কাজানে উপস্থিত বিশ হাজার, আর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা লক্ষ-কোটি সমর্থককে কাঁদিয়ে, বেলজিয়ামের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে চলতি রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮ থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। ফলে ২০০২ আসরের পর টানা চতুর্থবারের মত শিরোপাবঞ্চিত থাকতে হলো তাদেরকে। ২০২২ সালে কাতারে যখন পরবর্তী বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে, ব্রাজিল ভক্তদের অপেক্ষার কাল ১৬ থেকে বেড়ে ২০-এ পৌঁছে যাবে।

নিঃসন্দেহে মাঠের খেলার বিচারে দুই দলের মধ্যে শ্রেয়তর দলটিরই জয় হয়েছে। কিন্তু তারপরও ম্যাচ শেষে পরাজয় মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে অনেক সেলেকাও সমর্থকেরই। যার কারণ দ্বিতীয়ার্ধে তাদেরকে একটি নিশ্চিত পেনাল্টি থেকে বঞ্চিত করা। বিরতির পর খেলা শুরু হওয়ার দশ মিনিটের মাথায় বেলজিয়াম ডি-বক্সে ভিনসেন্ট কম্পানি তার ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাব সতীর্থ গ্যাব্রিয়েল জেসুসকে এমন মারাত্মক একটি ট্যাকল করে বসেন, তাও আবার বল যখন ধারে-কাছেও ছিল না, তাতে অধিকাংশ মানুষই সেটিকে ফাউল বলে ধরে নেয়, এবং ভাবে পেনাল্টি পেতে যাচ্ছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, পেনাল্টি দেয়া হয়নি ব্রাজিলকে!

এই ঘটনার পর রবার্তো মার্তিনেজের শিষ্যরা দ্রুত গোল-কিক নিতে উদ্যত হয়, যাতে খেলা শুরু হয়ে যায় আর রেফারি ভিএআরের মাধ্যমে ঘটনাটি রিভিউ করতে না পারেন। কিন্তু রেফারি মিলোরাদ মাজিচ সাময়িকভাবে খেলা থামিয়ে দেন এবং ইয়ারপিসের মাধ্যমে ভিএআর কন্ট্রোল রুমের সাথে যোগাযোগ করতে থাকেন। সকলেই আশা করেছিল, বিতর্ক এড়ানোর জন্য তিনি হয়ত নিজেও মাঠের পাশে রাখা স্ক্রিনে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে যাবেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। সবাইকে চমকে দিয়ে, মাত্র অল্প কিছুক্ষণ আলোচনার পরই ‘প্লে অন’ বলে খেলা পুনরায় শুরু করে দেন তিনি।

ম্যাচের প্রথমার্ধ জুড়ে রেড ডেভিলসরাই ছড়ি ঘুরিয়েছে, এবং ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচ অনেকটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই তেড়েফুঁড়ে খেলতে আরম্ভ করে তিতের দল, এবং ওই সময় পেনাল্টি থেকে তারা যদি গোলটি করতে পারত, তাহলে খেলার গতিপ্রকৃতি যে পাল্টে যেত তা বলাই বাহুল্য। একটি গোল ব্রাজিলকে যেমন মানসিকভাবে অনেক চাঙ্গা করে দিত, হতোদ্যম করে দিত বেলজিয়ামকেও। ফলে দিনশেষে ম্যাচের ফলাফল ব্রাজিলের পক্ষে আসুক বা না আসুক, ম্যাচটি নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত সময়ে গড়াতেই পারত। কিন্তু রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তে তা আর হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বিবিসি ওয়ানের সহ ধারাভাষ্যকার ড্যানি মারফি বলেন, “আমি জানি না এইমাত্র আমরা যা দেখলাম, তারা (ভিএআর কন্ট্রোল রুমের রেফারিরা) কি তা দেখেননি? তাহলে এটিকে পেনাল্টি না দিয়ে কীভাবে পারেন তারা? খুব বড় বাঁচা বেঁচে গেল বেলজিয়াম। কোম্পানিকে অনেক ভাগ্যবান বলতে হবে।”

