লেখেন?

ওবায়েদ হক: আমার মনে আছে, ক্লাস ফোরে যখন পড়ি তখন আমাদের স্কুলে নতুন করে পাঠাগার চালু হয়েছিল। কাঠের আলমারীতে বন্দী করা হয়েছিল কিছু বই, তাদের অপরাধ তারা ‘আউট বই’। ছাত্র ছাত্রীদের অনাগ্রহে বইগুলোর বন্দীদশা কাটছিল না। একদিন আমি সাহস করে এক স্যারের কাছে সেই নিষিদ্ধ বস্তু চেয়ে বসলাম। স্যার কৃপা করলেন, ভালো ছাত্রের তকমা ছিল বলে দিলেন দুটো বই। সাথে একটি উপদেশ, এইগুলো যাতে মাথা না খায় আমার। কিন্তু আমার মাথা খেয়ে বসলো দুটো বই। আমার স্মৃতিশক্তিকে অভিশাপ দেই অবিরত, সেই দুটো বইয়ের নাম ভুলে গেছি। সৃষ্টির তাড়না হয়েছিল সেই প্রথম। আমি ছয় লাইনের একটি ছড়া লিখেছিলাম, আমার প্রথম সৃষ্টি। স্কুলের ম্যাগাজিনে নিজের এবং বন্ধু বান্ধবদের জন্যও ছড়া লিখেছি। একসময় কবিতাও লেখার চেষ্টা করেছিলাম, সেগুলো কিশোর বয়সের প্রলাপ ছাড়া কিছুই হয়নি। তারপর বহুদিন, আমি কবিতা লিখিনি, ছড়া লিখিনি, গান শুনিনি। একদিন অন্ধকার শেষ হলো, কিছু মানুষের অন্তরঙ্গতায় নিজেকে প্রকাশের সাহস পেলাম। আবার সৃষ্টি করলাম, এবার গল্প। গল্প লেখা শেষ হলে, একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়, সুখ এবং অতৃপ্তির মিশেল। এই সুখ এবং অতৃপ্তি আমাকে লেখার জন্য তাড়িয়ে বেড়ায়। সেজন্যই আমি বলি, লেখালেখি আমার শান্তি এবং শাস্তি।

সোহেল নূর: ‘মার্জিনে মন্তব্যে’ সৈয়দ হক বলেছিলেন ‘লেখাটা মানুষ খুন করার মত। পেশাদার খুনী বাদে আর সবাই খুনটা করে ফেলবার পর খুনী যেমন আৎকে উঠে; আহা আমি খুনী! একজন প্রথম অক্ষরপাত করে উঠেই আৎকে ওঠে। এখানে তফাৎ আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন -আমি লিখে ফেলেছি। ঝোঁকের বশে খুন করা কোন কোন খুনী পেশাদার খুনী হয়; ঝোঁকের বশে লিখতে শুরু করে কেউ কেউ পেশাদার লেখক হন। আপনার কী মত? সাহিত্য কি দিনের পর দিন অনুশীলনের বিষয় নাকি কিছুটা অনুশীলন কিছুটা প্রকৃতি প্রদত্ত কিংবা সহজাত?

ওবায়েদ হক: অনেকে বলেন বই পড়া ছাড়া লেখা যায় না। অনেকাংশেই সঠিক কথা, কিন্তু শুধু বই পড়ে এবং অনুশীলন করে কি যে কেউ লেখালেখি করতে পারবেন? আমার মনে হয় না, সেজন্য প্রয়োজন উপলব্ধি। উপলব্ধি প্রকৃতি প্রদত্ত নয়, বোধহয় পরিবেশ প্রদত্ত।

সাইফুদ্দিন রাজিব: সুনীল বলেছেন ‘শুধু কবিতার জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি’! সাহিত্যের জন্য আপনি কি করতে পারেন?

