ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

“আপা…গণতন্ত্র রক্ষায় আমি জীবন দিতেও রাজী আছি!”

সাল উনিশশো সাতাশি। রাজধানী ঢাকা। সূর্য মাথার ওপরে চড়ে বসেনি তখনও, রাস্তায় প্রচুর মানুষজন, মিছিলগুলো সব ঢাকার নানা প্রান্ত থেকে জড়ো হচ্ছে জিরো পয়েন্টের দিকে। রাজপথে জনস্রোত, মানুষের মাথা ছাড়া কিছু দেখা যায় না আর। এরমাঝে চোখে পড়ে ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড। মাইকের হাঁকডাক শোনা যায়, তারচেয়েও জোরে গর্জে ওঠে মিছিলে অংশ নেয়া জনতার কণ্ঠ। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে পথে নেমেছে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ, এরশাদের পতন ঘটানোটাই একমাত্র লক্ষ্য।

একসঙ্গে আন্দোলন করছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ আর বিএনপি। নভেম্বরের দশ তারিখে আওয়ামীলীগের সমাবেশ ছিল জিরো পয়েন্টে, বিএনপি জমায়েত হয়েছিল হাউজবিল্ডিং ফিন্যান্স কর্পোরেশন বিল্ডিঙের সামনে, দৈনিক বাংলায় জড়ো হয়েছিল বামপন্থী দলগুলো। খন্ড খন্ড মিছিলগুলো এসে মিশে যাচ্ছে জনসমুদ্রে, সেই সমুদ্রের আকার বাড়ছে ধীরে ধীরে, রূপ নিচ্ছে মহাসাগরে।

একটা সেডান গাড়ির ভেতরে বসে আছেন বঙ্গবন্ধুকণ্যা এবং আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কিছুক্ষণ পর ভাষণ দিতে মঞ্চে উঠবেন তিনি। আশেপাশে পরিচিত নেতাকর্মীরা ভীড় করে আছে। কার্তিকের মিঠে রোদ একটু একটু করে তেজ ছড়াচ্ছে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। বছর পঁচিশের এক তরুণ হঠাৎ করেই দৃষ্টি আকর্ষণ করলো তার, খালিগায়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই যুবক। শ্যামলা বরণ শরীরজুড়ে সাদা কালিতে কয়েকটা শব্দ লেখা। সামনের দিকের লেখাগুলো পড়তে পারেন শেখ হাসিনা, সেখানে লেখা- “স্বৈরাচার নিপাত যাক”।

শেখ হাসিনা কাছে ডাকলেন সেই তরুণকে। বললেন, “আপনার গায়ের লেখাগুলো দেখলে তো পুলিশ গুলি করবে। সাবধানে থাকবেন।” লোকটা তার মাথা খানিকটা নামালো, গাড়ির জানার কাঁচের কাছাকাছি মুখ এনে বললো- “আপা, আমার জন্যে দোয়া করবেন, গণতন্ত্র রক্ষায় আমি জীবন দিতেও রাজী আছি!” তারপর হারিয়ে গেল মিছিলের ভীড়ে, মিশে গেল জনমানুষের স্রোতে। এই তরুণের নাম নূর হোসেন, কিছুক্ষণ পর যিনি বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে নিজের নামটা লিখে যাবেন স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে।

জন্ম তার ১৯৬১ সালে, পিরোজপুরে। বাবা মুজিবুর রহমান ছিলেন অটোরিক্সা চালক। স্বাধীনতার পর পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন মুজিবুর রহমান, সেই সূত্রে নূর হোসেনের বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই। পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের কারণে পড়াশোনা করতে পারেননি বেশীদূর, ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েই পাট চুকিয়ে নিয়েছিলেন এই অধ্যায়ের। কাজ শুরু করেছিলেন গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে। রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল খুব, দেশে তখন স্বৈরশাসন, কিংবা শাসন না বলে শোষণ বলা ভালো। সে শোষণের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদী ছিলেন সর্বদা। ১৯৭৫ সালে পরিবারের সবাইকে হারানোর ছয় বছর বাদে শেখ হাসিনা তখন দেশে ফিরেছেন, নূর হোসেন যোগ দিলেন আওয়ামীলীগে। নিজের কার্যক্রমে বনগ্রাম শাখার প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন কয়েক বছরের মধ্যেই।