কী কারণ থাকতে পারে ব্রাজিলকে পেনাল্টি না দেয়ার পেছনে? সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য যুক্তি যেটি, তা হলো কম্পানি যখন স্লাইড করে জেসুসকে ট্যাকলটি করতে যান, ততক্ষণে বল বাই-লাইনের বাইরে বেরিয়ে গেছে। তাই কম্পানির সাথে যদি জেসুসের সংঘর্ষ না-ও হতো, তাহলেও তিনি গোলে শট নিতে পারতেন না। বল ইতিমধ্যেই ‘আউট অফ প্লে’ হয়ে যাওয়ার ফলে রেফারি চাইলে পেনাল্টি না-ও দিতে পারেন, এবং এক্ষেত্রেও হয়েছে সেটিই।

কিন্তু তারপরও আরেকটি প্রশ্ন থেকেই যায়। ভিএআরের মাধ্যমে নিজ চোখে পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখার সুযোগ থাকলেও, সেটি কেন নিলেন না রেফারি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই টেনে আনছেন নেইমারকে। এমনকি এ কথাও তারা বলছেন যে নেইমারের কৃতকর্মের জন্যই সাজা পেতে হয়েছে তার দলকে!

নেইমারের কোন কৃতকর্ম? সেটি জেসুস-কম্পানি সংঘর্ষের পাঁচ মিনিট আগের ঘটনা। রাশিয়া বিশ্বকাপের আগের চার ম্যাচে নেইমারকে যতটা মাটিতে গড়াগড়ি খেতে, এবং রেফারির কাছে ফাউলের দাবি জানাতে দেখা গেছে, অতটা দেখা যায়নি বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে। কিন্তু তারপরও দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে ফেলাইনিকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার সময় খুব আলতো একটি ছোঁয়াতেই পড়ে যান বিশ্বের সবচেয়ে দামি এই খেলোয়াড়, এবং আবারও অতিরঞ্জিত অভিনয় করতে শুরু করেন।

রেফারি চাইলে তখন তাকে ইচ্ছাকৃত ডাইভের জন্য হলুদ কার্ড দেখাতে পারতেন, যেমনটি দিনের আগের খেলায় দেখেছেন কিলিয়ান এমবাপে। কিন্তু নেইমার সে যাত্রায় বেঁচে যান। তবে এই কারণেই মিনিট পাঁচেক পর ব্রাজিল যখন একটি নিশ্চিত পেনাল্টির সুযোগ পায়, রেফারি নিজের চোখে সেটি রিভিউ করার প্রয়োজনও বোধ করেননি বলে অভিমত সাবেক ইংলিশ খেলোয়াড় অ্যালান শেয়ারার।

“এটিই (নেইমারের ডাইভ) সম্ভবত কারণ যেজন্য পাঁচ বা দশ মিনিট বাদে তারা ভিএআরের কল পায়নি। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তারা যদি কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, নিঃসন্দেহে সেটি ব্রাজিলের বিপক্ষেই গিয়েছে। নেইমারের এরকম কাজ, ইচ্ছাকৃত ডাইভ বা চিট করতে চাওয়া, দলকে কখনোই কোনভাবে সাহায্য করতে পারে না। আমি মনে করি ব্রাজিল তার এসব কাজেরই শাস্তি পেয়েছে।”

১৯৯০ সালে পশ্চিম জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপ জেতা এবং ২০০৬ বিশ্বকাপে জার্মানির কোচের দায়িত্বে থাকা জার্গেন ক্লিন্সম্যানও জেসুসের পেনাল্টি না পাওয়ার জন্য নেইমারের ডাইভের দিকেই আঙ্গুল তুলেছেন, “এটি একটি পরিষ্কার পেনাল্টি। ভিএআর কি নেইমারের ডাইভের শোধ নিল? কন্ট্রোল রুম থেকে রেফারিকে কী বলা হলো?”

বেলজিয়ামের বিপক্ষে ব্রাজিলের এই হতাশাজনক হারের অন্যতম কারণ হয়ে থাকবে জেসুসের পেনাল্টি না পাওয়ার ঘটনাটি। কিন্তু এর পেছনে নেইমারের কোন প্রভাব রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার সময় এসেছে ব্রাজিল টিম ম্যানেজমেন্টের। তার প্রতিভা নিয়ে কারও মনে কোন সংশয় নেই, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে যেভাবে তিনি তার অভিনয়শৈলীর জন্য বিতর্কিত হয়েছেন, এবং দলের হারের দিনও যেভাবে তাকে নিয়ে চর্চা অব্যাহত রয়েছে ও তাকে দায়ী করা হচ্ছে, সেটি কখনোই ভালো কিছুর ইঙ্গিত দেয় না।

Comments
Spread the love