ওবায়েদ হক:

সুনীল কবিতার জন্য অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছেন, অথচ কবিতাই তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। এখন যুগটা এমন যে সাহিত্য করাটাও একটা ত্যাগ। আমি তাদের কথা বলছি যারা সাহিত্যকে সাধনা হিসেবে নিয়েছেন। আমিও সাধনা করছি, ত্যাগও করেছি, ত্যাগের ফিরিস্তি দিলে ত্যাগের মহিমান্বিতা ক্ষুণ্ন হবে, তাই সেই চেষ্টা করলাম না।

সোহেল নূর: নিজেকে আড়াল করে রাখেন মানছি। কিন্তু কখনো কি ইচ্ছে করে না- পাঠকের আনন্দে-উচ্ছ্বাসে অংশ নিতে? আপনার এমনও পাঠক আছে জানি-যে সারা রাত জেগে দীর্ঘ মন্তব্য ও প্রশংসায় উদ্বেলিত হয়ে আপনাকে ম্যাসেজ দিয়েছে আর আপনি জবাব দিয়েছেন -আমি কী বলব? অনেকের ম্যাসেজের রিপ্লাইও দেন না। নিজেকে কীভাবে স্তুতি; উচ্ছাস কিংবা সমালোচনা থেকে এভাবে নিবৃত্ত রাখতে পারেন? নির্লিপ্ত থাকেন কী করে? এর জন্যে কী কোন বিশেষ সাধনা করেছেন? নাকি আপনি স্বভাবগতভাবেই এমন?

ওবায়েদ হক: অপরিচিত মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। একটা মানুষকে না জানলে তার সাথে সহজ হতে পারি না, অস্বস্তি কাজ করে। সাধনা করতে হয়নি, নির্লিপ্ত থাকাই আমার স্বভাব। এছাড়া আগেও বলেছি স্তুতির চোরাবালিতে ডুবতে চাইনা আমি।

সাইফুদ্দিন রাজিব: গল্প ও উপন্যাসকে আপনি কীভাবে ভাগ করতে চান? কি কি ভাবনা কাজ করে এই বিষয়টিকে আলাদা করতে?

ওবায়েদ হক: গল্পকে আমি কবিতার সাথে তুলনা করতে পারি। গল্পেও ছন্দ থাকে, ভাব থাকে একটা গতিও থাকে কিন্তু পরিসর থাকে নির্দিষ্ট। উপন্যাসে ব্যাপকতা আছে, একটা গল্প বলার প্রয়োজনে সেখানে আরো অনেকগুলো গল্পের অবতাড়না করতে হয়। তবুও একটা কথা বলি, গল্প উপন্যাস রচনায় আমি কোন ব্যাকরণ মানতে রাজি নই। সৃষ্টিশীল কাজের কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নেই।

সাইফুদ্দিন রাজিব: খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন, আপনার গল্প নির্বাচনে বাস্তবতা নাকি কল্পনাকে প্রাধান্য দেন?

ওবায়েদ হক: আমি যা কিছু দেখেছি, যা কিছু শুনেছি এবং যা কিছু কল্পনা করেছি সবগুলো মিলেই অভিজ্ঞতা। গল্প লেখায় অভিজ্ঞতা কাজে দেয়, কিন্তু সবচেয়ে জরুরী যা তা হলো উপলব্ধি। উপলব্ধি থাকলে নিরস কোন বাস্তব ঘটনায়ও রসালো গল্প পাওয়া যায়। আর সাহিত্যে কল্পনা হচ্ছে নুনের মত, অবশ্য প্রয়োজন।

সাইফুদ্দিন রাজিব: নিজেকে পাঠক হিসাবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। সেজন্য আপনার বইও পড়েছি, গল্পও। যেমন ধরুন আপনার লেখা ‘অসুখ’ গল্পে একটা চরিত্র ছিল, রত্না। যিনি স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ির পরে খালেদদের বাড়ী আসেন। ঠিক কি ভেবে এমন একটা চরিত্র ওই গল্পে এসেছিল?