সেই গণতন্ত্রপ্রেমী নূর হোসেন এগিয়ে যান দীপ্ত পদক্ষেপে, মিছিলের অগ্রভাগে থাকে তার কৃষ্ণকায় শরীরটা, সাদা রঙের হরফগুলো মুক্তোর মতোন জ্বলজ্বল করে সেখানে। লক্ষ মানুষের মিছিলে এক অন্যরকম প্রেরণা এনে দেয় এই কয়টা শব্দ- “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক!” মিছিলে আগতদের গলা আরও জোরে গর্জে ওঠে নূর হোসেনকে দেখে। সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তিনি, সবার সামনেই দেখা যায় তাকে। সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্রেম খুঁজে ফেরে তাকে।

আরও একটা জিনিস নূর হোসেনকে খুঁজে ফেরে। এরশাদ সরকারের লেলিয়ে দেয়া পুলিশের বন্দুকের নল। মিছিলটা তখন জিরো পয়েন্টের সামনে, গুলির আওয়াজ শোনা যায় মূহুর্মূহু। বাতাসে পোড়া বারুদের গন্ধ, কালো পিচঢালা রাস্তা তখন লাল রঙে রঞ্জিত, নূর হোসেন নিজেকে আবিষ্কার করে মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায়। চারদিকে তুমুল হইচই, সেসবের আওয়াজ কানে ঢোকে না নূর হোসেনের। উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই শরীরে, টিয়ার গ্যাসের ঝাঁঝালো গন্ধে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে তার। শেষবারের মতো চোখ বন্ধ করে ফেলার আগে একবার নীল রঙের আকাশটার দিকে তাকান নূর হোসেন, সেখানে জ্বলজ্বল করছে সূর্যটা।

সেদিন পুলিশের গুলিতে মোট তিনজন শহীদ হয়েছিলেন। নূর হোসেন, নূরুল হুদা বাবুল এবং আমিনুল হুদা টিটু। এদের মধ্যে নূর হোসেন এবং নূরুল হুদা বাবুল সরাসরি আওয়ামীলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যে গণতন্ত্রের দাবীতে নূর হোসেনের আত্মত্যাগ, যে গণতন্ত্রকে গায়ে জড়িয়ে নূর হোসেন বুকপেতে নিয়েছিলেন পুলিশের তপ্ত সীসার বুলেট- সেই গণতন্ত্র সাময়িকের জন্যে হলেও এসেছিল বাংলার মাটিতে। স্বৈরাচারীর অত্যাচার হার মেনেছিল নূর হোসেনদের বলিষ্ঠ প্রতিবাদের সামনে, দুর্বার আন্দোলনের পথটা সুগম করে দিয়েছিল নূর হোসেনের বলীদান, সে আন্দোলনেই শেষ পর্যন্ত পিতন ঘটেছিল স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের।

ত্রিশ বছর হয়ে গেছে সেই ঘটনার বয়স, নূর হোসেনের রক্তে রঞ্জিত জায়গাটার নাম এখন শহীদ নূর হোসেন স্কোয়ার। ১০ই নভেম্বর পালন করা হয় শহীদ নূর হোসেন দিবস। সেদিনের সেই স্বৈরাচারী এরশাদ পরে সংসদে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চেয়েছেন নূর হোসেনের মৃত্যুর জন্যে। কিন্ত যে গণতন্তের জন্যে নূর হোসেনরা জীবন দিয়েছিলেন নিঃশঙ্কোচে, সেই গণতন্ত্র কি এসেছে সত্যিকার অর্থে? প্রশ্নটার উত্তরটা সরাসরি দিতে দ্বিধা হয় এখনও। ক্ষমতার পালাবদলে সময়ের পরিক্রমায় সেদিনের স্বৈরাচারী এরশাদ এখনও ক্ষমতার প্রভাবক হিসেবে কাজ করেন বড় দলগুলোর জন্যে, তাদের রুটি-কলা ভাগাভাগীর অংশীদার হন। তাতে নূর হোসেনের আত্মা কতটা তৃপ্তি বা কতখানি কষ্ট পায়- সেটা আমরা জানিনা।

আমরা শুধু জানি, নূর হোসেন এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের নাম, প্রতিবাদী এক সত্ত্বার নাম, এক বিদ্রোহী স্ফুলিঙ্গের নাম নূর হোসেন- যে স্ফুলিঙ্গ অত্যাচারীর ভিত নাড়িয়ে দেয়, স্বৈরাচারীর অবৈধ ক্ষমতার মসনদ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় গণতন্ত্র নামের সুবাতাসের হাতছানিতে!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close