ওবায়েদ হক: প্রধান চরিত্রের আক্ষেপ বাড়ানোর জন্য রত্নার প্রয়োজন ছিল। একটা নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তকে জাস্টিফাই করার জন্য এমন একটি চরিত্রের অবতারণা জরুরী ছিল। স্বাধীনতা যদি কেউ উপলব্ধি করতে না পারে সে বুঝতেই পারবে না যে সে পরাধীন।

সাইফুদ্দিন রাজিব: ‘নীল পাহাড়’ অথবা ‘তেইল্যা চোরা: কিংবা ‘জলেশ্বরী’ প্লট হিসাব করলে সেমি ক্লাসিক ধরা যায়। সত্তর/আশির দশকের কাহিনী। গল্প নির্বাচনে ঠিক ওই সময়টাকে কেন ভাবেন?

ওবায়েদ হক:

যে দিনগুলো গত হয়েছে, হারিয়েছে তার জন্য আমাদের মনে মায়া আছে। আমরা স্মৃতিকাতর হই। পুরনো বন্ধু পেলেই অতীতে ফিরে যাই, স্কুলে গিয়ে রহিম স্যারের বেতের খোঁচা খাই। একটু অবসর পেলে শৈশবে ঘুরে আসি, বাবার কোলে চড়ি, মায়ের আচল ধরে হাঁটি। সেইসব কর্দমাক্ত দিনও এখন সোনালি মনে হয়। উপন্যাস রচনার জন্য সেই সোনালি সময়কে উপেক্ষা করতে পারিনি। তবে সময়ের গন্ডিতে আবদ্ধ থাকতে চাই না আমি। মনে কোন গল্প আঘাত হানলে সেই গল্পটা লিখে ফেলতে চাই, তা যে সময়েরই হোক না কেন।

সাইফুদ্দিন রাজিব: আপনার বাক্য রচনায় একটা মোহ টের পাই। রসবোধও রয়েছে। যা বেশীরভাগ পাঠককে গল্পের থেকে ন্যারেটিভ কৌশলে আঁকড়ে রাখে। প্রশ্ন হলো, বাক্য গঠন কি গতানুগতিক ভাবনা থেকে এসে যায়, নাকি লেখার পরে সেগুলো আবার সাজান?

ওবায়েদ হক:

লেখার আগে আমি যা চিন্তা করি, তার অনেকটাই লিখতে পারি না। লিখতে লিখতেই কোথাকার গল্প যে কোথায় চলে যায়। তখন মনে হয়, আঙ্গুলই আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, মাথা নয়। একবার একটা গল্প এবং উপন্যাস লিখে ফেলার পর আমার খুব অনাগ্রহ চলে আসে সেই লেখাটার প্রতি, উত্তেজনাটা আর থাকে না। ভাবি অনেক কিছু সংশোধন করব, কিন্তু খুব বেশি কিছু করা হয় না আর।

সাইফুদ্দিন রাজিব: আপনার লেখায় একটা জিনিস খেয়াল করি; অনুচ্ছেদ ভাগ করার সময় গল্পের স্খলন। চরিত্রগত স্খলনও বলতে পারি, মানে প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়ে অন্য বিষয় পরিবর্তন করা। কেন?

ওবায়েদ হক: এটার একটা কারণ হতে পারে, আমি দীর্ঘক্ষণ এক টানা লিখতে পারি না। আমার বিরতির প্রয়োজন হয়। একটা ঘটনাপ্রবাহ একটানা বেশিক্ষণ আমাকে উত্তেজিত রাখতে পারে না, সেজন্য বিরতি নেই আমি, গল্প থেকে, চরিত্র থেকে। এসব আপনি বললেন বলেই আমার মাথায় এলো। এমনিতে আমি কখনোই এসব ব্যাপার খেয়াল করিনি।

সাইফুদ্দিন রাজিব: ধরুন কোন প্লট ভাবলেন, লিখতে বসার আগে আপনি সকল চরিত্রবিন্যাস করে ফেলেন? আবার গল্পের ভেতরে গল্প চলে আসা। এগুলো কি পুর্ব পরিকল্পিত নাকি লিখতে লিখতে তৈরি হয়?

ওবায়েদ হক: আগেই বলেছি আমি যা ভাবি তার অল্পকিছুই লিখতে পারি। মাথার ভেতরে কোন ভাবনা যদি বাসা বেধে ফেলে, তখন আমি সেই ভাবনাটাকে যাচাই বাছাই করি মনের মধ্যেই। অনেক কাটছাটের পর যদি সন্তোষজনক মনে হয় তখন লিখতে বসি। লিখতে বসে আবার কাটছাট করে আমার আঙ্গুল। তারপর যা হয় প্রায় সময়েই তা আমার মনের মত হয় না। তখন হয়ত লেখাটা আর শেষ করিনা অথবা রেখে দেই ভবিষ্যতের জন্য। অনেক সময় লিখতে লিখতেই গল্প গর্ভবতী হয়, গল্প থেকে জন্ম নেয় নতুন গল্প।

সাইফুদ্দিন রাজিব: লিখছেন সমাজের গল্প, সামগ্রিকভাবে যদি জলেশ্বরীর কথা বলি। সেখানে একটা চরিত্র ছিল, জলছর গ্রামের ইব্রাহীম। পাঠক হিসাবে এই খুব অল্প সময়ের চরিত্র আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, ভাবিয়েছে। যদি প্রশ্ন করি, কেন এলো জলছরের ইব্রাহীম অথবা কি ভেবে তাকে তুলে আনলেন?

ওবায়েদ হক: আমি আমার গল্প উপন্যাসের সব চরিত্রের নাম মনে রাখতে পারি না, তাৎক্ষণিক ভাবে মাথায় আসে না আর কি। ইব্রাহিমের কথা জিজ্ঞাসা করলেন, তখন আমার মাথায় এলো, ইব্রাহিম কে যেন? অথচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ইব্রাহিম গাজী একটি জিজ্ঞাসা, যার উপর গড়ে উঠেছে পুরো গল্পটি। নাম ভুলে গেলেও চরিত্রটি আমার মনে আছে। কোন বিশেষ চিন্তায় এই চরিত্রের সৃষ্টি, তা এখন মনে করা কঠিন। তবে এই চরিত্রটি আমাকে শেষ পর্যন্ত গল্পটি লিখতে বাধ্য করেছে। কীভাবে ইব্রাহীম গাজীর ভাঁজ খুলবো তা নিয়ে আমিও উত্তেজিত ছিলাম। এইটুকু উত্তেজনা না থাকলে লেখার ধৈর্য থাকতো না।

সাইফুদ্দিন রাজিব: নীল পাহাড়, জলেশ্বরী, তেইল্যাচোরা যে বইয়ের কথাই বলেন। আপনার লেখায় একটা বিশেষ দিক থাকে, পাঠক বাক্য পড়ার সময় ভিউজুয়ালাইজ করতে পারে। যেমন ধরুন, ‘একটু আগে গরম পানিতে পশম হারানো কুকুর দুটি দূর থেকে তাকিয়ে আছে আর কুঁই কুঁই শব্দ করছে, তাদের একটি মানব সঙ্গী জুটবে মনে হচ্ছে।’ মুহূর্ত আগে আপনি বলেছেন কেরামত মিয়াঁর কথা, সাথে সাথে স্খলন ঘটিয়ে কুকুরের উদাহরণ এমনভাবে দিলেন যেন চোখের সামনের ঘটছে। এই ভাবনাটা কীভাবে আনেন? অর্থাৎ গল্প লেখার সময় বিষয়বস্তুর বাইরে নিজের ভাবনাকে কীভাবে টেনে নেন?

ওবায়েদ হক:

কল্পনার চরিত্র এবং পারিপার্শ্বিকতাকে বিশ্বাস করতে হবে। লেখক নিজে বিশ্বাস করলে পাঠকের কাছেও বিশ্বাসযোগ্য হবে। আমি চোখ বন্ধ করে যদি দৃশ্যটা দেখতে না পারি, পাঠকেরাও পাবেন না। আমি নিজের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য বিভিন্ন ছোটখাট উপাদান যোগ করি। পাঠক যদি সেই দৃশ্যটি ধরতে পারে তার কৃতিত্ব পাঠককেও দিতে হবে, উপলব্ধি আছে বলেই লেখকের চোখে পাঠক দেখতে পায়। কি অপূর্ব ব্যাপার।

সাইফুদ্দিন রাজিব: গল্প ও প্লট নির্মাণে আপনার ক্ষমতা আমার কাছে ঈর্ষনীয় মনে হয়। আমরা যেখানে ইতিহাসের গল্প লিখি, আপনি কল্পনাকে বাস্তব বানাচ্ছেন। ঠিক কি কি ভাবনা থেকে প্লট নির্বাচন করেন?

ওবায়েদ হক: প্লট নির্বাচনের জন্য কোন নির্দিষ্ট মানদণ্ড চিন্তা করি না। কোন গল্প যখন আমার মনে ধরে যায়, তখনই তা লিখতে বসি। আমার নিজের পছন্দটাই গুরুত্ব দেই এইক্ষেত্রে।

সোহেল নুর: প্লট নির্বাচন নিয়েই যখন কথা হচ্ছে তো একই টপিকে আমারও একটা প্রশ্ন আছে। আপনার প্রথম বই ‘একটি শাড়ি এবং কামরাঙা বোমা’ র নাম গল্পটি সহ আরো একটি গল্প ‘ছোঁয়া’ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত; আপনার প্রথম উপন্যাস ‘নীল পাহাড়’ এ মুক্তিযুদ্ধের কয়েকটি প্রেক্ষাপট খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাবে ছিল ( যেমন- বরকত আলীর নৃশংসতা; সুধীর বাবুর স্ত্রী কন্যার ধর্ষণ; ছেলেকে পাক বাহিনীর নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা; মানিকের জন্যে দোয়াতের কালি রেখে যাওয়া মেয়েটির ধর্ষণের শিকার হওয়া..) আপনার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘তেইল্যা চোরা’র প্রেক্ষাপট-ই তো মুক্তিযুদ্ধ এর উপর; আপনার তৃতীয় উপন্যাস ‘জলেশ্বরী’-তেও অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ভাবে কিন্তু খুবই বলিষ্ঠ চরিত্র মুক্তিযোদ্ধা আসাদউদ্দীনকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা এনেছেন। এই যে বারে বারে আপনি মুক্তিযুদ্ধের কথা আপনার লেখায় তুলে ধরেন, এটা কি কোন সচেতন ‘বোধ’ থেকে?

ওবায়েদ হক:

আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন ভাবতাম আরেকবার যুদ্ধ হলে আমি অবশ্যই যুদ্ধে যাব। বড় হওয়ার পর আমার ভাবনাও স্বার্থপর হয়েছে, অনেক পিছুটান সৃষ্টি হয়েছে। এখন অবাক হয়ে ভাবি, গর্ভবতী বউকে ফেলে, বাপ মায়ের অবাধ্য হয়ে, জীবনের মায়া ছেড়ে কি চিন্তা করে তারা যুদ্ধে গিয়েছিল? কি আগুন জ্বলেছিল তাদের বুকে? আমি ভুলতে পারি না তাদের। তারা আমার ভাবনায় থাকে তাই গল্পেও চলে আসে।

সাইফুদ্দিন রাজিব: বইমেলায় বিষয়ভিত্তিক বইকে সাহিত্যের বই হিসাবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার ভাবনা কি?

ওবায়েদ হক: বিষয়ভিত্তিক বইও সাহিত্য হতে পারে, যদি তাতে শিল্প থাকে। যেমন শাহাদুজ্জামানের ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর একটি কাল্পনিক সাক্ষাৎকার, যেখানে ক্যাস্ট্রোর ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক জীবন উঠে এসেছে। এই বইটিকে আপনি সাহিত্য থেকে খারিজ করে দিতে পারবেন না। আর যে লেখায় শুধু উদ্দেশ্য আছে, শিল্প নেই সেটা সাহিত্য নয়। এসব অপসাহিত্য ক্ষণস্থায়ী, ঝড়ের মত এসে ধুলোবালি উড়িয়ে আবার মিলিয়ে যাবে।

সোহেল নূর: আপনাকে বলা হয় ‘আউট অফ প্রিন্ট’ লেখক। আপনার অধিকাংশ বই বাজারে অনেক দিন ধরেই আউট অফ প্রিন্ট ছিল ( এখনো আপনার প্রথম বইটি এই খেতাবধারী) আপনার বইগুলোর এত পাঠকপ্রিয়তা পাবার পরও এমন মন্দ ভাগ্য জুটল কেন?

ওবায়েদ হক: এখন তো চারটা বই বাজারে আছে। উপরোক্ত খেতাব থেকে মুক্তি পেতেই পারি। প্রথম বইটি রিপ্রিন্ট করার জন্য অনেক প্রকাশক আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, আমিই রাজি হইনি। কিছু গল্প ঝোকের বশে লিখেছি, যেগুলোকে আমি এখন নিজের বলে অস্বীকার করি। আমি চাই না আমার লেখক সত্তাকে কেউ সেইসব লেখার মাধ্যমে বিচার করুক।

সোহেল নূর: বই বিপণনের ক্ষেত্রে কার ভূমিকা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন- লেখক নাকি প্রকাশকের?

ওবায়েদ হক: বিপণন তো প্রকাশকেরই কাজ। বিজ্ঞাপণে লেখক হয়ত সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু বিপণন বিজ্ঞাপণ সব লেখকের উপর ছেড়ে দিয়েছেন অনেক প্রকাশক। টাকা দিয়ে বই ছাপিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ মনে করেন। বাধ্য হয়ে তখন লেখক হয়ে যান -সেলসম্যান, মার্কেটিং এজেন্ট। ফেইসবুকের বাইরে প্রচারণা বলতেও কিছু নেই, তাই পাঠক হয়ে যাচ্ছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি।

সোহেল নূর: কখনো কী আক্ষেপ হয় ‘ইশ আমি যদি ‘অমুক’ ‘অমুক’ লেখকের মত লিখতে পারতাম!

ওবায়েদ হক: যখনই কোন ভালো লেখা পড়ি, আমার এই আক্ষেপ হয়।

সাইফুদ্দিন রাজিব: একজন তরুণ লেখককে কথা সাহিত্যের মূলধারার গল্প লিখতে লেখক ওবায়েদ হক কি কি পরামর্শ দেবেন?

ওবায়েদ হক: পরামর্শ দেয়ার মত জ্ঞাণ আমার নেই। আমি যা বিশ্বাস করি, তাই বলতে পারি। নিজের লেখার সবচেয়ে বড় সমালোচক হতে হবে নিজেকে। প্রশংসায় গা ভাসাবেন না, সমালোচনায় আহত হবেন না। নিজের তৃপ্তির জন্য লিখুন, কিন্তু সবসময় অতৃপ্ত থাকুন। পারলে সিনিয়র লেখকদের এড়িয়ে চলুন। সাহিত্যিকদের অনেক জোট আছে ঢাকা শহরে। এসব জোটে গেলে সহজেই পাদ প্রদীপের আলোয় আসতে পারবেন। অনেকেই সিনিয়র লেখকদের কৃপা দৃষ্টির জন্য পায়ে পায়ে ঘুরেন, বাজার সদাই করে দেন, বাচ্চাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসেন। এসব ব্যাক্তিত্ব বিবর্জিত কাজ করে সাহিত্যিক হিসেবে আত্মাহুতি দিবেন না। নিজের কাজের উপর বিশ্বাস রাখুন। জোট করে ঘোট পাকিয়ে সাহিত্য হয়না।

সোহেল নূর: ইদানীং বেশির ভাগ তরুণ লেখকই থ্রিলার; হরর; ফ্যান্টাসি জনরা’তে লিখছেন। পাঠকও তা আনন্দের সাথেই গ্রহণ করছে। আপনার কী থ্রিলার বা এভাবে জনরা ভিত্তিক লেখার আগ্রহ আছে?

ওবায়েদ হক: এই জনরা ব্যাপারটা তো প্রকাশকদের আবিষ্কার। পাঠকদের সুবিধার জন্য অথবা আকৃষ্ট করার জন্যই ভাগ বাটোয়ারা। আমি কখনোই জনরা মাথায় রেখে লিখিনি। ব্যবসায়ীদের শ্রেনীবিন্যাস আমার লেখার গতি নির্ধারণ করবে আমি তা কখনোই মানতে পারব না।

সাইফুদ্দিন রাজিব: এ সময়ের লেখকগণ যেখানে সোশ্যাল মিডিয়াতে সরব সেখানে আপনি ব্যক্তিগতভাবে নীরব, একজন লেখক যেহেতু সাধারণ পাঠকের জন্য লেখেন, তাহলে লেখাটাকে সাধারণে পৌছতে আপনার ভূমিকা কম থাকবে কেন? এখানে একটা দায়বদ্ধতা থেকে যাচ্ছে না?

ওবায়েদ হক: আমি অজুহাত দিতে পারি, সব দোষ ফেলতে পারি আমার অন্তর্মূখী স্বভাবের ঘাড়ে। তারপরও দায় থাকে। দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে পাঠকেরাই, পাঠকরা চালুনিতে ছেকে নিবে, ধূলোবালি সব ছেকে মণি মাণিক্য রেখে দিবে। আমি মনে করি ধূলোবালি প্রচারের কোন মানে হয়না। কোনদিন যদি মণি মাণিক্য রচনা করতে পারি পাঠকেরাই খুঁজে নিবে। অবশ্য পাঠকরা খুঁজে না নিলেও হীরা মণি মাণিক্যের জৌলুস কমে যাবে না। অর্থ, যশ, খ্যাতি অনেক সময় লেখকের সৃষ্টিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। রণজিৎ দাশগুপ্ত এজন্য বলেছেন, নবীন লেখকদের অন্তত দশ বছর নির্বাসনে কাটানো উচিত, অগ্রজ সাহিত্যিক, স্তুতি এবং সমালোচনা থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখা উচিত।

সাইফুদ্দিন রাজিব: আমার পক্ষ থেকে শেষ প্রশ্ন, বইমেলা ২০১৮-তে নতুন কোন বই নেই। আক্ষেপ নাকি নতুন কোন চমকের অপেক্ষা?

ওবায়েদ হক: লিখতে পারিনি কিংবা লিখতে ইচ্ছা হয়নি। বইমেলা কেন্দ্রিক বই বাণিজ্যে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে এখন এক প্রকার অনীহা বোধ করি। এখন মনে হয় বইমেলা মূলত প্রকাশকদের মেলা। যারা পাঠক তারা সারাবছরই বই কিনেন। তাই যারা লেখক তাদেরও সারা বছর লেখা উচিত, শুধু বইমেলায় নয়। আমি লিখছি, প্রকাশযোগ্য কিছু গড়তে পারলে নতুন বই আসবে। হতে পারে এই বছর, আগামী বছর অথবা দশ বছর পরে।

সোহেল নূর: সাইফুদ্দিন রাজিব এবং ওবায়েদ হক আপনাদের দুইজনকে ধন্যবাদ। সাক্ষাতকারে গ্রহণে প্রশ্ন ও উত্তর দিয়ে সাহায্য করার জন্যে। বাংলা সাহিত্য আপনাদের মত আরো সকল সমকালীন তরুণ-অরুণ লেখকদের হাত ধরে এগিয়ে চলুক সামনের দিকে। আপনারা এগিয়ে চলুন শুভ কামনা রইল। ‘এগিয়ে চলো’-কে ধন্যবাদ এই দুঃসাহসী কর্মটি করার সুযোগ দেয়ার জন্যে। এগিয়ে চলো এভাবে এগিয়ে চলুক সামনের পানে।

Comments
Spread the love